বাড়ির উঠোনজুড়ে একদফা ছুটোছুটির পর ঘরে ঢুকে গেলো নূপুর। প্রথমেই চেয়েছিলো ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দিতে। কিন্তু অয়ন পৌঁছে গেলো তার আগেই। শক্ত হাতে দরজা ঠেলতে শুরু করলো। নূপুর বেশিক্ষণ তাকে বাঁধা দিতে পারলো না। দরজা ছেড়ে পেছাতে শুরু করলো।
অয়নের ডান হাতে তখনও ভাতের বড়সড় লোকমা ধরা। নূপুর আতঙ্কিত হয়ে সেদিক তাকালো। ঢোক গিলে বলল,
-"ভুল হয়ে গেছে। আর জীবনেও মরিচ-টরিচ মেশানোর মতো কাজ করবো না।"
অয়ন ভালো মানুষের মতো হেসে বলল,
-"কোনো ব্যাপার না। মানুষ মাত্রই তো ভুল।"
নূপুর স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল,
-"ধন্যবাদ। এবার আমি যাই?"
নূপুর কোনোমতো ঘর থেকে বের হওয়ার পায়তারা করছিলো। অয়নের পাশ কাটিয়ে দ্রুত ছুট লাগাবে কি, অয়ন তার হাত ধরে ফেলল। পরপর কাছে টানতেই নূপুর মোচড়ামুচড়ি শুরু করলো। অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল,
-"মোচড়ামুচড়ি বন্ধ করো। মানুষ মাত্রই ভুল বলেছি। ভুলের শাস্তি দিবো না, এমন কিছু তো আমি বলিনি।"
নূপুর মোচড়ামুচড়ি বন্ধ করে চক্ষুদ্বয় পিটপিট করে চাইল। বড্ড নিষ্পাপ স্বরে বলল,
-"শাস্তি? আপনি শাস্তি দেবেন আমাকে?"
-"অফকোর্স।"
-"প্রথমবার রান্না করেছি। মরিচ একটু বেশি করে পড়তেই পারে। তাতে এত রেগে যাওয়ার কি আছে, শুনি? এবার দেখছি আপনার নামে নারী নি*র্যাতনের মামলা ঠুকতে হবে।"
অয়ন বিচলিত হলো না। উলটো হেসে বলল,
-"তোমার দৌড় ওই বড়বড় কথা অব্দিই।
আর হ্যাঁ, মরিচ ভুল করে পড়লে মাফ করে দিতাম। কিন্তু যেহেতু মরিচ শুধু আমারটাতেই মিশিয়েছো, তাই শাস্তিটা কমানো যাচ্ছে না।"
অস্থির হয়ে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য আবারও ব্যস্ত হলো নূপুর। অয়ন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মজা নিচ্ছে। নূপুর কিছুতেই অয়নের মতি-গতি ধরতে পারছে না। শাস্তি দিতে হলে এতক্ষণে ঝাল ভাত মুখে ঠুসে দেয়ার কথা। সেটা করছে না, আবার যেতেও দিচ্ছে না। শুধু উৎকন্ঠা বাড়াচ্ছে।
অনেকক্ষণ পর ব্যর্থ চেষ্টা থামিয়ে নূপুর মাথা তুলে চাইল অয়নের দিকে৷ স্বভাববিরুদ্ধ নরম সুরে বলল,
-"আপনার ঝাল তো কমেই গেছে। তাও কেন আমার সাথে এমন করছেন?"
অয়ন জিজ্ঞেস করলো,
-"কি করছি?"
