নৈঃশব্দ্যের প্রেমালাপ

পর্ব - ২৮

🟢

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে ধরনীতে,আজকের সন্ধ্যার আকাশ টা ভীষণ সুন্দর, চোখ ধাধানো হলুদাভ মেঘেরা উড়ে যাচ্ছে,সাথে মনমাতানো দখিনা হাওয়া।মন মেজাজ সবই যেনো ফুরফুরে হয়ে গেছে নিমিষেই।

ছাদের কার্নিশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে নোভা,বাবা মায়ের সাথে দেখা করে এসেছে দুবোন,তখন থেকেই তার মন টা কেমন বিষন্ন,আভা জানে কেনো এতোটা চিন্তিত তার বোন,কি আর করার?সমাজের মানুষের মুখ তো আর বন্ধ করা যাবে না!মেয়ে হয়ে যখন জন্মেছে যতদিন বিয়ে নামক ট্যাগ লাইন গায়ে না লাগবে ততোদিন কথা শুনে যেতেই হয়,বিয়ে করার পরও শান্তি নেই সংসার টিকবে কি টিকবে না ওসব নিয়েও কথা বলতে চলে আসে পাড়া প্রতিবেশি! আভা বরাবরের মতই নোভার থেকে বিপরীত,আভা নিজেও স্বীকার করে নোভা তার থেকে বেশি বুদ্ধিমান, মেয়েটা পরিস্থিতি কতো সহজে সামলে নিতে পারে,বেশ শক্ত ব্যক্তিত্বের মেয়ে নোভা,আভা তো আগে কেঁদে কে'টে ভাসায়,বোনটাই তো তাকে সেই ছোট থেকে আগলে আগলে রাখছে বয়সের পার্থক্য বেশি থাকতে হয় না দায়িত্ব নেওয়ার জন্য, এটা যেনো ভাই বোনদের আল্লাহ প্রদত্ত একটা নেয়ামত, তারা ছোট ভাইবোনদের আগলে রাখার দায়িত্ব টা নিতে শিখে যায় নিজে নিজেই।

কিছুটা দূরে বসেই আদিব,স্নিগ্ধার বিয়ে নিয়ে আলাপ আলোচনা জুড়ে দিয়েছে বাকিরা,আভা ওখানে বসেই বোনের দিকে তাকিয়ে আছে,নাদিম আদাভান ভাইয়ের সাথে বাহিরে গেছে তাদের কি যেনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ পড়ে গেছে কে জানে?স্নিগ্ধা কে খনে খনে লজ্জায় ডুবিয়ে দিচ্ছে সকলে।

তৃধা নোভার কাঁধে হাত রাখতেই নোভা চমকে উঠলো, নিজের ভাবনায় সে এতোটাই বিভোর ছিলো খেয়ালই করেনি কিছু।

তৃধা নোভা কে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো, নোভা চুপ করে পড়ে রইলো।

তৃধা মৃদু হেসে বললো--,,আমার ভাইকে হারিয়ে ফেলার ভয় হচ্ছে বুঝি?

নোভা মুচকি হাসলো,পাগ"ল মেয়েটা মাঝেমধ্যেই বুঝদার হয়ে উঠে এই তো ঠিক বুঝে গেলো মনের কথা,যদিও ঘটা করে কোনো কিছুই নোভা তৃধা কে বলেনি।

তৃধা নোভার হাতে হাত রেখে বললো--,,তোর ফুপ্পিরা আবার কাহিনি জুড়ে দিয়েছে তাই তো?আংকেল কি বললো?

নোভা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বললো--,, এর জন্যই তো তোর ভাইকে এরিয়ে চলতাম,সম্পর্কে জড়াতে চাইনি আমি,এখন যদি অনাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটে তো তার দায়ভার সারাজীবন বয়ে চলতে হবে আমায়!

তৃধা ও জানে বিষয় টা কতোটা জটিল,নোভা নাদিম দুজনই সমবয়সী, চাইলেই বিয়ে করার মতো সিদ্ধান্তে যেতে পারবে না তার ভাই,বাস্তবতা টা অনেক সময় বেশ কড়া ভাবেই আঘা'ত হানে জীবনে!

তৃধা আস্বস্ত করে বললো--,, আংকেল তো তোদের দুজনকেই অনার্স কমপ্লিট করার পর বিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন,সিদ্ধান্তে পরিবর্তন এসেছে নাকি?

নোভা লম্বা শ্বাস টেনে বললো--,,আব্বু নিজের কথায় অনড় তবে আম্মু বাকিদের কথায় কিছুটা পিছুপা হয়ে গেছেন,তবে আমিও স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছি আমি এই মুহুর্তে বিয়ে করবো না,এ নিয়ে তর্ক বেঁধে গেছে মায়ের সাথে আমার, উনি রাগের বসে বললেন আমাদের বোঝা আর টানতে পারবেন না মেয়েদের বিয়ে না দেওয়া পর্যন্ত নাকি বাবা মায়ের শান্তি নেই,উনার মতে মেয়ে মানুষ কে বিশ্বাস নেই, দাদী ফুপির ও একই কথা যদি মেয়ে সম্মান খুইয়ে আসে তখন?সমাজে মুখ দেখাতে পারবেন না তারা!

