প্রত্যেক দলেরই গোটা দিনটা কাটলো ব্যস্ততায়। নির্বাচন, মিটিং-মিছিল আরও কত কি। বিকেল চারটা বাজতেই সমাপ্ত হলো উচ্ছলতা। পরপরই আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা শুরু হলো ফলাফলের। প্রত্যেক ভোটকেন্দ্র থেকে একে একে ফলাফল প্রকাশ হচ্ছে। এখন অব্দি এগিয়ে আছে অয়ন। আর সময়ে সময়ে হৃৎপিণ্ডের ঢিপঢিপ বাড়ছে নূপুরের।
একটা ভোট কেন্দ্রে ফলাফল আসে, সর্বাধিক ভোটপ্রাপ্ত অয়ন। আরেকটা কেন্দ্র থেকে ফলাফল আসে, সর্বাধির ভোটপ্রাপ্ত নূপুর। মাঝে কিছু ভোটকেন্দ্রে অন্যদের জয়েরও খবর এসেছে। কিন্তু চূড়ান্তভাবে এখনও কিছুই জানা যায় নি। এই ফলাফল আসতে সময় লাগবে।
সবাইকে কৌতূহলের চূড়ায় নিয়ে সর্বশেষ ফলাফল বের হলো রাত্রি সাড়ে দশটায়। তৎক্ষনাৎ মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়লো সেই খবর। চেয়ারম্যান পদে নির্বাচিত হয়েছে অয়ন। নূপুর হেরেছে মাত্র অল্প কয়েকটি ভোটের ব্যবধানে। বাকিদের সাথে ফাড়াক দূর-দূরান্তে।
দশটা বাজলেই গ্রাম হিসেবে অনেক রাত হয়ে যায়। কিন্তু সেদিন বোঝাই গেলো না যে এত রাত হয়েছে। সবাই হৈ-চৈ শুরু করেছে। যারা অয়নকে ভোট দিয়েছে বা অয়নের পক্ষে ছিলো, তাদের তো খুশির শেষ নেই। অয়নের বাবা বাক্স ভরে ভরে মিষ্টি এনে গ্রামবাসীর মধ্যে বিলাচ্ছে।
বিপরীত অবস্থা নূপুরের বাড়িতে। নূপুরের বাবা মেয়েকে স্বান্ত্বনা দিচ্ছে। মেয়ের মতো তার মুখটাও গোমড়া হয়ে আছে। রেহানা অবশ্য খুশিই হয়েছেন। হেরে গিয়ে যদি মেয়ের মাথা থেকে চেয়ারম্যান হওয়া ভূত নামে।
মুখে অবশ্য সেটা প্রকাশ করছেন না। মেয়ের দুঃখে শোক প্রকাশ করছেন।
অয়ন খুশি, আবার একটু চিন্তিত। পার্টি অফিসে যখন মিষ্টি নিয়ে লাফালাফি তখনই অয়ন মিন্টুকে বলল,
-"জয়ী হয়েও খুশি কিভাবে হই? আমার বিরোধীদলীয় নেত্রীর মুখটা তো দেখলাম না এখনো!"
মিন্টু স্বান্ত্বনা দিয়ে বলল,
-"দেখবেন ভাই, কালকেই দেখবেন। আমরা সকাল সকাল আনন্দ মিছিল নিয়ে বের হবো। শুভ শুরুয়াত করবো ভাবীর বাসার সামনে দিয়েই!"
অয়ন চোখ পাঁকালো,
-"ভাবী?"
