অয়ন বেশ কিছুক্ষণ হবে বেরিয়েছে। মিন্টু তাদের উঠোনেই হাঁটাহাঁটি করছে। রাশিদা ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে মিন্টুকে জিজ্ঞেস করলো,
-"এত রাতে অয়ন কই গেলো?"
মিন্টু উত্তরে জানালো,
-"বাইরেই আছে। এসে পড়বে।"
-"কি করছে ও? আমিই যাই। দেখি কোথায় আছে?"
মিন্টুর বাঁধা না মেনেই বেরিয়ে গেলেন ভদ্রমহিলা। বাড়ির প্রাচীরের এপাশে এসে খোঁজার চেষ্টা করলেন ছেলেকে। ডাক ছুড়লেন,
-"অয়ন!"
ডাকার সাথে সাথেই পিছনে ঘোরামাত্র অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্য দেখতে পেলেন দৃষ্টিসম্মুখে। অয়নের সাথে একটা মেয়ে।
এদিকে রাশিদার কন্ঠস্বর পেয়েই ঘাবড়ে গিয়ে ছুরিটা ফেলে দিয়েছে নূপুর। পিছিয়ে গেছে অয়নের থেকে। এবং সে দৃশ্যটাও রাশিদার নজর এড়ায় নি। এত রাতে দু'টো ছেলে-মেয়েকে একত্রে দেখে স্বাভাবিকভাবে যা ভাবার কথা, সেটাই ভেবে নিয়েছেন তিনি। তবে মেয়ের মুখখানা এখনো দেখা হয় নি।
কয়েক মুহুর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন তিনি। সে সময়টা অয়ন ও নূপুর মুখ দেখাদেখি করলো। পরপর রাশিদা এগিয়ে এলেন দু'জনের দিকে। একবার অয়নের মুখটাতে তাকিয়েই নূপুরের দিক ফিরলেন। বাক্য ব্যয়হীন হাত রাখলেন নূপুরের নিকাবে। তুলে ফেললেন সেটা। প্রসাধনী বিহীন ফ্যাকাসে মুখটা দৃষ্টিগোচর হতেই সবিস্ময়ে বললেন,
-"নূপুর!"
এরপর অয়নের দিক ঘুরে বললেন,
-"অয়ন! তোরা প্রেম করছিস? অথচ আমাকে জানালিও না?"
নূপুর অসম্মতি প্রকাশ করে কিছু বলতে চাচ্ছিলো। অয়ন মাঝপথেই বলে ফেলল,
-"নির্বাচন নিয়ে যা ভেজাল গেলো, এজন্যই বলতে পারিনি। ভেবেছিলাম এসব ঝামেলা শেষ হলে জানাবো। তুমি তো আগেই জেনে গেলে।"
ডাহা মিথ্যে কথাটায় বিস্ময়ের তোঁপে হা হয়ে গেলো নূপুরের মুখখানা। তীক্ষ্ণ স্বরে চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করতে চাইলো তৎক্ষনাৎ। রাশিদা সে সুযোগ দিলেন না। এক হাত দিয়ে অয়নের হাত ধরলেন, অন্য হাত দিয়ে নূপুরের হাত ধরে টান বসালেন। ব্যস্ত হয়ে বললেন,
-"এসব আলাপ ঘরে বসে করা যাবে। লোক জানাজানি হওয়ার আগে ভেতরে চল দু'জন। নয়তো কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।"
রাত বারোটা পার করায় তখন অয়নদের বাড়ি বলতে গেলে ফাঁকাই। কেবল রাশিদা, আফতাব ও মিন্টু উপস্থিত রয়েছে। মাঝরাত্রিতে রাশিদা নূপুরকে নিয়ে ঘরে হাজির হতেই বাকি দু'জন বিভ্রান্ত হলেন। আফতাব জিজ্ঞেস করলেন,
-"নূপুর এত রাতে এখানে?"