-"আটকে রেখেছেন।"
এমনসময় দরজায় টোকা পড়লো। বাহির থেকে আফতাব বললেন,
-"তোদের মারামারি শেষ হলো রে? কতক্ষণ ধরে খাবার ওভাবেই পড়ে আছে।"
বাবার কন্ঠস্বর পেয়েই নূপুরের হাত ছেড়ে দিলো অয়ন। নূপুরও যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো। এক মুহুর্তও সময় অপচয় না করে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।
হাতের ভাতগুলো পানিতে ধুয়ে টিনের চালে ছড়িয়ে দিয়ে বসার ঘরে এলো অয়ন। রাশিদা তখন অন্য থালায় নতুন করে ভাত বাড়ছিলেন। আগের ঝাল ঝাল ভাতের থালাটা অন্যপাশে রয়ে গেছে। অয়ন খেতে বসার আগে বলল,
-"এই ভাতগুলো ধুয়ে পাখিদের দিয়ে দিও, মা।"
-"তোরা ভাত খা। এগুলোর কি করা যায়, তা আমি দেখবো।"
ভাত-তরকারি সব থালায় বেড়ে দিয়ে পাতিল, বাসন-কোসন নিয়ে ঘর থেকে চলে গেলেন।
অয়ন ও নূপুর পাশাপাশি খেতে বসেছে। খাওয়ার ফাঁকে নূপুর বলল,
-"একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"
অয়ন খাওয়া থামিয়ে নূপুরের দিকে ঘুরে বলল,
-"করো।"
-"ঝাল ভাতটা খাওয়ানোর সুযোগ পেয়েও খাওয়ালেন না কেন?"
অয়ন স্মিত হেসে উত্তর দিলো,
-"কারণ আমি জানি, আমার বউ ঝাল খেতে পারে না।"
নূপুর বিস্মিত নজরে চাইল অয়নের দিকে। সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-"আদিখ্যেতা! এত্ত পিরীত যে কোত্থেকে উথলায়!"
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। বলল,
-"আমার ভালোবাসাকে মানুষের কাছে আদিখ্যেতা মনে হয়। দুনিয়াতে ভালো মানুষ আর ভালোবাসা, কোনোটারই দাম নেই দেখছি।"
নূপুর অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
-"ওরে বাবা! তা কত দাম দরকার আপনার?"
অয়ন প্রতিত্তোরে বলল,
-"দাম জিজ্ঞেস করছো? তুমি নিবে? তুমি নিলে দাম লাগবে না। বিনামূল্যে আমার মতো একটা ভালো মানুষ জামাই আর সীমাহীন ভালোবাসা পেয়ে যাচ্ছো। সুযোগ শুধুমাত্র আমার বিরোধীদলীয় নেত্রীর জন্য প্রযোজ্য।"
নূপুর 'চ' সূচক শব্দ করে বলল,
-"সারাদিন এত কাব্যিক কথা-বার্তা কই পান আপনি? চুপচাপ খাবারটা হজম করতে পারছেন না? নাকি আমার মাথাটা না খেলে হয় না?"
-"কথা তো তুমি নিজেই শুরু করলে।"
-"ঘাট হয়েছে। মাফ চাইছি। এবার খান।"
*********
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। সূর্যের তাপ মিইয়ে এসেছে। ঝিমিয়ে পড়া রোদ উঠোনজুড়ে।
রাশিদা বেগম বাড়িতে নেই। কোনো এক দরকারে বাহিরে গিয়েছেন। নূপুর বাড়িতে একা। কোমড়ে শাড়ির আঁচল গুজে দড়িতে দেয়া কাপড় তুলছে।