মিন্টু ভ্যাবলার মতো দাঁত কেঁলিয়ে বলল,
-"ইয়ে মানে, ভুল করে সত্য কথা বলে ফেলেছি।"
*********
সকালে বের হবে বলেও ধৈর্য ধরতে পারলো না তারা। সিদ্ধান্ত নিলো নিজের গ্রামে আনন্দটা আজ রাতেই করবে। অন্যান্য গ্রামগুলোতে আনন্দ মিছিল নিয়ে বের হবে আগামীকাল। আজ নিজের গ্রামের মুখচেনা প্রত্যেকটা মানুষের সাথে দেখা করে আসবে।
রাত্রি এগারোটা বাজেই বের হলো তারা। অয়ন, অয়নের কাছের কয়েকজন মানুষ। আর মিন্টু তো তার ডানহাত। সর্বদা অয়নের সাথে সাথেই থাকে। বাসাও পাশাপাশি। বহু আগে থেকেই অয়নকে বড় ভাই বলে বড্ড সম্মান দেয় ছেলেটা।
নূপুরের বাসার কাছাকাছি অয়নের পুরো দলটা যখন এলো, তখন এগারোটা বিশ। নূপুর মন খারাপ করে একদম মূর্তির ন্যায় বসে আছে খাটে। নড়ন-চড়ন নেই বিন্দুমাত্রও। কেবল শক্ত মনের মানুষ বলেই ভ্যা ভ্যা করে কেঁদে ফেলে নি।
হঠাৎ হৈ-চৈ এর শব্দ পেতেই নূপুর বুঝলো অয়নরাই আসছে। এবং তাদের বাড়ির কাছেই আসছে। এহেন কাজটা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করলো। রাগে-ক্ষোভে বিছানায় থাকা তুলতুলে বালিশটা খামচে ধরলো নূপুর।
আশ-পাশের বাড়ির মানুষরাও হৈ-হল্লার শব্দ শুনে বাইরে ভীড় জমিয়েছে। তাল মিলিয়ে নেওয়াজ ও রেহানাও বেরিয়েছে। বাকিদের সাথে কথা-বার্তার ফাঁকে নূপুরদের বাড়ির পেছন দিকটায় হাজির হলো অয়ন ও মিন্টু। যেথায় অবস্থিত নূপুরের রুমের জানালাটা।
নূপুরের বাইরে যেতে হলো না। বিছানায় বসেই শুনতে পেলো মিন্টুর কন্ঠস্বর,
-"বড় ভাই, পুরো গ্রামবাসীর দর্শন হয়ে গেলো। কিন্তু আপনার বিরোধীদলীয় নেত্রী তো দর্শন দিলো না।"
অয়ন বাড়ির প্রাচীর পেরিয়ে ভেতরে তাকালো। উঁচু প্রাচীরের ওপাশে জানালাটা আরেকটু দূরে থাকায় বেচারা ভেতরে দেখার বিন্দুমাত্র সুযোগ পাচ্ছে না। নূপুর যে কেন একটু বাইরে আসলো না, এই ভেবে হতাশ হলো অয়ন। মাটির দিকে তাকিয়ে দু'হাত পেছনে গুজলো। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-"তিনি দর্শন দেবেন না, আমি আর তাতে কি বলতে পারি? জানিস তো-
❝নারী জাতি বড্ড নরম,
আবার এই নারীই বড় বেরহম!❞
আর আমার তো..."
নূপুর ক্ষেপে গিয়ে জানালা বন্ধ করতে এসেছিলো। শেষ কথাটায় হাত থামলো তার। কান পাতলো অয়নের পরবর্তী কথা শোনার উদ্দেশ্য। তাকে অপেক্ষা করাতেই বোধহয় অয়ন আরও কিছুসময় মৌন রইলো। ধৈর্যহারা হলো নূপুর। ঠিক তখনই অয়ন গানের সুর ধরলো,
-"বেইরি পিয়া, বারা বেদারদি..!"
স্বশব্দে জানালা আটকানোর শব্দ এলো প্রাচীরের অভ্যন্তর থেকে। অয়ন চোখ বুজলো। বলল,
-"বাপ্রে! জানালাটা ভেঙেই ফেললো বোধহয়।"
মিন্টু ফাজিলমার্কা হেসে বলল,
-"ভাই, বিরোধীদলীয় নেত্রীর চক্করে আপনি নির্ঘাত দেবদাসই হবেন।"
-"সময় বলবে।"
জানালার কাছটা থেকে সরে গেলো দু'জনে। সামনের দিকটায় এসে কথা বলল সকলের সাথে। গ্রামবাসী মহাখুশি। তাদের চোখের সামনে বড় হওয়া, তাদেরই গ্রামের ছেলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হয়েছে। এতে খুশিটা ভাগাভাগি করে নিয়েছে সবাই।
অয়ন দলবল নিয়ে বিদায় নেয়ার পর নেওয়াজ ও রেহানা ঘরে ফিরলেন। নূপুর দু'জনকে দেখামাত্রই কটমটিয়ে বলল,
-"চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হলো তোমাদের?"