বাবা চুপচাপ ছিলেন তার পরও তিনি নিজের সিদ্ধান্তে অটল আছেন,তিনি বলছেন মেয়েরা কখনো বোঝ হয় না, যদি বাবা মা হয়েই বোঝ মনে করেন তো পরের বাড়ির মানুষ কি মনে করবেন?ফেলনা নয় তার মেয়েরা, সমাজের মেয়েদের যেমন বিশ্বাস নেই তার মতে ছেলেদের ও বিশ্বাস নেই,যদি ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দেওয়ার পর ছেলেটা খারাপ হয় তখন তার মেয়ের জীবনের কি হবে?তাই তিনি মেয়েদের যোগ্য বানাতে চান যাতে নিজের জীবন একা চলার মতো সাহস ও সামর্থ্য দুটোই তাদের থাকে,জীবনসঙ্গীর দরকার আছে জীবনে তবে তা নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে নয়!তিনি চান তার মেয়েরা বড় হোক তার মুখ উজ্জ্বল করুক, তার পর তিনি বিয়ে দিবেন এর আগে নয়,বাড়ি যেতে না যেতেই বাবা মায়ের এরকম মত বিরোধ দেখে কেমন যেনো অশান্তি লাগছে আমার!

তৃধা নোভার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেসে বললো--,, আংকেল কে নিয়ে তোর গর্ব করা উচিত,উনার মন মানসিকতা সত্যি প্রসংশা যোগ্য!চিন্তা করিস না বোকা এটা তো রোজকার কাহিনি,হোস্টেলে ফিরে গেলে দেখবি আবার সব আগের মতো হয়ে যাবে, বাড়িতে যতদিন থাকবি ততোদিন কানে তুলো গুঁজে বসে থাকবি, মানুষের কথায় কান দিয়ে নিজের জীবন ধ্বং"স করার কোনো মানেই হয় না!

নাদিম এসে দাঁড়ালো ওদের পেছেন কখন এসেছে দুজনের কেউ তাকে খেয়াল করেনি এতোক্ষণ, কপাল বেয়ে ঘামের স্রোত নেমে যাচ্ছে ছেলেটার।

নাদিমের শান্ত চাহনি,তৃধা কে উদ্দেশ্য করে বললো--,,তোকে ভাইয়া নিচে ডাকছে যা।

তৃধা পা বাড়ালো নিচে যাওয়ার জন্য, আজান পড়বে কিছুক্ষণের মধ্যে, তাই বাকিদের কে বললো--,, সব নিচে চল তো, এই স্নিগ্ধা আয় দাদী দেখলে রাগ করবে, শুধু শুধু কথা শুনবি পড়ে।

বাকিরা ও তৃধার পেছন পেছন নেমে গেলো,নোভা চলে যেতে নিলেই নাদিম তার হাত চেপে ধরে দাঁড় করায়।

নোভা কিছু বললো না, চুপচাপ দাড়িয়ে রইলো নাদিমের পাশে।

নাদিম হঠাৎ করেই হেসে উঠলো, নোভা এবার চোখ তুলে তাকে দেখলো,ছেলেটা দেখতে সুন্দর সুদর্শন!চোখজোড়ার মায়ায় আটকে গেছে নোভা,মায়া কাটিয়ে তুলতে পারবে তো কোনো দিন?নোভার মনে কেমন চাপা কষ্টরা ভীড় জমালো,সব কিছু কেমন এলোমেলো লাগলো হঠাৎ যদিও জানে কিছুই ঘটেনি সব কিছুই ঠিক আছে,তবুও মন কু ডাকছে যদি ভবিষ্যতে কোনো দিন এমন কোনো পরিস্থিতি আসে যাতে নাদিম নামক এই ছেলেটা তার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে যায় তখন?নোভার এবার ভীষণ রকম কান্না পাচ্ছে,ঠোঁট চেপে ধরলো দাঁত দিয়ে, কান্না আটকানোর প্রবল চেষ্টা তার মাঝে!

নাদিম নোভার দিকে নিজের দু বাহু প্রসারিত করে বললো--,,"তোর কান্না ভেজা মুখ, আমার হৃদয়ের তীব্র অসুখ"!ভালোবাসার দাবান'লে পুড়'ছে যে আমাদের সুখ!

এই বুকখানা না হয় তোকে দিলাম কেঁদে কে'টে এখানেই শান্ত হয়ে যা তুই!তোর সব গন্তব্য এখানেই এসে থেমে যাক সবসময়, অভাগা প্রেমিকের ফাঁকা বুক ছাড়া অন্য কিছুই নেই তোকে দেওয়ার মতো!

আয়, নিজেও শান্ত হ আমাকে ও শান্ত কর!

নোভা এক ছুটে ঝাপিয়ে পড়ল নাদিমের বুকে, কান্নার স্রোত যেনো থামবার নয়,মেয়েটা থরে থরে কেঁপে কেঁপে উঠছে,কান্নারা লেপ্টে যাচ্ছে প্রেমিক নামক ছেলেটির শার্টের ভাঁজে, এ কেমন সুখ?এতো অসুখের ভীড়েও এই বুকে কেনো এতো সুখ?এই বুকে মাথা রাখার সময়টা দীর্ঘ হোক খুব বেশি দীর্ঘ হোক!

নোভা নাদিমের পিঠের দিকে শার্ট খামচে ধরে পড়ে আছে,নাদিম নোভার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো--,, ইশ্! কি করেছিস অবস্থাটা?বোকা আমি কি ম'রে গেছি?যা হয়নি তা নিয়ে এতো ভেবে মন খারা'প করছিস কেনো?দুজন মিলে সামলে নিবো তো,বিশ্বাস নেই আমার উপর!আম্মুকে তো ইতিমধ্যে তোর কথা বলে দিয়েছি, ছেলের বউ হিসেবে তোকে তার পছন্দ হয়েছে এবার আম্মু বলেছে ছেলে আর ছেলের বউ বড় হয়ে গেলেই নাকি তাদের বিয়ে দিবে,ততোদিন আমার জন্য অপেক্ষা করতে পারবি না?