এমনসময় বাড়িতে ঢুকলো অয়ন। হাতে একগাদা শাপলা। সে ভেতরে ঢুকামাত্রই নূপুরকে দেখে থমকে গেলো। নূপুরের কোমড়ে গুজে রাখা আঁচল, খোঁপায় বাঁধা চুল, সব মিলিয়ে পাক্কা গৃহিনীভাব ফুটে উঠেছে।
অয়নকে অমন হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে নূপুর ভ্রু নাচিয়ে বলল,
-"কি হলো? হা করে তাকিয়ে রইলেন কেন? মাছি ঢুকবে তো।"
অয়ন হুশে ফিরলো। হেঁটে এসে হাতের শাপলাগুলো রান্নাঘরের সামনে ফেলে রাখলো। এরপর এগিয়ে এলো নূপুরের কাছে৷ উপর-নীচ পরখ করে বলল,
-"জানো, তোমাকে পাক্কা গিন্নি লাগছে।"
নূপুর কাপড় তুলতে তুলতে বলল,
-"হতে তো চাইনি। আপনিই বানিয়ে দিলেন।"
-"উত্তম কাজ করেছি। নাহয় এমন দৃশ্য মিস করে যেতাম।"
অয়নের নজর তার সমগ্র দেহে গভীরভাবে বিচরণ করছে। নূপুর সেটা উপলব্ধি করামাত্র অস্বস্তিতে পড়ে গেলো। কোমড় থেকে আঁচল ছাড়িয়ে গায়ে জড়ালো। বলল,
-"আপনার নজর বড্ড খারাপ, চেয়ারম্যান সাহেব।"
-"বউয়ের জন্য একটু খারাপ হওয়াই যায়, নেত্রী ম্যাডাম।"
নূপুর বিনিময়ে কোনো উত্তর দিলো না। কাপড়গুলো নিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেলো। বিছানায় ফেলে একে একে ভাজ করতে শুরু করলো সেগুলো। অয়নও এলো তার পিছুপিছু। বেশ কিছুক্ষণ কাজে ব্যস্ত বউকে পরখ করে হাত গেলো চুলের খোঁপায়। মুহুর্তের মাঝে আলগা করে ফেলল সেটা। পরপর এলোমেলো কেশরাশি ছড়িয়ে পড়লো পিঠময়। কোমড় ছাড়িয়ে হাঁটুর কাছাকাছি।
নূপুর মহাবিরক্ত হলো। তবে রাগারাগি করলো না। কপাল কুঁচকে রেখে বলল,
-"সমস্যা কি? চুলগুলো খুলেছেন কেন?"
অয়ন নূপুরের চুলে অগোছালো স্পর্শ বুলাতে বুলাতে বলল,
-"শখ লেগেছিলো, তাই। সবসময় তো খোঁপা করে রাখতে। তাই কখনো দেখা হয়নি। আর জানোই তো, না দেখা জিনিসে মানুষের আগ্রহ একটু বেশিই থাকে।"
-"কোনোদিন বলেছেন?"
-"বললে কি আর বাড়ি ফিরতে দিতে? সেদিনই পুকুরে চুবিয়ে ফেলতে না আমায়?"
নূপুর না চাইতেও হেসে ফেলল অয়নের কথা বলার ভঙ্গিতে। প্রতিত্তোরে বলল,
-"তাহলে ভয়ও পান আমাকে?"
অয়ন হাতের আঙুলের একটা কড় হিসেব করে বলল,
-"হ্যাঁ, এই এতটুক ভয় পাই। জানো না? পত্নীকে ভয় পাওয়া আদর্শ পতীর দায়িত্ব।"
-"ভালো। ওমন একটু-আধটু ভয় পেলে সংসার সুখের হয়।"
-"এজন্যই আগে বলিনি। কিন্তু এখন? এখন তো আমার পুরো অধিকার আছে। তুমি বাঁধা দিতে পারবে না।"
নূপুর কন্ঠস্বর নামিয়ে বলল,
-"বাঁধা দিচ্ছে কে?"
অয়ন চকচকালো। বিস্মিত হয়ে বলল,
-"পরোক্ষভাবে অন্যকিছুর অনুমতি দিচ্ছো?"
