একটা দুঃসাহসিক কাণ্ড করে ফেলায় পাড়ায় একটা নাম হয়ে গেল আমার। কদিন খুব চর্চাও হলো। নানা মুনির নানা মতের দুনিয়ায়—-কেউ খুব প্রশংসা করল। আবার কেউ বিরক্ত মুখে বলতে লাগলো, বখাটেদের সাথে লাগতে যাওয়ার কি দরকার ছিল। প্রশংসার পাল্লা ভারি হলেও বিরক্তির দলে গিয়ে আমার মা একাই মানদণ্ড ভেঙে দিলেন। স্পষ্ট করে বলে দিলেন, ভবিষ্যতে এধরনের ঘটনা ঘটিয়ে বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টা করলে আমার ঠ্যাং ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেবেন। আমি বুঝলাম না আমার অপরাধ কি। বলার সাহসও হলো না। মা ভীষণ রাগে গজরাতে লাগলেন,
“একা মেয়েমানুষ তুমি, তবুও সাহস কি করে হয়! শুরুতেই দেখলে যখন চার-পাঁচটা ছেলে আছে, তুমি সরে গেলে না কেন? খুব বাহাদুরি দেখানোর শখ তাই না? তখন কেউ সাহায্য না করলে, কি হতো ভেবে দেখেছো?”
আমি অপরাধীর ন্যায় মাথা নিচু করে সমস্ত দায় ঘাড়ে নিলাম। নিজের স্থানীয় এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে থেকেও যদি নিরাপত্তা নিয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকতে হয়, তাহলে আর রইলো কি! তারচেয়ে একটু সাহস দেখানো ভালো নয়? এই এলাকায় কি আমরা আজ থেকে আছি? জন্মের পর থেকে বড় হইনি এখানে? আজ সাহস না দেখালে ওরা পেয়ে বসত না? রোজ রোজ ওই টংয়ের দোকানে বসতো; সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে খিস্তি-খেউড় করতো; আর আমার মতই এলাকার বাকি মেয়েদের হেনস্তা করত! আজ মহল্লাবাসীর মার খেয়ে অন্তত দিলে ভয় ঢুকবে, এই এলাকার মানুষ একত্রিত হলে কি হতে পারে!
যাইহোক, মাকে বুঝানো আমার সাধ্যে কুলোবে না। আমি দোষ স্বীকার করে নিলাম। বাবা প্রথমে খুশি হলেও মার যুক্তি শুনে আর কিছু বললেন না। সাবধানে চলার নির্দেশ দিয়েই উনি খালাশ। ভাইয়া আগেই হৈচৈ করেছে। এখন মার বকা খাওয়ার পরও পিঠ চাপড়ে দিলো, ‘কিপ ইট আপ!’
পরদিন সকালবেলা ভাড়াটিয়া আন্টির সাথে দেখা। গেটে ময়লা দিতে গিয়েছিলাম সিটি কর্পোরেশনের ছেলেটাকে। আন্টিও দেখলাম মায়ের দলের মানুষ। বললেন,
“এতো সাহস ভালো না, জিনিয়া। কালকে সবাই সময়মত না বেরোলে কি হতো তোমার সঙ্গে ভাবতে পারো?”
আমি আন্টিকে কিছু বললাম না। মায়ের সামনে যুক্তি দেইনি, সেখানে বাইরের মানুষের কাছে নিজেকে প্রমাণ করার কোন প্রয়োজন আমার নেই। তাছাড়া উনি তো ভালোর জন্যই বলেছেন।
বিকেলে ছাদে হাঁটছিলাম ইকবাল এসে ডাকলো,
“হ্যালো জিনিয়া?”
প্রথমবারের মতো সুন্দর করে আমার নাম বললো দেখে ভারি অবাক হলাম। স্মিত হেসে বললাম,
“কি ব্যাপার আজ খুকি বললে না যে?”
