গুঞ্জরনের নীড়ে

পর্ব - ১২

🟢

আমি বিভ্রান্ত হয়ে বললাম, “কেন?”

“কেন মানে? কয়দিন পর পরীক্ষা না তোমার? চলো চলো।”

ইকবাল তাগাদা দিতেই আমি বিরক্ত চোখে তাকালাম,

“কি আশ্চর্য! আমার এখানে থাকা নিয়ে তোমার সমস্যা কি? সরো দেখি, ওপাশে যাবো।”

ওকে পাশ কাটাতে চাইলেই আবারও মুখের সামনে এসে দাঁড়ালো। রাগ রাগ কণ্ঠে বললো,

“বললাম না, যাওয়া যাবে না ওদিকে?”

“সমস্যা কি?”

আমি দ্বিগুণ চেতে উঠলাম। ইকবাল হতাশ হলো,

“ওদিকে ভুট্টা আছে।”

“তো?”

“তুমি বোঝো না, জিনিয়া? ভুট্টা ওখানে ওর প্রেমিকার সাথে আছে। তুমি ওখানে কেন যাবে?”

“ভুট্টার প্রেমিকা আছে? সিরিয়াসলি? বিড়ালরাও প্রেম করে?”

আমি এবারে উৎসাহ পেলাম যেন। ইকবালের ওই ধবধবে সাদা বিড়ালটার প্রেমিকাকে দেখতে বেশ আগ্রহ জাগলো। বিড়ালেরা কি র‍্যাসিস্ট হয়? ওদের মধ্যে সাদাকালোর ভেদাভেদ নেই?

ইকবালের ভ্রু কুঁচকে এলো,

“তুমি কি আসলেই বোঝনি? নাকি বুঝেও আমার সঙ্গে মজা করছ?”

আমি ঠোঁট উল্টে বললাম, “কি বুঝবো? এখানে বোঝার কি আছে?”

“তুমি একটা মূর্খ। বায়োলজিতে ডাব্বা মারবে।”

ইকবাল রেগেমেগে অস্থির! ধুপধাপ পায়ে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলো। আমি বেকুব হয়ে একবার উঁকি দিলাম ওদিকে। তাতেই আমার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো। ইয়া আল্লাহ্! ছিঃ! ইকবালের দুশ্চরিত্র বিড়ালটা কি করছে—দেখেই লজ্জায় আমার মাথা কাটা গেল।

আমি একপ্রকার লাফিয়েই নিচে নামতে লাগলাম,

“এই কথা তুমি আমাকে বলবে না? ছিঃ! কি দেখলাম! তোমার ভুট্টা একটা নষ্ট!”

ইকবাল তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়লো। ঘাড় বাঁকিয়ে তেরছা চোখে তাকালো,

“নষ্টের কি আছে? ন্যাচারাল সিস্টেম! গরমে ওদের হিটিং সাইকেল চলে না? আর যা দেখেছ, নিজের দোষে। আমি তোমাকে নিষেধ করেছিলাম।”

“কিভাবে নিষেধ করেছিলে? ভালো করে বলতো ঠিকই বুঝতাম!”

ইকবাল কিছু না বলে তীক্ষ্ম দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। ভেতরে ভেতরে রেগে ফেটে পড়ছে। আমি কি করব! আমার মোটেও দোষ নেই। আমি না কখনো বিড়াল পেলেছি; না এই ব্যাপারে আমার জ্ঞান আছে। নিজের লজ্জা ঢাকতে গিয়েই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল,

“দেখেছি বেশ হয়েছে। নাহলে তো জানতেই পারতাম না, তোমার ভুট্টার চরিত্র। যেখানে-সেখানে… আর তুমি? ওর জন্য নির্লজ্জের মত পাহাড়ায় বসে ছিলে! ইসস!”

“এবার কিন্তু বেশি বলে ফেললে, জিনিয়া! ওকে আমরা আটকেই রেখেছিলাম বাসায়। কখন বেরিয়েছে, খুঁজতে এসেই দেখলাম…”

আমি আর কিছু বললাম না। মুখ ভেংচে চলে এলাম বাসায়। ঘরে ঢুকেই লজ্জারা ঘিরে ধরলো পুনরায়। ধ্যাৎ! আমি একটা গাধা!

