আমার হঠাৎ করেই মনে হলো পৃথিবীটা থমকে গেছে। মাথার ভেতরটা অদ্ভুত শূণ্যতায় ঘেরা। আমি বোবা চোখে মার দিকে তাকালাম। মা আছড়ে পড়ে কাঁদছে,
“নিশানের বাইক এক্সিডেন্ট হয়েছে রে। ট্রাক চাপা দিয়ে গেছে আমার ছেলেটাকে। রাস্তায় পড়ে আছে রে। একজন ফোন করে বললো। আমার নিশান রে…”
মার কথা স্পষ্ট না। তবুও যা বোঝার বুঝে ফেললাম আমি। আমার দমবন্ধ হয়ে আসতে চাইলো। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করলো। বাবা এলোমেলো করে শার্ট পড়েছে; সেভাবেই দৌড়ালো। আমি নিজেকে আটকাতে পারলাম না। নিজেও ছুটে বেরোলাম বাবার সাথে!
_______
হাসপাতালের গেটে আমরা দাঁড়িয়ে আছি। রংপুর-সৈয়দপুর রোডে এক্সিডেন্ট হয়েছে। বাইকে দুজন ছিল। একজন মারা গেছে; অন্যজন গুরুতর আহত। এম্বুলেন্সে করে আনছে ওদের। যে ফোন করেছিল সে শনাক্ত করতে পারেনি আমার ভাইয়া কোনটা। শুধু ফোনটা পেয়ে কল করেছে। আমি সারাক্ষণ দুয়া পড়ছি; ভাইয়া যেন বেঁচে থাকে। আল্লাহ্! এতবড় দুঃখ দিও না আমাদের। একবার ভেঙেছে এই পরিবার; আরেকবার ভাঙলে সব শেষ হয়ে যাবে!
এম্বুলেন্সটা এলো। পেছনের দরজা খুলে বের করে আনলো একটা রক্তমাখা শরীর। আমি মুখ চাপা দিলাম নিজের। বাবা আঁতকে উঠলো। এ আমার ভাইয়া নয়!
পরের স্ট্রেচারটা এলো; রক্তমাখা শরীরটার মুখের উপর কাপড় ঢাকা। বাবা আমার কাঁধে হাত রাখলো, চোখের ইশারায় বললো কাপড় তুলতে। তার ক্ষমতা নেই তোলার। আমি কাঁপা কাঁপা হাতে কাপড়টা সরালাম। আল্লাহ গো!
“আমার নিশান!”
বাবা বসে পড়ল মেঝেতে। দুনিয়াটা ভেঙে এলো আমার। সবকিছু মিথ্যা মনে হতে লাগলো। আমি হামলে পড়লাম নিথর দেহটার উপর,
“এই ভাইয়া! এই! কি হয়েছে তোর? এভাবে আমাকে ছেড়ে যাস না প্লিজ। প্লিজ! এই ভাইয়া, উঠ না।”
আশেপাশের লোকজনেরা আমাকে টেনে সরাতে চাইলো। বাবা হাত ধরলো আমার। আমি ভাইয়াকে ছেড়ে বাবার গলা আঁকড়ে ধরলাম,
“ও বাবা! ভাইয়ার কি হইছে বলনা। ও শুয়ে আছে কেন? বাবা, ওকে উঠতে বলো। অনেক শয়তানি করেছে। এখন থামতে বলো। বাবা, বাবা গো!”
বাবা হাউমাউ করে কাঁদছে। কিছু বলছে না। আমি নিজেকে আটকাতে পারছিলাম না। ওরা স্ট্রেচারটা নিয়ে যেতে চায়। আমি দৌড়ে গেলাম,
“না, প্লিজ। ওকে হাসপাতালে নিওনা। ও বাবা, ওদের থামাও। প্লিজ!”