“ভেবে দেখলাম…”
বলেই আমার দিকে তাকাতেই আমি ইশারা করলাম বাক্য পূরণ করতে,
“তোমাকে খুকি ডাকা যাবেনা। তুমি দারুণ সাহসী একটা মেয়ে। খুকিদের এতো সাহস থাকেনা!”
“বাব্বাহ! ভালোই তো ভেবেছ!”
আমি হেসে ভ্রু নাচালাম। ইকবাল আজ কোনো ফাজলামি করলো না। খুব সুন্দর করে বললো,
“তুমি খুব দূর্দান্ত কাজ করেছ, জিনিয়া। অনেকেই এটার সমালোচনা করছে, কিন্তু কাজটা একদম ঠিক করেছ তুমি। মাঝে মধ্যে একটু সাহস দেখাতে হয়। বুঝলে?”
আমি মাথা নাড়ালাম। ও হঠাৎ খুশি হয়ে উঠলো,
“ভালো কথা, এই দুঃসাহসিক কাণ্ডের কথা তোমার গাছগুলোকে বলেছ? তারা জানে তাদের পানি ছিটিয়ে সতেজ রাখা নিরীহ মেয়েটার মধ্যে কত তেজ?”
সম্ভবত এই প্রথমবারের মতো ইকবালের খোঁচা খেয়েও আমার রাগ হলো না। বরং আমি হাসলাম মন খুলে!
_____
কলেজ কিংবা টিউশিন নেই বলে সারাটাদিন আমি বাসাতেই থাকি। ভাইয়া ভার্সিটি নিয়ে খুব ব্যস্ত। সিটি-ফিটি দিয়ে অস্থির। ওদের মিড সম্ভবত আমার এইচএসসির সময়ে। ভালোই পড়ছে। এরমধ্যে অবশ্য একটা দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছে বেচারার সাথে। যে কোর্সটা শুরু করেছিল অনলাইনে; শালারা টাকা মেরে দিয়েছে!
এই নিয়ে মা কিছুদিন খুব হতাশ হয়ে রইলো। তারপর দেখি সব ঠাণ্ডা। জিজ্ঞেস করতে বললো,
“মৃ¡ত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে মৃ¡ত্যু কোনো দুঃসংবাদ নয়!”
দার্শনিক কথাবার্তায় আমি একচোট হাসলাম। অবশ্য মার কথা খুব একটা ভুল নয়। কঠিন সমস্যায় পড়ে যাওয়ার পর ছোটখাটো সমস্যা তেমন গায়ে লাগেনা। বাবার চাকরি নেই বলে যে বিশাল সমস্যায় আছি, এরমধ্যে ভাইয়ার সাড়ে তিন হাজার টাকা মার গিয়েছে শুনে তেমন বড় সমস্যায় পড়িনি। মাস খানেক কাটলো। দিন যাচ্ছে তার মতই!
সারাদিন আমার পড়ালেখা নিয়েই সময় চলে যায়। বিকেলবেলা মা ঘরে এলো,
“খবর শুনেছ, জিনিয়া? তোমার লিশি আপুর নাকি বিয়ে কালকে?”
“বলো কি! সত্যিই?”
“হ্যাঁ। সত্যি।”
কথাটা শুনে বিস্ময়ের সীমা রইলো না আমার। লিশি আপু আমার চাচাতো বোন। দুঃসম্পর্কের না, একদম নিজের চাচাতো বোন। আমার চেয়ে বছর তিনেকের বড় হলে কি হবে ছোটবেলা থেকে আমাদের অনেক খাতির! ঈদে ও বাড়িতে না গেলে আমার অস্থির অস্থির লাগে; বাড়িতে থাকতেই ইচ্ছে করেনা। সোশাল মিডিয়ার যুগে আমরা অনলাইনে তেমন একটা চ্যাটিং করিনা; অত একটিভ নই। কিন্তু আমাদের সারা বছরের জমানো কথাগুলো আমরা ঠিকই ছুটিতে গিয়ে উগলে বের করি। সেই লিশি আপুর বিয়ে হচ্ছে আর আমি খবর পেলাম না?
