নৈঃশব্দ্যের প্রেমালাপ

পর্ব - ১৫

🟢

বাড়িতে এসেছে বেশ কয়েক দিন হয়েছে তৃধা আদাভানের, মৃধা জোবানের সম্পর্কের কথা শুনে দুই পরিবারের মানুষই কিছুক্ষণ থ মে'রে ছিলো,ওরা ভেবেছে ছেলে মেয়ে দুটো নিশ্চিত খারা"প কোনো জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছে,রাগে ক্ষো'ভে তারা এতোটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলো ভেবেই দেখেনি কার পরিবার কেমন,কেনো একসাথে থাকার এতো বড় সিদ্ধান্ত টা নিয়েছে ছেলে মেয়ে দুটো।অবশেষে ত"র্ক বিতর্কের পর মৃধা জোবান কে ক্ষমা করা হলো,বাবা মায়েরাও স্বীকার করলো তাদেরও দোষ ছিলো,ছেলেমেয়েদের ইচ্ছে অনিচ্ছে পছন্দ অপছন্দ কে মূল্য দেওয়া উচিত ছিলো তাদের।

তৃধা ওইদিন মাঝখান থেকে বলে উঠেছিলো --,,আমার পছন্দ ও তো তোমরা দেখোনি এখন জামাই পরিবর্তন করে দাও এই লোককে আর সহ্য করতে পারছি না আমি!

আদাভান তেলে বেগুনে জ্ব'লে উঠে বলেছিলো--,,বে"য়াদব মেয়ে তিন বেলা গা'ধার মতো তোমার পেছনে খাটছি, এতো কিছু করছি তাও বলছো জামাই পছন্দ হয়নি?অনলাইনে অর্ডার করো মন মতো জামাই!

তৃধা হি হি করে হেসে বলেছিলো--,,অনলাইনে ভালো জামাই পাওয়া যায়?কোনটাতে লিং'ক টা দিন তো প্লিজ, আমি খুঁজে খুঁজে পাঁচ খানা অর্ডার করে দেই!

আদাভান গাল ফুলিয়ে তৃধার হাত শক্ত করে চেপে ধরে সবার উদ্দেশ্যে বলেছিলো--,,তোমরা আমাকে নির্ল"জ্জ বলো আর যাই বলো এই মেয়েকে এখন আমি রুমে নিয়ে যাচ্ছি,এর ডো'জের সময় হয়েছে, ডো'জ ঠিকঠাক না পড়লে এসব পাগ"লের প্রলা'প ব'কে এই মেয়ে!

তৃধা অসহায় হয়ে বললো--,,আশ্চর্য! ছাড়ুন বলছি ভালো হবে না কিন্তু।

বসার ঘরে দুজনের কান্ডকারখানা দেখে সে কি হাসিটাই না হেসেছিলো পরিবারের সবাই!

----------

কেটে গেছে আরো দু মাস, তৃধা তার ফ্রেন্ড নিশির বোনের বিয়েতে গিয়েছিলো খুলনা তে, সেখানে যেতে দিতে মোটেও রাজি হয়নি আদাভান,নাদিম,আভা, নোভা, নিশি, রাদিফ মিলে আদাভান কে রাজি করিয়েছে,আদাভান একশোটা শর্ত ধরিয়ে দিয়েছে।তার কথা হচ্ছে তার বউ সে যেভাবে দিচ্ছে সেভাবেই যেনো ফেরত পায়।