রাশিদা প্রতিত্তোরে বললেন,
-"আস্তে কথা বলো। পাড়া-প্রতিবেশীদের কানে যেন না পৌঁছায়।"
নূপুর বলতে চাইলো,
-"আন্টি, আপনি ভুল ভাবছেন। আমি তো..."
অয়ন বিরক্তি সমেত বলল,
-"আহ, নূপুর। চুপ করবে তুমি? যা হয়েছে, তোমার দোষেই তো। এত রাতে তোমাকে আসতে কে বলেছিলো? কাল দিনেও দেখা করতে পারতাম। মাঝরাতে কেন আমাকে শুভেচ্ছা জানাতে উতলা হলে?"
নূপুর চেঁচিয়ে প্রতিবাদ করলো,
-"না। আমি আপনার সাথে দেখা করতে আসিনি, শুভেচ্ছাও জানাতে আসিনি।"
অয়ন তবুও বিচলিত হলো না৷ দু'হাত ভাজ করে বুকে গুজে দাঁড়ালে। কপাল কুঁচকে বলল,
-"আচ্ছা। তাহলে কেন এসেছো তুমি? সবাই দেখেছে তুমি মিন্টুকে দিয়ে আমাকে ডাকিয়েছো।"
অতঃপর ঘুরলো মিন্টুর দিকে। শুধালো,
-"কিরে মিন্টু? ও-ই ডেকেছিলো না আমায়?"
মিন্টু সম্মতির সুরে মাথা নাড়লো। অয়ন নির্বিঘ্নে বলে দিলো,
-"দেখলে, প্রমাণও আছে। অস্বীকার কেন করছো, নূপুর? আমার মাকে ভয় পেয়ে? আমার মাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। মা ভীষণ ভালো মানুষ।"
নূপুর কথা হারিয়ে ফেলল। বুঝতে পারলো, সে জলে কুমির ডাঙায় বাঘের মাঝে আটকা পড়েছে। যদি বলে অয়নের সাথে দেখা করতে আসে নি, তাহলে আসল কারণটা বলতে হবে। এরপর? খু*নের চেষ্টা করার অপরাধে পুলিশে ধরিয়ে দিলে?
আবার প্রেমের কথাটায় হ্যাঁ-ও করতে পারছে না। এক কথায় অয়ন ওকে ভালোমতোই ফাঁসিয়ে দিয়েছে। কোনো রাস্তাই অবশিষ্ট রাখেনি।
বাকিরা অয়নের কথাই সত্য মনে করলো। রাশিদা ভাবলেন, নূপুর তাকে ভয় পাচ্ছে। এজন্যই অয়নের সাথে সম্পর্কের কথা স্বীকার করতে চাচ্ছে না। অথচ ভদ্রমহিলা ভীষণ মনখোলা মানুষ। ছেলের পছন্দ হলে তিনি নূপুরকেই বউ বানাবেন। তাই স্বান্ত্বনা দিতে এগিয়ে এলেন নূপুরের দিকে। বললেন,
-"মা, তুমি আসলেই আমাকে ভয় পাচ্ছো? ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তেমন শাশুড়ী নই। আমার ছেলের পছন্দই আমার পছন্দ। আর তোমাকেও আমার পছন্দ হয়েছে।"
বিপরীতে নূপুর মাথা নিচু করে চুপ করে রইলো। রাশিদা তাড়াহুড়ো করে বললেন,
-"পাশের বাড়ির ভাবি বোধহয় ওদের একসাথে দেখে ফেলেছে। কাল সকালেই পুরো গ্রামে রটনা করতে বেরুবে। তখন কত বড় অঘটনটা হবে ভাবতে পেরেছো?
এরচেয়ে ভালো আমরা ওদের বিয়ে দিয়ে দেই।"
নূপুর চমকে গেলো। চোখ পিটপিট করে বলল,
-"এহ? বিয়ে? বিয়ে কেন করতে হবে?"