নোভা বাচ্চাদের মতো গুটিয়ে গেছে যেনো,নাদিম নোভাকে সোজা করে দাঁড় করিয়ে চোখের পানি মুছলো,অগোছালো চুলগুলো কানের পাশে গুঁজে দিলো স্বযত্নে, গালে আলতো করে হাত রেখে বললো--,,আর কোনো দিন যদি কাঁদতে দেখেছি তো..

নোভা ঠোঁট উল্টে ফেললো,কান্না থামতেই চাচ্ছে না কেনো যেনো,,,"তো..কে ছাড়া অন্য কারো হবো ভেবেই আমার শুধু কান্না পাচ্ছে"!

"ভালোবাসিস তাহলে?"

নোভা কপট রাগ দেখিয়ে বললো--,, রসিকতা করছি নাকি আমি তোর সাথে?

"ভালোবাসি ও তো বলিস নি একবার ও!"

"শুনে কি করবি শুনি?"

"মনের ব্যাথা দূর করতাম আর কি!"

নোভা মুখ বাঁকালো,নাদিম বুকে দু হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে রইলো,বাতাসে উড়ছে দুজনের চুল,মনে থাকা গভীর অনুভূতি, ছড়িয়ে পড়ার আভাস তবুও যেনো ভয় হারিয়ে ফেলার!

উত্তপ্ত হৃদয়ের সুপ্ত বাসনা পূ্রণ করলে কি খুব বেশি ভুল হয়ে যাবে নাদিম?ভালোবাসা তো ধরা বাঁধা নিয়ম মানে না,আমাদের বারণ শুনে না, সে নিজ মর্জি মতো আসে, থেকে যায়,নিরবে পু'ড়িয়ে যায় মানব মানবীর হৃদয়!তবুও মানুষ ভালোবাসতে চায়,জ্বল'সে যাওয়ার ভয় নেই তাদের, কল"ঙ্ক লেগে যাবে জেনেও কেনো পিছপা হতে পারে না কেনো বলতে পারিস?তোর হতে চাইনি, তবে নিজেকে আর আটকাতে পারলাম কই,সেই ভুলে আবার তোর সাথেই তো জড়িয়ে গেলাম। ভুলের মাশুল তো দিতেই হবে বল,তারপরও এতো ভয় কেনো হয় আমার?

নাদিম হাসলো,প্রানবন্ত হাসি ছেলেটার।চোখ বন্ধ করে শ্বাস ছেড়ে বললো--,,একবার ভালোবাসি বলে তো দেখ,ভুল করেও কিছু কিছু সময় ভালো কিছু হয়!অনুভূতি কে চাপা দিতে চাওয়া অন্যায়,ভুলের ক্ষমা হয় অন্যায়ের কোনো ক্ষমা হয় না জানিস না?

নোভা হাসলো, কথার জা'লে ফাঁ'সিয়ে দিতে উস্তাদ এই ছেলে,নোভা রয়েসয়ে এক পা দু পা করে আগালো নাদিমের কলার চেপে ধরে নিজের দিকে কিছুটা টেনে এনে চোখে চোখ রেখে বললো--,, "যা হে'রে গেলাম আমি,ভালোবাসাল তোকে!যাতনা সইতে হলে না হয় সইলাম তবুও তরই না হয় থাকলাম।"

নাদিম চোখ বন্ধ করে বললো-- ,,তোকে জড়িয়ে ধরি অনুমতি দিবি?

নোভা কলার ছেড়ে নিজ থেকেই জড়িয়ে ধরলো নাদিম কে,নাদিম স্নিগ্ধ ঠোঁটে হাসলো,গোধূলির মেঘেরা উড়ে গেলো অজানায় স্বাক্ষী হলো বুঝি নব্য প্রেমের সূচনায়!

----------------------

চুপিচুপি রাদিফ,নাদিম,আদাভান,আবির মিলে আদিবের বাসর ঘর সাজিয়েছে। মেয়েরা কেউই এই বিষয়ে কিছু জানে না এমনকি আদিব নিজেও জানে না,সে তো কোনো কাজে সেই বিকেলে বেরিয়েছে এখনো আসার নাম নেই,আসলেও যে ঘরে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। সেই ভাবনা অনুযায়ী ড্রয়িং রুমে বসে পাহারা দিচ্ছে রাদিফ,আবির।

স্নিগ্ধা বসে আছে মায়ের ঘরে,সেখানে তাকে কি কি যেনো বুঝাচ্ছেন তিন গৃহিণী মিলে,তৃধা তো সুযোগ বুঝে কে'টে পড়েছে,তার বিয়েতে এসব কিছু বলেনি দেখে সে অন্তত খুশি,কি সব কথা বলে শুনেই কান গরম হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা।

তৃধা গিয়ে বসলো গেস্ট রুমে,সেখানে আপাতত বাকিরা আছে,সাথে যোগ দিয়েছে জোছনা বেগম।তাকে নিয়েই হাসিঠাট্টায় মেতে উঠেছে সকলে।

রাতের খাবারের পাঠ চুকেছে বেশ কিছুক্ষণ হলো,আদিব কে এক প্রকার ধরে বেঁধে গেস্ট রুমে এনে বসিয়ে দিয়েছে নাদিম।সে এতে বেজায় বিরক্ত, এই মুহুর্তে তার ঘুম পেয়েছে ভেবেছিলো রুমে গিয়েই একটা ঘুম দিবে,মনে হচ্ছে না এরা তা আর হতে দিবে।

স্নিগ্ধাও এখানেই আছে,এক পাশে চুপটি করে বসে আছে সে,যে মেয়ে হুড়োহুড়ি করে কুল পায় না সে এখন শান্তশিষ্ট থাকার ভান ধরেছে ব্যাপারটা খারাপ না,বিয়ের পর থেকেই মেয়েটা দিগুণ বেশি লজ্জা পাচ্ছে ভেবেই হাসলো আদিব!

