একটা মানুষ জীবনে ঠিক কতটা ঠোকর খায়—আমি জানিনা। উনিশ বছরের এই জীবনে আমি কম দুঃখ পাইনি। তবে পুরো জীবনটায় যত না কষ্ট পেয়েছি; তারচেয়ে বেশি কষ্ট বোধ হয় পেয়েছি গত একবছরে। মানুষ বলে, ‘আল্লাহ যাব দেতাহে ছাপ্পার ফার কে দেতা হ্যায়।’ আমাকে বোধ হয় ‘ছাপ্পার ফার কে’ শুধু দুঃখই দিয়েছেন।
প্রথমে বাবার অসুস্থতা; সেই বাহানায় তার চাকরি চলে যাওয়া; মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে জীবনযাত্রা নিম্নমধ্যবিত্ত পর্যায়ে চলে আসা; আত্মীয়-স্বজন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া—-কোনকিছুর কমতি ছিল? তবুও তো আমরা মানিয়ে নিয়েইছিলাম। ছিল তো আমাদের চারজনের একটা ছোট সুখী পরিবার? এই নীড় আমাদের গুঞ্জরনে মুখরিত ছিল তো?
সেটাও কেড়ে নিলেন আল্লাহ! আমার ভাইয়া, সুস্থ-সবল মানুষটা, এক সকালে বেরোল বাসা থেকে আর ফিরে এলো না! রোড এক্সিডেন্টে স্পটডেডকো! আগে থেকে কোন জ্বর-জারি নেই; বিমারি নেই—-একটা আচমকা হওয়া দুর্ঘটনায় চলে গেল তার প্রাণ?
আচ্ছা যাও। এটুকুও মেনে নিলাম। আল্লাহর মাল আল্লাহ নিলো। হায়াত-মওত সবেরই মালিক তিনি। নগণ্য মানুষ হয়ে তার বিপক্ষে কথা বলার সাহস কোথায়? এযে ঈমানের বড় পরীক্ষা!
কিন্তু এত এত পরিশ্রমের পরও দিনশেষে কপালে কিছুই জুটলো না? একটা ফুটো-কড়িও না? এ কি আমার প্রতি সৃষ্টিকর্তার অবিচার নাকি ভাগ্যের নির্মম পরিহাস!
ইদানিং অদ্ভুত অদ্ভুত চিন্তা আসে মাথায়। কাউকে বলতে পারি না। চুপচাপ থাকি। মাঝে মাঝে মা ডাকেন। কাছে বসিয়ে কি কি দুয়া পড়ে মাথায় ফু দেন। মিহি গলায় বলেন,
“মন ছোট করে না, মা। আল্লাহর সাথে অভিমান চলেনা। তিনি তো মালিক। এই কঠিন বিপদে তিনি সাহায্য না করলে আমরা যাবো কোথায়? ভরসা রাখো। হিম্মত রাখো।”
ভদ্রমহিলার আশ্চর্য রকমের ধৈর্য! আমি অবাকই হই আজকাল। ভাইয়ার মৃত্যুর পর প্রথম কিছুদিন খুব কান্নাকাটি করেছেন; পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর হঠাৎ একদিন ঠিক হয়ে গেলেন। একদম আগের মত। শুধু ঠোঁটের কোণ থেকে হাসিটা মিলিয়ে গেল।
‘হাসি’ অবশ্য এই বাড়ি থেকেই মিলিয়ে গিয়েছে। ভাইয়ার যাওয়ার পর আমরা কেউ একমুহূর্তর জন্য হেসেছি কিনা মনে পড়েনা। অথচ ভালো থাকার অভিনয় তো চলে প্রতিনিয়তই।
_____
আজ জানুয়ারির পঁচিশ তারিখ। গত দুই মাসে জীবনে কি কি ঘটেছে তার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণী দেই। আজকাল স্মৃতিশক্তি বড্ড চালায় তো তাই অনেক কিছুই ভুল হয়ে যেতে পারে। পাঠক মার্জনা করবেন।
চৌদ্দ তারিখ বিকেলে রেজাল্ট হওয়ার পর আমি খুব কাঁদলাম। একেবারে হাউমাউ করে কান্না যাকে বলে। এরমধ্যে মাগরিবের আজান হলো। বাবা নামাজ পড়ে বাসায় এসে শুনলেন রেজাল্ট। বিগত চার-পাঁচ বছর থেকে এবছর কাটমার্ক সবচেয়ে বেশি; মার্ক ডেন্সিটিও অনেক বেশি। চুয়াত্তর দশমিক দুই পাঁচ—-এবছরের কাটমার্ক। এর চেয়ে মাত্র দশমিক দুই পাঁচ নম্বর কম পেয়ে আমি পিছিয়ে গিয়েছি সর্বশেষ সিরিয়ালের আটাত্তর জন পেছনে। মার্ক ডেন্সিটি ঠিক কেমন, আন্দাজ করা যায়?
