বাবার কথা ফেলার সাধ্য আমার নেই। ছোটবেলা থেকে আমি বাবার কথাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে এসেছি। তাই এবারও বাবার কথাকে অগ্রাহ্য করতে পারলাম না। ইকবালের মত আমিও মেডিকেল কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে গেলাম।
সেপ্টেম্বরের তিন তারিখ ওরিয়েন্টেশন হলো। পাঁচ তারিখ থেকে আমার ক্লাসও শুরু হয়ে গেল। বলতে গেলে পরীক্ষার পর ছুটি কাটাতেই পারলাম না একটুও। অবশ্য এখন আর সময় নষ্ট করা যাবেনা। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা সবার আগে হয়। তাই যারা ভার্সিটি এক্সাম দেবে তাদের চেয়ে সময়টা কমই পাওয়া যাবে। এই নিয়ে মা বেশ অসন্তুষ্ট। একে সময় কম, দ্বিতীয়ত ফুল সিলেবাসের প্যারা—-চান্স হবে কি-না আশঙ্কা থেকেই যায়। আর যারা মেডিকেল কোচিং করে তাদের জন্য পরবর্তীতে ভার্সিটিতে চান্স পাওয়া খুবই কঠিন। কারণ একটা বৃহৎ সংখ্যক শিক্ষার্থী আগে থেকেই ওই ভার্সিটির জন্য প্রিপারেশন নিচ্ছে। ভর্তিযুদ্ধে ওদের সাথে লড়াইয়ে বিজয়ী হওয়া মুখের কথা নয়!
বাবা-মা দুইজনের দুই চাওয়ার মাঝখানে ভাইয়া নিরপেক্ষ মতামত দিলো, বাবার কথা অনুযায়ী মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দেই। চান্স না হলে গুচ্ছ আর কৃষিগুচ্ছর জন্য আবার চেষ্টা করা যাবে। সাধারণত মেডিকেলের পরপরই অন্যান্য ভার্সিটিগুলোর পরীক্ষা হয়ে যায়। কিন্তু গুচ্ছ আর কৃষিগুচ্ছর পরীক্ষাটা বেশ পরেই হয়। মোটামুটি দুই-তিনমাসের মতো সময় পাবো।
ভাইয়ার হস্তক্ষেপে মার রোষ কিছুটা কমলো। আমিও মন দিলাম বর্তমান পড়ায়। একদিন পর পর সকাল সাতটা পনেরোয় ক্লাস। ইকবালের ক্লাস দশটায়। তাই আসার পথে প্রায়ই দেখা হয়ে যায়। ইকবাল পড়ালেখা বিষয়ে বেশ খোঁজ-খবর নেয়। আমি সেগুলোর উত্তর করি। বাড়তি কথা বলিনা।
দেখতে দেখতে মাসখানেক পেরিয়ে গেল। রেজাল্টের দিন ঘনিয়ে আসছে। একেকটা দিন কাটে টেনশনে। মনে পড়ে যায়, হলে বসে কি কি ভুল করে এসেছি। একেকবার একেক বিষয়ের কথা ভাবি আর আতঙ্কে শিউরে উঠি। আবার মনে হয়, টিচার যদি খাতা দেখতে ভুল করেন? কোনভাবে ফেল এসে গেলে? ভাবলেও কলিজা শুকিয়ে আসে। আল্লাহ গো! এবারের মতো বাঁচিয়ে দাও।
এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জামানায় একটা বোর্ড পরীক্ষা হয়েছে; পঁচিশের এসএসসি ব্যাচ। তাদের রেকর্ড ভালো না মোটেও। সেই হিসেবে আমাদের কেমন হবে তা ভেবেই আমি ভয়ে সেঁধিয়ে যাচ্ছি। এ পর্যন্ত তিনবার রেজাল্টের দিন ঘোষণা করেছে; পাল্টেছে। যত সময় পার হচ্ছে, জল্পনা-কল্পনা বাড়ছে হু হু করে। কেউ কেউ বলছে, অর্ধেকই ফেল করবে। প্লাসের সংখ্যা কমে যাবে অনেক। কি যে হয়!