এরই মধ্যে তৃধা বলে উঠলো--,,আজকে স্নিগ্ধা আর আমি একসাথে ঘুমাবো!

আদিব শান্ত চোখে তাকিয়ে থেকে বললো--,,মন চাইলে থাকবি, এটা বলার কি আছে!

নাদিম ভ্রু বাঁকালো আগেই বুঝা উচিত ছিলো, ওর ভাই একটা আস্ত নিরামিষ। বাসর নিয়ে মানুষের স্বপ্নের শেষ নেই আর এই ছেলেকে দেখো বিয়ে করেই শেষ এখন যেনো অন্য কিছু ভাবাও তার জন্য পাপ আগের মতোই গোমড়া মুখো হয়ে আছে!আরে ভাই বিয়ে সাদি করেছিস একটু তো হাস।

আদাভান মুখ কাচুমাচু করে বলে উঠলো--,,দেখো ভা"য়রা ভাই তুমি বউ ছাড়া থাকতেই পারো, আমি আমার বউ ছাড়া থাকতে পারবো না বলে দিচ্ছি!

জোছনা বেগম হেসে বললেন--,,নাত জামাই তো পুরাই আমার বুড়োর মতো হইছে বউ ছাড়া থাকতেই পারতো না।

নোভা বলে উঠলো--,,তাই নাকি দাদী?তোমার বুড়ো তো দেখছি সেই রোমান্টিক!

তৃধা বেঁকে বসলো,সে আজকে যাবে না কিছুতেই।তৃধা বলে উঠলো--,,আপনি গিয়ে আদিব ভাইয়ার সাথে থাকুন, আমরা এক সাথে থাকবো আজকে।

আদাভান তৃধার হাত চেপে ধরে বললো--,, অসম্ভব!এই ভাই আদিব ক্যাচা'ল করিস না তো বউ নিয়ে ভাগ,আমার বউ ছাড়া ঘুম আসে না!

স্নিগ্ধা এদের কান্ড দেখে হা হয়ে তাকিয়ে আছে,স্নিগ্ধা বলে উঠলো--,,আপু তুমি ভাইয়ার সাথে যাও আমি আমার রুমে গেলাম!

আদাভান সরু চোখে তাকালো,আশ্চর্য বিয়ে করার জন্য দুটো পাগ'ল হয়ে যাচ্ছিলো এখন এক সাথে থাকতে চাচ্ছে না কেনো?হসপিটাল থেকে আসার পর কি সম্বন্ধি মশাই বউ পিটি"য়েছে!

নাদিম বলে উঠলো--,,চুপ বেয়া'দব, যা ভাইয়ার ঘরে গিয়ে ঘুমা!

স্নিগ্ধা ফুঁসে উঠে বললো--,,তোমার ভাইয়া তার ঘরে আমাকে থাকতে দিবে না,আমি কি ছেঁছ"ড়া নাকি আমার ঘর নাই?আমি ওখানেই থাকতে পারবো কারো অনিচ্ছা স্বত্বে আমি তার ঘরে যাবো না!

জোছনা বেগম সবাইকে থামিয়ে দিয়ে বললো--,,এই বাচ্চাদের মতো এগুলো কেমন কথা? বিয়ের প্রথম রাত স্বামী স্ত্রী একসাথে থাকতে হয়,কথা বাড়াবি না বেশি, আমার কথাই শেষ কথা।এই যা তো স্নিগ্ধা কে সাজিয়ে নিয়ে আয় শাড়ি পড়াবি!

স্নিগ্ধা বিরক্ত হয়ে বললো--,, দাদী!

আদিব শান্ত চোখে তাকালো, না বউয়ের তে'জ আছে বলতে হবে!এক ফাঁকে কিছুটা হেসে ও নিলো সে।

আদিব উঠতে যাবে তখনই জোছনা বেগম বলে উঠলেন--,,দাদু ভাই, বিয়ে তো করে নিয়েছো এবার বউয়ের দায়িত্ব নিতে শিখো,বউয়ের সাথে সুন্দর ব্যবহার করবে,কোনো উচ্চবাক্য করবে না।আর স্নিগ্ধা তুই ও স্বামীকে অপমান করে কথা বলবি না দুজন মিলে মিশে সব সমস্যার সমাধান করবি, দুজনই জে'দ ধরে বসে থাকলে সমাধান হবে কি করে?একেক সময় এক জন না একজন কে নরম হতেই হবে,মনে রাখবি সম্পর্ক টা তোদের এটাকে ঠিক রাখার দায়িত্ব ও তোদের!

স্নিগ্ধা চুপ রইলো কিছু বললো না,আদিব সেই দুপুরেই তাকে বলে দিয়েছে,পরীক্ষার আগে আমার ঘরের ত্রিসীমানায় ও যেনো তোকে না দেখি,বিয়ে তো করে নিয়েছিস লাফিয়ে লাফিয়ে আর যেনো কোনো ফাঁকি বাজি না দেখি আমি!স্নিগ্ধাও অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ভাব খানা এমন স্নিগ্ধা একা ভালোবেসেছে একাই বিয়ে করতে চেয়েছে অন্য কারো কোনো আগ্রহ নেই ইচ্ছে নেই!

