অপরিচিতার প্রেমে

পর্ব - ২

🟢

ব্যালকনিতে দাড়িয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম আর পুরনো দিনের স্মৃতিচারণ করছিলাম। কত রঙিন ছিল ভার্সিটির সেই দিনগুলো! লুকিয়ে লুকিয়ে তাকে দেখা, লজ্জায় কথা না বলতে পারা -- কি বোকা ছিলাম আমি! তখন যার সাথে কথা বলতে, যার সামনে দাড়াতে লজ্জায় কুঁকড়ে যেতাম, আজ তার সাথেই সংসার করছি আমি। তাকেই বিয়ে করে সংসার বেঁধেছি!

হসপিটালে সেদিনের ঘটনার পর তাকে আমি আর পাত্তা দিতাম না। সর্বদা এড়িয়ে চলতাম। কিন্তু একদিন—

তখন আমি লাইব্রেরিতে বসে একটা অ্যাসাইনমেন্টের কাজ করছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার ঠিক পাশের চেয়ারটায় কে যেন এসে বসেছে। চোখ তুলে তাকিয়ে দেখি তিনি।উনি আমাকে দেখে সৌজন্যতার হাসি দিয়ে বললেন,

–কি ব্যাপার নিতু? আপনাকে তো আর দেখাই যায় না! অমাবস্যার চাঁদ হয়ে গেলেন যে?পড়ালেখা নিয়ে খুব ব্যস্ত বুঝি?

– নাহ্—তেমন কিছু না। সামনে এক্সাম আছে। তাই পড়াগুলো একটু গুছিয়ে নিচ্ছিলাম। এই আর কি! তা আপনার কি খবর?

– আমার খবর নিতে হলে তো আমার কাছে এসে জিজ্ঞাসা করতে হবে। যেহেতু আমি এলাম তাই আমিই খবর নিবো। তোমার দরকার হলে তুমি এসো।

তার কথা শুনে হাতের বই গুলো গোছাতে গোছাতে বললাম,

– বেশ। তবে অন্য একদিন গিয়ে আপনার খবর নেবো। আজ সময় নেই। বাসায় যেতে হবে। ভালো থাকবেন। আসছি।

বলেই চটপট উঠে দাড়িয়ে হাঁটা শুরু করে দিলাম। তবে একটা জিনিস বুঝলাম না, আগে উনি কথা বলতে এলে কেমন যেন লজ্জা লাগতো। কথা বলার সময় তার মুখের দিকে তাকাতেই পারতাম না! কিন্তু আজ কেন জানি তার চোখের দিকে তাকিয়েই কথাগুলো বললাম। কোন লজ্জা লাগেনি। স্পষ্ট ভাষায় তাকে এড়িয়ে চলে এলাম। কিভাবে এত সাহস হলো আমার? কেন এমন লজ্জাহীন ব্যবহার?

এরপর বেশ কদিন তিনি আমাকে রাস্তায়-পথে দেখা পেলেই কথা বলতেন, খোঁজখবর নিতেন। আমিও ভদ্রতার খাতিরে কথার জবাব দিতাম। তবে আমার কথাগুলো ছিল একরাশ তিক্ততায় ঘেরা। স্পষ্টতই তাকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা ছিল কথায়!

____________

সেদিন ক্লাস শেষে বাসায় ফিরব বলে রিকশার অপেক্ষায় ক্যাম্পাসের গেটে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ তিনি কোথা থেকে যেন হাঁপাতে হাঁপাতে পাশে এসে দাড়িয়ে বললেন,

– আজকাল কি কানে কম শোনা হচ্ছে নাকি? ডেকে ডেকে হয়রান হয়ে যাচ্ছি, কানে শোনো না?

তার কথা শুনে অবাক হবার ভান করে বললাম,

– জ্বী,আমাকে বলেছিলেন?

তিনি দুদিকে ঘন ঘন মাথা নাড়িয়ে বললেন,

– না, না, তোমাকে কিছু বলিনি। ভালো আছো তুমি? পড়ালেখার কি অবস্থা?

– আলহামদুলিল্লাহ,ভালো। বাসায় ফিরছিলাম। আসি তাহলে?

