তাসমিয়াতুন-নেসাঃ পার্ট - ৫

🟢

ভাঙন যখন গভীর হয়, তখন মানুষ আর কাঁদে না। কাঁদার জায়গাটাও যেন শুকিয়ে যায়। তাসমিয়ার ঠিক তেমনই অবস্থা এখন।

সে জানে না কবে থেকে তার ভেতরে এই পরিবর্তনটা এসেছে। কোনো একটা সকাল ছিল না, যেদিন ঘুম ভেঙে সে বুঝেছে—আজ থেকে আমি বদলে গেছি। বরং ধীরে ধীরে, দিনের পর দিন, ছোট ছোট ঘটনা তাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে, যেখানে আবেগ আর যুক্তির মাঝখানে সে একা দাঁড়িয়ে আছে।

স্কুলে যাওয়া এখন আর কষ্টকর লাগে না, আবার ভালোও লাগে না। এটা হয়ে গেছে অভ্যাসের মতো। ইউনিফর্ম পরা, ব্যাগ কাঁধে নেওয়া, রাস্তায় হাঁটা—সবকিছু সে করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। যেন কেউ ভেতরে বসে রিমোট কন্ট্রোল চালাচ্ছে, আর সে শুধু চলেই যাচ্ছে।

স্কুলের গেটে ঢুকতেই সে আজ খেয়াল করে—নাইম নেই। আগের কয়েকদিনও সে তেমন চোখে পড়েনি। কেউ কেউ বলে, সে নাকি অন্য সেকশনের বন্ধুদের সাথে বেশি থাকে এখন। কেউ আবার বলে, কোচিং বদলেছে। তাসমিয়া এসব কথায় আর আগ্রহ পায় না। সে শুধু এটুকু জানে—নাইম তার জীবনের দৃশ্যপট থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। কোনো নাটক ছাড়া, কোনো অভিযোগ ছাড়া।

এই সরে যাওয়াটাই সবচেয়ে বাস্তব।

ক্লাসে আজ সে বোর্ডের দিকে তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ। স্যার কী লিখছেন, সে বুঝতে পারে। কিন্তু প্রতিটা লাইনের ফাঁকে ফাঁকে তার নিজের একটা প্রশ্ন ঢুকে পড়ে—আমি কি আসলেই কাউকে ভালোবাসতাম? নাকি ভালোবাসার মতো কিছু একটা অনুভব করতে চাইতাম?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সে আর চেষ্টা করে না। কারণ উত্তর খুঁজতে গেলে আবার নতুন প্রশ্ন জন্ম নেয়।

টিফিন পিরিয়ডে আজ সে ছাদে ওঠে। এই জায়গাটায় খুব কম মানুষ আসে। বাতাস বেশি, শব্দ কম। সে রেলিংয়ে হাত রেখে নিচের মাঠের দিকে তাকায়। ছেলেমেয়েরা খেলছে, হাসছে। কারো জীবনে যেন কোনো জটিলতা নেই। এই দৃশ্যটা দেখে তার মনে হয়—সবাই কি আসলেই এমন? নাকি সবাই নিজের ভেতরের গল্প লুকিয়ে রাখে?

হঠাৎ পেছন থেকে পায়ের শব্দ।

সে ঘুরে তাকায়।

নাইম।

আজ তাকে দেখে নাইমের মুখে কোনো দ্বিধা নেই। চোখে আছে স্থিরতা। তাসমিয়ার বুকের ভেতর একটা অজানা আশঙ্কা জন্ম নেয়। এই স্থিরতা ভালো কিছুর ইঙ্গিত দেয় না—সে জানে।

“একটু কথা বলবো?”—নাইম জিজ্ঞেস করে।

তাসমিয়া মাথা নাড়ায়। তারা দুজন ছাদের একপাশে দাঁড়ায়। বাতাসে দুজনের কথাই ভেসে যেতে পারে—এই নিশ্চয়তাটাই জায়গাটাকে নিরাপদ করে তোলে।

“আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না,”—নাইম সরাসরি বলে।

এই বাক্যটা শুনে তাসমিয়ার ভেতরে কিছু একটা ভেঙে পড়ে। সে জানত এই কথা আসবে, তবু প্রস্তুত ছিল না।