তৃধা স্নিগ্ধাকে নিয়ে চলে যাচ্ছিলো,পেছন থেকে তখনই আদিব বলে উঠলো--,,দয়া করে শাড়ি টারি পড়িয়ে আমার কাছে পাঠাস না,তোদের বোনের বয়স টয়স তখন ভুলে যেতে বাধ্য হবো আমি!

আদাভান এবার শব্দ করে হেসে দিলো,পর পর চাপা হাসির রোল পড়লো ঘরে,জোছনা বেগম শাড়ির আঁচল টেনে বললেন--,,দাদু ভাই আমার নাতনির বয়সে আমি দুই সন্তানের মা হয়েছি,তালুকদার বংশের মেয়ে সে এতোটাও দুর্বল ভাবিস না, চুনোপুঁটির মতো স্বামী ঠিক সামলে নিতে পারবে দেখিস!

আদিব চোখ বড় বড় করে তাকালো চুনোপুঁটির মতো স্বামী?কি ভয়া'বহ অপমান!আদিবের অবস্থা দেখে আর না হেসে পারলো না আদাভান,তার যেনো আজকে হাসির দিন,হেসেই চলেছে সকাল থেকে।

স্নিগ্ধা কিছুতেই সাজবে না,এমন ফা'লতু লোকের জন্য ঘটা করে সাজতে পারবে না ও।নোভা,তৃধা মিলে ওকে বুঝালো,এরই মধ্যে কল আসলো মৃধার সে আসতে চেয়েছিলো পরে আর আসা হয়নি তাই কাল আসবে জিদান কে নিয়ে।জিদান ভিডিও কলে খালামনি কে দেখে উতলা হয়ে উঠলো,তৃধার কলি"জা যেনো এই ছেলে, মৃধার ভাষ্যমতে তৃধা তার ছেলেকে ক"ব্জা করেছে!স্নিগ্ধা ও হাসিমুখে কথা বললো,কথা বলা শেষ হতেই ঘরে ঢুকলেন রাজিয়া বেগম তার সাথে সুফিয়া ও রুনা বেগম।

রুনা বেগম মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন--,,মা আমার জে'দ ধরতে নেই, বিয়েটা যেভাবেই হোক হয়েছে তো।যা তৈরি হয়ে নে।

সুফিয়া বেগম স্নিগ্ধাকে টেনে কাছে নিয়ে জড়িয়ে ধরে বললেন--,,মা টা আমার ছেলের বউ হয়ে গেলো এর থেকে খুশির আর কি আছে রে রুনা?এমন চাঁদের টুকরো বউ মা আমি কই পেতাম বল তো?ছেলেটা হয়েছে একটা অপ"দার্থ ওর কথায় মন খারাপ করিস না তুই,সকালে ঠিক ব'কে দিবো আমি ওকে যা মা রাত অনেক হয়েছে এবার তৈরি হ!

রাজিয়া বেগম হেসে এগিয়ে দিলেন গহনার বাক্স, তৃধার দিকে দিয়ে বললো--,,মন মতো সাজিয়ে দে ভাইয়ের বউকে।

স্নিগ্ধা মন খারা'প করে বললো--,, এভাবে পর করে দিচ্ছো বড় আম্মু?এখন ছেলের বউ হয়ে গেলাম, মেয়ে আর নই তাই না?

রাজিয়া বেগম হেসে ফেললেন,বোকা মেয়ে ওটা তো এমনি বললাম আগে তো তুই আমার মেয়ে। মেয়ে আর ছেলের বউ কি আলাদা হলো নাকি?পাগ'লী মেয়ে যখন দেখো অভিমান করে বসে!

স্নিগ্ধা হাসলো,তারপর মনে মনে বুদ্ধি আটলো সেজেগুজে যাবে ঠিকই, পরে আদিব কে এক ঝ'লক দেখা দিয়েই কে'টে পড়বে।

আদিব কে এখনো রুমে যেতেই দেয়নি কেউ,স্নিগ্ধা কে মোটেও লাল টুকটুকে বউ সাজায়নি তৃধা,ভাইয়ের পছন্দের নীল পরী সাজিয়ে দিয়েছে।স্নিগ্ধা গাল ফুলিয়ে অভিযোগ করেই যাচ্ছে,আপাই তুই আমাকে একদম নীল টি"ল পড়াবি না, পছন্দ না আমার!

তৃধা বোনকে সম্পূর্ণ তৈরি করে বলে উঠলো "মাশাআল্লাহ!" আমার ভাইয়ের ঘরের এক মাত্র চাঁদ।

স্নিগ্ধা লজ্জায় জুবুথুবু হয়ে গেলো, মেয়েটা লজ্জা ও পায় বেশি।

তৃধা ওকে নিয়ে ঢুকলো আদিবের ঘরে,ঢুকতেই হা হয়ে গেলো,ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখা ঘর,মোমবাতির আলো গুলো নিভু নিভু করছে,কয়েকটা আবার দীপ্ত শিখা ছড়িয়ে যাচ্ছে আনমনে।

তৃধা মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে বললো-,,এসব কখন করা হলো?

স্নিগ্ধা নিজেও হা হয়ে তাকিয়ে আছে,আভা বলে উঠলো--,,মনে হয় ভাইয়া আর নাদিম মিলে করেছে, আদিব ভাইয়া তো বাড়িতেই ছিলো না!

