তাসমিয়াতুন-নেসাঃ পার্ট - ৪

🟢

সকালের আলোটা আজ তাসমিয়ার ঘরে ঢুকেছে নির্দয়ভাবে। কোনো কোমলতা নেই, কোনো ধীরে জাগানোর চেষ্টা নেই। জানালার ফাঁক দিয়ে সোজা এসে পড়েছে তার চোখে। সে চোখ বন্ধ করে আবার খুলে। মাথার ভেতর এক ধরনের ভারী ভাব—যেন ঘুম ঠিকমতো হয়নি, আবার জাগাও সম্পূর্ণ হয়নি।

গত কয়েকদিন ধরে তার এমনই লাগছে।

বিছানা থেকে উঠতে ইচ্ছে করে না। উঠলেও দিন শুরু করতে ইচ্ছে করে না। অথচ উঠতেই হয়। কারণ পৃথিবী কাউকে থেমে থাকতে দেয় না—বিশেষ করে কিশোরীদের।

সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। ফোনটা হাতে নেয়। নাইমের কোনো নতুন মেসেজ নেই। গত রাতেও সে অপেক্ষা করেছিল। ইচ্ছা করেই নয়, অভ্যাসবশত। তারপর নিজেকেই বকা দিয়েছে—এই অপেক্ষাটাই তো সমস্যা।

রিয়াজের কথাও মনে পড়ে। “নিজের অনুভূতিকে ভয় পেও না।” কথাটা ভালো শোনায়, কিন্তু বাস্তবে ভয় না পাওয়া এত সহজ না। অনুভূতি যখন আসে, সে সঙ্গে নিয়ে আসে দায়, সিদ্ধান্ত, ভুল—সবকিছু।

নাশতার টেবিলে আজ তাসমিয়া খুব কম কথা বলে। মা দু’বার তাকায়, কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করে না। মায়ের এই না-জিজ্ঞেস করাটাই তাকে বেশি কষ্ট দেয়। কারণ তাসমিয়া জানে, মা টের পাচ্ছে। মায়েরা সবসময় টের পায়। শুধু সবসময় বলে না।

স্কুলের পথে হাঁটতে হাঁটতে সে হঠাৎ বুঝতে পারে—তার ভেতরের অস্থিরতা এখন আর শুধু তার একার না। আশপাশের মানুষও সেটা টের পাচ্ছে।

স্কুলে ঢুকতেই প্রথম যে জিনিসটা সে অনুভব করে, সেটা দৃষ্টি। সরাসরি তাকানো না, কিন্তু পাশ কাটিয়ে তাকানো। ফিসফিস। হালকা হাসি। কেউ কেউ আবার খুব স্বাভাবিক হওয়ার ভান করছে—যেটা আরও অস্বাভাবিক।

তাসমিয়া নিজের বেঞ্চে গিয়ে বসে। জানালার পাশে। আজ জানালার বাইরে তাকিয়েও শান্তি পাচ্ছে না। মনে হয়, জানালাটাও আজ তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে।

নাইম ক্লাসে ঢোকে কিছুক্ষণ পর। আজও চোখাচোখি হয়। কিন্তু আজ সে দৃষ্টিটা সরিয়ে নেয় আগে। এই ছোট্ট ঘটনাটা তাসমিয়ার বুকের ভেতরে কোথাও একটা চিড় ধরায়। সে বুঝতে পারে—নাইম কিছু বুঝে গেছে। অথবা কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে।

ক্লাস শুরু হয়। বোর্ডে লেখা ওঠে, স্যার কথা বলেন। তাসমিয়া খাতায় লেখে। কিন্তু লেখার লাইনের ফাঁকে ফাঁকে তার নিজের প্রশ্নগুলো ঢুকে পড়ে।

আমি কী ভুল করছি? আমি কি কাউকে কষ্ট দিচ্ছি? আমি কি আসলে নিজেকেই ঠকাচ্ছি?