_______
অক্টোবরের ষোলো তারিখ আজ। এইচএসসির রেজাল্ট হবে আমার। সাধারণত টেনশনে মানুষের ঘুম খুব কম হয়। আমি এর ব্যতিক্রম। টেনশনে আমার বেশি ঘুম হয়; তাও শান্তির ঘুম।
যাইহোক, রেজাল্ট দেয়ার কথা দশটায়। আমি আরাম করে ঘুম থেকে উঠলাম নয়টা চল্লিশে। কোচিং বন্ধ আজকের জন্য।
উঠেই একদফা বকা হজম করলাম মায়ের। দেরিতে উঠে কোন মহাভারত শুদ্ধ করে ফেলবো এই নিয়ে চর্চা চললো কিছুক্ষণ। আমি নিঃশব্দে দাঁত মাজতে মাজতে সেসব শুনলাম এবং এককান দিয়ে ঢুকিয়ে অন্য কান দিয়ে বের করে দিলাম। বাসায় তখন আমরা তিনজন। ভাইয়া ভার্সিটি গিয়েছে।
নাশতা নিয়ে বসতে বসতে নয়টা আটান্ন বাজলো। মাত্র দুইমিনিট বাকি আর। কি ভেবে উঠে গেলাম ঘরে। ফোনে আগেই মেসেজ টাইপ করে ড্রাফটে রাখা ছিল। স্ক্রিনে ঠিক দশটা বাজতে দেখেই সেন্ড অপশনে ক্লিক করলাম। উমিদ ছিলনা দ্রুত রিপ্লাইয়ের। কিন্তু আমাকে সর্বোচ্চ অবাক করে দিয়ে ফিরতি মেসেজ এলো কিছু সেকেন্ডের ব্যবধানে। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে গেল রীতিমত। প্রাণপণে চিৎকার করলাম,
‘ও বাবা! মা!’
ওঘর থেকে বাবা ছুটে এলেন। মা বাথরুমে কাপড় ধুচ্ছেন, সেভাবেই চেঁচালেন,
“কি হলো, জিনিয়া? রেজাল্ট দিলো নাকি?”
বাবার প্রশ্নাত্মক চাহনির বিপরীতে আমি ফোনটা বাড়িয়ে দিলাম। আর নিজে কেঁদে ফেললাম ভেউ ভেউ করে। বাবা সময় নিলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে পড়ে শোনালেন,
ZINNIA SOBHANI;
HSC BOARD: DINAJPUR;
ROLL: 13****;
GPA: 5.00;
আমি কাঁদতে কাঁদতে মেঝেতে বসে পড়লাম। বিছানায় মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলাম। বাবা ফোন রেখে মাকে ডাকলেন,
“তোমার মেয়ে কেঁদে বাড়িঘর ভাসায় ফেললো। তাড়াতাড়ি এসো!”
তারপর ধীরে ধীরে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন,
“কাঁদছিস কেন? যা চেয়েছিস তা তো পেয়েছিসই!”
_______
রেজাল্টের পর আমি হাউমাউ করে কেঁদেছি এই খবরটা সারা এলাকায় চাউর হয়ে গেল। সর্বপ্রথম আমাকে কল করলো ভাইয়া। রিসিভ করতেই হৈহৈ করে উঠলো,
“কি রে ছাগলা! তুই নাকি রেজাল্ট শুনে কেন্দে দিয়েছিস?”
ওর ভেংচানো ‘কেন্দে’ শব্দটা শুনে আমি ভয়াবহ লজ্জা পেলাম। তথাপি নিজের মুখ রাখতে বলে ফেললাম,
“তাতে কি সমস্যা? আটান্ন দশমিক আট তিন শতাংশ পাশ করছে। যদি পিছলায় যাইতাম?”
“নাটক রে! গোল্ডেন পেয়েও তোদের টপারগুলোর কান্নাকাটি। আমরা তো পাশ করলেই খুশি!”
ভাইয়া চেতানোর চেষ্টা করে গেল। আমিও পাল্টা জবাব দিতে লাগলাম। এমন না ওর রেজাল্ট খারাপ।এইচএসসিতে এক সাব্জেক্টে প্লাস আসেনি। কিন্তু জিপিএ ফাইভ তো! তারপরও সুযোগ পেলে আমাকে ‘ঢংগী টপার’ বলাটা ওর অভ্যাস। হুহ!
