মার ডাক শুনে আমার কলজেটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মুহূর্তেই মধ্যেই কয়েক মাস পুরোনো সেই দৃশ্যপটগুলো ভেসে উঠতে লাগলো মনে। আমি দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে প্রাণপণে চিৎকার করলাম,
“ভাইয়া! ও ভাইয়া! তাড়াতাড়ি আয়!”
বিছানায় শুয়ে অস্থিরতা করছে বাবা; বিন্দু বিন্দু ঘামে তার পুরো কপালটা পূর্ণ। মা তার শার্টের বোতামগুলো খুলে দিলো। আমি ফ্যান ছেড়ে দিলাম দ্রুত। মনের মধ্যে অশুভ সব চিন্তারা হানা দিচ্ছে। এর আগে বাবার একবার স্ট্রোক হয়ে গেছে। ম্যাসিভ স্ট্রোক। তার ধাক্কা সামলে উঠতে না উঠতেই আবার নতুন কোন মুসিবত!
ভাইয়া ছুটে গিয়ে প্রেশার মাপার যন্ত্রটা আনলো। প্রেশারটা মাপা জরুরি!
বাবার এমনই হাই প্রেশার। আজকে সারাদিন তারও মনটা খারাপ ছিল; স্ট্রেস বেশি হয়ে গেছে। প্রেশার বেড়ে বিপদ-আপদ কিছু একটা হয়ে গেলে? ইয়া আল্লাহ্, এমন করোনা প্লিজ!
আমার চোখ ঝাপসা হয়ে গেলো হঠাৎই। ভাইয়া গম্ভীর কণ্ঠে প্রেশার চেক করে বললো,
“হাই!”
তেঁতুল গোলা পানি আনতে তাগাদা দিতে লাগলেন মা। আমি আবারও রান্নাঘরের দিকে ছুট লাগালাম। অনবরত দুয়া-দরুদ পড়ে যাচ্ছি। আল্লাহ পাক সহায় হোন যেন!
প্রায় ঘণ্টাখানেকের চেষ্টা-চরিত এবং সেবা-যত্নের পর বাবার অবস্থা কিছুটা সুস্থিত হলো। সারা গা ঘেমে একাকার বাবার। আমি পাতলা গামছা দিয়ে মুছিয়ে দিলাম গা’টা। ভাইয়া বললো,
“চলো, ডাক্তার দেখিয়ে আসি। তোমার অবস্থা তো বেশি ভালো না!”
“এইবেলা ডাক্তার বসে আছে? সিরিয়াল দেয়া লাগবেনা? কালকে যাবো।”
বাবা একবাক্যে প্রস্তাব নাকোচ করে দিলেন। কিন্তু আমাদের মন মানছিল না। আমি বললাম,
“রাতে যদি আবারও অসুস্থ হও?”
“কিছু হবে না। আগে কখনো প্রেশার বাড়েনি? শুধু শুধু হাজারখানেক টাকার ফিস দিয়ে আসা। হুদাই টেস্টও দিবে কতগুলো!”
“টেস্টের দরকার হলে দেবেনা? মুফতে করে দেবে সব?”
মা বিরক্ত চোখে তাকালেন। বাবা তবুও অবুঝের মতো গোঁ ধরে রইলেন। কিছুতেই যাবেন না। ভাইয়া বললো,
“নাহয় দিলেই কয়টা টাকা গচ্চা। তাও টেনশন ফ্রি থাকা তো যাবে?”