আদাভান আর তৃধার সম্পর্কটা এখন খুবই মিষ্টি,যে কেউ দেখলেই বলবে ওদের মতো সম্পর্ক আমাদের হলেও পারতো!দুজন মিলে সংসার?না!তারা নিজেদের জন্য সংসার গড়ে তুলেনি, তাদের সম্পর্ক স্বামী স্ত্রী রূপে স্বীকৃতি পায় নি।তবে তারা ভালো বন্ধু হয়ে উঠেছে নিজেদের ভালো মন্দ সব কাজকে একসাথে সেলিব্রেট করতে শিখেছে, শিখছে কিভাবে এক আকাশ সমান দুঃখ নিয়ে একসাথে হাসা যায়,ভালোবাসি না বলেও কতোটা আপন হওয়া যায়,একজনের হৃদয়ে অন্য জন কতোটা নিজের অস্তিত্ব ধরে রাখতে পারে।মনে মনে বলা কথা বুঝার অদৃশ্য শক্তি পাওয়া যায়।ব্যাথা পেলে তুমি তার আঁচ পেয়ে ছ'টফ'ট করি আমি!তোমার জ্ব'রের উত্তাপ পু"ড়িয়ে দেয় অপর ব্যক্তি কে।প্রেম আজোও লুকায়িত ভোরের আলোর চাদরে,শুরু টা করবে কে?মন কে প্রশ্ন করে করেও বলে হয়ে উঠা হয় না কারোই,হারিয়ে ফেলার ভয় নেই তাদের এই তো দুজন দুজনকে কি ভীষণ আগলে রাখে বিশ্বাস করে!

আদাভান চশমা খুলে টেবিলে রাখলো, মেয়েটা রওনা হয়েছে সকালের ট্রেনে চিন্তায় চিন্তায় সে ক্লান্ত মন কেমন যেনো করছে, নিজেকে বার বার বুঝ দিচ্ছে, আজে"বাজে চিন্তা করা বন্ধ কর তুই!

তৃধা ট্রেনে চেপেই ফোন করেছিলো।আদাভান স্বস্তির নিশ্বাস নিলেও তার মন এখনও অশান্ত!

তৃধা ট্রেনের বেঞ্চিতে বসলো আরাম করে পেছনে হেলান দিয়ে বলে উঠলো--,,গাই'স একটা সিরিয়াস কথা বলার আছে,তোরা পরামর্শ দিবি, লেগ"পুল করলে সোজা ট্রেনের বাহিরে ফেলে দিবো শা"লা!

নোভা হাই তোলে বললো--,,আমার অনেক ঘুম পাচ্ছে ভাই!

রাদিফ বললো--,,নিশি হলুদের দিন তোকে কি যে সুন্দ...!

তৃধা থামিয়ে দিয়ে বললো---,,পরে আবার বলতে পারবি না বা'সর সেরে ফেললি আমাদের কিছু বললিও না!

এবার নড়েচড়ে বসলো সবাই,আভা মুখে চিপস পুরে বললো--,,প্রেম নামক জন্ডিসে আক্রা"ন্ত হয়েছো নাকি বান্ধবী!

তৃধা কিছুটা ঝুঁকে বসে বললো--,,আমি ভাবছিলাম।

নাদিম এক্সাইটেড হয়ে বললো--,,কি?

তৃধা এবার হাফ হেঁড়ে বললো--,,ভনিতা করতে পারতাম নাই ভাই,এসব ঢং টং আমারে দিয়া হইতো না।আমি আজকে যাওয়ার পর আমার জামাইরে প্রোপোজ করমু!আমার মনে হয় আমি খুব ভালো মতোই অসহ্য লোকটার প্রেমে পড়ছি!

নিশি এবার কথা না বলে থাকতে পারলো না, সে হা হয়ে জোরে চেঁচিয়ে বললো--,,কিহ্!সত্যি এ ও সম্ভব প্রতিদিন না এসে বলতি তোরা সারাদিন শুধু ঝগ'ড়াই করিস অন্য কিছু নাই,তাইলে....

নিশির মুখ চেপে ধরে নোভা বললো--,,কেমনে কি?আমি তো আন্দাজ করছিলাম কিন্তু এতো সিরিয়াস তা তো ভাবতেও পারি নাই!

নাদিম বলে উঠলো--,,তোরা সব ক'টা মাথামোটা আরে ভাই ওরে পুরো কথাটা শেষ করতে তো দে।

তৃধা ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট বক্স বের করে বললো--,,দেখ তো পছন্দ হয় কিনা নিজের জন্যই কিনেছি।

আভা বক্স ছিনিয়ে নিয়ে বললো--,,তুই কি নিজেরে নিজে প্রোপোজাল দিবি নাকি?