______

পরের কয়েকদিন আমি পারতপক্ষে ইকবালের মুখোমুখি হলাম না। অবশ্য ওর দুশ্চরিত্র বিড়ালটার সাথে ঠিকই দেখা হলো। ছাদেই যেন আস্তানা গেড়েছে বদমাইশটা! একেকদিন একেক প্রেমিকা নিয়ে আসে। আমি দু’দিন দেখলাম দু’টোকে নিয়ে ঘুরছে।

জিনিয়ার সেই কলিটা ফুটেছে। গাছগুলোতে অনেক কলি এসেছে। ইকবাল বেশ কিছু চারা দিয়েছিল। সবগুলোরই সম্ভবত ভিন্ন রং। প্রথম যেটা ফুটলো ওটা লাল রঙের ছিল। কয়েকটা কলি এখন হলুদ, কমলা আর গোলাপি রঙের। আরেকটা গাছের কলি কেবল এসেছে। কি রং হবে ফুলের, কে জানে!

পরশু থেকে আমার এইচএসসি শুরু। সিট পড়েছে রোকেয়া কলেজে। বাসা থেকে বেশ দূরেই; আমি একা যেতে পারবনা। কিন্তু সমস্যা নেই। ভাইয়ার ভার্সিটিতে কীসের যেন ছুটি আছে। কয়েকদিন যাতায়াত করবে। তারপর তো চেনা হয়েই যাবে! আমি নিজেই যেতে পারবো।

সকাল সকাল দাদু-দাদি এসে হাজির। যদিও আমার দাদাবাড়ি কাছাকাছিই। রংপুর থেকে জলঢাকা কতটুকুই বা দূরত্ব! ওরাও নিয়মিত আসা-যাওয়া করে। রংপুরেই আমার বাকি দুই চাচা আর ফুপু থাকেন। তবে আমাদের বাসাতে অনেকদিন পর এলেন।

আমি বেশ খুশি হয়েই উঠে গেলাম পড়া থেকে; দেখা করে আসি। টুকটাক কথা বললেন। কেমন আছি, কি অবস্থা, বাড়ি যাইনা কেন—-এইসব। আমার পরীক্ষার কথা একবার জিজ্ঞেসও করলেন না! ভুলে গেছেন ভেবে আমিই উঠতে উঠতে বললাম,

“পরীক্ষা আছে তো। আমি যাই, পড়তে বসি।”

“আচ্ছা, যাও।”

আমি দুজনের মুখের দিকে তাকালাম। ইচ্ছে করেই কি তুললেন না কথা? আমার ফুপাতো বোন, নিধিরও পরীক্ষা। ও অবশ্য আলিম দিবে। নিধিকে দাদি সোনার চেইন বানিয়ে দিয়েছেন, পরীক্ষা উপলক্ষ্যে। পরশুদিন নিধি কল করেছিল মাকে; পরীক্ষার জন্য দুয়া চাইতে। আমার সাথেও কথা হলো, তখন বলেছে। সেখানে আমাকে একটু জিজ্ঞেস করা যেতনা?

খানিক মন খারাপ নিয়েই আমি পড়তে বসলাম। দাদিরা থাকলেন না অবশ্য। দুপুরের খাবার খেয়েই চলে গেলেন। যাওয়ার সময় আমি পরীক্ষার জন্য দুয়া চাইলাম। ‘দুয়া তো করিই সবার জন্য’ বলেই ওরা চলে গেল। আমার এবার সত্যিই খুব খারাপ লাগলো। ওদের বিদায় দিয়ে বাসায় ঢুকেছি ভাইয়ার সাথে দেখা। হেসে বললো,

“কি রে? মুখ দেখে মনে হচ্ছে গান্ধি পোকায় পেদে দিছে? এরকম করে আছিস কেন?”

“কিছু না।”

আমি উদাস হয়ে ঘরের দিকে পা বাড়ালাম। ভাইয়া মাকে জিজ্ঞেস করলো,

“এই হাম্বার কি হইছে? এখনি না হেসে হেসে কথা বলল দাদির সাথে।”

“কি হবে? নিধিকে সোনার চেইন দিয়েছে, ওরে দেয়নি। তাই!”

ঘরে যেতে যেতে কানে এলো উত্তরটা। আমি তড়াক করে ঘুরে দাঁড়ালাম,

“মোটেও না! সোনার চেইন দিয়ে আমি কি করব? ভালোমত একটু জিজ্ঞেস করলেও তো হতো। সেটাও করলো না। আমি ক'বার ইঙ্গিত দিলাম, যাওয়ার সময় তো বললামও সরাসরি। দুয়া করিয়েন।”

“বললো তো সবার জন্যই দুয়া করে। সমস্যা কি?”