“অতো টেনশনের কিছু নাই। কিছুক্ষণ শুয়ে থাকলেই ভালো হয়ে যাব।”
বলেই শুয়ে পড়লো বাবা। আমরা দুই ভাইবোন অসহায় চোখে একে-অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম।
“মরার আগে ঔষুধ খাওয়ার অভ্যাস বাদ দেও। তোমার গাফিলতির জন্যই আজকে এই পরিস্থিতি।”
মা হঠাৎ করেই তেঁতে উঠলেন। আমি ভাবলাম এই বুঝি লেগে যায় ঝগড়া! বাবা নিশ্চিত ক্ষেপে যাবেন। তার রক্তচক্ষু দেখে ভাইয়া তড়িঘড়ি করে বললো,
“আহ হা মা! বিপদ কি কাউকে বলে-কয়ে আসে? কপালে যা ছিল হয়েছে। বাবা, চলো তো; ডাক্তারের কাছ থেকে ঘুরে আসি।”
“হ্যাঁ, যাও না বাবা। প্লিজ!” আমিও তাল মেলালাম।
শেষমেষ বাবা যেতে রাজি হলেন। ভাইয়া আর মা সহ তারা গেলেন ডাক্তার দেখাতে। আমি রয়ে গেলাম বাসায়। যাওয়ার আগে ভাড়াটিয়া আন্টিকে বলে গেলেন অবশ্য। সন্ধ্যা বেলা। আমি একা যদি ভয় পাই?
যদিও আমার ভয়ের কিছুই ছিলনা। তারপরও আন্টি এসে ডেকে নিয়ে গেলেন তাদের বাসায়। ইকবাল তখন নিজের ঘরে পড়তে বসেছে। সম্ভবত বাবার অসুস্থতার কথা জানেনা। আমাকে দেখে উঁকি দিলো একবার,
“কি ব্যাপার? তুমি এসময়?”
“জিনিয়ার আব্বু অসুস্থ, ইকবাল। ওরা সবাই ডাক্তার দেখাতে গেছে।”
পাশের ঘর থেকে বেরিয়ে আমার হয়ে জবাবটা দিয়ে দিলেন আন্টি। ওনার কোলে ভুট্টা। ইকবাল একপলক আমার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে গেলো। বললো,
“টেনশন করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে।”
আমি মাথা নাড়লাম। আন্টি ওকে জিজ্ঞাসা করলেন,
“তুই হঠাৎ বেরিয়ে এলি যে? কাল কোচিংয়ে ক্লাস নেই? পড়া হলো!”
“পড়বো গো! প্রচণ্ড মাথা ধরেছে। একটু চা করে দেবে?”
“আচ্ছা। করছি। জিনিয়া রং চা খাবে? মসলা দিয়ে জ্বাল করবো।”
আমি নীরবে ঘাড় নাড়ালাম কেবল। আমার ভালো লাগছে না কিছুই। আন্টি ভুট্টাকে নামিয়ে দিয়ে রান্নাঘরে ঢুকলেন। ইকবাল কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। না তাকিয়েও বুঝতে পারছি, ওর দৃষ্টি আমার উপরেই। একটুপর চুপ করে পাশে এসে বসলো। ভুট্টা লাফিয়ে কোলে চড়লো। ভয়ে আমি সরে যেতে চেষ্টা করলেই বললো,
“এত স্ট্রেস নিও না। ও কিছুই করবেনা। তুমি বসে থাকো।”
আমি যতটা সম্ভব চেপে বসলাম। ইকবাল এখনো আমার দিকে তাকিয়ে আছে। জানি কোনো বাজে উদ্দেশ্য নেই ওর; তবুও এটা অস্বস্তিকর! অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে বললাম,
“তুমি প্লিজ অন্যদিকে তাকাবে?”
“কেন? কি করেছি?”
ধীর স্বরে জানতে চাইলো। আমি ওরদিকে ফিরলাম,
“কিছু করোনি। কিন্তু আমার ভালো লাগছে না, ইকবাল।”
“তুমি স্ট্রেসে আছো। আরো বেশি চাপ নিচ্ছ। স্বাভাবিক হও, জিনিয়া!”
ইকবাল আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বললো। আমি মাথা নামিয়ে ফেললাম। গলার স্বর খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বললাম,
“আমার কিছু ভালো লাগছে না, ইকবাল। আমার কিছু ভালো লাগছে না!”
