বৈরীতা ও অনুরক্তি

পর্ব - ৬

🟢

মেয়ের বিয়ে নিয়ে রেহানা যতখানি উৎফুল্ল ছিলেন, বিদায়ের সময় ঘনিয়ে আসতেই কমতে শুরু করলো। যদিও মেয়ে বহুবছর মায়ের থেকে দূরে শহরেই থেকেছে, তবুও মন ভার হতে শুরু করলো। কান্না চেপে রাখা দুষ্কর হয়ে পড়লো।

বিদায়বেলায় ঝরঝরিয়ে কেঁদে ফেললেন তিনি। সবসময়ের শক্ত-পোক্ত মানুষটাও মেয়ে বিদায়ে চোখের পানি ফেললেন। মা-বাবার কান্না দেখে নূপুরও সামলাতে পারলো না নিজেকে।

নূপুরদের বাড়ি থেকে অয়নদের বাড়ি খুব বেশি দূরে নয়। হেঁটেই চলে যাওয়া যায়। অন্যথায় ভ্যানে চড়ে যেতে হবে। বিলাসবহুল গাড়ি, রিকশার ব্যবস্থা নেই। তবে আজ বিয়ে উপলক্ষে ঘোড়ার গাড়ি আনা হয়েছে। সাথে নূপুরের জন্য সৌখিন সাজে রঞ্জিত পালকির বন্দোবস্ত করা হয়েছে।

রাশিদা বুঝিয়ে-সুঝিয়ে, স্বান্ত্বনা দিয়ে নূপুরকে পালকিতে উঠালো। কনেপক্ষের সকলের থেকে বিদায় নিয়ে পড়ন্ত বিকেলে বাড়ির পথে যাত্রা করলো তারা। রেহানা ও নেওয়াজের মনে কেবলমাত্র এতটুক স্বান্ত্বনা রয়ে গেলো, মেয়ে চাইলেই এক ছুটে চলে আসবে মা-বাবার কাছে। কতই বা দূরত্ব দুই বাড়ির?

***********

বরপক্ষের দলটার অয়নদের বাড়িতে পৌঁছুতে পনেরো-বিশ মিনিট লাগলো। দরজার কাছাকাছি আসতেই হৈ-হুল্লোড়ে মাতোয়ারা হয়ে গেলো পাড়া। সদর দরজার বাইরেই পালকি থামিয়ে নূপুরকে নামানো হলো। মেয়ের আচরণ তখন অতিশয় ভদ্র ও লজ্জামাখা। ভদ্রতার ভারে যেন মাথা তোলা দায়।

রাশিদা বরণ করে ঘরে তুললেন পুত্রবধূকে। নূপুর সবে ভেতরে পা রাখতে যাবে, অমনিই অয়ন পেছন থেকে তার হাতখানা চেপে ধরলো। বলল,

-"আমারে রেখে একা একাই যাবে নাকি?"

আশেপাশের মানুষের মাঝেও নূপুরের মুখ থেকে অয়নের জন্য সোজা জবাব বের হলো না। ফট করে বলে বসলো,

-"আপনার বাড়িতে আপনি ঢুকবেন, সেটা আমাকে বলার কি হলো?"

রাশিদা হেসে ফেললেন। বললেন,

-"তাই তো! এই অয়ন, তুই ওকে জ্বালাস না তো। তুমি ভেতরে আসো মা।"

রাশিদা নূপুরকে ভেতরে নেওয়ার আগেই অয়ন কোলে তুলে ফেলল তাকে। বলা নেই, কওয়া নেই, আকস্মিক এ আচরণে হতভম্ব নূপুর। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেলো। পড়ার আশঙ্কায় দু'হাতে আলগাভাবে জড়িয়ে ধরলো অয়নের গলা।