বাবাও দৌড়ে এলেন। আমার হাত ধরে কাতর চোখে তাকালেন। হয়তো বুঝতে পারছেন না। আমি একহাতে চোখ মুছলাম; আবারো ভিজে গেল অশ্রুতে। ঝাপসা চোখে তাকিয়ে বললাম,
“হাসপাতালে নিলে ওরা ভাইয়াকে আরও কষ্ট দেবে বাবা। অনেক কষ্ট দেবে! অটোপসি করবে; অনেক অনেক কষ্ট দেবে। থামাও প্লিজ! আমার ভাইটাকে আর যন্ত্রণা দিওনা।”
বাবা আমার দুহাত ধরলেন। আমি কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লাম নিচে। আমার ভাইয়া মরে গেছে। ও আর ফিরবে না। কিন্তু হাসপাতালে নিলে ওরা ওই দেহটাকে কেটে-কুটে শেষ করবে। আমার মরে যাওয়া ভাইটাকে ওরা আবার মেরে ফেলবে। আমি তা হতে দেবনা। না কিছুতেই না!
বাবার পা আঁকড়ে ধরলাম। কাঁদতে কাঁদতে বললাম,
“ভেতরে নিলেই ওরা পুলিশ ডাকবে। ওটোপসি করবে ওরা, বাবা। ভাইয়ার দেহটা কেটে-ছিঁড়ে একাকার করবে। প্লিজ থামাও না।”
“আচ্ছা। কিছু করবে না। তুমি ওঠো, আম্মু!”
বাবা আমাকে টেনে উঠাতে চাইলেন; আমি আরো জোরে চিৎকার করতে লাগলাম। ভাইয়াকে ওরা হাসপাতালের ভেতর নিয়ে গেছে। তারপর?
তারপর হঠাৎ আমার চোখের সামনে সব অন্ধকার হয়ে এলো। আমার আর কিছু মনে নেই!
______
আমার জ্ঞান যখন ফিরল তখন আমি বাসায়। লিশি আপু আমার মাথার কাছে বসে আছে। আমাকে জেগে উঠতে দেখে গালে হাত বুলিয়ে বললো,
“এখন কেমন লাগছে?”
আমি ওর হাতের দিকে তাকালাম। ঝাড়া মেরে ওর হাতটা সরিয়ে দিয়ে বিছানা থেকে নামলাম,
“তুমি? তুমি এখানে কি করছ? নাটক করতে এসেছ?”
“এসব কি বলছিস জিনু! পাগল হয়ে গেছিস?”
লিশি আপু আমার দিকে এগিয়ে এলো। ওকে বিশেষ পাত্তা দিলাম না আমি। দৌড়ে ঘর থেকে বের হলাম। বাসা ভর্তি মানুষজন। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী সবাই এসে উপস্থিত। আমি মাকে খুঁজলাম। ভাইয়ার ঘরে বসে কাঁদছে মা। চাচিরা ঘিরে ধরে আছে। ইকবালের মাও আছে দেখলাম। আমি যেতেই আমাকে জড়িয়ে ধরলো মা।
আমি ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকালাম। তারপর বললাম,
“এরা এখানে এসেছে কেন, মা?”
মা আমার প্রশ্নে অবাক হয়ে তাকালো,
“কারা?”
“এই যে সবাই। এরা কেন এসেছে? গত এক বছরে এদের তো কোন খবরই ছিল না! বাসার রাস্তা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। আজকে কেন এসেছে? দরদ দেখাতে?”
আমি মার বাহু ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ালাম। রাগে চিৎকার করতে লাগলাম।আমাকে থামাতে চেষ্টা করলো মা। হাত ধরে টানতে লাগলো। অন্যদের মুখের অবস্থা শোচনীয়। কিন্তু আজ তো আমি থামবো না। এতোদিন খোঁজ না নিয়ে এখন কেন এসেছে? হারামখোর গুলো!