তৃধা চুল গুলো বাতাসে উড়িয়ে দিয়ে বললো--,,নো,তৃধার প্রেমে পড়ার মুহুর্ত থেকে শুরু করে টেনে টুনে আজ প্রস্তাব দেওয়ায় এসে ঠেকেছি স্পেশ্যাল না হলে কি চলে?আমার স্টাইল হবে ইউনিক!

আভা উঠে এসে ঠেলেঠুলে তৃধার পাশে বসে বললো--,,হ্যাঁ বইন এবার ঠিক আছে, কি কি করবি বল শিখে রাখি, বিয়া করার পর আমিও জামাইরে প্রেম নিবেদন করমু!

তৃধা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বসে বললো--,,শোন তবে,প্রথমে যাবো গিয়েই গলায় ঝু'লে পড়বো।মানে সব সময় যা করি!

নাদিম চোখ ছোট ছোট করে বললো--,,ভাগ্যিস তোর ওজন কম, না হয় ভাইয়ার কি হইতো ভেবে ভেবেই আমার ঘাম ছুটে যাচ্ছে!

নোভা গুঁ'তো মে'রে বললো--,,শা"লা বউরা তুলার মতো হালকা হয়,তুই বিয়া কর পরে বুঝতে পারবি!

রাদিফ বলে উঠলো--,,ভাগ্য কতো ভালো তোদের বন্ধু হতে পেরেছি, না হয় কতো কিছু মিস করে ফেলতাম!

নিশি ভাব নিয়ে বললো--,,শুকরিয়া কর ভাই শুকরিয়া কর!

রাদিফ বলে উঠলো--,,এটা কিন্তু বারাবাড়ি, আমি তোর কোন জন্মের ভাই!

আভা বলে উঠলো--,,থামবি তোরা।

তৃধা বিরক্ত হয়ে বললো--,,আমি আর কিছু কইতাম না যা।

নোভা তৃধার হাত ধরে বললো--,,মনু না ভালা বল বল পরে কি?

তৃধা বলে উঠলো---,,তার পর কিছু না, ঘুমাবো ধর রাত তিনটের দিকে টেনে তুলবো ঘুম থেকে এক বালতি পানি ঢালবো সাথে ফ্রি তে,তার পর টুপ করে দুটো চুমু খেয়ে টেনেটুনে বারান্দায় নিয়ে যাবো,বারান্দা টা কিউট করে সাজাবো, তার পর ব্যাটা'র ছেলেকে টেনে বসিয়ে দিয়ে হাতে বক্স টা ধরিয়ে দিয়ে বলবো--,,ভালোবাসি এবার আংটি টা পড়িয়ে দিয়ে হাতের পিঠে চুমু খেয়ে প্রমান করুন আপনিও আমায় ভালোবাসেন!

আভা হা হয়ে গেছে পুরো সে বলে উঠলো--,,তার পর!

তৃধা নাক মুখ কুঁচকে বললো--,,শেষ!

নাদিম মিন মিন করে বললো--,,এটা প্রোপোজাল?না মানে ডাকা'তি বললেও ভুল হবে না!

তৃধা ভাব নিয়ে বললো--,,এমন প্রেম নিবেদন দিয়ে কি লাভ যদি হার্ট অ্যা"টাক না করে?এমন কিছু করতে হবে যাতে সারা জীবন মনে থাকে এবার যে যার মতো ঘুমা তো, যা!

___________

গাড়ি চলছে আপন গতিতে রাত আটটা,সোনালী খুশিতে আত্নহারা,কতোদিন পর ভালোবাসার মানুষ টিকে দেখবে।

এরিশ তাকে কতোটা ভালোবাসে,যখন শুনবে ওদের একটা মেয়ে আছে তখন এরিশ কখনো তাকে ফেরাতে পারবে না।মাহির নামক কারা'গার থেকে মুক্তি পাবে আজ থেকে!