রেজাল্টের জন্য বাবা মিষ্টি কিনে আনলো বিকেলে। যেহেতু ইকবালদের ফ্ল্যাটই সবার আগে; সেহেতু প্রথমে ওদের বাসাতেই গেলাম। অবশ্য রেজাল্টের খবর ওরা আগেই পেয়েছে।
দরজা খুললো ইকবাল। আমাকে মিষ্টির প্লেট নিয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে হেসে বললো,
“খুকি থেকে ইন্টার পাশ হয়ে গেলেন, ম্যাডাম?”
“হুম। হলাম। মিষ্টি নাও।”
আমি স্মিত হেসে এগিয়ে দিলাম প্লেটটা। ইকবাল নিলো না। দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। আমি তাকাতেই বললো,
“একটা কথা বলি?”
“না।”
আচমকাই কি ভেবে যেন উত্তরটা বেরিয়ে গেল মুখ থেকে। প্লেটটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে আমি দ্রুত বাসায় ঢুকলাম। পেছনে ইকবাল হাসলো একচোট। টিটকারি করে বললো,
“ভয় পেয়ে গেলে নাকি?”
বাস্তবিকই ভয় পাওয়ার মতো কথা। ভয় পাবোনা কেন!
ইকবালকে আমি এড়িয়ে যেতে লাগলাম সূক্ষ্ম ভাবে। একই বাসায় থাকি। দেখা হয় প্রতিনিয়তই। ও কথা বলে, আমি যতোটা সম্ভব মাথা নাড়িয়েই জবাব দিয়ে ফেলি। আমার ভয় হয় খুব। আমার ইনটুইশনকে আমি বিশ্বাস করিনা। আবার অবিশ্বাস করারও সাহস পাইনা!
আমি যে ইকবালকে ইগনোর করছি এটা সম্ভবত ও নিজেও বোঝে। অবশ্য কিছু বলেনা। আমি চাইও না বলুক। আমি চাই ও নিজেই বুঝে যাক। আমার অনুমানকে ভুল প্রমাণ করে দিক। বাড়াবাড়ি না করুক। এতে যে দু’জনেরই মঙ্গল!
আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন। এই উপলক্ষ্যে আমাদের ভর্তি পরীক্ষাগুলোর দিন এগিয়ে এলো। আজ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়েছে বারোই ডিসেম্বর নাকি মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা! শুনেই আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। এতো দ্রুত কীভাবে কি পড়বো? এ-তো রীতিমত জুলুম!
ঢাবির পরীক্ষা বিশ ডিসেম্বর। বাকি সব বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাই ডিসেম্বর-জানুয়ারির মধ্যে হয়ে যাবে। মেডিকেলে চান্স না হলে যে অন্য কোথাও হবে সে সুযোগটুকুও হবেনা। সব পরীক্ষাগুলো পরপর। হায়রে অভাগা পঁচিশ ব্যাচ!
সময় এগিয়ে এসেছে বলে কোচিংয়ের রুটিনও পাল্টালো। ধর তক্তা মার পেরেকের মত এরাও শুরু করলো—-‘আসো, ক্লাস করো আর পরীক্ষা দাও’ নীতি। প্রতিদিন সকালে ক্লাস, ক্লাসটেস্ট, সপ্তাহে টিউটোরিয়াল! পড়ার প্রেশারে আমার বাইরে বেরোনোই বন্ধ হয়ে গেল। এতে অবশ্য সুবিধা হয়েছে। ইকবালের সাথে দেখা হচ্ছে না। বাঁচোয়া!
কিন্তু আজ সকালে কোচিং থেকে ফেরার সময় দেখা হয়ে গেল ইকবালের সঙ্গে। হেসে ‘হাই’ বলতেই আমিও ‘হ্যালো' বলে চলে আসবো তখনই পিছু ডাকলো,
“জিনিয়া শোনো?”
“বলো।”
আমি ঘুরে তাকালাম। হাত দিয়ে এগিয়ে আসার ইশারা করলো ইকবাল,
“একটু এদিকে আসবে?”
আমি গেলাম না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। অগত্য ইকবাল নিজেই এগিয়ে এলো। আমার মুখোমুখি হয়ে নরম গলায় বললো,
“তুমি কি কোনো কারণে আমার উপর রেগে আছো, জিনিয়া? কিংবা মন খারাপ করে আছো?”