টিফিন পিরিয়ডে সে আর লাইব্রেরিতে যায় না। আজ সে সোজা মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আশপাশে কয়েকজন মেয়ে। তাদের কথার টুকরো টুকরো শব্দ ভেসে আসে।

“ওই যে, ওইটা না?” “শুনছিস, কোচিং স্যারের সাথে…” “না না, সিনিয়র একজন…”

তাসমিয়ার শরীর ঠান্ডা হয়ে আসে। কথাগুলো স্পষ্ট না, কিন্তু ইঙ্গিত পরিষ্কার। এই প্রথম সে বুঝতে পারে—নীরবতা কখনো কখনো মানুষকে বাঁচায় না, বরং সন্দেহের জায়গা তৈরি করে।

সে কিছু বলে না। কারণ সে জানে, কিছু বললেও এই কথাগুলো থামবে না। মানুষ যেটা জানে না, সেটা নিজে বানিয়ে নেয়।

স্কুল ছুটি হলে নাইম তার কাছে আসে না। এই না-আসাটা খুব স্পষ্ট। আগের দিন হলে এই না-আসাটাই হয়তো তাকে শান্ত করত। আজ সেটা কেবল ফাঁকা লাগে।

বাসায় ফেরার পথে সে আর কারো সাথে কথা বলে না। মনে হয়, সে যেন ধীরে ধীরে একটা ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ছে—যার দরজা বাইরে থেকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বিকেলে টিউশনের সময় রিয়াজ আসে। আজ তার আচরণ খুব স্বাভাবিক। খুব বেশি স্বাভাবিক। যেন ইচ্ছা করেই কোনো ব্যক্তিগত জায়গায় পা দিচ্ছে না।

পড়া শুরু হয়। তাসমিয়া মন দিয়ে শোনে। অংকগুলো আজ কঠিন না, কিন্তু মনোযোগ রাখতে কষ্ট হচ্ছে। রিয়াজ একসময় থেমে বলে—

“আজ তোমার মন অন্য জায়গায়।”

তাসমিয়া চমকে তাকায়। “এতটা বোঝা যায়?”

রিয়াজ হালকা হাসে। “যাকে পড়াই, তাকে তো একটু বুঝতেই হয়।”

এই কথার মধ্যে কোনো রোমান্টিকতা নেই। আছে কেবল বাস্তবতা। তাসমিয়া হঠাৎ স্বস্তি পায়। অন্তত এখানে তাকে কিছু প্রমাণ করতে হচ্ছে না।

“স্কুলে কিছু হয়েছে?”—রিয়াজ জিজ্ঞেস করে।

এই প্রশ্নটাই যেন বাঁধ ভেঙে দেয়। তাসমিয়া চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তারপর বলে—

“মানুষ কথা বানাচ্ছে।”

রিয়াজ আর কিছু জিজ্ঞেস করে না। শুধু বলে, “মানুষ সবসময়ই বানায়। প্রশ্ন হলো—তুমি কোনটাকে গুরুত্ব দেবে।”

এই কথাটা সহজ, কিন্তু কাজে লাগানো কঠিন।

টিউশন শেষ হলে রিয়াজ উঠে দাঁড়ায়। আজ সে আর বেশি কথা বলে না। চলে যাওয়ার সময় শুধু বলে—

“নিজেকে হারিও না। বাকিটা মানুষ যেমন খুশি ভাবুক।”

রিয়াজ চলে যায়। তাসমিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। বাইরে সন্ধ্যা নামছে। এই আলো-আঁধারির সময়টাতেই সে সবচেয়ে বেশি অসহায় বোধ করে।

রাতে ফোনে একটা মেসেজ আসে। নাইম।

“আজ তোমাকে অনেক দূরে মনে হলো।”

এই লাইনটা সে অনেকক্ষণ দেখে। উত্তর দেয় না সঙ্গে সঙ্গে। কারণ সে জানে, যাই লিখবে—সেটা কিছু না কিছু ভাঙবে।

শেষমেশ সে লেখে—“আমি কনফিউজড।”

নাইমের রিপ্লাই আসে কিছুক্ষণ পর। “আমি বুঝি। কিন্তু সব কনফিউশনের মাঝখানে কেউ কেউ ভীষণ পরিষ্কার থাকে।”

এই কথাটার মানে তাসমিয়া বুঝতে পারে। নাইম বলছে—সে আর এই মাঝামাঝি অবস্থানে থাকতে চায় না।

পরদিন স্কুলে পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দু-একজন সরাসরি প্রশ্ন করে না, কিন্তু আচরণ বদলে যায়। কেউ কেউ দূরে থাকে, কেউ আবার অপ্রয়োজনীয় ঘনিষ্ঠতা দেখাতে চায়। এই দুইটাই সমান অস্বস্তিকর।

একসময় তাসমিয়া বুঝতে পারে—এই অবস্থাটা আর সাময়িক না। এটা ধীরে ধীরে তার পরিচয়ের অংশ হয়ে যাচ্ছে।

নাইম এখন আর নিজে থেকে কথা বলে না। কিন্তু দূরে থেকেও নজরে রাখে। এই নজর রাখাটাই সবচেয়ে কষ্টকর। কারণ এতে না আছে দাবি, না আছে ছেড়ে দেওয়া।

একদিন টিফিনের সময় নাইম নিজেই কথা বলে।

“আমরা কি একটু হাঁটবো?”