আমি বিমূঢ় হয়ে বললাম,
“কার কাছে শুনলে তুমি?”
“তোমার ছোট চাচির কাছে। ওরা কাল গিয়েছে ওখানে। আজ গায়ে হলুদ। আমরা এখনো যাইনি কেন, শোনার জন্য কল করলো।”
“তুমি কি বললে?”
আমি শূণ্য চোখে তাকালাম। মা হাসলো। অদ্ভুত সে হাসি,
“কি বলবো? আমাদের যে দাওয়াত করেনি, এটা বলবো? কি ভাববে ওরা?”
আমি আচমকা রাগে ফেটে পড়লাম,
“বলবে না সেটা? লিশি আপুর বিয়ে হচ্ছে, আর আমরা জানবো না? আজকে গায়ে হলুদ—-মানে কি! আরও আগে থেকে বিয়ের কথাবার্তা চলছে? এরমধ্যে আমরা কিচ্ছু জানলাম না! বাবা জানে নাকি? বলেছে চাচ্চু?”
মা মাথা নাড়লো, সে কথা উনি জানেন না। বাবা তখন বাসায় নেই। ফিরলো এশার নামাজের পর। খেতে বসে জিজ্ঞেস করলাম আমি। ভাইয়াও আমার মত প্রতিক্রিয়া দিলো। কিছুটা বিস্ময়, অধিকাংশ রাগ। বাবা তেমন কিছু বললো না। যেন কিছুই যায় আসেনা!
আমরা আরও অবাক! মা এবার রাগ করে চেপে ধরতেই গম্ভীর স্বরে জানালেন,
“আম্মা সপ্তাহখানেক আগে বলছিল। লিশির বিয়ে। আমরা যেন যাই।”
“দাদি? দাদি কেন বলবে! চাচ্চু নিজে বলতে পারেনাই তোমাকে? এমনিতে তো জীবনেও কল দেয় না। এটুকুও বলতে পারেনি?”
আমি উত্তেজিত হয়ে উঠলাম। মা চোখ পাকিয়ে তাকালেন আমার দিকে। কারো সামনে তার পরিবার নিয়ে কিছু বললে সে মন খারাপ করবে অবশ্যই। তার’পর এটা বাবা! উনি খুব কষ্ট পাবে।
নিশ্ছিদ্র নীরবতা নেমে এলো খাবার ঘরে। একটুপর মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“হয়তো খোঁজ না নিতে নিতে ভুলেই গেছে আমাদের কথা। বাদ দেও!”
“ভাবছে হয়তো গিফট দিতে পারবো না।”
ভাইয়ার কণ্ঠে তাচ্ছিল্য। আমি বাবার মুখের দিকে তাকালাম। এখনো কিছু বলছেন না। গম্ভীর হয়ে ভাত খাচ্ছেন। আমার ভয়ংকর কান্না পেলো। রুদ্ধ কণ্ঠে বললাম,
“ওদের সাথে কি আমাদের গিফটের সম্পর্ক? চাচ্চু আপন ভাই না বাবার?”
বলতে বলতেই কেঁদে ফেললাম। মা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ধীরে ধীরে বললো,
“কাঁদে না, মা। ভাত খাও। মনে করো কিছু শোনো নি। আমরা কালকে বিরিয়ানি বানাবো। ঠিক আছে?”