বাবা-মার কোনো প্রতিক্রিয়া হলনা। মা আগে বলতো, ‘মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মৃত্যু কোনো দুঃসংবাদ নয়!’ সম্ভবত এই কথা তারা মনেপ্রাণে মেনে নিয়েছেন। ভাইয়াকে হারানোর কাছে এই সংবাদ মোটেও ‘দুঃ’ কিছু নয়। লাইফ গোস অন!
আমার চেয়ে এক দশমিক পাঁচ নম্বর বেশি পেয়ে ইকবালের চান্স হলো রংপুর ডেন্টাল ইউনিটে। বেচারার দু'বছরের সাধনা সার্থক হলো। ওকে কখনো আমি হিংসা করিনি; তাই এই খবরটা আমার ভালোই লাগলো। ওকে অভিনন্দন জানালাম।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা মনে পড়ে গেল। এবার মানবিক গুণাবলী সেকশনে একটা প্রশ্ন ছিল, অনেকটা এরকম ‘তুমি নিজে কোনো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পরও তোমার কৃতকার্য হওয়া বন্ধুটিকে অভিনন্দন জানালে—-তুমি তাহলে কোন ব্যক্তি? সৌজন্যপূর্ণ, সহানুভূতিশীল নাকি অন্য কিছু?’ উত্তর হয় সৌজন্যপূর্ণ ব্যক্তি। নিজে চান্স না পেয়েও ইকবালকে কংগ্র্যাটস করে আমি তো ‘সৌজন্যপূর্ণ’ই হয়ে গেছি তাইনা?
ধ্যাত, এই বেলা আবার চোখ ভিজে আসছে। পাঠকদের গল্প না বলে, বসে বসে ন্যাকা কান্নার সময় আছে নাকি!
ইকবালদের চুক্তি ছিলো ভর্তি পরীক্ষার সময়টুকু থাকবে। ওরা তাই করলো। ডিসেম্বরের ষোলো তারিখে তল্পিতল্পা গুটিয়ে চলে গেল নিজেদের বাড়ি। যাওয়ার আগে ইকবাল কিছু বলতে চেয়েছিল বোধ হয়; আমি ওর সামনেও যাইনি।
এরপর আমাদের শূণ্য বাড়িতে রয়ে গেলাম আমরা তিনটি মানবমূর্তি!
ঢাবির পরীক্ষা ছিল বিশ ডিসেম্বর। ‘ওসমান হাদি' নামের একজন বিপ্লবী বীরের অকাল মৃত্যুতে রাষ্ট্রীয় শোক পালিত হলো। তাই পরীক্ষা স্থগিত হয়ে গেল। ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে দিশেহারা আমি ‘ওসমান হাদি'কে চিনতাম না একদমই। কৌতূহলী হয়ে অনলাইনে সার্চ করলাম। আপোষহীন বিপ্লবী তরুণ!
সাতাশ তারিখ ঢাবির পরীক্ষা হলো। মেডিকেল এক্সামের পর আমি আর পড়তে বসিনি। ভাঙাচোরা মন নিয়ে যা পারলাম তাই লিখলাম। এরপর ছাব্বিশ সাল এলো। জানুয়ারির তিন তারিখে কৃষি গুচ্ছ, ষোলো তারিখে রাবি। কোনো পরীক্ষাই পড়ে দিয়েছি—-বলবো না। ফলাফলে কিছু প্রত্যাশাও করছি না। মন ভেঙে গেলে যে আর কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করেনা!
বাসা থেকে কোনো প্রেশার নেই। মা - বাবা দু’জনেই খুব সহানুভূতি দেখিয়েছেন। যথেষ্ট ধৈর্য ওদের। দ্বিতীয়বারের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছে। আমি কিছু বলিনি। আপাতত সময় দিচ্ছি নিজেকে। কতদিন নিজেকে নিয়ে কিছু ভাবিনি আমি?
