অপরিচিতার প্রেমে

পর্ব - ১

🟢

কলেজের গণ্ডি পেরিয়ে প্রথম যেদিন ভার্সিটিতে গেলাম সেদিন মনে ছিল একরাশ ভয় আর আতঙ্ক! জানতাম না ঠিক কি হতে যাচ্ছে আমার জীবনে। একে বাবার ট্রান্সফারের কারণে নতুন এক জায়গায় এসে পরেছি, কাউকে চিনি না! তারমধ্যে আবার আছে ভার্সিটির সিনিয়রদের ভয়! শুনেছি ওদের হাতে পরলে নাকি রক্ষে নেই! কিসব র্যাগ না কি যেন দেয় তারা!

শত ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে সেদিন প্রথম ক্লাসটা করতে গিয়েছিলাম। তবে যে ভয় আর শঙ্কায় মন ছিল শঙ্কিত মুহুর্তেই তা হারিয়ে গেল নতুন সৃষ্টি হওয়া বন্ধুত্বের জোয়ারে! আমার সেই বন্ধুটির নাম ছিল স্বাতী ইসলাম। তার সাথে প্রথম দিনের ক্লাসটা ভালোভাবে করেই বাড়ি গিয়েছিলাম। কিন্তু বিপত্তি তো সেদিন ঘটেনি, ঘটেছিল তার পরের দিন! ভার্সিটির গেট দিয়ে ঢুকতেই চোখ আটকে গেলো এক হলুদ পাঞ্জাবি পরা হিমুকে দেখে!

হলুদ পাঞ্জাবি দেখে নামটা হিমু রাখলেও তার আসল নামটা কি ছিল, তা আমি জানতাম না। পরে অবশ্য জেনেছিলাম তিনি হিমু ছিলেন না। তিনি ছিলেন— না থাক বলবো না।

সেই হিমুকে দেখেছিলাম আরেক পাঞ্জাবি পরা ছেলের সাথে কথা বলতে বলতে হেঁটে যাচ্ছিলেন। মাঝে মাঝে কথার ছলেই হেসে উঠছিলেন। তাকে দেখেই যেন আমার হৃদয়ে একরাশ মুগ্ধতা বয়ে গিয়েছিল!

কিন্তু সেদিনের পর তাকে অনেক খুঁজেও আর পাইনি আমি। যেহেতু তাকে প্রথম ভার্সিটিতেই দেখেছিলাম আর নামটাও জানি না তাই সেভাবে আর খোঁজাটাও হয়ে ওঠেনি। অনেক খোঁজা-খুঁজির পর স্বাতী সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিল হয় তো তিনি এ ভার্সিটির নয়! কোনো কাজে এসেছিলেন! তাকে মনে হয় আর পাওয়া যাবে না, তাই আর না খোঁজাই ভালো!

কিন্তু মানুষ যা ভাবে তা কখনোই হয় না। তেমনই হঠাৎ করে তার দেখা পেয়ে গেলাম। একদিন ব্রেক টাইমে দেখি উনি বটতলায় বসে আড্ডা দিচ্ছেন। তার সাথের ছেলে-মেয়েগুলোর মুখ আমার বেশ পরিচিত। ভার্সিটিতে আসতে-যেতে প্রায়শই তাদের দেখতাম আমি। তারা তো এ ভার্সিটিরই ছাত্র। তবে তিনি?

তারপর থেকেই মাঝে মাঝে মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো করে আপনার দেখা পেতাম আমি। হঠাৎ এসে হঠাৎই চলে যেতেন! কখনো লাইব্রেরিতে, কখনো ক্যান্টিনে, কখনো মাঠে কখনো বা বটতলায়!

কিন্তু কখনোই আপনার সাথে পরিচিত হতে পারিনি আমি। আপনি খুব হাসি-খুশি, দুষ্টু, প্রাণোচ্ছ্বল আর অমায়িক একজন ছিলেন। দেখতাম সবার সাথে খুব সহজেই মিশে যেতেন। অপরিচিত কারো সাথে পরিচিত হতে খুব একটা সময় লাগতো না। কিন্তু আমি পারিনি সেই সুযোগটাকে কাজে লাগাতে! পারিনি নিজ থেকে পরিচিত হতে! দূর থেকে দেখেই আমার ভালো লাগতো।

স্বাতীর মাধ্যমেই জেনেছিলাম আপনার নাম, ইয়ার, ডিপার্টমেন্ট সব! অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তখন। নম্র-ভদ্র টাইপের হলেও দুষ্টুমি আর ফাজলামোতে আপনার জুড়ি মেলা ভার! সে কথা আমি সহ ভার্সিটির প্রায় সবাই জানতো।

