চাকরিটা যাবার পর বাবার মেজাজ ইদানিং খুব খারাপ থাকে। রোজ রোজ মার সঙ্গে ঝগড়া, চিৎকার-চেঁচামেচি—-আমাদের সুখের সংসারটা প্রায় ভেঙেই যেতে ধরলো। অসহ্য ধরে গেল সব। এমন করুণ অবস্থা হলো যে একদণ্ডও আর শান্তিতে বাড়িতে টেকা যায়না!
আত্মীয়-স্বজনরা যে সবাই বাপের চাকরির জন্যই আমাদের ভালোবাসে—-একথাও আমি বুঝতে পারলাম বাবার চাকরি যাওয়ার পর। মোটামুটি সমস্ত আত্মীয়-স্বজনরাই হঠাৎ করে খুব ব্যস্ত হয়ে উঠলো; এতোই ব্যস্ত যে কল করলে কলব্যাক তো দূর রিসিভ করতেই সময় পাননা। বাসার কোনো অনুষ্ঠানে সবাইকে ডাকতে মনে থাকলেও আমাদের কথা আর মনে পড়েনা। অথচ আমাদের বাড়ির অনুষ্ঠানে ওদেরই আমরা সবার আগে ডাকতাম! আশ্চর্যের কথা না?
এসবকিছুই হলো শুধু একটা ঘটনার কারণে।
মাস তিনেক আগে একটা সুন্দর সকালে আমরা তৈরি হয়েছিলাম যাপিত জীবনের জন্য। কলেজে সিটি ছিল আমার; তাই সকাল সকাল বেরিয়ে গিয়েছিলাম। হল থেকে বেরিয়ে দেখি ভাইয়া দাঁড়িয়ে আছে গম্ভীর মুখে। বাবা অসুস্থ; হাসপাতালে যেতে হবে। বাবার হঠাৎ কি হলো? আমি এত অবাক হলাম!
আমি জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। ভাইয়া তেমন কিছুই খোলাশা করলো না। শুধু বললো, বাবা খুব বাজেরকম অসুস্থ। শঙ্কা কাটেনি এখনো। কিন্তু আমি যেন মার সামনে যেন একদম স্বাভাবিক হয়ে থাকি; উনি এমনি খুব ভেঙে পড়েছেন। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সকালবেলার আমার ভালো বাবা বেরিয়েছে বাসা থেকে; হঠাৎ কি হলো!
হাসপাতালে গিয়ে আমি স্তম্ভিত। আইসিউর সামনে একদল লোক এসে ভীড় করে আছে। ওরা সব বাবার অফিসের লোক। ভাইয়া আমাকে দাড় করিয়ে রেখে ভেতরে যাওয়ার অনুমতি চাইতে গেল। একটুপরে আমাকে ঢুকতে দেয়া হলো; কাচ ঘেরা কেবিনের বাইরের করিডোরে আমি দাঁড়িয়ে থেকে দেখলাম বাবাকে। শরীরের জায়গায় জায়গায় সফেদ ব্যান্ডেজ। শান্ত শিশুটির ন্যায় শুয়ে আছে চুপচাপ। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ; তারপর আচমকাই চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে গেলো। জ্ঞান হারিয়েছিলাম আমি!
একটা মিটিংয়ে যাওয়ার কথা ছিল বাবার; ইজিবাইকে করে যাচ্ছিলেন। পথে হঠাৎ করে খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। ব্যালেন্স হারিয়ে হুড়মুড় করে পড়ে গেলেন চলন্ত গাড়ি থেকে। সবাই হুড়োহুড়ি করে হাসপাতালে আনার পর জানা গেল ম্যাসিভ স্ট্রোক হয়েছে। একে চলন্ত গাড়ি থেকে পিচের রাস্তায় পড়ে তার শরীরে ক্ষতের অভাব নেই; তার উপর এই স্ট্রোক!
আমার মাথাই কাজকরা বন্ধ করে দিলো। সত্যি বলতে আমি বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলাম বটে; কিন্তু এইসব স্ট্রোক - এ্যাটাক বুঝতাম না ঠিকঠাক। আমার ভয় হতে লাগলো বাবা কি মরে যাবে? আমরা কি হারিয়ে ফেলব তাকে?