ভাড়াটিয়া আন্টি হঠাৎ উঠে এলেন। আমাকে বোঝানোর চেষ্টা করে বললেন,
“জিনিয়া থামো মা। এমনই বাসায় একটা শোকের মাতম চলছে। আর ঝামেলা করোনা। আপনারা কিছু মনে করবেন না প্লিজ। বোঝেনই খুব কষ্টে আছে।”
শেষ কথাটা বাকি সবার উদ্দেশ্যে বললেন। বিনিময়ে দুটো মুখ ভেংচি আর কটুকথাও শুনতে হলো। আমিও জবাব দিলাম। শেষমেষ অন্যঘর থেকে ছোটমামী এসে টেনে নিয়ে গেলেন আমাকে।
এখন সাড়ে চারটা বাজে। ভাইয়াকে গোসল দিয়েছে। কাফন পরাবে একটুপর। বাদ মাগরিব দাফন করা হবে। হাসপাতালে তেমন ঝামেলা হয়নি। এক্সিডেন্ট সবার সামনে হয়েছে; বাবাও কেস করতে চায়না তাই ময়না তদন্ত করা হয়নি। ভাইয়াকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। আত্মীয়-স্বজন সবাই কাছাকাছি থাকে বলে আর অপেক্ষারও কিছু নেই। আমার ভাইকে ওরা যত দ্রুত সম্ভব বিদায় দিয়ে দেবে!
আমি একা গিয়ে দেখে এলাম একবার। গোসল করিয়ে গ্যারেজে রাখা লাশ। লাশ? কত সহজেই সকালের ভাইয়া, বিকেলবেলা লাশ হয়ে গেল তাইনা?
আমি ঢোক গিলে ওর মুখের কাপড় সরালাম। সকালবেলার রক্তমাখা ভয়াবহ মুখটাকে পরিষ্কার করার পর কি সুন্দর দেখাচ্ছে! মুখটাও কি হাসি হাসি। যেন পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। আমার চোখটা ভিজে উঠলো আবার। ভাইয়ারে, তুই এভাবে চলে যেতে পারলি? বলেছিলি ফিরে এসে শোধ তুলবি, এই তোর শোধ নেয়া? সারা জীবনের জন্য শোধ তুলে নিয়েছিস রে!
ঘরে ফেরার পথে ইকবালের সাথে দেখা হলো। করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। আমি হাসতে চেষ্টা করলাম। চোখে পানি নিয়ে সেই হাসি বোধ হয় আমার জীবনের সবচেয়ে জঘন্য হাসি। কারণ এই মুহূর্তে পৃথিবীর কারো করুণ দৃষ্টি নিয়েই আমার আর মাথাব্যথা নেই!
ভাইয়াকে ওরা নিয়ে যাচ্ছে। কান্নার রব উঠলো আরেকবার। আমি দৌড়ে গিয়ে মাকে জড়িয়ে ধরলাম। চোখের পানিতে ভিজে যেতে লাগলো মার শাড়ির আঁচল।
______
আমার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার ঠিক দু’ সপ্তাহ পূর্বে আটাশে নভেম্বর পবিত্র জুম্মার দিন আমার বড় ভাই ‘নিশান সোবহানি’ সড়ক দূর্ঘটনায় প্রাণ হারালো।
আমার পুরো পরিবার ভেঙে পড়লো এই ঘটনায়। আমার পড়ালেখা করার ইচ্ছেটুকু নষ্ট হয়ে গেল। একটা বর্ণও পড়তে পারতাম না। টেবিলে বসলেই নানান কথা মনে পড়তো। এই বুঝি ভাইয়া এসে মাথায় চাটা মারে। এই বুঝি টিটকারী করে বলে,
“কি রে গরু! পড়ছিস? চান্স হবে তো? নাহলে বের করে দেব কিন্তু বাসা থেকে!”
আমি আঁতকে উঠি; কই কেউ তো বলেনা। আমি ম্যাথে ডাব্বা ছিলাম; ভাইয়া সবসময়ই টপার। মেডিকেল কোচিংয়ে যখন ভর্তি হলাম; ভাইয়া সেদিন খুব হেসেছিল। গা জ্বালিয়ে বলেছিলো,
“ম্যাথ পারিস না এজন্য ভর্তি হইলি, তাইনা?”
কেউ খেতে বসে মারামারি করে না। কাপে চা বেশি নিয়েছি বলে দ্বন্দ্ব হয়না। আমার বইখাতায় জোর করে নিজের নাম সাক্ষর করে নষ্ট করে দেয়না। আমার জামা-কাপড় নিয়ে টিটকারী করে বলেনা, ছিঁড়ে গেছে। রাগ ধরানোর জন্য বলেনা,
‘তোকে কুড়িয়ে আনছি!’