নূপুরের ভাব-ভঙ্গি পরিবর্তিত হয়ে এলো। কন্ঠস্বরে ঝাঁঝ মিশিয়ে বলল,
-"সবকিছুর উল্টোপাল্টা অর্থ বের করা শুধু। আমাকে কাজ করতে দিন তো৷ জ্বালাতন করবেন না।"
অয়নের জন্য নূপুরের কাজের দেরি হচ্ছে। সে অয়নকে একটা ধমক দিয়ে ব্যস্ত হলো কাপড় ভাজ করতে। আর অয়ন ব্যস্ত হলো চুলগুলো গুছিয়ে খোঁপা করায়। কিন্তু চুল বড় ও ঘন হওয়ায় কিছুতেই সুবিধে করতে পারছে না। নাড়া-চাড়া করছে আর চুলের ঘ্রাণ নিচ্ছে। যেন একরাশ মাদকতা মিশে সেই চুলের ঘ্রাণ। লম্বা এক নিশ্বাস টেনে অয়ন বলল,
-"বউয়ের চুলের ঘ্রাণ পৃথিবীর যেকোনো সুগন্ধিকে হার মানাবে। উফফ, তোমার চুলের ঘ্রাণ পাগল করে দিবে আমায়।"
অয়নের চুল এলোমেলো করার মাঝে নূপুরের কাপড় ভাজ করা শেষ হলো। সে ঘুরে অয়নের পাঞ্জাবিটা অয়নের হাতে দিয়ে বলল,
-"এটা শ্যাম্পুর ঘ্রাণ, চেয়ারম্যান সাহেব। গতকাল শ্যাম্পু করেছি, তাই ঘ্রাণ পাচ্ছেন। চুলের কোনো ঘ্রাণ হয় না। তেল বা শ্যাম্পু দিলেই ওসবের ঘ্রাণ পাওয়া যায়। আর হ্যাঁ, আপনার বলতে হবে না, আমি জানি আমার শ্যাম্পু ভালো কোয়ালিটির।"
বলেই পাশ কাটিয়ে চুলে খোঁপা করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো। অয়ন পেছনে পাঞ্জাবি হাতে অবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। হতাশ হয়ে বলল,
-"এই মেয়েকে পটাতে গেলে নির্ঘাত আমার দশ কেজি ওজন কমে যাবে।"
অয়ন নিজের পাঞ্জাবিটা আলনায় তুলে রাখছিলো। এমনসময় বাহির থেকে নূপুরের চেঁচানোর শব্দ ভেসে এলো। এক ডাকে অয়ন হাজির উঠোনে। হন্তদন্ত হয়ে বলল,
-"কি হয়েছে? ভূত দেখেছো নাকি?"
নূপুর পালটা প্রশ্ন করলো,
-"শাপলা কোত্থেকে আনলেন?"
অয়ন জবাব দিলো,
-"গ্রামের কচি-কাচা ছেলেমেয়েগুলো পুকুরে নেমেছিলো শাপলা তুলতে। তাই আমিও নিয়ে এসে পড়লাম। ভাবলাম, ঘরে নতুন বউ আছে। প্রেম-ভালোবাসা নিবেদন করা যাবে।"
নূপুর অদ্ভুত দৃষ্টিতে অয়নের দিক চেয়ে বলল,
-"আপনি শাপলা তুলতে গিয়েছিলেন?"
অয়ন ঘনঘন দু'পাশে মাথা নেড়ে বলল,
-"না না। আমি তুলতে যাইনি। বললাম না কচি-কাচারা নেমেছিলো? আমি শুধু দূর থেকে তদারকি করেছি।"
নূপুর বুঝেছে এমন ভঙ্গিমায় ঠোঁট গোল করে বলল,
-"ওহহো! কচি-কাচারা নেমেছিলো। আপনি তো বুড়ো মানুষ, আপনি কেন নামতে যাবেন পুকুরে?"
অয়নের হাসি-খুশি ভাবটা মুছে গেলো। গুরুভার স্বরে বলল,
-"বারবার এক বিষয়ে খোঁটা দেবে না, নূপুর। সব তোমার দোষেই হয়েছে। বেশি বুঝা হচ্ছে তোমাদের নারীজাতির স্বভাব। আর তোমার এই বেশি বুঝার স্বভাবের জন্যই বিয়েটা করতে এত দেরি হলো। তুমি যদি আমাকে একটু বুঝতে, ঘাড়ত্যাড়ামি না করতে, তাহলে এতদিনে আমাদের বাচ্চাটা স্কুলে পড়তো।"
কোথাকার কথা কোথায় গিয়ে থেমেছে, তা সম্পর্কে বিভ্রান্ত হয়ে হা হয়ে গেলো নূপুর। সময় লাগলো পুরো কথাটা ধরতে। কয়েক মুহুর্ত নীরবতায় পালন করে বলল,
-"আমি না হয় ভুল বুঝেছিলাম, ত্যাড়ামি করেছিলাম, আপনি কি করেছেন? অন্য কাউকে বিয়ে করে নিলেই পারতেন। ঝামেলার সমাধান হয়ে যেত৷"
অয়ন গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,
-"নিজের স্বামীকে অন্য কাউকে বিয়ে করার উস্কানি দিচ্ছো? লজ্জা করে না তোমার?