মাহির কু"টিল হেসে বললো--,,রাতটা তোর সকাল টা অন্য কারোর,তোর দুই কু'লই না আবার চলে যায়!

সোনালী হেসে বললো--,,এরিশ আমার হবে ভেবে কি তুই কষ্ট পাচ্ছিস?

মাহির হেসে বললো--,,তোর কি মনে হয়, আমার লাভ ছাড়া তোকে আমি ব্যব"হার করছি?

সোনালী চুপসে গেলো আসলেই তো এভাবে কেনো ভেবে দেখলো না ও এতোদিন ধরে যেহেতু এই ছেলের এতো আয়োজন নিশ্চিত কোনো বড় কারন আছে!

সোনালী মিন মিন করে বললো--,আমাকে বল,আমি ও তো এই কাজে তোর পার্টনার!

মাহির হো হো করে হেসে বললো--,,শেয়া'লের কাছে মুরগী ভা"গী দেওয়ার মতো লোক মাহির না!

ওই তো প্রায় চলে এসেছি,তৈরি হয়ে নে!

---------

আদাভান তৃধার ছবির দিকে তাকিয়ে হাসলো,মেয়েটা আছে বলেই তার জীবনে সব কিছু আছে, নিজের ব্যবহারে আজকাল বেশ অবাক হয় সে, মেয়েটা নিজের সাথে সাথে তাকেও বাচ্চা করে ছেড়েছে,কোনো দিন যদি তৃধা না থাকে?আদাভানের হৃদয়ে ব্যাথা অনুভব হলো কথা টা ভেবেই তার কলি"জা ফে'টে যাওয়ার উপক্রম!মেয়েটা কে ছাড়া এই কয়দিন যে কিভাবে কাটিয়েছে আবার নাকি সারাজীবন! আদাভান আনমনেই তৃধার ছবিতে চুমু খেলো,পর পরই হেসে বলে

উঠলো--,,"কি এক রোগ হয়েছে আমার?তোমাকেই দেখি বার বার,তুমি কাছে নেই তবুও কেমন যেনো মনে হয় দূর থেকেও শাসন করছো আমায়,যত্নে, খুনসুটি তে মাতিয়ে রাখছো আমায়!মেয়ে তুমি এতোটা আপন কবে হলে আমার?তোমায় ভালো না বেসে উপায় আছে কি আর?আমি তে ফেঁ"সে গেছি পুরোটাই!"

আদাভান ঘরি দেখলো তৃধার আসার কথা যে কোনো সময়,কতো করে বললো--,স্টেশনে আসি, সে সাফ মানা করে দিয়ে বলেছে,একদম আসবেন না।আপনি আসবেন না,আমি আসছি সারপ্রাইজ দিবো,এমন একটা ভাব নিয়ে বসে থাকেন যেনো জানেন না আমি আসবো,হুট করে এসে চম'কে দিচ্ছি বুঝেছেন?

আদাভান কপাল চাপ'ড়ে রাজি হয়েছে,মেয়েটার সব অদ্ভুত ইচ্ছে, বায়না গুলো তবুও নাকি সব আদাভানের কাছেই করে সে,আদাভান কোন মুখে না করবে?আদোও কি সম্ভব তার দ্বারা!

কিছু সময় পার না হতেই কলিং বেল বেজে উঠলো, আদাভান তড়িঘড়ি উঠে গেলো, এতো তাড়াতাড়ি চলে আসলো?আদাভান দরজা খুললো হাসি মুখে যেই না কিছু বলতে যাবে।

আচমকা সোনালী তাকে জড়িয়ে ধরে বললো--,,কেমন আছিস এরিশ?

আদাভান এক ঝটকায় সোনালী কে দূরে সরিয়ে দিয়ে বললো--,,সোনালী তুই এখান?এতো রাতে!

সোনালীর পেছন থেকে বাচ্চা মেয়েটি এসে আদাভান কে জড়িয়ে ধরে বললো--,,বাবা!

নৈঃশব্দ্যের প্রেমালাপ পর্ব ১৫ গল্পের ছবি