নূপুরকে পাত্তাই দিলো না কেউ। আফতাব বললেন,
-"হ্যাঁ, গন্ডগোল লাগার আগেই কাজ সেরে ফেলি। নূপুরের মা-বাবাকে ডেকে নিয়ে আসো। যদি কাল এই ব্যাপারে কেউ জিজ্ঞেসও করে, তাহলে বলে দিবো ওদের বিয়ের কথা-বার্তা চলছিলো৷"
একটু থেমেই আবার ক্ষেপলেন ছেলের উপর। বললেন,
-"তোমারও কি আক্কেল-জ্ঞান শুনি? পছন্দের কথা আগে বলতে পারো নি? আমরা কি না করতাম? ষাঁড়ের মতো হাতে-পায়ে বড়ই হয়েছো কেবল। বুঝ আসে নি। এই বয়সে এসে বাচ্চাদের মতো কাজ-কারবার মানালো তোমায়?"
নূপুরের কাঁদোকাঁদো চেহারাটা উজ্জ্বল হলো একটু। সুযোগ পেতেই খোঁচা মারতে ছাড়লো না। আফতাবের সাথে তাল মিলিয়ে বলল,
-"আপনার ছেলে আসলেই একটা ষাঁড়।"
অয়ন চোখ রাঙালো। রাশিদা বললেন,
-"তুমি চিন্তা করো না, ওকে পরে কথা শুনানো যাবে। আপাতত আসল কাজটা সমাধান করি৷ গ্রামের অবস্থা তুমি জানোই নূপুর। এক কান, দু কান হতে হতে পুরো গ্রামে একটা কথা ছড়িয়ে পড়লে দুই পরিবারেরই মান-সম্মানে টান পড়বে। আমি চাই না এমন কিছু হোক।"
আফতাব বললেন,
-"হ্যাঁ। অয়নও সবে সবে চেয়ারম্যান হয়েছে। একটা কেলেঙ্কারি রটে গেলে সমস্যা। তোমার মা-বাবাও নিশ্চিত আমাদের সাথে একমত হবে। আর তোমরা যেহেতু একে-অপরকে পছন্দ করো, তো আমাদের আর কি সমস্যা থাকবে? আমরা বিয়ের জন্য রাজি।"
অয়নের পাশে পছন্দ বা প্রেম শব্দটা বিকট লাগলো নূপুরের কাছে। বিতৃষ্ণায় মুখখানা বিকৃত করে বলল,
-"ওকে পছন্দ করবো? আর আমি?"
কপাল ভালো, আস্তে করে বলায় কেউ শুনে নি। আফতাব ও রাশিদা অধৈর্য হয়ে পড়ছেন ছেলের বিয়ে দেয়ার জন্য। ছেলেকে এতদিনেও বিয়ের জন্য রাজি করাতে পারেন নি। আজ সুযোগ পেয়েছেন, সেটা কি হাতছাড়া করবেন? আবার মেয়েও গ্রামের বিশিষ্ট গণ্যমান্য পরিবারের। সব মিলিয়ে তারা প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন, বিয়েটা এবার দিয়েই ছাড়বেন।
ছেলে-মেয়ে দুটোরই শহরে জানাশোনা আছে। পরিবারের সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলে পালানোর সুযোগ খুঁজতে পারে। এই ভুল তারা করবেন না। যত দ্রুত সম্ভব, তত দ্রুতই কাজ সারবেন।
মাঝরাত্রিতে ঘরের ছেলেকে একটা মেয়ের সাথে দেখলে মা-বাবার রেগে যাওয়ার কথা। এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখে নূপুর ভাবনায় পড়ে গেছে। রাশিদা ও আফতাব এত স্বাভাবিক কি করে? এমনভাবে আয়োজন শুরু করেছেন, যেন বিয়েটা উনারা নিজ থেকেই দিচ্ছেন।