অবশ্য উস্কানি দিলেই কি? আমি তো আর করছি না।"
রান্নাঘরের বাইরে, উঠোনের উঁচু জায়গাটায় বসে রয়েছে নূপুর। অয়ন তার পাশে দাঁড়ানো। অমন কারবার সহ্য হলো না নূপুরের। হাত টেনে অয়নকে বসালো নিজের পাশে। হঠাৎ টান পড়ায় টাল সামলাতে পারেনি অয়ন। বসতে হলো তাকে। নূপুরের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
-"কি হলো?"
নূপুর দু'গালে হাত রেখে প্রশ্নাত্মক চাহনি নিক্ষেপ করলো অয়নের উপর। জানতে চাইলো,
-"আচ্ছা, আমি তো শহরে চলে গিয়েছিলাম। সিদ্ধান্তও জানিয়ে দিয়েছিলাম, কখনোই বিয়ে করবো না। আপনাকে তো ভুলেও না৷ তো আপনি সবটা জেনেও কেন অন্য কাউকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিলেন না? সাত-আটটা বছর কিসের ভরসায় রইলেন?"
অয়ন নিজের দু'হাতের মুঠোয় নূপুরের দু'হাত ধরলো। শক্ত করে ধরে বলল,
-"ভরসা না থাকুক, অপরাধবোধ তো ছিলো। আমি জানতাম, আমাকে ভুল বুঝেই তুমি দূরে সরে গিয়েছো। আমার প্রতি একটা ভুল ধারনা নিয়ে বসেছিলে তুমি। তাহলে এটা কি আমার দায়িত্ব নয় যে আমি তোমার সেই ভুল ধারনা ভাঙাই?"
নূপুর অভিভূতের ন্যায় কয়েকপল চেয়ে থেকে মাথা ঝুঁকিয়ে ফেলল। ভেবেচিন্তে বলল,
-"আমার ভুল ধারনা ভাঙানোর জন্য আপনি বসেছিলেন? কিন্তু কি কারণে? আমি ভুল ধারণা নিয়ে দূরে সরলেই বা আপনার কি হতো?"
নূপুর খুব আশা নিয়ে বসেছিলো, অয়ন ভালোবাসার কথা স্বীকার করবে। জানাবে, ভালোবেসেছিলো বলেই অপেক্ষা করেছিলো। কিন্তু অয়ন আশাহত করলো। গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে বলল,
-"অতকিছুর ব্যাখ্যা তো নেই৷ শুধু তুমি আমায় ভুল বুঝে দূরে সরে গেছো, এটা আমার ভালো লাগে নি।"
নূপুরের রাগ হলো, নাকি মন খারাপ, সেটা সে নিজেও বুঝতে পারলো না। অজ্ঞাত অনুভূতির মাঝে হাবুডুবু খেয়ে বলল,
-"যদি ভুল না বুঝতাম, সঠিকটা জেনেই হারিয়ে যেতাম, তাহলে কি আপনি আর আমাকে ফেরানোর চেষ্টা করতেন না?"
প্রশ্নের ভাবার্থ ধরতে পারলো অয়ন। নিষ্পলক চেয়ে রইলো বউয়ের দিকে। নূপুরের কৌতুহলী হয়ে পল্লব ঝাপটানোর মাঝে সোজাসাপটা উত্তর ছুড়লো,
-"সঠিকটা জানলে তোমার ত্যাড়ামি করার কথা না, নূপুর। তাও যদি ওমন করতে তো আমার কিছু করার ছিলো না৷ বিয়ে করতে না চাইলে সেটাই করতাম, যেটা এবারে করেছি।"
নূপুর হতবাক হয়ে বলল,
-"তার মানে তখনও হুমকি-ধমকি দিয়ে বিয়ে করতেন?"