তারপর একটা প্রজেক্টের কাজের জন্য আপনার সাথে পরিচয় হলো আমার। যৌথ সেই প্রজেক্টে গ্রুপ করে কাজ করতে হতো আর সিনিয়রদের হেল্প লাগতো। আপনিই পরেছিলেন আমাদের গ্রুপে! সেই সূত্রেই পরিচয়।

আপনি আপনার স্বভাব-সুলভ ভাবেই আমার সাথে মেশার চেষ্টা করেছিলেন,কিন্তু আমি পারিনি। আমার মাঝে সবসময়ই অজানা একটা জড়তা কাজ করতো। তাই সহজ হতে চেয়েও হওয়া আর হয়নি!

তিন মাসের সেই প্রজেক্টে আপনার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা হয়েছিল আমার। আপনাকে দেখেছি, চিনেছি, ভালোবেসেছি। হ্যাঁ, প্রথম দেখার সেই ভালোলাগাটা ঐ তিন মাসের পরিচয়ে ভালোবাসায় পরিণত হয়েছিল! তবে বলা আর হয়ে ওঠেনি। ঐ যে বললাম জড়তা! ওই জড়তার কারণেই আর বলতে পারিনি। বললে কি হতে পারে সেটা ভেবেই সরে এসেছিলাম। আমার হৃদয়ে গড়ে ওঠা সেই ভালোবাসাটা না হয় থাকুক আমার হৃদয়ে!

দেখতে-দেখতে সময় পার হয়ে গেল। আপনি মাস্টার্স পাশ করলেন। ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে এই ভার্সিটিতেই অ্যাপয়েন্টমেন্ট এর লেটার পেলেন। জানেন, আপনার রেজাল্ট শুনে যতটা খুশি হয়েছিলাম ঠিক ততটাই কষ্টে এ হৃদয় ভরে গিয়েছিল। কারণ এরপর আপনি জব করবেন। চলে যাবেন এখান থেকে! আগের সেই চোখের দেখাটাও বুঝি আর হবে না? তবে যখন শুনলাম আপনি এ ভার্সিটিতেই জয়েন্ট করছেন শুনে কি খুশিটাই না হয়েছিলাম!

জয়েনিংয়ের কিছুদিন আগে আপনার অ্যাক্সিডেন্টের কথা শুনেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠেছিল! স্বাতী বলেছিল কারের সাথে বাইক বাজিয়ে দিয়ে নাকি রlক্তারlক্তি অবস্থা! আপনাকে ওটি তে নিয়েছে কিন্তু আপনার রক্তের গ্রুপ নাকি কারো সাথে ম্যাচ করছে না! খবরটা শুনেই আমি আর স্বাতী দৌড়ে গেলাম হসপিটালে। তখন একবারও ভাবিনি কেউ যদি প্রশ্ন করে তুমি কে? তখন কি উত্তর দেবো। যদি বলে ও তোমার কে হয় যে তার জন্য তুমি এতো উদ্বিগ্ন? সেদিন শুধু ভেবেছিলাম আপনাকে দেখতে যাওয়াটা খুব জরুরি!

আপনার রক্তের গ্রুপ ছিল ও-নেগেটিভ। অনেক রেয়ার গ্রুপ! সিনেমার নায়িকাদের মতো আমি সেদিন আপনাকে রক্ত দিতে পারিনি। কারণ আমার ছিল এবি-পজেটিভ। আপনার পরিবার, বন্ধু কেউ কোথাও গ্রুপের রক্তের ডোনার খুঁজে পাচ্ছিল না। সবাই ভাবছিল আপনি বুঝি আর বাঁচবেন না! তবে হয়তো আল্লাহর অশেষ রহমতেই সেদিন বেঁচে গিয়েছিলেন আপনি!