রাশিদা মিন্টুকে বললেন ছুটে গিয়ে নূপুরের মা-বাবাকে ডেকে আনতে। মিন্টুও হুকুম তামিল করলো। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেলো। এর ফাঁকেই অয়ন পাঁচ মিনিটের জন্য বাইরে গিয়ে আবার ফিরে এলো। রাশিদা ও আফতাব ততক্ষণে ব্যস্ত অতিথি আপ্যায়ণের আয়োজনে।
নূপুর চূড়ান্ত বিরক্তি, ক্ষোভ, হতাশা ও দ্বিধাদ্বন্দ নিয়ে দাঁড়িয়ে উঠোনের মাঝে। বাতাসে তার বোরকার নড়ন-চড়ন বোঝা যাচ্ছে। অয়ন ফিরে এসে দাঁড়ালো ঠিক তার পাশেই। নূপুরের উচ্চতা অয়নের ঠিক কাঁধ বরাবর। অয়নের দিক তাকাতে তাকে মাথা উঠাতে হবে।
অয়ন গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে নূপুরের মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করলো। নূপুরে ঘুরে তাকাতেই বলল,
-"আমার বউ হওয়ার অনুভূতি বলো এইবার।"
নূপুরের গা-পিত্তি জ্বলে গেলো যেন। দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
-"অনুভূতি পুকুরে ডুবে ম*রে গেছে। এখন আমারও গিয়ে ডুব দেয়া উচিত।"
অয়ন নির্বিকার ভাব দেখিয়ে বলল,
-"কোনো লাভ নেই। বিয়েটা তোমাকে করতেই হবে।"
-'করবো না আমি। মা-বাবা আসলেই ওদেরকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাসায় চলে যাবো। কি করে ফেলবেন আপনি?"
অয়ন মুচকি হাসি দিয়ে বলল,
-"তুমি যেই ছুরিটা দিয়ে আমায় মারতে এসেছিলে, ওটা আমি উঠিয়ে রেখেছি। খুব সাবধানে রেখেছি, তোমার ফিঙ্গারপ্রিন্টটা এখনো আছে বোধহয়। বেশি কিছু নয়। ব্যস, ওই ছুরিটা পুলিশের হাতে যাবে। আমি একটা অভিযোগ লেখাবো। আমার ক্ষমতা তো তুমি জানোই! দ্রুত প্রমাণও হয়ে যাবে। তারপর এটেম্পট টু মা*র্ডারের কেসে তুমি ভেতরে।
এবার বলো, আমাকে স্বামী বানাচ্ছো নাকি আসামী হতে চাইছো?"
অয়নের আচরণে নূপুর স্তম্ভিত। চোখের পলক ফেলতেও ভুলে গেলো। হতবিহ্বলতায় হাবুডুবু খেয়ে বলল,
-"আপনি আমাকে হুমকি দিচ্ছেন?"
-"উহু। সত্যিটা বলছি। মা*রতেই তো এসেছিলে আমায়। ভেবেছিলে কি, এভাবে কেস খেয়ে যাবে?"
-"দেখুন, আমি আপনাকে বিয়ে করতে পারবো না।"
-"কারণ কি?"
-"আমার আপনাকে পছন্দ নয়।"
অয়ন ঠোঁট উল্টালো। বলল,
-"ওহহ! আচ্ছা, তাহলে কি করার? আমি পুলিশকে ফোন করি।"
নূপুর আঁতকে উঠে বলল,
-"না। আপনি চেয়ারম্যান হয়েছেন বলে যার-তার উপর জোর করতে পারেন না।"
-"তোমার উপর জোর করতে পারি। আমার ভবিষ্যৎ বউ বলে কথা!"