থতমত খেয়ে গেলেন স্বামী-স্ত্রী। নেওয়াজ সাহেব এগিয়ে এলেন মেয়েকে বুঝাতে। বললেন,
-"দেখ মা, তুই নিজের পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ চেষ্টা করেছিস। কিন্তু ভাগ্য বলেও তো একটা কথা আছে, তাই না? আল্লাহ যেটা নির্ধারণ করেছে, তুই সেটা বদলাতে পারবি? পারবি না। আল্লাহর লেখা মানতে হবে রে, মা। আল্লাহ অয়নের প্রতি সহায় ছিলেন, তাই অয়ন জিতেছে। তাই বলে আমরা মুখ কালো করে রাখবো? উহু। যা হয়েছে তা মেনে নিবো, এবং আবার পরবর্তীতে চেষ্টা করবো। যা হয়েছে মেনে নে। ভবিষ্যতে আবার নির্বাচন হবে তো নাকি? তখন আবারও চেষ্টা করিস, আমি তোর পক্ষে থাকবো।"
রেহানা শঙ্কিত হয়ে বললেন,
-"আবার নির্বাচন? সে তো পাঁচ বছর পরে? অতদিন অপেক্ষা? আমি আরও ভাবছিলাম এবার মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে দিবো।"
নূপুর বিরক্ত হয়ে বলল,
-"বিয়ে-শাদির কথা বলো না, মা। আমি আরও ভাবছি পার্টি থেকে পদত্যাগ করে শহরে ফিরে যাবো।"
-"তুই কি বিয়ে করবি না, নূপুর?"
নূপুর মায়ের প্রশ্নের জবাবে সরাসরি জানালো,
-"না।"
নেওয়াজ চোখের ইশারায় বউকে থামতে বললেন। মেয়েকে বললেন,
-'আচ্ছা মা, তুই ঘুমা একটু। সারাদিন অনেক ছুটোছুটি গিয়েছে। একটু আরাম দরকার এখন।"
-"আচ্ছা। তুমি আমায় কাল বাসের টিকিট করে দিও। আমি ঢাকায় যাবো।"
নেওয়াজ মেয়ের কথা মেনে নিলেন। নূপুরকে ঘুমাতে বলে স্বামী-স্ত্রী দু'জনেই তার ঘর থেকে বের হলেন। নিজেদের ঘরে ঢুকে দরজাখানা আটকে মত্ত হলেন আলাপে।
-"তুমি মেয়েকে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিলে? এভাবে আর কতদিন নিজের ইচ্ছেতে চলবে, শুনি? আর কত আশকারা দিবে ওকে?"
-"আহা, চেতছো কেন? আমি শুধু হ্যাঁ করেছি। পাঠিয়ে দিয়েছি নাকি?"
-"একই তো হলো। সেই তো মেয়ে যাবেই ঢাকায়।"
-"আমি টিকেট কাটলে তো যাবে? টিকেট নেই এসব অমুক-তমুক বলে ওকে আটকে রাখবো। মাঝ দিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে এবার জোর করেই বিয়ে দিবো। আমরা আর কতদিনই বা দুনিয়ায় আছি বলো? মেয়েকে কার ভরসায় রেখে যাবো?"
রেহানা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল,
-"যাক। এতদিনে তোমার সুবুদ্ধি হলো তবে!"