“আমি বুঝি,”—সে বলে। এই বোঝাটার ভেতরে কোনো নাটক নেই।

নাইম একটু থামে। তারপর বলে, “আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না। সত্যি বলছি।”

তাসমিয়া চুপ করে থাকে।

“কিন্তু আমি নিজেকেও আর এই অবস্থায় রাখতে পারছি না,”—নাইম বলে। “আমি প্রতিদিন ভাবি—তুমি কি একদিন আমার দিকে আসবে? নাকি আমি শুধু তোমার জীবনের একটা ধাপ?”

এই প্রশ্নটার উত্তর তাসমিয়া জানে। কিন্তু জানাটা বলার মতো সাহস তার নেই।

“আমি এখনো পরিষ্কার না,”—শেষমেশ সে বলে। “আর আমি তোমাকে মিথ্যে আশাও দিতে চাই না।”

এই সততাটাই নাইমের চোখে পানি এনে দেয়। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়।

“এই কথাটাই সবচেয়ে কষ্ট দেয়,”—নাইম বলে। “কারণ এতে তোমার কোনো দোষ নেই।”

তারা দুজনেই চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এই চুপ থাকা আর আগের চুপ থাকার মতো না। এটা শেষের চুপ।

“আমি সরে যাচ্ছি,”—নাইম বলে। “একদম।”

এই ‘একদম’ শব্দটা তাসমিয়ার বুকের ভেতর অনেকক্ষণ বাজে।

“নিজেকে বাঁচানোর জন্য,”—নাইম যোগ করে।

তাসমিয়া মাথা নেড়ে। সে জানে—এই সরে যাওয়াটা দরকার ছিল। তবু বুকের ভেতর কেমন যেন ফাঁকা লাগে। কেউ যখন দরজা বন্ধ করে চলে যায়, তখন হাওয়ার শব্দটাও কানে বাজে।

নাইম চলে যায়। পেছন ফিরে তাকায় না।

সেদিন তাসমিয়া অনেকক্ষণ ছাদে দাঁড়িয়ে থাকে। ঘণ্টা বাজে, ক্লাস শুরু হয়। সে দেরিতে ক্লাসে ঢোকে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না। হয়তো সবাই বুঝে গেছে—আজ প্রশ্ন করার দিন না।

বিকেলে রিয়াজ আসে টিউশনে। আজ সে আগের চেয়ে বেশি চুপ। পড়া শুরু হয়, কিন্তু তাসমিয়ার মন বসে না।

“আজ শেষ সপ্তাহ,”—রিয়াজ হঠাৎ বলে।

এই কথাটা শোনার পর তাসমিয়া চমকে তাকায়। সে জানত, তবু শুনতে চায়নি।

“আমি কাল-পরশু আর আসবো,”—রিয়াজ বলে। “তারপর… চলে যাবো।”

এই ‘চলে যাবো’ শব্দটার ওজন অনেক।

“ভালো থাকবেন,”—তাসমিয়া বলে, খুব স্বাভাবিকভাবে।

রিয়াজ হালকা হাসে। “তুমিও।”

কিছুক্ষণ চুপ। তারপর রিয়াজ বলে, “তোমার বয়সে আমি অনেক কিছু ভুল বুঝেছিলাম।”

তাসমিয়া তাকায়।

“আমি ভাবতাম,”—রিয়াজ বলে—“যে অনুভূতিটা তীব্র, সেটাই সত্য। পরে বুঝেছি—যেটা শান্ত, সেটাই টিকে।”

এই কথাটা তাসমিয়ার মনে কোথাও গেঁথে যায়। কিন্তু সে প্রশ্ন করে না—এই শান্তিটা কি সে পাবে?