-"হ্যাঁ। আর আমার মনে হয় তুমি বিষয়টাতে খুশিই হতে। তোমার রিয়েকশন তাই জানাচ্ছে আমাকে।"
থতমত খেয়ে গেলো নূপুর। অয়নের একটু একটু অনুভূতি প্রকাশে রীতিমতো আহ্লাদে গদগদ হয়ে যাচ্ছিলো। ভুলবশত তার মনের ভাবনাটাও প্রকাশ পেয়ে গেছে। যা বুঝা যাচ্ছে, তাতে বেশিদিন সে অয়নের সামনে কঠোর ভাব-ভঙ্গি ধরে রাখতে পারবে না। নূপুর গলে যেতে বাধ্য।
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-"এবার তো রাগটা কমান, নেত্রী ম্যাডাম। কতদিন এই অধমের উপর অ*ত্যাচার করবেন?"
নূপুর গাল ফুলিয়ে বলল,
-"কতদিন মানে? বিয়ের তো হলোই মাত্র একদিন।"
-"ওই একদিনই আমার কাছে একযুগের সমান লাগছে। বিয়ে করেও বউয়ের থেকে দূরে থাকার মতো কষ্ট আর কিছুতে হয়, বলো? এমনিতেই বিয়ে করতে চেয়েছিলাম আরও সাত বছর আগে। তুমি কতগুলো বছর বিয়ে পিছিয়ে দিলে। এখনও যদি এমন করো তো কি করে চলবে?"
-"সাত বছর আগেই যখন বিয়ে করার ইচ্ছা ছিলো, তো অন্য কাউকে করে নিলেই পারতেন। এতদিন অপেক্ষা করতে হতো না।"
অয়ন অতিষ্ঠ ভঙ্গিমায় তাকালো নূপুরের দিকে। দু'গালে চেপে বসলো তার শক্তপোক্ত হাত। অধৈর্য হয়ে বলল,
-"এতকিছু শুনেও এ-কথা কিভাবে বলো তুমি? মাথা পুরোপুরি গেছে তোমার?
আচ্ছা যাও, এতদিনেও বিয়ে না করে বিরাট ভুল করে ফেলেছি। এখন আরেকটা মেয়ে খুঁজে বিয়ে দিতে পারো। আমি রাজি আছি।"
নূপুর তৎক্ষনাৎ ক্ষে*পে গিয়ে লাগাতার কয়েকটা ঘুষি বসালো অয়নের বুকে। রুক্ষ স্বরে বলল,
-"শখ কত ঘরে বউ রেখে আরেকটা বিয়ে করার! এখন এসব চিন্তা-ভাবনা করলেও ঠ্যাং কেটে বসিয়ে রাখবো।"
অয়ন ঘুষি-টুষি খেয়েও প্রতিবাদ করলো না। বাধ্য স্বামীর মতো হজম করলো। এরপর শাপলাগুলো তুলে নূপুরের হাতে দিয়ে বলল,
-"মাথা ঠান্ডা। নাও ফুল নাও আর রাগ করা বন্ধ করো।"
নূপুর মার থামিয়ে ফুলগুলো হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখলো। বিভ্রান্ত হয়ে বলল,
-"শাপলা? মানে রাগ কমানোর জন্য শাপলা?"
-"হ্যাঁ, শাপলা দিচ্ছি। প্রেম-ভালোবাসা নিবেদন করছি।"
-"বাহ। মানুষ গোলাপ দিয়ে প্রেম-ভালোবাসা নিবেদন করে। আর আপনি শাপলা দিচ্ছেন?"
অয়ন ভাব-গাম্ভীর্যের সাথে উত্তর দিলো,
-"সবাই গোলাপ দিলে আমাকেও গোলাপ দিতে হবে? গোলাপে কাঁটা থাকে, জানো না? তোমার হাতে কাঁটা ফুঁটতে পারে। তাই গোলাপ দেইনি। আমি হচ্ছি দেশপ্রেমিক মানুষ। তাই জাতীয় ফুল শাপলা দিয়েছি বউকে। এতে ভালোবাসা নিবেদনও হবে, আবার তরকারি রান্না করেও খাওয়া যাবে। ভালো বুদ্ধি না?"