স্বাতীর রক্তের গ্রুপ ছিল ও-নেগেটিভ। যেটা আমি জানতাম না। রক্ত পাওয়া যাচ্ছিল না শুনে ও রাজি হয়েছিল রক্ত দিতে। ও রক্ত দেবার জন্য ভিতরে গেলে আমি বাইরে দাঁড়িয়ে থাকি।

_____________

পাশাপাশি দুটো কেবিনের করিডোরে একটা করে বেঞ্চ। স্বাতী যাওয়ার পর লক্ষ্য করলাম দু'জন মহিলা বেঞ্চটাতে বসে আছেন। একজন মধ্যবয়স্ক আর একজন আমার বয়সী। আমার বয়সী মেয়েটার পরনে ঘরে পড়বার সুতি শাড়ি। দেখে বোঝাই যাচ্ছে কোনো খারাপ খবর পেয়ে ছুটে এসেছে! মেয়েটা তার শাড়ির আঁচলে মুখ চেপে ধরে কাদঁছে। আর মধ্যবয়স্ক মহিলাটি তার পিঠে আর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

আমি ঠিক বুঝলাম না এনারা কারা! এরা কি ওনার কেউ নাকি অন্য কেউ? যদি তাই হয় তবে এই মধ্যবয়স্ক মহিলাটি ওনার মা হবে। কিন্তু মেয়েটা কে?

অপারেশন সাকসেসফুল হলো। ওনাকে কেবিনে দেয়া হলো। ডাক্তার বলে গেল জ্ঞান ফেরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। আমি আর স্বাতী করিডোরে দাঁড়িয়ে আছি তখনই একজন নার্স এসে বললো আপনার নাকি জ্ঞান ফিরেছে। আপনি নাকি আপনার মাকে খুজছেন। কথাটা শুনেই ওই মহিলাটি দৌড়ে গেলেন। উনি কেবিনে ঢুকতেই নার্সটা বলে গেল- "একজন একজন করে যাবেন। বেশি ভিড় করবেন না। এতে রোগীদের সমস্যা হয়!"

কিছুক্ষণ পর স্বাতীর ভিতরে যাবার ডাক পরলো। পেশেন্ট না-কি দেখতে চায় কে তাকে রক্ত দিয়ে বাঁচালো। স্বাতী যেতে চাচ্ছিল না কিন্তু তাও ওকে ঠেলে পা আমি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইলাম। সেখান থেকেই দেখলাম কি সুন্দর সুস্থ-সবল, হাসি-খুশি ছেলেটার কি অবস্থা! কপালে, হাতে-পায়ে ব্যান্ডেজ! মুখ-চোখ শুকনো। কথাও ঠিক মতো বলতে পারছেন না!

উনি আর ওনার মা মিলে স্বাতীর সাথে কথা বলছেন। আন্টি স্বাতীর মাথার হাত বুলিয়ে দিয়ে দোয়া করে দিল। তখন জীবনে প্রথম বারের মতো বন্ধুর পাওয়া কোনো জিনিসের প্রতি হিংসে হয়েছিল আমার! মনে হয়েছিল, কেন আমার ব্লাড গ্রুপ ও-নেগেটিভ হলো না? কেন এবি-পজেটিভ হতে হলো?

সেদিন আমি আর আপনার সামনাসামনি যেতে পারিনি। কারণ নার্স বলেছিল একে-একে যেতে। কিন্তু একে-একে গেলে তো আমি আর যেতে পারবো না। কারণ আমি তো তার কেউ না। না বন্ধু, না ক্লাসমেট আর না কোনো আত্মীয়! আমি তো তার জুনিয়র। আমি সেখানে গিয়েছিলাম স্বাতীর সাথে। আর তো কোনো কারণ নেই! কি পরিচয়ে তার সাথে দেখা করবো আমি?

আমি দরজার আড়াল থেকে সরে এলাম। দেখলাম ওই মেয়েটা তখনও ফুপাচ্ছে। আমি আর কৌতুহল দমাতে না পেরে তাকে গিয়ে বলেই বসলাম-

– পেশেন্ট আপনার কে হয়? মানে আপনি পেশেন্টের কে?

প্রশ্ন শুনে মেয়েটা এক মুহুর্তের জন্য কান্না থামিয়ে আমার দিকে তাকালো। কান্না মেশানো কণ্ঠে বলল,

– জ্বী,আমি ওনার ওয়াইফ। কেন?

"ওয়াইফ"— শব্দটা কানে যেতেই থমকে গেলাম আমি। কী! উনি বিবাহিত? উনি বিয়ে করেছেন আর এই মেয়েটা ওনার ওয়াইফ? বিশ্বাস হয় না! তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম-

– না মানে তখন থেকে দেখছি আপনি শুধু কেদেই যাচ্ছেন, তাই জানতে চাচ্ছিলাম আর কি! চিন্তা করবেন না আপনার স্বামীর জন্য দোয়া করুন। আল্লাহ নিশ্চয় আপনার দোয়া কবুল করবেন। আই উইশ হি উইল রিকভার সুন!