বলেই চলে যাবার জন্য পা বাড়ালাম। তিনি হঠাৎ পিছন থেকেই বলে বসলেন,

– বাসায় ফেরাটা কি খুব জরুরি?

কথাটা কানে যেতেই দাড়িয়ে গেলাম আমি। মাথা ঘুরিয়ে বললাম,

– কোন কাজ তো নেই, তাই। কেন, কোনো দরকার?

– হুম, হ্যাঁ—না—মানে—না—

– জ্বী ঠিক বুঝতে পারলাম না?

– মানে তোমার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে। একটু সাইডে আসবে, প্লিজ?

এবার বেশ দৃঢ় কন্ঠে বললেন উনি।

– খুব জরুরি কিছু?

– জীবন-মরণ সমস্যা!

করুণ চাহনি তার। মায়া লাগলো, বললাম,

– ঠিক আছে।

বলেই তার পিছন পিছন হাঁটতে লাগলাম। হাঁটতে হাঁটতে একটু নিরিবিলি জায়গায় আসতেই তিনি পাশের একটা বেঞ্চে বসতে বললেন। আমি সেখানটায় বসেই বেশ ব্যস্ত ভঙ্গিতে বললাম,

– কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলুন। হাতে সময় নেই!

– হুম। বলেই তিনি আমার মুখোমুখি হয়ে বসলেন। তারপর বোকা শুরু করলেন,

– দেখো নিতু,আমি পেঁচিয়ে কথা বলতে পারিনা। যা বলি সোজাসুজি বলি। পেটের ভিতর কথা লুকিয়ে রাখা আমার পক্ষে অসম্ভব। তাই সরাসরিই বলছি। আমি তোমাকে ভালোবাসি। হ্যাঁ,ভালোবাসি তোমাকে। কেন ভালোবাসি সেটা জানতে চেয়ো না। কখন থেকে ভালোবাসি স

তাও বলতে পারবো না। শুধু বলতে পারবো। তোমাকে যখন ভালোবেসেছি তখন জীবনের শেষ পর্যন্ত তোমাকেই ভালোবাসবো।

তারপর কিছুক্ষণ থেমে হঠাৎ সুর বদলিয়ে বললেন,

– ধ্যাত! তোমাকে ভালবাসার কথা বলছি কেন? আমি কি তোমাকে প্রেম করতে ডাকছি? নাহ্। আমি তো প্রেম করবো না। আমি তো সরাসরি বিয়ে করবো। তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে? উইল ইয়্যু ম্যারি মি?

বলেই পকেট থেকে একটা কালো গোলাপ বের করে এনে আমার সামনে ধরলেন। আর উত্তরের অপেক্ষায় জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন আমার দিকে।

আমি মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে তার হাত থেকে দূর্লভ প্রজাতির কালো গোলাপ হাতে নিয়ে বললাম,

– ধন্যবাদ। কালো গোলাপ আমার ভীষণ পছন্দের। কিন্তু আমি সরি। আই ও’নট ম্যারি ইউ। আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারব না। কারণ কোনো বিবাহিত ছেলেকে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছে নেই আমার। গুড বাই।

আমার কথা শুনে যে তিনি ফ্যাল-ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলেন তা আমি জানলেও তার দিকে না তাকিয়েই চলে এসেছিলাম সেদিন।

হা হা হা। কি চমৎকার জবাবটাই না দিয়েছিলাম সেদিন! মনে পরলে আজও হাসিতে পেট ফেটে যায়! একটা অবিবাহিত ছেলের প্রপোজালে বলেছিলাম আমি বিবাহিত ছেলেকে বিয়ে করব না। বিয়ে না করেই বিবাহিত!

আপনমনেই হাসছি হঠাৎ ঘাড়ে কারো তপ্ত নিঃশ্বাস পরতেই চমকে উঠলাম। তার শরীরের মাতাল করা ঘ্রাণটাই জানান দিচ্ছে সে কে। ঘাড়ের ওপর মুখ গুঁজে দুহাতে কোমর জড়িয়ে ধরে আছে সে। মুখ গুঁজে রেখেই ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন,

যার লাজুক হাসিতে
তীর বিঁধে এ বুকে—
যার কোকিলা কন্ঠে
মুগ্ধ আমি!
মাতাল হয়ে যাই যার
ভেজা চুলের সুঘ্রাণে—
বারবার পরি সেই
#অপরিচিতার_প্রেমে

তার কবিতা শুনে চুপ করে আছি আমি। কিছুই বলছিনা। তিনি আমার নিরবতা দেখে ঘাড়ে একটা চুমু খেয়ে বললেন,

– কি ভাবছে মহারাণী?