টিউশন শেষ হলে রিয়াজ উঠে দাঁড়ায়। আজ সে দরজায় দাঁড়িয়ে একটু বেশি সময় নেয়।

“একটা কথা বলি?”—সে জিজ্ঞেস করে।

তাসমিয়া মাথা নেড়ে।

“তুমি কাউকে হারাওনি,”—রিয়াজ বলে। “তুমি শুধু কিছু ভুল সময় চিনে নিয়েছো।”

এই কথাটা শুনে তাসমিয়ার চোখ জ্বালা করে। সে চোখ নামিয়ে নেয়।

রিয়াজ চলে যায়। দরজা বন্ধ হয়। এই দরজাটা আর খুলবে না—এই উপলব্ধিটা তাকে হঠাৎ খুব একা করে দেয়।

রাত আসে। আজ সে জানালার কাছে যায় না। বিছানায় বসে থাকে। ফোনটা হাতে নেয়, আবার নামিয়ে রাখে। নাইমের কোনো মেসেজ আসবে না—সে জানে। রিয়াজেরও না।

এই জানা জিনিসটাই আজ সবচেয়ে ভারী।

পরদিন স্কুলে সে একা একা থাকে। কেউ আর তাকে নিয়ে কথা বলে না—কারণ মানুষের আগ্রহ ক্ষণস্থায়ী। নতুন গল্প এসেছে। এই স্বস্তিটা তাসমিয়ার জন্য অদ্ভুত।

স্কুল শেষে সে একা হাঁটে। রাস্তার ধারে দোকান, মানুষের ভিড়—সবকিছু স্বাভাবিক। শুধু তার ভেতরটা বদলে গেছে।

সে বুঝতে পারে—এই কয়েক মাসে সে অনেকটা বড় হয়ে গেছে। বয়সে না, বোঝায়।

ভালোবাসা মানে সবসময় পাওয়া না। কিছু ভালোবাসা মানে ছেড়ে দেওয়া। আর কিছু আবেগ মানে—ভবিষ্যতের আগে আসা ভুল।

এই উপলব্ধিগুলো তাকে শান্ত করে না, কিন্তু শক্ত করে।

রাতে সে খাতা খুলে লেখে। আজ সে কারো নাম লেখে না। শুধু নিজের কথা লেখে। নিজের ভয়, নিজের ভুল, নিজের না-পারাগুলো।

লেখা শেষ করে সে কলম নামিয়ে রাখে। জানে—এই অধ্যায় প্রায় শেষ।

কিন্তু ঠিক শেষ হওয়ার আগেই তার মনে একটা প্রশ্ন উঠে আসে, যেটা তাকে ঘুমোতে দেয় না—

যদি এই বয়সে সে কাউকে ভালোবাসতে গিয়ে নিজেকে হারায়, তাহলে বড় হয়ে সে কি আদৌ কাউকে ভালোবাসতে পারবে?

নাকি এই ভাঙনটাই তাকে সারাজীবনের জন্য সাবধান করে দেবে?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো পরের দিনগুলো দেবে। আর সেই উত্তরটা—হয়তো কারো হাত ধরে আসবে না।

...

শেষটা কখনো হঠাৎ আসে না। শেষটা আসে ধীরে—এত ধীরে যে মানুষ টেরই পায় না, কখন সে শেষের ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

তাসমিয়া এখন ঠিক সেই জায়গাটায় দাঁড়িয়ে আছে।

ভোরের আলো জানালায় এসে পড়ে। আজ সে পর্দা টানে না। আলো ঢুকুক—এই সিদ্ধান্তটা আজ তার নিজের। ঘুম ভাঙার পর সে অনেকক্ষণ বিছানায় বসে থাকে। ফোনটা হাতের কাছে আছে, কিন্তু সে ছোঁয় না। আজ আর কোনো মেসেজের অপেক্ষা নেই। আজ আর কেউ লিখবে না—এই জ্ঞানটা তার ভেতরে অদ্ভুত এক ধরনের শান্তি এনে দিয়েছে।

শান্তি মানে সুখ না। শান্তি মানে বোঝা।

আজ রিয়াজ চলে যাবে।

এই বাক্যটা সে গত কয়েকদিন ধরে মাথার ভেতর ঘুরিয়েছে। প্রথমে বাক্যটা ভারী ছিল, তারপর ধীরে ধীরে হালকা হয়েছে। এখন বাক্যটা কেবল সত্য। কোনো আবেগ নেই, কোনো প্রতিবাদ নেই।