কি হলো কে জানে। সন্ধ্যা থেকে জমিয়ে রাখা কান্নাগুলো ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে লাগলো, নিঃশব্দে ঝরে পড়তে লাগলো অশ্রু হয়ে। রান্নাঘর থেকে আন্টির ডাক পড়লো। ইকবাল উঠে চলে গেল। আমি পাশ ফিরে তাকালাম, ছাড়া পেয়েও ভুট্টা নেমে গেলনা পিছু পিছু। বরং স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে। কে জানে, ওর চোখে বিস্ময় ছিল কিনা!
আমি কাঁদতে কাঁদতেই ওর ছোট্ট মাথাটায় হাত ছোঁয়ালাম; এই প্রথমবারের মতো! কি আশ্চর্য! আমার একটুও ভয় লাগছে না। ভুট্টা সরে এসে গা ঘেঁষে বসলো আমার। লহু স্বরে ডাকতে লাগলো। ইকবালও ফিরে এলো শব্দবিহীন। হাতে চায়ের কাপটা দিয়ে সুন্দর করে হাসলো। সেই হাসিতে আমি নিজের জন্য ভরসা খুঁজে পেলাম!
___________
যতটা ভয় আর আতঙ্ক ঘিরে ধরেছিল আমাকে; ততটা কঠিন হলোনা। ডাক্তার দেখিয়ে দশটার দিকে ফিরল ওরা সবাই। ডাক্তার বলেছে, সবকিছু আপাতত ঠিকঠাক আছে। প্রেসক্রাইব করেছেন। নিয়মিত ফলোআপ করতে হবে। শুনে কিছুটা স্বস্তি মিলল আমার। যদিও বাবা খুব রাগ দেখালেন, শুধু শুধু তার কতোগুলো টাকা চলে গেছে। আমরা বিশেষ পাত্তা দিলাম না। টাকার চেয়ে জীবনটা দামি!
পরের কয়েকটা দিন খুব সাবধানেই কাটালাম আমরা। কথায় আছে, বনের বাঘে খায় না মনের বাঘে খায়! মনের দুশ্চিন্তা তো দূর করা সহজ নয়। বাবাও বুঝলেন সেসব। আমাদের অতি সেবাযত্নে বিরক্ত হলেননা।
দেখতে দেখতে আরো দুইমাস পেরিয়ে গেল। বসন্ত পেরিয়ে গ্রীষ্ম এসেছিল। সেও ফুরোতে চললো প্রায়। জুন মাসের বারো তারিখ আজকে। আমার উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা ছাব্বিশ তারিখ থেকে। বুঝতেই পারছেন, হাতে সময় এখন একেবারেই নেই!
_____
সারাদিন পর বিকেলে একটু সময় পাই। তাই ছাদে গিয়েছিলাম। ইকবালের দেয়া জিনিয়া গাছগুলোর একটায় কলি এসেছে দেখলাম। ফুল কি ফুটবে? এক অদ্ভুত আনন্দের শিহরণ খেলে গেল শরীরে।
আমি হাসি হাসি মুখ করে পায়চারি করতে লাগলাম। ছাদের ওপাশে যাবো হঠাৎ বিড়ালের ‘ম্যাও ম্যাও’ ডাক কানে ভেসে এলো। স্বাভাবিক না। ভুট্টোর কি হয়েছে নাকি?
কৌতূহলী হয়ে ওদিকে এগোতেই হঠাৎ কোত্থেকে ইকবাল হুঁশিয়ারি দিলো,
“খবরদার, জিনিয়া! ওদিকে যেওনা যেন!”
আমি ফিরে তাকাতেই চৌকিতে বসা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো ইকবাল। সামনে এসে বললো,
“তুমি এসময় ছাদে এসেছ কেন? তোমার পড়ালেখা আছে না? চলো চলো। নিচে গিয়ে পড়তে বসবে।”
আচানক ওর জোরাজোরি দেখি আমি আহাম্মক হয়ে গেলাম!
চলবে____