গ্রামাঞ্চলে এহেন কান্ড ঘটানোর সাহস কারো নেই। সাহস করলেই এক কথায় তাকে নির্লজ্জ উপাধি দেয়া হবে। বিশেষ করে পাড়া-পড়শীর চোখে পড়লে কানা-ঘুষা শুরু হয়ে যাবে তৎক্ষনাৎ। অয়ন সেসবের পরোয়া করলো না একবিন্দু। নূপুরকে কোলে তুলেই হনহনিয়ে চলে গেলো ভেতরে।

অয়নদেরই এক প্রতিবেশী। সে নিজ দায়িত্বে এগিয়ে এলো প্রথমেই। শাড়ির আঁচলটা মুখের কাছে ধরে বলল,

-"আপা, দ্যাখছেন আপনের পোলার কাম? বউরে কোলে লইয়া ভিতরে গেলো যে? পোলা যদি এহনই বউয়ের এত পাগল হয়, তাইলে পরে তো বউ আপনের পোলারে আঁচলে বাইন্ধা রাখবো। ইশারায় নাচাইবো।"

যেমন ছেলে, তেমনই তার মা-বাবা। রাশিদার এসবে কিছুমাত্র এলো-গেলো না। সাবলীল ভঙ্গিমায় বলে ফেলল,

-"রাখুক আঁচলে বেঁধে, সমস্যা কি? বউ তো এনেছিই যেন আমার ছেলেকে আঁচলে বেঁধে রাখতে পারে।"

সরাসরি উত্তরটায় থতমত খেলেন ভদ্রমহিলা। আর কথা আগানোর সাহস পেলেন না। অন্যরাও রাশিদার উত্তর শুনে এই বিষয়ে আর উচ্চবাচ্য করলেন না। এড়িয়ে গেলেন সন্তপর্ণে। তবে নিজেদের মধ্যে আলোচনা ঠিকই চলমান রইলো তাদের।

অয়ন নূপুরকে নিয়ে সোজা নিজের ঘরে যায়নি। অন্য ঘরে এনে খাটের মাঝে বসিয়ে দিয়েছে। নূপুরের সৎবিৎ ফিরলো তখন। কটমট করে বলল,

-"এটা কি হলো?"

-"আমার বউকে কোলে তুলে সমাদরে আমার জীবনে নিয়ে আসা হলো।"

-"আশেপাশের লোকের কথা ভাবা উচিত ছিলো।"

-"আশেপাশের লোকের কথা তুমি কবে থেকে ভাবতে শুরু করলে? আমি যতদূর জানি, তুমি তো লোকের কথায় কান দাও না। আজ কেন দিবে?"

নূপুর রেগেমেগে বলল,

-"অন্যান্য প্রসঙ্গ আর মানুষের সামনে কোলে তোলার প্রসঙ্গ ভিন্ন চেয়ারম্যান সাহেব।"

অয়ন থমথমে স্বরে বলল,

-"আমার বউকে আমি কিভাবে রাখবো, কিরকম আচরণ করবো, কোলে তুলবো নাকি মাথায় তুলবো, এসব আমার একান্ত ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ নূপুর। অন্যরা এই ব্যাপারে কি বলল, তাতে আমার কিছুই যায় আসে না।"

অতঃপর নূপুরকে বিপরীতে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো অয়ন। পরপরই হুড়মুড়িয়ে ভেতরে ঢুকলো ছোট থেকে শুরু মাঝবয়সী এবং বয়স্ক মহিলাদের আগমন। নতুন বউ দেখতে হাজির হয়েছে সবাই। যেহেতু তাদের বিয়েটা হঠাৎ করেই হয়ে গেছে, তাই কেউ-ই প্রস্তুত ছিলো না আজকের চমক দেখার জন্য। মানুষ আসছে, বউ দেখছে, বউয়ের হাতে সালামী গুজে দিয়ে কতক্ষণ নিজেদের মধ্যে আলাপ করে আবার চলে যাচ্ছে।