নূপুর হাসবে না কাঁদবে, বুঝতে পারছে না। অয়নের যুক্তির সামনে বেচারী তব্ধা লেগে গেছে। মনে মনে ভাবছে, দুনিয়ার সব কথা এক মুখে বলে ফেলতে পারে। কিন্তু সুযোগ পেয়েও ভালোবাসার কথা বলতে পারছে না। এমন মানুষকে তুলে একটা আ*ছাড় মারা উচিত নয় কি?
আছাড় দেয়া উচিত হলেও নূপুরের পক্ষে সম্ভব নয়। সে কপাল চাপড়ে বলল,
-"ওরে আমার দেশপ্রেমিক, সংসারপ্রেমিক জামাই রে!!"
অয়ন ভুল শুধরে দিলো,
-"বউপ্রেমিকও৷ এটা মিস করে গেছো, নেত্রী ম্যাডাম।"
নব্য প্রেমে পড়া প্রেমিক-প্রেমিকার ন্যায় একটা লম্বা সময় পার করলো দু'জনে। টনক নড়লো মাগরিবের আজান পড়তেই। নূপুর ত্রস্থ উঠে পড়লো মাথায় ঘোমটা দিয়ে। রুমের বাতিগুলো জ্বালিয়ে দিয়ে গলা উঁচিয়ে ডাকলো,
-"চেয়ারম্যান সাহেব, ভেতরে আসুন। নাহয় মশা কামড়াবে।"
অয়ন নিজের রুমে ঢুকে নূপুরকে বলল,
-"কি আর করার বলো? বউয়ের কামড় খাওয়ার বয়সে মশার কামড় খেতে হয়।"
নূপুর ভ্রু কুঁচকে বলল,
-"তো আপনি বউয়ের কামড়ই বা কেন খেতে চাইছেন?"
অয়ন ভণিতাহীন একবাক্যে বলল,
-"ওটা ভালোবাসার কামড়, তাই।"
-"যুক্তিহীন কথা-বার্তা।"
অয়ন নূপুরের কাছে পৌঁছে গেলো। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
-"না, সত্যি বলছি। ওটা ভালোবাসার কামড়। তুমি খাবে?"
আকস্মিক এই কান্ডে ভয়াবহ চমক লেগে নূপুর উলটে পড়তে নিয়েছিলো। অয়নের দু'বাহু শক্ত করে ঝাপটে ধরে সামলালো নিজেকে। চক্ষুদ্বয় বড়বড় করে বলল,
-"কি করছেন এগুলো!"
অয়ন সত্যি সত্যি নূপুরের ঘাড়ে পৌঁছে গেলো। উষ্ণ নিশ্বাস ছড়িয়ে পড়লো সেথায়৷ অয়ন বলল,
-"খালি বাড়ির সুযোগ নিচ্ছি।"
নূপুর ছটফট করে বলল,
-" ভরসন্ধ্যের শয়তান চেপেছে আপনার ঘাড়ে। ওমাগো! সত্যি সত্যি কা*মড়ে দিয়েছে!"
-"চুপ! এত চেঁচিও না। লোকে ভাববে, বউ পিটাচ্ছি।"
নূপুর অয়নকে বাঁধা দিচ্ছিলো ঠিকই, তবে তাতে কোনো জোর ছিলো না। যেন স্বেচ্ছায় সম্মতি দিচ্ছিলো নিজেও। তাদের একান্ত মূহুর্তের বারোটা বাজাতে বাড়িতে হাজির হলো রাশিদা। উঠোন থেকে তার কন্ঠস্বর পেতেই নূপুর জোরেশোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো অয়নকে। লম্বা-লম্বা শ্বাস নিয়ে বলল,
-"মা এসে পড়েছে।"
অয়ন আশ্চর্যান্বিত হয়ে বলল,
-"তো কি হয়েছে? এমন ভাব করছো যেন প্রেম করতে গিয়ে ধরা খেয়েছি!"