নূপুর তেজ দেখিয়ে বলল,
-"চেয়ারম্যান সাহেব, এবার কিন্তু বেশি বেশি হচ্ছে! শুনেছিলেন, আপনার বাবা পর্যন্ত বলেছে আপনি একটা ষাঁড়। ষাঁড়ের সাথে কে সংসার করবে? বিয়েও করতে চাইছেন হুমকি-ধামকি দিয়ে। বলি রস-কষ আছে আপনার মধ্যে?"
অয়নের মনে হলো, নূপুর তাকে পরোক্ষভাবে আনরোমান্টিক বলতে চাইছে। হয়তো বিয়ের আগে একবার প্রপোজও করে নি বলেই। ব্যাপারটা হজম হলো না অয়নের। অধৈর্য হয়ে বলল,
-"এত নাটক বাদ দাও নূপুর। সরাসরি বিয়ের প্রপোজাল দিচ্ছি তোমায়,
আমাকে নিজের স্বামী বানাও, নয়তো আ*সামী হয়ে নিজে জে*লে যাও। দুটো অপশন তোমার সামনে। যেকোনো একটা বেছে নাও।"
নূপুর হতবাক হলো। পরপর কটমট করে বলল,
-"এটা প্রপোজ ছিলো?"
অয়ন শান্তভাবে বলল,
-"হু।"
নূপুর দু'হাত কোমড়ে রেখে বলল,
-"এমন প্রপোজ করলে মেয়েমানুষ দূর, কোনো জীব-জন্তুও আপনাকে বিয়ে করবে না।"
-"মেয়ে মানুষও লাগবে না, জীবজন্তুও লাগবে না। তুমি তো আমার বউ হচ্ছোই।"
নূপুর প্রতিবাদ করতে গিয়েও হতাশ হলো। এই লোকের উপর যতই ক্ষেপছে ততই অয়ন শান্ত মাথায় খেল খেলছে। কিরকম ঠান্ডা মাথায় বাঁশ দিয়ে বসলো তাকে। কোনো কথা না খুঁজে পেয়ে বলল,
-"কানের সামনে বউ বউ করা বন্ধ করুন। এখনো বউ হইনি আমি।"
-"হয়ে যাবে দ্রুতই।"
-উফফ!"
বলেই নূপুর বিরক্ত হয়ে সরে পড়লো অয়নের সামনে থেকে। মাইনকার চিপায় পড়া কাকে বলে, সেটা নূপুরকে দেখে বুঝা উচিত। এই মুহুর্তে অয়নকে বিয়ে করা ছাড়া আর কোনো পথ বাকি নেই নূপুরের সামনে।
********
মিন্টু সত্যি সত্যি ছুটে গিয়ে হাজির হলো নূপুরের বাড়ির দোরগোড়ায়। হাঁপাতে হাঁপাতে দরজায় ঠকঠক করলো। কয়েকবার শব্দ হওয়ার পর এলেন রেহানা। ভেতর থেকেই জিজ্ঞেস করে দরজা খুললেন তিনি। হাই তুলতে তুলতে বললেন,
-"এত রাতে তুমি এখানে?"
-"অয়ন ভাইয়ের বাসায় চলুন। জরুরি দরকার আছে।"
ঘুম ছুটে গেলো ভদ্রমহিলার। চিন্তিত হয়ে বললেন,
-"কি হয়েছে? জরুরি তলব হঠাৎ?"