এভাবেই পার হলো অনেকটা সময়। সূর্য অস্ত গেলো, সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলো। নূপুর তখনও ঠায় একজায়গায় বসে। মুখচেনা, পরিচিত মানুষগুলোকেই হঠাৎ বেশ অপরিচিত লাগছে তার। চিরচেনা গ্রামবাসী তাকে নতুন বউ, নতুন বউ ডাকছে। রাশিদা মেহমান সামলে একটু পরপর এসে নূপুরকে দেখে যাচ্ছেন। প্রথমবার এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে নূপুরের অস্বস্তি হচ্ছে কি না, সেটা নিয়েই তিনি ভীষণ তৎপর।

সেসময়েও রাশিদা নূপুরকে দেখে রুমের বাইরে বেরুলেন। তখুনি নজরে এলো এক গুচ্ছ মহিলাদের মাঝে আলাপ হচ্ছে অয়ন ও নূপুরকে নিয়ে। কি ভেবে এগিয়ে গেলেন তিনি! শুনতে পেলেন,

-"এই মাইয়া তো চেয়ারম্যান নির্বাচনেও ও খারাইছিলো। দুইডার মধ্যে না নির্বাচন লইয়া ঝামেলা চলতাছিলো? এহন আবার জামাই-বউ হয়া গেলো?"

-"বুঝি না ওগো কাম-কারবার। দুইদিন আগেও নির্বাচন লয়া যাগো বনিবনা হইতো না, ওরা বিয়া কইরা লইলো। ক্যামনে কি হইলো?"

-"গ্রামবাসী অয়নরে চেয়ারম্যান বানানোর লাইগা ভোট দিলো। কিন্তুক যা অবস্থা দেখতাছি, তাতে মনে হইতাছে চেয়ারম্যান নিজেই এহন বিরোধীপার্টির কথায় চলবো।"

-"আরে না! দল-টল নিয়া ভেজাল হইবো না। হুনছি নূপুরে পার্টিত্তে পদত্যাগ করবো। বিয়া-শাদি করোনের চিন্তা ছিলো দেইখাই মনে হয়। এত বছরে নেওয়াজ সাহেবের মাইয়ার মাথায় সংসারধর্ম ঢুকছে।"

-"তোমরা যাই কও, আমি খালি একটা কথাই ভাবতাছি। বহুকাল আগে হইতে বিরোধী পার্টির চুলাচুলি দেখতে হইতো। আর এহন জমানা বদলাইছে। বিরোধীপার্টি গো সংসারও দেখতে হইবো। একদিনেই চেয়ারম্যান সাব যা দেহাইলো! বেডা ম্যালা বউপাগল হইবো।"

-"আসল কথা হইলো নির্বাচনে হাইরাও নূপুরের কপাল খুইলা গেছে।"

রাশিদা সব শুনে মুচকি মুচকি হাসছেন কেবল। তাদের কথা শেষ হতেই গলা খ্যাঁকাড়ি দিলেন তিনি। এগিয়ে আসতেই একজন বললেন,

-"আমগোরে না কইয়াই তো পোলার বিয়াডা দিয়া দিলেন, রাশিদা আপা। বিয়ার দাওয়াত তো দূর, খবরও পাইলাম না।"

রাশিদা হেসে বললেন,

-"কিছু মনে করবেন না। একদম হঠাৎ করেই ছেলের বিয়ের আয়োজন করে ফেলেছি বলে তেমন অনুষ্ঠান করা হয়নি, আপা। তবে শিগগির সময়-সুযোগ বুঝে ঘটা করে অনুষ্ঠান করবো। তখন পুরো গ্রামবাসীকে দাওয়াত করবো।"

রাশিদার উত্তরের পরও প্রশ্নকর্তার মুখ দেখে মনে হলো না তিনি বিশ্বাস করেছেন। বিয়ে-শাদির দাওয়াত না-ও আসতে পারে। তবুও তিনি এসেছিলেন অয়নের বউ দেখতে। অন্যের বউ দেখে তাকে নিয়ে দিনরাত্রি এক করে আলোচনা-সমালোচনা করা তাদের নিকট এক বিরাট শখের কাজ।