অকারণে কেউ চুল ধরে টানেনা। মারেনা। বিরক্ত করেনা। আচমকা বাড়িটা শান্ত হয়ে গেছে। অদ্ভুত রকম শান্ত!
চারপাঁচদিন পর মা-বাবা নিজেকে সামলে নিলেন। আমাকে দেখে বললেন মন দিয়ে পড়তে। নানা ভাবে বোঝালেন। একসপ্তাহ পর মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। আমার সারা পরিশ্রম বৃথা যাবে যদি এখন না পড়তে পারি। মেডিকেলে না হলে যে অন্য ভার্সিটিতেও হওয়ার সম্ভাবনা নেই!
আমি তাদের কথা শুনলাম। কিন্তু লাভ হলোনা। আমার মন মরে গেছে। পড়তে আর ইচ্ছে করে না। দিনভর বসে থাকি পড়ার টেবিলে। বইয়ের পাতা উল্টাই! কিছু বুঝিনা; মাথায় ঢোকেনা। তবুও বসে থাকি। জোরে জোরে আওড়াই ওই কালো কালো অক্ষরের লেখাগুলো।
বারোই ডিসেম্বর। শুক্রবার।
সকাল দশটায় আমার পরীক্ষা। এই দিনটা নিয়ে আমার কত পরিকল্পনা ছিল! এইচএসসির পর ভেবেছিলাম তিনমাস ধুমিয়ে পড়বো; চান্স পাওয়া ঠেকায় কে! সবকিছুই ঠিক চলছিল শুধু দুই সপ্তাহ আগের ওই ঘটনা না ঘটলে… আটাশে নভেম্বরকে যদি কোনোভাবে মুছে ফেলা যেত জীবন থেকে!
চোখ ভিজতে গিয়েও আটকালাম। পরীক্ষা হলো একরকম। না ভালো; না মন্দ। আমি বিরস মুখে হল থেকে বেরিয়ে বাবাকে খুঁজলাম। গিজগিজ করছে মানুষ। অনেকের চেহারাতেই উচ্ছ্বাস; অনেকের বেদনার নীল ব্যথা। আমি অভিব্যক্তিহীন চোখে সবাইকে দেখলাম। ভিড় ঠেলে বেরোতে গিয়ে ইকবালের সাথে দেখা হলো। ওর মনটা খুব খারাপ। জিজ্ঞেস করলো,
“পরীক্ষা কেমন হয়েছে?”
“হলো একরকম। তোমার?”
“খুব একটা ভালো না। সহজ জিনিস ভুল করে রেখে এসেছি। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেছে!”
আমি কিছু বললাম না। মাথা নাড়ালাম কেবল। ইকবালের দুঃখ হওয়া স্বাভাবিক। সেকেন্ড টাইম দিচ্ছে। দু’ বছরের সাধনা। আমার কি অনুভূতি হচ্ছে বুঝতে পারছি না। চান্স না হলে বাবা-মা খুব কষ্ট পাবে। কিছুদিন আগেই একটা বড়সড় আঘাত পেয়েছে, এখানেও আঘাত পেলে সইবে কি করে! আমি আকাশের দিকে তাকালাম। রোদ উঠেছে খুব; নীল আকাশ সাদা মেঘে পূর্ণ। আমি মনে মনে আল্লাহকে ডাকলাম,
“আল্লাহ্! এবার অন্তত আমার তকদিরে সুখ লিখ? অনেক তো হলো। আর যে ভার বইতে পারছি না!”
ইকবাল আমার বাবাকে দেখতে পেয়েছে। সোয়েটারের হাতা ধরে টেনে নিয়ে যেতে লাগলো সেদিকে।
________
চৌদ্দ তারিখ বিকেলে রেজাল্ট হলো। আমার জীবনের আরেকটা কঠিন দুঃসংবাদ হলো সেই রেজাল্ট। দশমিক দুই পাঁচ নম্বরের জন্য আমার মেডিকেলে চান্স হলোনা!