তাসমিয়া আয়না দেখে হাসছে

নাশতার টেবিলে মা আজ একটু বেশি কথা বলে। তাসমিয়া শুনে, উত্তর দেয়। বাবার চোখে আজ তাকে একটু বেশি খেয়াল করার ছাপ। সে জানে—বড়রা সব বোঝে না, কিন্তু অনেক কিছু টের পায়।

স্কুলে যাওয়ার পথে আজ তার বুকের ভেতরে কোনো তাড়া নেই। রাস্তার প্রতিটা দৃশ্য সে মন দিয়ে দেখে। দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ, স্কুলগামী বাচ্চাদের হাসি, রিকশার শব্দ—সবকিছু আজ তার কাছে পরিষ্কার লাগে। যেন সে প্রথমবার চারপাশটা দেখছে।

স্কুলে পৌঁছানোর পর সে আর জানালার পাশে বসে না। আজ সে মাঝখানের বেঞ্চে বসে। এই ছোট্ট পরিবর্তনটা সে নিজেই লক্ষ্য করে। জানালার পাশে বসে সে সবসময় পালাতে চেয়েছিল—বাইরে, দূরে। আজ সে আর পালাতে চায় না।

ক্লাসে আজ নাইম নেই। সে জানে, নাইম আজ আসবে না। হয়তো ইচ্ছা করে, হয়তো প্রয়োজন থেকে। এই অনুপস্থিতিটা আজ তাকে কষ্ট দেয় না। বরং মনে হয়—এটাই ঠিক।

টিফিনের সময় সে একা বসে না। দু-একজন বান্ধবীর সাথে বসে। কথা বলে সাধারণ বিষয় নিয়ে। পড়া, পরীক্ষার প্রস্তুতি, ভবিষ্যৎ। এই ভবিষ্যৎ শব্দটা আগে তাকে ভয় দেখাত। আজ শব্দটা নিরপেক্ষ লাগে।

স্কুল ছুটির পর সে বাড়ি ফেরে। আজ টিউশন নেই। আজ শেষবারের মতো রিয়াজ আসবে—শুধু দেখা করতে।

বিকেলের আলো নরম। ঘরে একটা অদ্ভুত নীরবতা। ঘড়ির কাঁটা স্পষ্ট শোনা যায়। দরজার বেল বাজে।

রিয়াজ আসে। আজ সে ব্যাগ নিয়ে আসেনি। সাধারণ পোশাক। মুখে হালকা হাসি। এই হাসিটা কোনো অভিনয় না—এটা বিদায়ের হাসি।

“ভেতরে আসুন,”—তাসমিয়া বলে।

তারা বসে। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না। এই নীরবতা অস্বস্তিকর নয়। এটা পূর্ণ।

“আমি যাচ্ছি,”—রিয়াজ বলে, খুব স্বাভাবিকভাবে।

“জানি,”—তাসমিয়া উত্তর দেয়।

রিয়াজ তাকায়। “তুমি বদলে গেছো।”

তাসমিয়া মাথা নেড়ে। “আমি বড় হয়েছি।”

এই কথাটা বলতে গিয়ে সে নিজেই অবাক হয়। বড় হওয়া মানে কি বয়স বাড়া? নাকি কিছু হারানো?

রিয়াজ ধীরে বলে, “আমি চাই, তুমি একটা কথা মনে রাখো।”

তাসমিয়া তাকায়।

“এই বয়সের অনুভূতিগুলো খুব সত্যি লাগে,”—রিয়াজ বলে—“কারণ এগুলো প্রথম। কিন্তু প্রথম মানেই শেষ না।”

এই কথাটা তাসমিয়ার বুকের ভেতরে কোথাও স্থির হয়ে বসে।

“আমি যদি কখনো তোমাকে বিভ্রান্ত করে থাকি,”—রিয়াজ বলে—“আমি দুঃখিত।”

তাসমিয়া তাড়াতাড়ি মাথা নেড়ে। “আপনি কিছুই করেননি।”

রিয়াজ হালকা হাসে। “কখনো কখনো কিছু না করাটাও কিছু করে ফেলে।”