তাসমিয়া মাথা নাড়ায়। তারা স্কুলের পেছনের দিকটায় হাঁটে। সেখানে লোক কম।

“আমি আর পারছি না,”—নাইম হঠাৎ বলে। “এইভাবে।”

“কোনভাবে?”—তাসমিয়া প্রশ্ন করে, যদিও সে উত্তর জানে।

“যেন আমি কিছু না কিছু আশা করছি, আর তুমি কিছু না কিছু এড়িয়ে যাচ্ছো।”

এই কথার জবাবে তাসমিয়া কিছু বলতে পারে না। কারণ এটা মিথ্যে না।

“আমি তোমাকে দোষ দিচ্ছি না,”—নাইম বলে। “আমি শুধু বুঝতে চাই—তুমি কি আদৌ আমার দিকে এগোচ্ছো?”

এই প্রশ্নটা সহজ, কিন্তু উত্তরটা ভয়ংকর।

“আমি জানি না,”—তাসমিয়া সত্যিটাই বলে। “আর এই না জানাটাই আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা।”

নাইম দীর্ঘশ্বাস ফেলে। “তাহলে আমাকে একটু দূরে যেতে দাও।”

এই কথাটা শোনার পর তাসমিয়ার বুকের ভেতর কেমন যেন শূন্য হয়ে যায়। সে চায় না নাইম দূরে যাক। আবার ধরে রাখার সাহসও নেই।

নাইম চলে যায়। কোনো নাটক ছাড়াই। কোনো অভিযোগ ছাড়াই।

সেদিন সন্ধ্যায় তাসমিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। ফোন হাতে নেয়, আবার নামিয়ে রাখে। আজ সে প্রথমবার বুঝতে পারে—সব বিচ্ছেদ ঝগড়া দিয়ে হয় না। কিছু বিচ্ছেদ হয় বোঝাপড়া দিয়ে, আর সেগুলোই সবচেয়ে কষ্ট দেয়।

রিয়াজের টিউশনে আজ সে খুব মনোযোগী। যেন পড়াটাই তার একমাত্র আশ্রয়। রিয়াজ কিছু বুঝলেও কিছু বলে না।

টিউশন শেষে রিয়াজ বলে—“তুমি আজ খুব চুপ।”

তাসমিয়া হালকা হাসে। “আজ চুপ থাকাটাই সহজ।”

রিয়াজ মাথা নাড়ায়। “সবচেয়ে সহজ জিনিসটাই অনেক সময় সবচেয়ে বেশি শেখায়।”

রাত গভীর হয়। তাসমিয়া জানালার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে। আজ তার মনে কোনো নাটকীয় প্রশ্ন নেই। আছে শুধু একটা ধীর উপলব্ধি—

সব অনুভূতি ধরে রাখা যায় না। সব সম্পর্ক নাম পায় না। আর সব ভালো লাগা শেষ পর্যন্ত শান্তি এনে দেয় না।

সে বুঝতে পারে—ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। নীরবে, ধীরে, কিন্তু স্থায়ীভাবে।

আর এই ভাঙনের পরের মানুষটা আর আগের মতো থাকবে না—এই সত্যিটাই তাকে সবচেয়ে বেশি ভয় দেখায়।

কিছু ভাঙন শব্দ করে না। কোনো দরজা বন্ধ হয় না, কোনো চিৎকার হয় না, কেউ কাঁদতেও থাকে না। তবু ভাঙনটা ঠিকই হয়—ধীরে, নীরবে, মানুষের ভেতরে।

তাসমিয়া এখন সেই নীরব ভাঙনের ভেতর দিয়ে হাঁটছে।

সকালগুলো তার কাছে এখন আর নতুন দিনের মতো লাগে না। বরং আগের দিনেরই টানা অংশ মনে হয়। ঘুম থেকে উঠে সে আর আগের মতো জানালার দিকে তাকায় না। জানালার বাইরে তাকালে আগে যে আশ্বাস পেত, এখন সেখানে কেবল ফাঁকা লাগে।