না, সেরকম হওয়ার সম্ভবনা কম। শুনে স্বস্তির শ্বাস নিলাম। কিন্তু তারপরেও সামনের দিনগুলো যে কি ভয়ংকর হয়ে দাঁড়াবে আমাদের জন্য; সেটা কেউ আঁচ করতে পারিনি। উফ্, কি দুর্বিষহ দিনগুলো গেছে আমাদের!
তিনমাস পর আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ঠিক করে সবকিছু মনে করতেও পারিনা আমি। কেমন অস্থির লাগে ভাবতে; মাথায় এলোমেলো বহু চিন্তা ঘুরপাক খায়। ডাক্তার বলেছিলেন, রাইট সাইডেড ব্রেইন স্ট্রোক। ফলে পার্শিয়াল প্যারালাইসড হয়ে গেছেন। দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে অসুবিধা হবে; সূক্ষ্ম কাজ করতে পারবেন না। শুরুর দিকে আমরা হুইলচেয়ার কিনেছিলাম; পরে অবশ্য লাগেনি। বাবা এখন লাঠি ব্যবহার করেন। কিন্তু সমস্যা সেখানে নয়। সমস্যা হলো যখন এইসব জটিলতার কারণে বাবাকে অফিস থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো তখন!
সারাদিন অফিসে থাকা মানুষটা যখন হঠাৎই বাসার চারদেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে গেল। প্রথমে তো আত্মীয়-স্বজনরা খোঁজ করতো নিয়মিত; দেখা করে যেত। ধীরে ধীরে যোগাযোগ তো বন্ধ করলোই, সাথে এমন এমন কর্ম করলো যে ওদের পরিচয় দিতেও আর ভালো লাগেনা।
একঘরে হয়ে আমরা বাসায় চারটি মানুষ। সারাদিন বাসায় বসে তিনি করবেন কি? তার ’পর তিনি নিজে কিছুই করতে পারেন না। একা জামা পরতে সময় লাগে; খেতে কষ্ট হয়, হাত থেকে ছিটকে পড়ে; এমনকি বাথরুমে অবধি গেলে মার সাহায্য প্রয়োজন হয়! পোস্ট-স্ট্রোক ইমোশনাল চেঞ্জেজের কারণে বাবার মানসিকতা পুরোপুরি পাল্টে গেল। অল্পেই রেগে যান; চিৎকার চেঁচামেচি করে হুলস্থূল কাণ্ড!
ভাইয়ার তখন এডমিশান পিরিয়ড। কোত্থাও চান্স হলো না। বাড়িতে আরেক জ্বালা শুরু! শেষমেষ অফিস থেকে পাওয়া টাকার ভরসায় প্রাইভেটে ভর্তি করালো ওকে। বাসা থেকে ভার্সিটি বাসে পঁয়তাল্লিশ মিনিটের পথ। রোজ এত এতক্ষণ জার্নি করে যাতায়াত করা রীতিমত জুলুম নিজের উপর; কিন্তু হোস্টেলে উঠলেও খরচা বাড়বে বৈ কমবে না! সেমিস্টার ফি-ই তো প্রায় লাখটাকা। তাতে আবার মাসে ফিক্সড দশ-পনেরো হাজার টাকা দেয়া সম্ভব?
ভাইয়া বোঝে; আমরাও বুঝি। কিন্তু কি করা যাবে এখন? ভাইয়া তবুও জেদ করছে হোস্টেলে ওঠার জন্য। এভাবে ওর পড়ালেখা হচ্ছে না। বাসার এই নিয়েও যন্ত্রণা। নিত্যকার অশান্তি! সামনে আমার কলেজে টেস্ট। এইচএসসির আগে ক’টা দিন মাত্র। আমার সিলেবাস এখনো ঠিকঠাক শেষ হয়নি। পড়তে ইচ্ছে করে না। রোজ ছোটখাটো বিষয়ে এতো হৈচৈ হয়—-আমার সত্যি সত্যিই মরে যেতে ইচ্ছে করে এখন। বিশ্বাস করুন!