মিন্টু জবাবে বলল,
-"আপনি আর আঙ্কেল জলদি চলেন ওই বাসায়। ওখানে গিয়েই জানতে পারবেন।"
রেহানা আর এক মুহুর্তও ব্যয় করলেন না। দ্রুত ভেতরে গিয়ে স্বামীকে ডেকে নিলেন। খুঁজতে গিয়ে দেখেন, নূপুর বাড়িতে নেই। তাতেই যা বুঝার বুঝে গেলেন। মনে কু ডাকলো তার। স্বামী-স্ত্রী মিলে যত জলদি সম্ভব গেলেন অয়নদের বাড়িতে।
তাদের সন্দেহ সঠিক প্রমাণিত হলো। নূপুরের অয়নদের বাড়ির বারান্দার জলচৌকিতে বসে বসে পা দুলাচ্ছে। মা-বাবাকে দেখে থামলো সেটা। তবে মাথা তুললো না। সেই সাহস বা মুখ, কোনোটাই নেই তার।
নূপুরকে বা অয়নকে কিছুই বলতে হলো না। যা বলার বললেন আফতাব ও রাশিদা। সবটা শুনে নেওয়াজ ও রেহানা বিস্মিত, হতভম্ব। শূণ্য দৃষ্টিতে তাকালেন মেয়ের দিকে। কি থেকে কি হলো! রেহানা রোষে চেঁচিয়ে বললেন,
-"রাতারাতি এত বড় কাহিনি হয়ে গেলো! সকালে পুরো গ্রামে রটনা হলে মান-সম্মান আর থাকবে না। নাহ, এ হতে দেয়া যায় না। দ্রুত আয়োজন করা হোক ওদের বিয়ের। কালকেই বিয়ে পড়াবো অয়ন আর নূপুরের।"
নূপুর এবার আর অবাক হলো না। কারণ জানতোই মা-বাবা জানলে ঠিক এটাই হবে। নেওয়াজ তাও সাফাই দিতে চাইলেন মেয়ের পক্ষে। বললেন,
-"আরে বাবা, দু'জনেই রাজনীতিতে আছে। ওই সম্পর্কীয় কথাও তো হতে পারে। আগে নূপুরকে জিজ্ঞেস করো, মতামত নাও।"
রেহানা প্রায় গর্জে উঠে বলল,
-"চুপ করো তুমি। মেয়ের পক্ষে আর সাফাই দিও। রাজনীতির কাজ এই মাঝরাতে থাকবে নাকি? আর কিছু জিজ্ঞেস করার দরকার নেই। কালই বিয়ে হবে ওদের।"
নূপুর ও অয়নের আড়ালে কি কি যেন আলোচনা হলো দুই পরিবারের মধ্যে। সর্বশেষে রেহানা শুধু বললেন,
-"বিয়ের আয়োজন পাকাপাকি করো শুধু। ওরা মা*রামা*রি করতে গিয়ে ধরা খেলেই বা আমাদের কি? আমরা তো আর জানি না! যা ওদের বুঝিয়েছি ওটাই।
অয়ন-নূপুরকে বুঝতে দেয়ার দরকার নেই। দু'জনের বিয়েটা হলেই হলো। দশ বছর আগের পরিকল্পনা দশবছর পরই না হয় সফল হোক!"
নূপুর বাইরের জলচৌকিতে বসে। অয়ন এসে বসলো তার পাশে। সাথে সাথে নূপুর সরে গেলো একটু। বলল,
-"আল্লাহ জানে, ওরা আমাদের ব্যাপারে কি ভাবছে। যা হলো, তা একদমই ঠিক হলো না।"
অয়ন খুব ভালো মানুষের মতো স্বান্ত্বনা দিয়ে বলল,
-"থাক। যা হওয়ার তা তো হবেই। মেনে নাও বিয়েটা।"
নূপুর ভ্রু কুঁচকে চাইলো। ক্ষিপ্ত কন্ঠে বলল,
-"আমি আপনাকে বিয়ে করবো না। আপনি মিথ্যে কেন বললেন, আমরা প্রেম করছি? এই মিথ্যের জন্যই এতকিছু হলো। মিথ্যাবাদী একটা! এই বিয়ে আমি করবো না!"
অয়ন নূপুরের মতো করেই জবাব দিলো,
-"চুপচাপ বসে থাকো, নূপুর। বিয়েটা তোমাকে করতেই হবে। যদি বেশি ত্যাড়ামি করেছো তো কাল উত্তর পাড়ার মতিন কাকুকে তুলে এনে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবো তোমার।"