বলেই পিছনে ফিরে দেখি স্বাতী দাড়িয়ে আছে। ও আমাকে বলল,

– কিরে দেখা করবি না?

আমি সেকথার কোনো জবাব না দিয়ে ওর হাত ধরে টেনে ওখান থেকে বেরিয়ে এলাম। বিষয়টা আর কাউকেই জানাইনি। নিজে নিজেই চেপে গেছি।

তারপর তিনি সুস্থ হয়ে ভার্সিটিতে জয়েন্ট করলেন। তবে ডিপার্টমেন্ট আলাদা বিধায় তার কোনো ক্লাস পাইনি।

সেদিনের পর থেকে মন থেকে এক প্রকার জোর করেই তাকে বের করতে চেয়েছি। তাকে মন থেকে তাড়াতে চেয়েছি। বন্ধুমহলে যখন কেউ তাকে নিয়ে কোনো আলোচনা করতো তখন সেটাকে এড়িয়ে যেতাম। তাকে দেখেও না দেখার ভান করে চলে যেতাম। আমার এই পরিবর্তনগুলো আর কারো চোখে না পরলেও স্বাতীর চোখে ঠিকই ধরা পরতো। ও আমার কাছে জানতেও চাইতো, কিন্তু আমি বলিনি। থাক না কিছু কথা অজানা! কাউকে কিছু না জানিয়ে গড়ে ওঠা হৃদয়ের তাজমহলটা নাহয় হৃদয়েই থাক! অযত্নে অবহেলায় নাহয় ভেঙেই পরুক! কেউ তো জানবে না কিছু!

______

– বাহ, মহারাণী পড়তে বসেছেন, অবিশ্বাস্য!

ব্যঙ্গ করা পুরুষ কণ্ঠে চমকে পিছনে তাকালাম। চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে দাড়ালাম। "ও-মাগো" করতে করতে দোয়া পরে বুকে ফুঁ দিলাম। আমার কাণ্ড দেখে তিনি হেসেই সাড়া! মুহুর্তেই ভয়টা হারিয়ে গেল। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে!

কি সুন্দর হাসি তার! হাসলে বা গালে টোল পরে। খোঁচা খোঁচা দাড়ির ফাঁকেও সে টোল যেন নিজ সৌন্দর্যে দীপ্তিমান। হাসি তালে দুলে ওঠা শরীর আর বাঁকা দাঁতের ঝলকানি!

আমি লক্ষ্য করে দেখেছি যাদের দাঁত বাঁকা তাদের হাসলে ভালো লাগে না। কিন্তু তিনি যখন হাসেন তখন তার ওই বাঁকা দাঁতের হাসিই যেন হাজার রমণীর বুকে তীর ছুড়ে মারে!

তারপর তিনি হাসি থামিয়ে টেবিলের দিকে এগিয়ে এসে বললেন,

– দেখি কি পড়ছিলে? কোন সাবজেক্ট?

আমি তাকে দেখেই আমতা আমতা করে ডাইরিটা লুকিয়ে ফেলতে ধরলাম। কিন্তু তার আগেই তিনি আমার হাত টেনে ধরলেন। বেশ ঠাণ্ডা কণ্ঠে বললেন,

– ডাইরি লুকাচ্ছো কেন?

– না— মানে— আসলে— এমনি—

– লুকিয়ে লাভ নেই জানপাখি! আমি তো জানি তুমি কি লেখো!

তিনি জানেন মানে? তিনি কি সত্যিই জানেন আমি আমার ডাইরিতে তাকে নিয়ে কি লেখি? তার দিকে অবাক চোখে তাকাতেই তিনি হেসে বললেন,

– তুমি কি লেখো কি ভেবেছো আমি জানিনা? জানি জানি। সব জানি। তুমি লেখো কোন ব্যাঙ কতো সালে বিয়ে করেছে, কোন হাতির বাচ্চা হয়েছে, কোন টিকটিকি মারা গেছে, একেবারে ছাতার মাথা!

বলেই অট্টহাসিতে ফেটে পরলেন। তার কথাগুলো শুনে গা জ্বলে উঠলো আমার। বলে কি এই লোক? আমি ছাতার মাথা লিখি?

আমি রাগ করে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে ধরলাম। যাওয়ার আগে সোফার ওপর থেকে একটা কুশন তুলে তার মুখ বরাবর চটকা মারতেই তিনি দু'হাতে সেটা ধরে ফেললেন। আর তার কি হাসি!

Story Cover