মা এমনভাবে বললো আমার সত্যিই কান্না পেয়ে গেল। আমি রাগ করে ঘরে ঢুকে বললাম,

“কোনো সমস্যা নাই। আমি পড়তে বসবো। জ্বালাবা না।”

______

আমি ভেবেছিলাম, আমার কষ্টটা কেউ বোঝেনি। আমি যে সত্যি কি আশা করেছিলাম ওরা বোঝেনি। সোনার চেইন দিয়ে আমি কি করবো? আমার কখনোই অলংকারের প্রতি মোহ ছিলনা। মা জোর করে ছোটবেলায় কান ফুটো করে দিয়েছিল, দুল কখনোই পরিনা। নাক ফুটো করিনি। গলায় চেইন পরা তো আমার কাছে দেখতেও ভালো লাগেনা। আমি কি করব! আমি শুধু আশা করেছিলাম, একটু আদর করে খোঁজখবর নেবে। মানুষ তো ভালো সালামিও পায় পরীক্ষার সময়। এসএসসির সময় আমাকে দাদু নিজেই দুশো টাকা দিয়েছিল। ছোট চাচা দিয়েছিল পাঁচশ। বড় চাচা আর ফুপু দু’জনেই জামা কিনে দিয়েছিল। এবার কেউ খোঁজটুকুও নিলো না!

নিধির কিন্তু এমন হয়নি। সে ঠিকই পেয়েছে সব। আর এখানেই যে আমার কষ্টটা—-কেউ বুঝবে না?

অবশ্য আমার নানা বাড়ির লোকজন ঠিকই মনে রেখেছে। আমার নানা-নানি বেঁচে নেই। মামা-খালাদের বাসাতেও তেমন যাইনা। তবুও ফোন করে খোঁজ নিয়েছে। দুই মামাই বিকাশে সালামি দিয়েছে। ছোট খালামণি বলেছে পরীক্ষার পর ঢাকায় তাদের বাসা যেতে। আমার জন্য গিফট আছে। অথচ আমি তাদের কাছে আশাও করিনি। জীবন খুবই অদ্ভুত আসলে। যাদের কাছে প্রত্যাশা থাকে, তারা তা পূরণ করেনা। যাদের কাছে কিছুই চাইনা, তারাই বোধ হয় দু’হাত ভর্তি করে দেয়!

গুঞ্জরনের নীড়ে মৌরিন আহমেদ

সকাল দশটায় পরীক্ষা। সেন্টার যেহেতু একটু দূরে তাই বাবা আগেই বেরোতে বলেছে। প্রথম পরীক্ষা, অনেকেরই পরিবার সাথে যাবে। রাস্তায় জ্যাম হওয়ার সম্ভবনা বেশি।

তাই সাড়ে আটটাতেই বেরিয়ে পড়লাম। মা বললো, ভাড়াটিয়া আন্টিকে বলে যেতে। মার সাথে ওনার খুব খাতির। আমারও খোঁজ নেয় সবসময়ই। কলিং বেল বাজাতেই ইকবাল দরজা খুলে দিলো। আমার পোশাক দেখে বললো,

“পরীক্ষা দিতে যাচ্ছ? প্রিপারেশন কেমন?”

“আলহামদুলিল্লাহ্। আন্টি কই? ডাকো।”

আন্টি ভেতরে ছিল। বেরিয়ে এসে বললো,

“এইযে এখানে আমি। পরীক্ষা ভালো করে দিও, আম্মু। এই নাও তোমার জন্য গিফট।”

আন্টির হাতে একটা কালো রঙের বক্স। খুলে দেখালেন একটা সুন্দর ঘড়ি। মা বললো,

“ঘড়ি লাগবে না, ভাবি। জিনিয়ার ঘড়ি আছে। নিশান পরশুদিনেই একটা কিনে এনেছে ওর জন্য।”

ভাইয়াও ঘড়ি দিয়েছে আমাকে। সেটা হাতেই পরা ছিল। আন্টি বললেন,

“তাতে কি? এটাও পরবে। অনেকগুলো পরীক্ষা তো।”

“হ্যাঁ, তাইতো। এটাও পরো জিনিয়া। আমি চয়েজ করে কিনেছি।”

ইকবাল তাকালো আমার চোখের দিকে। ওর দৃষ্টিতে কি যেন ছিল। আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। আন্টির সাথে কথা শেষ করে আমি আর ভাইয়া বেরোলাম।