এরই মধ্যে দরজার বাহির থেকে ছেলেদের কন্ঠস্বর শোনা গেলো,তৃধা স্নিগ্ধা কে বসিয়ে দিয়ে দরজার কাছে দাঁড়ালো,নোভা,আভা,নিশিও বেরিয়ে গেছে ততক্ষণে,

আদিব বলে উঠলো--,,আমায় যেতে দাও তো এবার, মাথা ব্যাথা করছে।

তৃধা রসিকতা করে বললো--,, শুধুই ব্যাথা যাও যাও ঘরে যাওয়ার পর মাথা সহ দুনিয়া ঘুরবে তোমার!

আদিব পকেটে হাত রেখে বললো--,, এই প্রথম দেখলাম শেয়ালের কাছে জেনে-বুঝে মানুষ মুরগী রেখে যায়,কি আর করার!

আদাভান বলে উঠলো--,, শেয়ালের বিড়াল হতেও বেশি দিন লাগে না!

তৃধা চোখ পাকিয়ে তাকালো, আদাভান বলে উঠলো--,,যাও ভায়"রা ভাই আমার শালিকা তোমারই অপেক্ষায়!

তৃধার হাত টেনে ধরে সামনে এগিয়ে যেতে যেতে বললো--,,বাকিরাও গিয়ে ঘুমাও,আমি গেলাম আমার বউ নিয়ে!

তৃধার রাগে দুঃখে ফোঁস ফোঁস করছে, এই লোক মান সম্মান শেষ করে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে একেবারে!

------------------

তৃধা ঘরে গিয়ে আগে আদাভানের চুল টেনে ধরলো সারাদিনের রাগ এবার ঝাড়বে বউ আদাভান ঠিক বুঝতে পারলো।

তৃধার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলো আদাভান, তারপর কিছু একটা ভেবে জোরেশোরে একটা ধম'ক দিয়ে বসলো,তৃধা ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ধম'ক দেওয়ার মতো কি এমন করেছে তৃধা?

মন খারা'প হয়ে গেলো সাথে সাথে,বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়লো চুপচাপ। আদাভান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হাসলো,এখন তো কিছুতেই রাগ ভাঙ্গানো যাবে না। সে নিজে গিয়ে লাইট অফ করে শুয়ে পড়লো পাশে তবে তৃধার থেকে অনেকটা দূরত্ব বজায় রেখে।

তৃধার এবার খুব জোর কান্না পেলো,কি এমন হলো?যার জন্য আদাভানের এমন করা লাগলো?দূরত্ব চাইছে তাহলে থাকুক দূরে তৃধা ও যাবে না কাছে!

-------------------

স্নিগ্ধা উল্টো ঘুরে দাঁড়িয়ে আছে,আদিব ঘরে ঢুকে বড়সড় একটা টা'স্কি খেয়েছে, কি হাল তার ঘরের?ফুলের গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে আছে পুরোপুরি। নিজেকে ধাতস্থ করে এগোলো সামনে, ভুলেও ভুল করা যাবে না। স্নিগ্ধার পরীক্ষার আগে তো নরম হওয়া যাবেই না, পরে দেখা যাবে এই মেয়ে আবেগে গা ভাসিয়ে পরীক্ষায় বড় সাইজের একটা আ"ন্ডা নিয়ে বাড়ি ফিরেছে,পড়াশোনায় এক ফোঁটা ও ছাড় দেওয়া যাবে না!আদিব তো ভেবেছিলো একেবারে পরীক্ষার পর বিয়েটা সারবে না মেয়েটা কি কান্ড করে বসলো!

স্নিগ্ধা বুঝলো ঘরে আদিব এসেছে তাও কথা বললো না আর না ঘুরে দাড়ানোর প্রয়োজন মনে করলো,মানুষ টা তাকে কি ভাবে?সে অবুঝ বাচ্চা শিশু?আবেগের বসে সব করে,তার ভালোবাসার কোনো মূল্য নেই?পড়াশোনা তে তো তেমন ফাঁকি"বাজ না স্নিগ্ধা তার পরও এতো ক'ড়া শাস'ন,স্নিগ্ধা সবই মেনে নিতো,তাই বলে কি হসপিটাল থেকে এনে ওভাবে অপমান করার খুব দরকার ছিলো?স্নিগ্ধা কি একবারও বলেছে সে আদিবের সাথে থাকার জন্য ম'রিয়া হয়ে উঠেছে?শুধু তো বিয়েই হয়েছে সে তো এমন কিছু ভাবেও নি, কি সুন্দর করে মুখের উপর বলে দিলো তোর জন্য বিয়েটা হয়েছে শুধু মেনে নিতে আমার সময় লাগবে!আসলে মেজো আব্বু ঠিকই বলেছিলো এমন ছেলেকে ভালোবাসাটাই ভুল হয়েছে তার।

স্নিগ্ধা শান্ত চোখে তাকালো এবার, সালাম দিতে পই পই করে বলা হয়েছে তাকে, তবুও দিলো না মৌনতা বজায় রেখেছে সে।

আদিব শান্ত অথচ গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, নিজ থেকেই সালাম দিলো স্নিগ্ধা কে।

স্নিগ্ধা সালামের জবাব দিয়ে আবার চুপ করে গেলো।

তারপর কিছু সময় অতিবাহিত হতেই সে বলে উঠলো

''সবাই চলে গেছে? এবার আমিও চলে যাচ্ছি এতোক্ষণ আপনার ঘরে বসে আপনাকে বিরক্ত করার জন্য দুঃখীত"!