সে-রাতে আমার কিছুতেই পড়ায় মন বসলো না। অন্যান্যদিন বারোটা অবধি জাগা আমার কাছে পানিভাত। কখনো কখনো দুটো অবধিও জেগে থাকি; বইয়ে মুখ গুঁজে রাখি। সেদিন রাত দশটাতেই আমার মনটা বিষিয়ে এলো।
বই বন্ধ করে আমি শুয়ে পড়লাম। খুব অভিমান হলো। চাচ্চু-চাচির উপরে, লিশি আপুর উপরে, গোটা পৃথিবীটার উপরে। অনেকটা সময় চুপচাপ শুয়ে থেকেও ঘুমপরী ধরা দিলোনা। পাশ পাল্টালাম, উঠে পানি খেলাম, বারান্দায় গিয়ে বসেও থাকলাম। আকাশে মস্ত একটা চাঁদ উঠেছে। অবাক জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে পৃথিবী। আমি ওই রূপালী চন্দ্রের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললাম,
“তুমি মানুষ হওনি; বড় সৌভাগ্য তোমার। মানুষ হয়ে জন্মানো অনেক কষ্টের, বুঝল? যাদের আপন ভাববে, ওরা এমনভাবে পর করে দেবে যেন তুমি কখনো ছিলেই না!”
রাত জেগে তারা খসা দেখলাম। একটাসময় পর মনে হলো, ঘুম পাচ্ছে। বিছানায় গা এলাতেই ডুবে গেলাম নিদ্রার অতলে।
______
পরদিনও আমার মন খারাপ জারি রইলো। পড়তে বসে বেশিক্ষণ স্থির থাকতে পারলাম না। ছাদে চলে গেলাম। এই সকালবেলাতেও ইকবাল ছাদে গিয়ে আছে। কোচিংয়ের বই সামনে মেলে চৌকিটায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে। আমি নিঃশব্দে নিচে নেমে এলাম। ইকবাল আমাকে দেখলেই এটা-ওটা বলবে। এখন কিছু শুনতে ইচ্ছে করছে না!
দুপুরে মা বিরিয়ানি রান্না করেছিল। মার হাতের এই বিরিয়ানি আমার সবচেয়ে পছন্দের। সবসময় আমি বেশি করে খাই। আজ অত পারলাম না। আধ প্লেট খেয়েই মাকে বললাম, আর পারছি না। ঘরে ফিরে এলাম।
পরীক্ষার সময় আমি সোশাল একাউন্টগুলো থেকে লগ আউট করে রাখি। এ্যাপগুলোও আনইনস্টল থাকে। বাইরের দুনিয়া যেন ডিস্ট্রাক্ট করতে না পারে। আজকে কি মনে করে ইনস্টাগ্রাম ডাউনলোড করলাম। লগ ইন করতেই লিশি আপুর গায়ে হলুদের ছবিতে পুরো ফিড ভেসে গেল। খুব স্বাভাবিক, পারিবারিক মানুষগুলোই তো শুধু আমার সাথে অ্যাড আছে। ওদের পোস্টই চোখে পড়বে!
আমি সবার স্টোরি, পোস্ট দেখলাম। লিশি আপুও স্টোরি দিয়েছে। লাভ দিয়ে রিপ্লাই করলাম,
“অনেক শুভেচ্ছা আপু!”
সিন হলোনা। হওয়ার কথাও নয়। বিয়ের কনে কি ফোন হাতে নিয়ে বসে আছে? আমি আবার পড়তে বসলাম।
ঘন্টাখানেক পরে কি মনে আসতেই আবার ইনস্টায় ঢুকলাম। মেসেজটা সিন হয়নি এখনো; ভাগ্যিস! আনসেন্ট করে দিলাম। ইনস্টায় এই এক সুবিধা। আনসেন্ট করলে বোঝা যায়না। লগ আউট করে চলে গেলাম ছাদে। গাছে পানি দিলাম। সারা বিকেল হেঁটে বেড়ালাম একা একা।
ছাদ থেকে ফিরেছি তখনই মার ডাক পড়লো,
“জিনিয়া, নিশান! কোথায় তোরা? তাড়াতাড়ি ঘরে আয়, দেখ তোদের বাবা যেন কেমন করছে!”