দুপুর একটার সময় পরীক্ষা শেষ হলো। অঢেল মানুষের ভিড়ে চ্যাপ্টা হয়ে কোনমতে বেরিয়ে বাবাকে পেলাম। ভাইয়ার আসার কথা ছিলো। কিন্তু বাবা আসাতেই বেশি ভালো লাগলো। পরীক্ষার খোঁজ-খবর নিতে নিতে আইসক্রিম কিনে দিলো বাবা।

আমার পরীক্ষা অবশ্য ভালোই হয়েছে। আড়াই ঘণ্টায় বাংলার সাতটা সৃজনশীল সুন্দর করে সাজিয়ে-গুছিয়ে লেখা খুবই কঠিন। কলেজের পরীক্ষাগুলোতেও অধিকাংশ সময় ছ’টা ভালো করে লিখতে পারতাম, সাত নম্বরে এসে অর্ধেক ফেলে রাখতে হতো। আজকে সেটা করতে হয়নি দেখে বাড়তি ভালো লাগা কাজ করছে। প্রশ্নটা এভারেজ। খুব কঠিন করলে উত্তর করতেই জান বেরিয়ে যেত।

_____________

দেখতে দেখতে অনেকগুলো পরীক্ষা হয়ে গেল। এক পেপার সহজ করলে অন্য পেপার কঠিন। ভালো-মন্দ মিলিয়ে হলো পরীক্ষাগুলো। রসায়ন দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষার আগের দিনের ঘটনা।

আগেই বলেছি পরীক্ষার সময় আমার সোশ্যাল একাউন্ট গুলো বন্ধ থাকে। বাড়িতে টিভিও কম দেখা হয়। তাই দেশের কোনো খবরই জানিনা। পরদিন পরীক্ষা ভেবে রাতে পড়া শেষ করেছি। খেতে বসে বাবা বললো ঢাকায় কোন স্কুলে নাকি বিমান পতন হয়েছে। অবস্থা নাকি ভয়াবহ। আমাদের পরীক্ষা হবে কিনা সেটাই জিজ্ঞেস করছিলেন। আমি তো কিছু শুনিনি। ভাইয়া জিজ্ঞেস করলো,

“কোন স্কুল বলোতো?”

“নামটা শুনেছিলাম। মনে পড়ছে না। আচ্ছা, তিন্নির ছেলে কোন স্কুলে পড়ে?”

তিন্নি আমার ছোট খালার নাম। তাইতো! খালামনির খোঁজ নেয়া হয়নি। ভাইয়া টিভি ছেড়ে ছিলো। সব চ্যানেলেই বিমান দূর্ঘটনার খবর। মাইলস্টোন স্কুল! দেখেই আমি চিৎকার করে উঠলাম,

”মা! খালামণিকে কল করো তাড়াতাড়ি। তানিমদের স্কুলে বিমান ক্র্যাশ করেছে।”

ভাইয়া ত্বরিত ফোন করলো খালামণির নাম্বারে। দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট মার মুখে। আমারও বুক কাঁপছে। তানিমের কিছু হয়নি তো? দু’ বার রিং হওয়ার পর খালামণি ফোন রিসিভ করলো। জানালো তানিমের জ্বর ছিল; আজকে স্কুলেই যায়নি। খবরটা শুনে কি যে ভালো লাগলো! পরক্ষণেই মনে পড়লো, তানিম সুস্থ থাকলেও ওদের স্কুলের অনেকেই ভালো নেই। কতগুলো ছোট ছোট বাচ্চার প্রাণ গেল আজকে। ফুলের মতো নিষ্পাপ বাবুগুলো অকালেই ঝরে পড়লো! আহারে!

কিন্তু এতবড় একটা দুর্ঘটনার পরও শিক্ষা উপদেষ্টার টনক নড়লো না দেখে অবাক হলাম। এরমধ্যে পরীক্ষা নেবে ওরা? যাদের ভাইবোন কিংবা কাছের কেউ আহত হয়েছে, মারা গেছে তারা কীভাবে পরীক্ষা দেবে? ওদের মানসিক অবস্থার কথা ভাববে না প্রশাসন? দেশের এমন ক্রান্তিলগ্নে আমাদের এইচএসসি নিয়ে কি এমন উন্নতি করে ফেলবে দেশ!

ফেসবুকে লগ ইন করলাম। রীতিমত তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে। নিউজফিডে ঢোকা যাচ্ছে না কিছুতেই। প্রতি রিফ্রেশে মানুষের আহাজারি, হাহাকার। পরীক্ষা স্থগিত নিয়ে কথা বলে যাচ্ছে এডটেকের অধিকাংশ টিচার। বয়কট করছে। বারোটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। পরীক্ষা স্থগিতের কোনো নির্দেশ নেই। তারমানে সত্যিই পরীক্ষা দিতে হবে? আমি মাকে বললাম,

“কাল পরীক্ষা দেবনা। বয়কট!”