মা লক্ষ্য করে—মেয়েটা এখন কম কথা বলে। খুব কম। আগের মতো গল্প করে না, বিরক্তও হয় না। শুধু নিজের মতো থাকে। এই নিজের মতো থাকা একটা বয়স পর্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু মায়েরা জানে, কখন নিজের মতো থাকা মানে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া।

স্কুলে পৌঁছানোর পর তাসমিয়া বুঝতে পারে—পরিবেশ বদলে গেছে। বা হয়তো বদলায়নি, বদলেছে তার দেখার চোখ। আগের সেই ফিসফিস এখন আর চাপা নয়। দু-একটা কথা কানে আসে পরিষ্কারভাবে।

“ওই মেয়েটাই না?” “কার সাথে আসলে?” “কোচিং স্যার না কি সিনিয়র?”

এই প্রশ্নগুলো সরাসরি তাকে কেউ করে না। কিন্তু সে জানে, প্রশ্নগুলো বাতাসে ভাসছে, আর সেই বাতাস সে শ্বাস নিচ্ছে।

নাইম এখন আর তার পাশে আসে না। দূর থেকে তাকায়ও না। এই সম্পূর্ণ দূরত্বটা প্রথমদিকে তাকে অবাক করে। পরে সে বুঝতে পারে—নাইম নিজের মতো করে সরে গেছে। কাউকে দোষ না দিয়ে, কাউকে বোঝাতে না চেয়ে।

এইভাবে সরে যাওয়াটাই সবচেয়ে কঠিন।

টিফিনের সময় সে একা বসে থাকে। আগের মতো কেউ এসে বসে না। মেয়েরা কেউ কেউ ইচ্ছা করে এড়িয়ে চলে, কেউ আবার অপ্রয়োজনীয়ভাবে বেশি বন্ধুত্ব দেখাতে চায়—যেন কাছাকাছি থাকলে কিছু প্রমাণ করা যাবে।

এই দুইটাই তাসমিয়াকে ক্লান্ত করে।

তাসমিয়া দাঁড়িয়ে আছে

একদিন হঠাৎ এক মেয়ে এসে বলে, “তুমি কিছু মনে করো না, মানুষ তো কথা বলবেই।”

এই “মানুষ তো কথা বলবেই”—এই বাক্যটাই তাসমিয়ার মাথার ভেতর অনেকক্ষণ ঘোরে। মানুষ কথা বলবেই, আর সেই কথার বোঝা বইবে সেই মানুষটা—যাকে নিয়ে কথা হচ্ছে।

ক্লাসে স্যার প্রশ্ন করলে সে উত্তর দিতে পারে। পড়ায় সে পিছিয়ে যাচ্ছে না। বরং আরও মনোযোগী হচ্ছে। যেন পড়াটাই এখন তার একমাত্র নিয়ন্ত্রণের জায়গা। যেখানে গুজব ঢুকতে পারে না, সন্দেহ ঢুকতে পারে না।

বিকেলে রিয়াজ আসে টিউশনে। আজ তার চোখে ক্লান্তি নেই, কিন্তু একধরনের তাড়াহুড়ো আছে। তাসমিয়া বুঝতে পারে—তার যাওয়ার দিনটা কাছে আসছে।

“আজকাল তুমি অনেক চুপ,”—রিয়াজ বলে।

“আগেও তো চুপই ছিলাম,”—তাসমিয়া উত্তর দেয়।

রিয়াজ হালকা হাসে। “আগে চুপ ছিলে স্বাভাবিকভাবে। এখন চুপ আছো ভারী হয়ে।”

এই ভারী শব্দটা তাসমিয়ার ভেতরে কোথাও লেগে থাকে। সে প্রশ্ন করে না। শুধু পড়ে।

একসময় রিয়াজ নিজেই বলে, “স্কুলে কিছু হচ্ছে, তাই না?”