রাতের বেলা খাবার খেয়ে এসে কি যেন ভেবে একবার ফেসবুকে ঢুকলাম। এডমিশন রিলেটেড গ্রুপগুলোয় যুক্ত আছি বলে একটা পোস্টে দেখলাম, মেডিকেলের মাইগ্রেশনের রেজাল্ট দিয়েছে। ওয়েটিং থেকে চান্স পেয়েছে আরো একশো জন! পোস্টটা দেখেই আমার পিলে চমকে উঠলো। নিরাশ প্রাণে হঠাৎ করে জেগে উঠল একমুঠো আশা। আমি ওয়েবসাইটে ঢুকলাম। কাঙ্ক্ষিত রোলটা দেখেই চিৎকার দিয়ে উঠলাম,
“মা? আমার রংপুর ডেন্টালে চান্স হয়েছে! বাবা?”
__________
আজ ভর্তি হতে এসেছি ক্যাম্পাসে। গার্ডিয়ান এলাও করছেনা। ফরম ফিল আপ, টাকা জমা দেয়া, মেডিকেল টেস্ট—-সবকিছু একা করতে করতে আমার মনে পড়লো, আমি বড় হয়ে গেছি। ভাইয়া নেই। এখন আমার পরিবারের দায়িত্ব কেবল আমারই! অতীতকে ভুলে নয়, তাকে সঙ্গে করে নিয়েই আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। ভাইয়ার স্মৃতি সারাজীবন থাকবে আমাদের সঙ্গে। কিন্তু আমরা আর ওই এক জায়গায় আটকে থাকবো না। যুগের সাথে পাল্টাবো।
সবকাজ সারতে বেলা হয়ে গেল অনেকটা। আমি ফিরব বলে গেটের দিকে আসছি হঠাৎ ইকবালের দেখা! একমাস পর ওকে দেখছি; পরনে ব্লু লেদার জ্যাকেট, ডেনিম প্যান্ট। ইকবালের চেহারায় একটা ম্যাচিউর ভাব এসে গেছে। ও এগিয়ে এলো আমার দিকে।
“ফুলের জন্য ফুল?”
‘হাই হ্যালো’র ধারে কাছেও গেলনা ইকবাল। দু'টো সূর্যমুখী ফুল বাড়িয়ে দিলো। আমার চমকে যাওয়ার কথা। কিন্তু আমি চমকালাম না। বরং অদ্ভুতভাবে আমার ভালো লাগলো ওর আচরণ। যেন ‘হাই হ্যালো’র মত ক্যাজুয়াল কথাবার্তার প্রয়োজনই নেই। আমরা তো সব জানিই। হৃদয়ের লেনাদেনা কি নিভৃতেই হয়নি আমাদের?
“থ্যাংক ইয়্যু।”
আমি ফুল দুটো হাতে নিলাম। ইকবাল হেসে দিলো। টুকটাক কথা হলো আমাদের। ভর্তির কিভাবে কি করলাম, সব ঠিকঠাক করতে পেরেছি কিনা—-এইসব ক্লাসফেলো টাইপ কথাবার্তা!
এরমধ্যে ভুলেও আমরা পুরোনো কথা তুললাম না। বাসার কি অবস্থা; সবাই কেমন আছে; এসব বললেও সূক্ষ্ম ভাবে এড়িয়ে গেলাম আটাশে নভেম্বরের কথাটা। এ ব্যাপারে ইকবালের বিবেচনা বোধ ভালো লাগলো। গর্দভটার বুদ্ধি হয়েছে!
অনেকটা সময় গল্প করার পর আমি ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম। উঠতে চাইলেই, ইকবাল এগিয়ে দিতে চাইলো। রিকশা পাওয়া অবধি দুজনে হাঁটতে থাকলাম। এতক্ষণে ইকবাল বললো,
“বলো তো আমি তোমাকে সানফ্লাওয়ার কেন দিলাম? তাও দুইটা?”
“কেন? আমার প্রিয় ফুল সেজন্যে?”