“কেন? মন খারাপ কেন হবে?”
“তাহলে আমাকে ইগনোর করছ কেন?”
ইকবালের অকপটে করা প্রশ্নের কোনো তাৎক্ষণিক জবাব আমার কাছে মজুদ ছিলনা। আমি ঠোঁট টিপে মাথা নামিয়ে রাখলাম। কথা ঘুরিয়ে বললাম,
“ইগনোর কোথায় করেছি? এডমিশন সামনে; সময় তো নেই কারোরই।”
“কথা ঘুরিও না।”
আমি চট করে মুখ তুলে তাকালাম। ইকবাল অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। ওই দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকা অসম্ভব। আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম। সেটা দেখে শান্ত কিন্তু দৃঢ় গলায় বললো,
“বিকেলবেলা ছাদে আসবে। তোমার সাথে কথা আছে।”
ইকবাল চলে গেল কোচিংয়ে। আমি দ্বিধা নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম কিছুক্ষণ।
_____________
সারাবেলা আমার মাথায় চেপে বসে রইলো ‘ইকবাল’। কিছুতেই কিছু ভাবতে পারলাম না। মস্তিষ্ক বলছে,
‘ছাদে যাওয়া বিপদ। কিছুতেই যাস না!’
মন বলছে,
‘গিয়ে একবার দেখই না। তুই যা ভাবছিস তা নাও তো হতে পারে?’
দ্বিধার দেয়াল ভেঙে আমি শেষপর্যন্ত ছাদে গেলাম। ইকবাল দাঁড়িয়ে আছে রেলিংয়ের কাছাকাছি। আমাকে চোখের ইশারায় ডাকলো। আমি নিঃশব্দে পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। অনবরত ঢোক গিলে যাচ্ছি। মনের ধারণা ভুল হোক। প্লিজ, প্লিজ, প্লিজ!
“তোমার প্রিয় ফুল কি, জিনিয়া?”
আচানক এই প্রশ্নে আমার চটকা ভাঙলো। মুখ তুলে তাকাতেই ইকবাল আবারো প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“বলো তোমার প্রিয় ফুল কি? যেটা দেখলে তুমি আনন্দে সব ভুলে যেতে পারো?”
আমি উত্তর দেয়া-না-দেয়া নিয়ে দ্বন্দ্বে পড়ে গেলাম। ইকবাল নরম হলো। ঘুরে আমার বরাবরে দাঁড়ালো। চোখে চোখ রাখলো,
“বলো?”
“সূর্যমুখী।”
“সূর্যমুখী!” —-আমার সাথে সাথে আওড়ালো। আমি আবারও ঢোক গিললাম। ইকবাল বলতে চাইলো,
“তোমাকে কেউ সূর্যমুখী দিলে তুমি খুব আনন্দিত হবে? যদি আমি তোমাকে এই ফুল দিয়ে বলি…”
ইকবালের চোখের ভাষায় কিছু লেখা ছিল। অজ্ঞ আমি পড়তে চাইলাম না। ওই ভাষা বোঝার সাধ্য আমার কখনো না হোক। ওকে থামিয়ে দিতে বাঁ হাত উঁচিয়ে ধরলাম; মনে যথেষ্ট পরিমাণ সাহস রাখতে নিচের দিকে তাকিয়ে বললাম,
“তুমি কিছু বলো না, প্লিজ। আমার কাছে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোথাও চান্স পাওয়া। তুমি তাতে আমাকে ‘স্বার্থপর’ বলতে পারো, কিন্তু আমার অবস্থাটা শুধু আমি জানি, ইকবাল। এই যাত্রায় ব্যর্থ হলে আমার সমস্ত পরিশ্রম নষ্ট হয়ে যাবে! আমার সব শেষ হয়ে যাবে!”
“তুমি আমার কথাটা একবার…”
“ইকবাল, প্লিজ!”
ইকবাল তবুও তাকিয়ে রইলো নিস্পলক। আমার বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে উঠলো। কাউকে ভালোবেসেও দ্বিধান্বিত থাকার এই পরিস্থিতিতে তো আমি কোনদিন পড়তে চাইনি। তবুও কেন পড়তে হলো?
আমি দৌড়ে নেমে এলাম ছাদ থেকে!