***********

মেহমানদারি করে সবাইকে বিদায় দিতে দিতে রাত্রি দশটা বেজে গেলো। পরিবেশ তখন নিস্তব্ধ হতে শুরু করেছে। আশেপাশের বাড়িগুলোতে একে একে বন্ধ হচ্ছে বাতিগুলো। অন্ধকার নেমে আসছে চারদিকে। চাঁদের আলো ও জোনাকির টিমটিমে আলো চোখে পড়ছে প্রায়ই। ঝিঝিপোকার শব্দ তো বিরতিহীন বেজেই চলেছে।

অয়নের চাচাতো ভাই ও বোন উপস্থিত ছিলো তাদের বাড়িতে। আজকে থেকে কালকে দিনেই চলে যাবে তারা। গতকাল রাতে ফোন করাতে সেসময়ই সব গুছিয়ে ভোরে রওনা দিয়েছিলেন তারা। তাই বরযাত্রী বের হওয়ার আগেই পৌঁছে গেছেন। একদিনের ছুটি শেষ হয়ে গেলো দ্রুতই। শহরের মানুষের অসময়ে বেশিদিন ছুটি কাটানোর নিয়ম নেই। বাঁধা-ধরা নিয়মে তারা একটু বেশিই অভ্যস্ত।

নিশাত, নীরব ও মিন্টুকে বাসরঘর সাজানোর দায়িত্ব দিয়েছে অয়ন। তারাও ভিন্ন ভিন্ন ফুল দিয়ে ভরে দিয়েছে ঘরখানা। বিশেষভাবে বেলী ও গোলাপের সুবাসে মো-মো করছে অয়নের ঘর।

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর নিশাত নূপুরকে নিয়ে অয়নের ঘরে ঢুকলো। নিশাত তাকে উঠিয়ে বসালো বিছানার মাঝ বরাবর। যেটাকে বিছানা কম, ফুলের কার্পেট বেশি লাগছে। নূপুরের অস্বস্তি হতে শুরু করলো। নিশাত যখনই ঘোমটা দিয়ে মুখ ঢাকতে যাবে তখুনি হাত ধরে ফেলল নূপুর। হাঁসফাঁস করে বলল,

-"আমি শাড়িটা বদলে আসি?"

নিশাত উত্তরে বলল,

-"একটু অপেক্ষা করো। ভাইয়া আসুক, পরে না হয় গিয়ে বদলে নিও।"

গল্পের বাহার এর গল্প (বৈরিতা ও অনুরক্তি) লেখিকা তিয়াশা চৌধুরী

নূপুর আর কিছু বলতে পারলো না। চুপ করে বসে রইলো। নিশাত তাকে ঘোমটায় ঢেকে চলে গেলো রুম থেকে।

ঘর খালি পেতেই দুষ্টুবুদ্ধি মাথাচাড়া দিলো নূপুরের। ঘোমটা উঠিয়ে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে নিলো, কেউ আসছে কি না? নিশ্চিত হতেই নামলো বিছানা থেকে।

দরজায় গিয়ে উঁকি মারলো বাইরে। নাহ, কারো আসার সম্ভাবনা নেই। দ্রুত ফিরে ঘরের মধ্যে খুঁজতে শুরু করলো কাঙ্ক্ষিত একটা জিনিস।

গতকাল রাতে অয়ন নূপুরের আনা ছুরিটা সামলে রেখেছে। লুকিয়ে রেখেছে নিজের ঘরেরই কোথাও। সেটা খুঁজে বের করতেই নূপুর ঘরময় আঁতিপাঁতি করতে লাগলো।

বিশমিনিট পার হওয়ার পর নূপুর খুব চিপাচাপা থেকে বের করে আনলো ছুরিটা। ক্রুর হেসে বলল,

-"এটা দিয়েই আমাকে ব্ল্যাকমেইল করা, তাই না? এবার আপনার হচ্ছে!"

Story Cover