আদিব তাকিয়েই রইলো,স্নিগ্ধা হাঁটা ধরলো বের হওয়ার জন্য, আদিব শান্ত কন্ঠে বলে উঠলো--,,কোথায় যাচ্ছিস?নামাজ পড়তে হবে যা অযু করে আয়!

স্নিগ্ধা থেমে গেলো বুঝে উঠতে পারছে না কি করা উচিত!অভিমান তো বাহানা মাত্র এই ছেলেকে ছাড়া থাকতে তো তার নিজেরই কষ্ট হবে বেশি!

স্নিগ্ধা কঠিন কন্ঠে বললো--,, ভেবে বলছেন তো?

আদিব এবার হাসলো,পিছু ঘুরে স্নিগ্ধার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো,স্নিগ্ধা নির্বিকার আদিব স্নিগ্ধার গালে আলতো ছুঁয়ে দিয়ে বললো--,,অভিমান কি একটু বেশিই হয়েছে নাকি আমার বউ এর?

স্নিগ্ধা দ্রুত ভঙ্গিতে চোখের পলক ফেললো শুধু এভাবে কথা বলতে থাকলে তো শক্ত থাকতে পারবে না স্নিগ্ধা বহু কষ্টে এরকম ভাবে কথা বলছে,সে তো মোটেও এমন না!

আদিব অভিমানে টইটম্বুর অর্ধাঙ্গিনী কে দেখে আরেকবার হাসলো।স্নিগ্ধার এবার গা জ্বা"লা করে উঠলো এসব হাসি মোটেও সহ্য করার মতো না!

রেগে বললো--"নাটক বন্ধ করুন বলছি!"নামাজ পড়ে ফর্মালিটি পালন করতে কেনো চাইছেন?বিয়েটা তো আমার ছেলেমানুষীর ফল,আপনি তো আমার মতো মেয়েকে বিয়েই করতে চাননি,আমি তো আপনার যোগ্যই না,আমি ম'রে যাই আমার যা খুশি হোক আপনাকে বিয়ে করতে জোর করেছিলাম আমি?বিয়ে করে মহান সেজেছেন এখন ভুল বুঝতে পেরে মু"ক্তি ও চাইছেন!আমার ভালোবাসা তো নিতান্তই আবেগ আপনার কাছে,যেহেতু ভালোবাসা আমার একার তার দায়ভার ও আমার একারই আপনাকে তো বলিনি আমার সাথে জড়িয়ে যান,তাহলে কেনো এমন করেছেন বলুন?আমি..

স্নিগ্ধার কথা আঁটকে গেলো গলার কাছেই, তার কথা বন্ধ করে দিয়েছে আদিব কৌশলে,ভালোবাসার পরশে আবদ্ধ করে নিয়েছে স্নিগ্ধার গোলাপের পাপড়ির ন্যায় ঠোঁট জোড়া!

স্নিগ্ধার মনে হলো আবেশে এবার অবচেতন অসার হয়ে পড়বে তার শরীর,চোখ বন্ধ হয়ে গেছে আপনাআপনি, সহ্য করতে পারছে না এই মধুর স্পর্শ, মানুষটিকে ঠেলে দূরে সরানোর শক্তিটুকুও যেনো লোপ পেয়েছে তার।

স্নিগ্ধার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে আদিব,ঢলে পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়ে গেছে একটা চুমুতেই?আর কিছু করলে এই মেয়ে ঠিক থাকতে পারবে তো!আদিব খেয়াল করলো স্নিগ্ধা একবারের জন্য ও আদিব কে আঁকড়ে ধরেনি,পড়ে যাওয়া মঞ্জুর তবুও তাকে ছুঁয়ে দিবে না?এতো অভিমান!

আদিবের ঠোঁটের কোনে ফুটে উঠলো হাসি,স্নিগ্ধা চোখ তুলে তাকালো,ঝাপ'সা হয়ে আসছে রীতিমতো চোখজোড়া,মুখ ঘুরিয়ে নিতে গিয়েও পারলো না আদিব দুহাতে তা আগলে ধরেছে।

স্নিগ্ধার কন্ঠনালি কাঁপছে, কথা বলতে চাচ্ছে কিন্তু পারছে না,অসহনীয় হয়ে উঠছে সব কিছু।

আদিব বড্ড নরম আদুরে সুরে ডাকলো--,, স্নিগ্ধপ্রিয়া!

স্নিগ্ধার সর্বাঙ্গে কাঁপন ধরলো এমন সম্বোধনে,বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারের মতো চোখ থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়লো।আদিব স্নিগ্ধাকে বুকের সাথে মিশিয়ে জড়িয়ে ধরলো।

কানের কাছে ফিসফিস করে বলে উঠলো--,,রাগের মাথায় বলে ফেলেছি,তা ছাড়া তুই এমন একটা কাজ করতে পারলি?যদি সত্যি সত্যি কিছু হয়ে যেতো তোর, আমি কি নিয়ে বাঁচতাম বল?স্যরি তো আর কখনো রাগ দেখাবো না প্রমিজ!

স্নিগ্ধা ভেজা কন্ঠে বলে উঠলো--,, খারা'প লোক একটা।

ঠিকই প্রমিজ টমি'জ ভুল একটু পরই ধম'কানো শুরু করবেন, চেনা আছে আমার আপনাকে!

"এতো ভালো করে যখন চিনিস,তাহলে ভাবলি কি করে তোকে ভালোবাসি না আমি,তোকে ছাড়া অন্য কারো হবো আমি?"