এই সত্যিটা তাসমিয়া আজ বুঝতে পারে।

রিয়াজ উঠে দাঁড়ায়। দরজার কাছে গিয়ে থামে। আজ সে আর কোনো উপদেশ দেয় না। শুধু বলে—

“নিজের সাথে সৎ থেকো। বাকিটা নিজে নিজেই ঠিক হয়ে যাবে।”

দরজা বন্ধ হয়। শব্দটা নরম, কিন্তু চূড়ান্ত।

রিয়াজ চলে গেছে।

ঘরটা হঠাৎ বড় হয়ে যায়। তাসমিয়া চেয়ারটায় বসে পড়ে। চোখে পানি আসে না। কাঁদার ইচ্ছাও হয় না। সে জানে—এই বিদায়টা দরকার ছিল।

রাত নামে। আজ সে জানালার কাছে যায় না। টেবিলে বসে খাতাটা খুলে। অনেকদিন পর সে পুরোটা পড়ে। নিজের হাতের লেখা। নিজের প্রশ্ন। নিজের ভাঙন।

আজ সে নতুন করে লেখে।

লেখে— “আমি কাউকে হারাইনি। আমি শুধু নিজেকে খুঁজে পেয়েছি।”

এই লাইনটা লিখে সে থামে। কলম নামিয়ে রাখে।

পরদিন সকালটা অন্যরকম। আজ তার কোনো তাড়া নেই। স্কুলে যাওয়ার আগে সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে। নিজের চোখের দিকে তাকায়। এই চোখে আজ ভয় কম, বোঝা বেশি।

স্কুলে গিয়ে সে শুনতে পায়—নাইম অন্য স্কুলে ভর্তি হয়েছে। কথাটা কেউ খুব স্বাভাবিকভাবে বলে। তাসমিয়ার বুকের ভেতরে একটা হালকা শূন্যতা হয়। তারপর সেটা মিলিয়ে যায়।

সে জানে—নাইম তার জীবনের একটা অধ্যায় ছিল। খুব প্রয়োজনীয় অধ্যায়। কিন্তু অধ্যায় মানেই বই না।

দিন যায়। সপ্তাহ যায়। মানুষের কথা থেমে যায়। গুজব পুরোনো হয়। জীবন নতুন ব্যস্ততায় ভরে যায়।

তাসমিয়া এখন একা হাঁটে। একা ভাবে। একা সিদ্ধান্ত নেয়।

এই একাকীত্ব তাকে দুর্বল করে না। বরং সে শিখেছে—একাকীত্ব মানে শূন্যতা না, একাকীত্ব মানে নিজের সাথে থাকা।

একদিন সন্ধ্যায় সে আবার জানালার কাছে দাঁড়ায়। অনেকদিন পর। বাইরে বাতাস। আকাশে চাঁদ। এই দৃশ্যটা আগেও ছিল। কিন্তু আজ সে আলাদা মানুষ।

আজ সে জানে—

প্রেম মানেই শান্তি না। ভালোবাসা মানেই নিরাপত্তা না। আর আবেগ মানেই ভবিষ্যৎ না।

এই বয়সে যা অনুভব হয়, তা সত্যি— কিন্তু সব সত্যি জিনিস ধরে রাখা যায় না।

কিছু সত্যি জিনিস ছেড়ে দিতে হয়, যাতে মানুষটা নিজে বাঁচে।

তাসমিয়া জানে—সামনে তার জীবন আছে। নতুন মানুষ আসবে, যাবে। হয়তো আবার ভালো লাগবে। হয়তো আবার ভয় পাবে।

কিন্তু এখন সে প্রস্তুত।

কারণ সে বুঝে গেছে— নিজেকে না বুঝে কাউকে ভালোবাসা মানে নিজের সাথে প্রতারণা করা।

জানালার কাঁচে তার প্রতিচ্ছবি পড়ে। সে তাকায়। হালকা হাসে।

এই হাসিটা কোনো জয়ীর হাসি না। এটা বোঝার হাসি।

আর এই বোঝাটাই— তার জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

◾ ---------- সমাপ্ত ---------- ◾

তাসমিয়া-৫ কভার ফটো