আমি কোনো ভনিতা ছাড়াই প্রত্যুত্তর করলাম। ইকবাল একটু অবাক হলো তাতে; হয়তো ভাবেনি আমি মনে রেখেছি। কিংবা আশা করেনি আমার অকপট স্বীকারোক্তি? তথাপি নিজেকে সামলে নিলো,
“উহুম।”
ইকবাল দুদিকে মাথা নাড়ালো। আমি আগ্রহী চোখে তাকালাম; এবার হেসে বললো,
“কয়েকদিন আগে রিলসে একটা থিউরি শুনলাম। সানফ্লাওয়ার থিউরি।”
“সেটা কি রকম?”
“বলবো না।”
“কেন?”
উত্তর দিলনা ইকবাল। কেবলই হাসলো। আমরা পাশাপাশি হাঁটলাম আরও কিছুক্ষণ। একদম নিঃশব্দে, নিভৃতে। রিকশায় ওঠার সময় ইকবাল বললো,
“বাসায় গিয়ে এই থিউরিটা খুঁজবে। যদি ভালো লাগে তাহলে আমাকে ফোন করবে। এইযে এই নাম্বারে; ঠিক আছে?”
ইকবাল আমার হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে পালিয়ে গেল! আমি অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
বিকেলবেলা।
ভর্তি হয়ে আসার পর খুব ব্যস্ত ছিলাম। সব কীভাবে করলাম, ঠিক ঠিক মত করতে পারলাম কিনা—-সবই ডিটেইলস বলতে হলো মাকে। অনেকদিন পর বাসায় বিরিয়ানি রান্না হয়েছে আজকে। আমার চান্স পাওয়া উপলক্ষে। দুপুরে খেতে বসে একদফা মন খারাপ হলো। আমার আর ভাইয়া—-দুজনেরই বিরিয়ানি পছন্দ ছিল। ‘কম পেয়েছি, বেশি পেয়েছে’—- বলে মারামারি করতাম। ওর যাবার পর এই প্রথম বাসায় বিরিয়ানি; চোখ তো ঝাপসা হবেই। তবে নিজেকে সামলে নিলাম। সকালের কথা মনে পড়লো!
আছরের নামাজের পর ছাদে হাঁটছিলাম। হঠাৎ ইকবালের কথা মনে পড়ায়, দ্রুত ঘরে ফিরে এলাম। গুগলে সার্চ করলাম ‘সানফ্লাওয়ার থিউরি’। রিলস চলে এলো,
“কাউকে সূর্যমূখী ফুল উপহার দিলে দুইটা দিতে হয়। কারন দিনের বেলা যখন রোদ থাকে তখন সূর্যমুখী সূর্যের আলোর দিকে মুখ করে থাকে। কিন্তু যখন সূর্য ডুবে যায়, মানে রাত হয়- তখন সূর্যমুখী একে অপরের দিকে মুখোমুখি থাকে।
এর মানে হলো তখন তারা একে অপরের মাঝে আলো খুঁজে পায়। অর্থাৎ আপনি যখন কাউকে সূর্যমুখী উপহার দেন, তখন আপনি আসলে তাকে জানাচ্ছেন, আমি তোমার মাঝে আলো খুঁজে পাই; এমনকি অন্ধকারেও।”
আমি থিউরিটা শুনে একা একা হাসলাম কিছুক্ষণ। দু’হাতে ফুল দু’টো নিয়ে দেখতে লাগলাম। সেই প্রথম দেখায় ইকবালকে আমি গর্দভ ভেবেছিলাম; আজ এতোদিন পর এসে গর্দভের প্রেমে পড়েছি বলে ভারি লজ্জা লাগলো।
একটুপর আমি লাজুক মুখে ফোন করলাম ইকবালকে। প্রথম রিং হতেই রিসিভ হলো, যেন ফোনটা হাতে নিয়েই ছিলো। বললো,
“জিনিয়া সোবহানি? সানফ্লাওয়ার থিউরি খুঁজে পেলেন, ম্যাডাম?”
আমি হাসলাম,
“কি মনে হয়? না পেলে কল করতাম?”
“উহুম।”
ইকবালের গমগমে স্বর। আমি ফিচেল হাসলাম,
“তাহলে? কি বুঝলে?”
“বুঝলাম যে, আমার মাকে আবার দেখতে যেতে হবে তোমাদের বাড়ি। তবে এবার ফ্ল্যাট নয় কনের মুখ দেখতে!”
বলেই হাসতে লাগলো বদমাইশটা। আমি ফোন রেখে দু’হাতে মুখ ঢাকলাম। আমার আজ লজ্জার দিন, ভারি লজ্জার দিন!
_______সমাপ্ত______