স্নিগ্ধা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরলো আদিবকে,বুকের সাথে মিশে যেতে চাইলো যেনো,আদিব স্নিগ্ধার কপালে মাথায় ঠোঁট ছুঁইয়ে বললো--,,রাগ কমেনি নাকি মেডাম?চলুন নতুন জীবনের শুরুটা সৃষ্টিকর্তা কে বলে শুরু করি।

স্নিগ্ধা আদিব কে ছেড়ে দিয়ে ধুপধাপ পায়ে বাথরুমে চলে গেলো,স্নিগ্ধা চলে যেতেই আদিব হো হো করে হেসে দিলো।বোকাটা সারাজীবন বোকাই রয়ে গেলো!

----------

রাতের শেষ প্রহর আকাশে চাঁদের দেখা নেই আজ,তবে তারারা জ্বল জ্বল করছে মৃদু আলোতে রাতের অন্ধকার কে দেখতে বেশ মোহনীয় লাগছে।

আদাভান তৃধা কে ডাকলো,তৃধা গভীর ঘুমে এরকম বার বার ডাকায় বিরক্ত হয়ে তাকালো,তার উপর ঘুমের আগে এই লোক তাকে ধম'ক দিয়েছে।পরক্ষণেই অন্য চিন্তা মাথায় আসলো তৃধার আদাভানের শরীল খারাপ না তো?

তৃধা চকিত নয়নে তাকিয়ে বললো--,,আদাভান আপনি ঠিক আছেন তো,কি হয়েছে?কয়টা বাজে!

আদাভান চিন্তিত তৃধাকে কিছুটা সময় নিয়ে দেখলো,তার পর নিজের হাত টা বাড়িয়ে দিলো তার দিকে,তৃধা দ্বিধাগ্রস্তের ন্যায় হাতে হাত রাখলো,আদাভান তৃধাকে টেনে নিয়ে গেলো বারান্দায়।

তৃধা বুঝার চেষ্টা করছে কি হচ্ছে,সে ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে হুট করেই আদাভান হাঁটু ভাজ করে তৃধার সামনে বসে পড়লো, মৃদু আলোতে আদাভানের হাতে থাকা সাদা পাথরের আংটিটা চকচক করছে।

তৃধা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আংটির দিকে এটা তো সেই আংটিটা যেটা তৃধা নিয়ে গিয়েছিলো আদাভান কে দিয়ে প্রোপোজ করাবে বলে পরে তো ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলো ময়লার ঝুড়িতে, এই লোকটা এটা কই পেয়েছে!

তৃধার চিন্তার মাঝেই আদাভান বলে উঠলো

"আমার রাগীনি,প্রেয়সী,শ্রেয়সী,চঞ্চলাবতী, অভিমানীনি, অনুরাগীনি, প্রেমময়ী, কেশবতী,প্রজাপতি, প্রিয়র চেয়ে ও প্রিয় আমার প্রিয়তমা, আমার অর্ধাঙ্গিনী!

ভালোবাসার এক নতুন রূপ হয়ে আমার কাছে ধরা দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ বউ,তুমি আমার ধূসর মলাটে আবৃত জীবনের রংধনু তুমি আমার হাসির কারন,তুমি আমার জীবনের নতুন বসন্ত,তুমি এসেছো গোপনে, ভালোবেসে রাঙিয়ে দিয়েছো আমাকে নিঃশব্দে নিরবে।আমার কি কৃতজ্ঞ হওয়া উচিত নয় মিসেস?

তবে আমি তো স্বার্থপরের মতো আবদার করতে এসেছি ফিরিয়ে দিবে?

আমাকে রেখে দিবে তোমার জীবনে চিরসাথী করে?আমি থাকতে চাই একান্ত তোমার হয়ে,রাখবে না আমায় জীবনের শেষ সময় অব্দি?আমি থেকে যেতে চাই তোমার মায়ায়,রোজ সকালে তোমার দেওয়া এক কাপ চায়ের ধোঁয়া উঠা উষ্ণতায়, তোমার ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখবে না আমায়?রাখলে কি খুব ক্ষ'তি হবে বউ!একটুই তো জ্বালা"ই তোমায় বেশি না তো।

তোমার অনামিকায় সঁপতে চাই নিজেকে, হাত টা বাড়িয়ে আমাকে ব'ন্দি বানিয়ে নাও না প্লিজ!

তৃধা ঠোঁট জুড়ে বসন্তের ফুলেদের মতো হাসি,কি স্নিগ্ধ সুন্দর হাসি,জীবনের বড় প্রাপ্তীর সবচেয়ে বড় সুখ যেনো তার সামনে হাত পেতে বসে আছে,তাকে ফেরানোর সাধ্য কি তৃধার আছে?যেখানে সে আগে থেকেই এই মানুষটার কাছে বন্দি"নী,সে মানুষটা তার কাছে ব"ন্দি হবার আবদার করছে?

তৃধা হাত বাড়িয়ে দিলো নিজের তার চোখে মুখে উবছে পড়া খুশি,আদাভান তৃধার আঙুলে আংটিটা গুঁজে দিয়ে হাতের উল্টো পিঠে চুমু আঁকলো।

তৃধাকে জড়িয়ে ধরে বললো--,, আমার বউয়ের ইচ্ছে অপূর্ণ রাখি কি করে বলো,এই তো রাতের শেষ প্রহর ঘড়িতে সময় তিনটে, তুমি আমি বারান্দায় আর একটা ঘুম ঘুম চোখের প্রস্তাবনা আর একটু শীতল ভেজা চুমু!

নৈঃশব্দ্যের প্রেমালাপ পর্ব ২৮ গল্পের ছবি