তাসমিয়া মাথা নেড়ে। “হচ্ছে।”

“তুমি কাউকে কিছু বোঝাতে চাইছো?”—রিয়াজ জিজ্ঞেস করে।

তাসমিয়া একটু ভেবে বলে, “আগে চাইতাম। এখন আর না।”

এই উত্তরটা শুনে রিয়াজ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর বলে, “সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া মানুষের দায়িত্ব না।”

এই কথাটা তাসমিয়া আগেও শুনেছে। কিন্তু আজ তার মানে বদলে গেছে।

রাতের বেলা সে ফোনটা হাতে নেয়। নাইমের সাথে শেষ কথোপকথনের স্ক্রিনটা খুলে দেখে। আর কিছু লেখা নেই। এই ‘আর কিছু নেই’ জায়গাটাই এখন সবচেয়ে পরিষ্কার।

সে বুঝতে পারে—নাইম এখন হয়তো তার নিজের মতো করে কষ্ট সামলাচ্ছে। এই ভাবনাটা তাকে অপরাধী করে না, কিন্তু ভারী করে তোলে।

পরদিন স্কুলে একটা ঘটনা ঘটে।

একজন শিক্ষিকা তাকে ডেকে নেয়। খুব স্বাভাবিকভাবে। প্রশ্ন করে—সব ঠিক আছে তো? পড়াশোনায় কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না? তাসমিয়া উত্তর দেয়—না।

এই প্রশ্নগুলোর পেছনে অন্য প্রশ্ন আছে—সে বুঝতে পারে। শিক্ষিকাও বুঝে। কিন্তু কেউ সেটা উচ্চারণ করে না।

এই দিনটার পর তাসমিয়া সিদ্ধান্ত নেয়—সে আর নিজেকে ছোট করতে দেবে না। কাউকে বোঝাতে যাবে না। নিজের ভেতরের প্রশ্নগুলো নিজেই রাখবে।

রিয়াজের শেষ সপ্তাহ শুরু হয়। সে আগের মতোই পড়ে, বোঝায়। কিন্তু আজকাল সে আর চোখে চোখ রেখে কথা বলে না। যেন ইচ্ছা করেই একটা সীমা টেনে রেখেছে।

একদিন টিউশন শেষে রিয়াজ বলে, “আমি চলে গেলে তুমি হয়তো অনেক কিছু ভুলে যাবে।”

তাসমিয়া বলে, “ভুলে যাওয়া সবসময় খারাপ না।”

রিয়াজ মাথা নেড়ে বলে, “কিছু জিনিস ভুলে যাওয়া যায় না। শুধু ব্যথা দেওয়া বন্ধ করে।”

এই কথাটা তাসমিয়ার মনে থেকে যায়।

স্কুলে নাইমের সাথে আর কথা হয় না। একদিন দূর থেকে দেখা হয়। নাইম অন্য ছেলেদের সাথে হাসছে। এই হাসিটা দেখে তাসমিয়ার বুকের ভেতরে একটা হালকা ব্যথা হয়—কিন্তু ঈর্ষা নয়, বরং বোঝাপড়া।

সে বুঝে যায়—মানুষ ঠিকই এগোয়। সবাই নিজের মতো করে।

এক সন্ধ্যায় সে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের দিকে তাকায়। আগের মতো সে নিজেকে প্রশ্ন করে না—আমি কী ভুল করলাম? বরং নতুন প্রশ্ন আসে—

আমি কি আমার বয়সের চেয়ে বেশি বোঝার চেষ্টা করছিলাম? আমি কি আবেগকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নিজেকে হারাচ্ছিলাম?

এই প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর সে খোঁজে না। শুধু প্রশ্নগুলোকে থাকতে দেয়।

রাত গভীর হয়। ফোনে হঠাৎ একটা অচেনা নাম্বার থেকে মেসেজ আসে।

“রিয়াজ স্যার আগামী সপ্তাহে চলে যাচ্ছেন—জানতেন?”

তাসমিয়া স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে। সে জানত। তবু এই মেসেজটা তাকে অস্থির করে তোলে।

কারণ এখন সে বুঝতে পারছে—একটা অধ্যায় একসাথে শেষ হচ্ছে। স্কুল, নাইম, রিয়াজ—সবকিছু একসাথে ধীরে ধীরে দূরে যাচ্ছে।

এই দূরে যাওয়ার ভেতরেই তার ভেতরে নতুন একজন তৈরি হচ্ছে—যে আর কারো উপর নির্ভর করে নিজের মানে খুঁজতে চায় না।

কিন্তু ঠিক এই সময়েই তার মনে একটা প্রশ্ন জেগে ওঠে—

যদি সে তখন একটু কম চুপ থাকত, একটু বেশি স্পষ্ট হতো, তাহলে কি এই ভাঙনটা এভাবে আসত?

নাকি এই ভাঙনটাই ছিল তার বড় হয়ে ওঠার একমাত্র পথ?

তাসমিয়া-৪ কভার ফটো