আমি মুচকি হেসে বললাম,

– সে ভাবছে ক্রাশবয়ের সাথে নিতুর বিয়ের কথা। কি করে সে তার প্রপোজাল রিজেক্ট করেছিল....

– আচ্ছা,তাই?

– হুম। মাথা নিচু করে জবাব দিলাম আমি। উনিও কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। তারপর কি যেন ভেবে উৎচ্ছসিত কন্ঠে বললেন,

– এই মনে আছে, তুমি চলে যাবার পর কিন্তু চমৎকার একটা বৃষ্টি হয়েছিল সেদিন।

– হুম,জানি। আর সদ্য প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে মনের দুঃখে সেদিন সেই বৃষ্টিতে ভিজেছিলে তুমি। তারপর সে রাতে জ্বরের ঠেলায় আর বাঁচ না! হা হা হা!

– এই জ্বর এসেছিল এ কথা কে বললো?

কপাল কুঁচকে তাকালেন। আমি হেসে ভ্রু নাচিয়ে বললাম,

– উহু,বলা যাবে না। জ্বর যে এসেছিল সে কথাতো সত্যি তাই না?

– নিশ্চয় হিয়া বলেছে,না? দাড়াও মজা দেখাচ্ছি।

বলেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। আমি আপনমনেই হাসছি। বড্ডো পাগল ছেলেটা!

তারপর আর কি? মা একদিন বললো আমাকে দেখতে আসবে কেউ। রেডি থাকতে হবে। মজার ব্যাপার হলো সেদিন সেই এসেছিল পাত্রী দেখতে!

যখন পাত্র-পাত্রীকে আলাদা কথা বলতে সেটা হয় তখন আমি অবাক হয়ে বলেছিলাম,

– আপনি?

– বলেছিলাম তো প্রেম না বিয়ে করবো? তুমি তো আবার ফ্যামিলির বাধ্য মেয়ে। ফ্যামিলি যা বলবে তাই করবে। নাও, ফ্যামিলির কথায় এখন আমাকেই বিয়ে করো।

– কিন্তু আপনার আগের বউ?

– মরে গেছে!

দায়সাড়া ভাবে জবাবটা দিলেন। আমি চমকে গেলাম,

– মানে কিভাবে?

– শুনবে?

আমি মাথা ঝাঁকাতেই উনি বেশ আগ্রহ নিয়ে বলতে লাগলেন,

– একদিন আমার সাথে খুব ঝগড়া লেগেছিল। তাই রাগের ঠেলায় দিলাম এক ধাক্কা।

– তারপর?

– তারপর আর কি? ধাক্কা খেয়ে তিন তলা থেকে সোজা উপরে।

বলেই শীষ বাজাতে বাজাতে চলে গেলেন। এরপরের ঘটনাটা তেমন কিছুই না। মা-বাবার পাত্র দেখে পছন্দ হয়ে গেল। আর আমিও ঠাস করে বিয়ে করে ঠুস করে বাসর ঘরে ঢুকে গেলাম। পরে অবশ্য জেনেছিলাম তিনি আগে কোনো বিয়েই করেননি। না করেছেন কোনো প্রেম!

সেদিনের মেয়েটা ছিল পাশের কেবিনে থাকা পেশেন্টের ওয়াইফ। পেশেন্টের আর কেউ ছিল না বলে আমার শাশুড়ি আম্মাজান তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন। হা হা!

আমি তা-না জেনে কি-না-কি ভেবে বসেছিলাম! অথচ এই কথাটা তিনি আমাকে বলেননি। যতবারই জানতে চেয়েছি, বলেছেন,

– আগের বউ মেরে ফেলেছি। তুমি ঝগড়া করলে , তোমাকে মেরে আরেকটা বিয়ে করবো।

আমিও আর ঝগড়া করি না। যদি আমাকে আবার ছাদ থেকে ফেলে মেরে ফেলে?

______[সমাপ্ত]______

Story Cover