রসায়ন বইটা নিয়ে আমার ঘরের বারান্দায় বসে ছিলাম। বসার ঘরে বাবা চিৎকার করছে কি নিয়ে যেন। খুব সম্ভবত রিমোট সরানো হয়েছে তার নির্ধারিত স্থান থেকে; এখন রিমোট খুঁজে না পেয়ে চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলছেন। মার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে না এখনো। ঝগড়ার প্রথম কিছুক্ষণ চুপ করেই সব হজম করা তার অভ্যাস। তারপর হঠাৎ একটা একটা করে জবাব দিতে শুরু করবেন; আমি কানে হাত চেপেও সেই চেঁচামেচি থেকে রেহাই পাবো না।
হঠাৎ কলিং বেল বাজতেই মা ডাকলো,
“দেখো তো, জিনিয়া! কে এলো।”
আমি উঠে গেলাম সাথে সাথেই। এই বাহানায় বাবা একটু চুপ তো করবে! রান্নাঘর পেরোতেই মা বললো,
“শোনো, বাসা দেখতে এলে দেখিয়ে দিও। নাহলে দরজা খোলার দরকার নেই।”
আমি মাথা নেড়ে সায় জানাতেই বাবা চেঁচিয়ে উঠলো,
“হ্যাঁ, বাসা দেখতেই তো আসবে লোকজন। আত্মীয়-স্বজন তো কখনো আসবেনা আর; ভয় পায় যদি হাত পেতে বসি. .”
আমি দৌড়ে চলে এলাম বাইরে।
আমাদের পাশের ফ্ল্যাটটার কাজ বাকি ছিল কিছু। তাই এখনো ভাড়া দেয়া হয়নি। কিন্তু টাকা - পয়সার যে টানাটানি চলছে! বাবা বলেছেন ভাড়া দেবেন। দু’ মাসের এডভান্স পেলেই ঠিকঠাক করিয়ে দেবেন ফ্ল্যাটটা। টু-লেট ঝোলানোর পর থেকেই সপ্তাহে একটা-দুটো লোক আসছে!
দরজা খুলে মুখটা একটু বের করতেই একটা লম্বা মতন ছেলে বললো,
“টু-লেট দেখে এসেছি। ফ্ল্যাটটা কোথায়?”
আমি উঁকি দিয়ে বাইরেটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করে বললাম,
“আপনি একা?”
ছেলেটাও আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে আশেপাশে তাকাচ্ছিল; প্রশ্ন শুনে ঘাড় নাড়লো,
“জ্বি।”
আমার ভ্রু কুঁচকে এলো। ব্যাটা দেখেনি তিনরুমের বাসা! একা থাকবে নাকি? জিজ্ঞেস করলাম,
“আপনি ম্যারিড?”
“জ্বি না। কিন্তু…”
ব্যস! বাকি কথা শোনার আগেই আমি দরজা আটকাতে আটকাতে বললাম,
“সরি। আমরা ব্যাচেলর ভাড়া দেইনা!”
ছেলেটা কি যেন বলতে চাইলো; দরজার ওপাশে টুকটুক করলো কিছুক্ষণ। আমি দাঁড়ালাম না। এতোবড় দামড়া ছেলেকে ভাড়া দেব নাকি আমরা! দরজা আটকে ফিরে এলাম।
সপ্তাহ খানেক পরের কথা। সেদিন মাসের দুই তারিখ। ভাড়াটিয়া ওঠার কথা আজকে। ছাদে বই নিয়ে গিয়েছিলাম; সেখান থেকেই দেখলাম হঠাৎ ভ্যানভর্তি মালামাল নিয়ে ওরা এলো। কি যেন ভেবে আমি নেমে এলাম নিচে। মা দরজা খুলে দিয়েছে ইতোমধ্যেই; এক আন্টিকে সাথে করে আমাদের ফ্ল্যাটে নিয়ে ঢুকলো।
আমি উঁকি দিলাম বাইরে। সেদিনের সেই ছেলেটাকে দেখলাম হঠাৎ! হাতে বড় ফুলদানি নিয়ে আসছে এদিকটায়; আমায় দেখে হাসলো,
‘হ্যালো খুকি! তোমাদের বাসায় থাকতে এলাম; ওয়েলকাম করো!”
আমি দৌঁড়ে বাসায় ঢুকলাম; মা বলেছে এক মহিলা তার ছেলেকে নিয়ে থাকবেন। সেই ছেলে যে এতোবড় তা তো বলেনি!