মা-বাবা দুজনেই ক্ষেপে গেলেন,

“পাগলে পেয়েছে? মুখে মুখে বলছে বয়কটের কথা; বাস্তবে গিয়ে দেখবে সবাই হলে ঢুকে বসে আছে।”

“এই পরীক্ষার উপর তোমার কতকিছু নির্ভর করছে! পুরো ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাবে।”

আমি কিছু বলতে চাইলাম বিপরীতে। কিন্তু সুযোগ হলোনা। পরীক্ষা দেয়াটা কঠিন অবশ্যই! চোখ বন্ধ করলেই একটু আগের ভিডিওগুলো চোখে ভাসছে; আগুনে পোড়া মানুষগুলোর কথা মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে। এ অবস্থায় অমানুষ ছাড়া কে পরীক্ষায় মন বসাতে পারে? কিন্তু কর্তৃপক্ষ না বলা অবধি কিছুই করার নেই।

পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়েছি হলে যাওয়ার জন্য। হঠাৎ ভাইয়া এসে বললো, পরীক্ষা স্থগিত। উপদেষ্টা মাহফুজ আলম রাত তিনটায় তার ফেসবুক ওয়ালে স্ট্যাটাস দিয়ে জানিয়েছেন। মানে কি বলবো! একটা দেশের উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তারা কীভাবে এরকম হতে পারে! কোনো সময়জ্ঞান নেই? রাত তিনটায় ফেসবুকে কেন নোটিশ দেবে; আশ্চর্য!

একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক পালন হলো।

ইকবালের সঙ্গে দেখা হলো বিকেলে। বেশ কিছুদিন পর! সেই প্রথম পরীক্ষার দিন যাওয়ার সময় দেখা হয়েছিল। ও আমাকে দেখে বললো,

“ছাদে যাচ্ছ? তোমার আজকের পরীক্ষা তো ছিলনা, তাইনা?”

আমি মাথা নাড়ালাম। ইদানিং ইকবালের সঙ্গে কথা বলতে আমার একটু কেমন যেন লাগে। মনে হয়, ওর সঙ্গে কথা বলা ঠিক হবেনা। দু’জনের কারো জন্যই না।

আমি সিঁড়ি ভাঙতে লাগলাম। ইকবালও পিছু পিছু এলো। আমি বললাম,

“তুমি আসলে যে?”

“এলে কি হবে?”

ইকবাল হাসি হাসি মুখ করে তাকালো। আমি কিছু বলতে পারলাম না। স্মিত হাসলাম। ইকবাল গতকালকের ঘটনাটা নিয়ে কথা বলতে লাগলো। আমি ‘হু হা’ করে গেলাম কেবল। সবাই বলে, মেয়েদের ইনটুইশন ক্ষমতা প্রবল। আমার ক্ষমতা কেমন জানিনা। কিন্তু আমার ভয় করতে লাগলো!

_______

পরবর্তী কিছুদিন এই ট্র্যাজেডির গল্পই চললো। কতজন তাৎক্ষনিক মা-রা গেছে, আহত কেমন, পাইলটের দোষ ছিল কিনা, তিনি কি করতে পারতেন, কি পারতেন না, দেশের শিক্ষানবিশ বৈমানিকদের ভালো না মন্দ বিমান দেয়া হয়, বিমানগুলো কতবছরের পুরোনো, কুর্মিটোলা ক্যাম্প কেন ওখানে, স্কুলই বা কেন ওরকম জায়গায় স্থাপন হয়েছে, ইত্যাদি ইত্যাদি—-হাজার রকমের কথা ভেসে বেড়াতে লাগলো।

এরপর একটা সময় পর মানুষ ধীরে ধীরে ভুলেও গেল। দেখতে দেখতে আমার পরীক্ষাও হয়ে গেল সব। স্থগিত হওয়া পরীক্ষাটার জন্য ব্যবহারিক পরীক্ষাও পেছাল। আগস্টের একত্রিশ তারিখে অবশেষে আমার এইচএসসি শেষ হলো।

এরপর ভর্তি যুদ্ধ! আমি তখনও সিদ্ধান্ত নেইনি কি পড়বো। বাবা বললো মেডিকেল কোচিং করতে, মা বললো ভার্সিটির প্রিপারেশন নিতে। আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম!

Story Cover