-"হয়েছে। এবার ঘুমাও তো।"
রাত্রি তখন বারোটা পেরিয়ে গেছে। গ্রামের পরিবেশ ঝিমিয়ে এসেছে অনেকটা। বাতাসে খানিক বাদে বাদে গাছপালার নড়া-চড়ার শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। সাথে একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
নূপুরের ঘুম এলো না। চোখ বুজলেই অয়নের কথাগুলো কানে বাজতে শুরু করলো। সে শতভাগ নিশ্চিত অয়ন তাকে বিদ্রুপ করেই কথাগুলো বলেছে। এবং আজকের পর থেকে দেখা হলেই এই আচরণ ফেরত পাবে। ভেবেই তার মস্তিষ্কের রক্ত টগবগ করে ফুটতে শুরু করলো।
নূপুর বরাবরই জেদী মেয়ে। মাথা গরম থাকলে ভুলভাল সিদ্ধান্ত নিতেও পিছপা হয় না। অয়ন তাকে পরোক্ষভাবে অপমান করেছে ভাবতেই মনের কোণে একটা চিন্তা উঁকিঝুঁকি দিলো। এই নির্বাচনের প্রচারণা শুরুর পর থেকেই অয়নের ইনিয়েবিনিয়ে খোঁচা শুনেছে সে। নূপুর তৈরি হয়ে ছিলো নির্বাচনের পর এর একটা মুখভাঙা জবাব সে অয়নকে দেবে। কিন্তু ভাগ্য তার সহায় হলো না। কিন্তু জবাব তো তাকে দিতেই হবে!
নূপুর শোয়া থেকে উঠে বসে ভাবতে লাগলো,
-"আচ্ছা ওর জ্বিভটা কেটে ফেললে কেমন হয়? খোঁচা মারার অবস্থাই থাকবে না তার।"
সবশেষে নূপুর সিদ্ধান্ত নিলো, সে অয়নের সামনে যাবে। পরিচয় লুকিয়ে তার সামনে হাজির হবে। এরপর ছু*রি ধরে একটু ভয় দেখিয়ে চলে আসবে। চেয়ারম্যানদের অনেক শত্রু থাকতেই পারে। অয়ন ম*রে গেলেও কেউ নিশ্চয়ই তাকে সন্দেহ করবে না! আর এমনিতেও সে কয়েকদিনেই ঢাকায় পারি জমাবে। তার খোঁজ নেয়ার সুযোগ।
ভয়ংকর এক পরিকল্পনা মস্তিষ্কে সাজিয়ে বিছানা ছাড়লো নূপুর। আলতা থেকে বের করলো নিজের কালো বোরকাটা। ঢোলা বোরকা, ওড়না দিয়ে সাধারণভাবে হিজাব বাঁধবে, আর নেকাব তো অবশ্যই লাগাবে। মুখদর্শন কোনোভাবেই হবে না।
পরিপূর্ণভাবে তৈরি হতেই নূপুরের স্রেফ চোখটা ব্যতীত আর কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। ছোট আয়নাটায় নিজের এই রূপ দেখে বেজায় খুশি নূপুর। কারণ তাকে একটুও চেনা যাচ্ছে না। অয়ন নির্ঘাত তাকে চিনতে পারবে না।
খুশি খুশি মনে ছুরি নিয়ে বের হলো নূপুর। ততক্ষণে অধিকাংশ বাড়ির বাতি বন্ধ হয়ে গেছে। হাতে গোণা কয়েকটা বাড়িতে আলো জ্বলছে। আবার কিছু বাড়িতে মানুষজন ভেতরে ঘুমালেও উঠোনের বাতিটা জ্বলছে। তার উপর চাঁদের জ্যোৎস্না সরাসরি পড়ছে মেঠোপথটায়। পথ চলতে অসুবিধা হচ্ছে না নূপুরের।
সূর্যনগর গ্রামটা বেশ ছোটই। অত রাতে অয়নের বাড়িতে যেতে বেশি সময় লাগলো না নূপুরের। অয়নদের বাড়ির প্রাচীরের বাইরে একটা অন্ধকার জায়গা বেছে অপেক্ষা করতে লাগলো নূপুর।
অয়নদের বাড়িতে যে মানুষজন জেগে রয়েছে, তা শব্দ শুনেই বোঝা যাচ্ছে। অয়নদের পাশাপাশি যে মিন্টুদের বাড়ি, সেখানকার সকলেও তখনো জেগে। অধিক আনন্দে বোধহয় ঘুম নেই কারো চোখে।
মিন্টু তখন নিজেদের বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, অয়নদের বাড়িতে ঢুকবে। এমনসময় ডাকলো নূপুর। কন্ঠস্বর যথাসম্ভব পরিবর্তন করলো। মিন্টু একবিন্দুও সন্দেহ করলো না। এক হাত দূরত্ব বজায় রেখে শুধালো,
-"জি বলুন।"
নূপুর বেশ চিকন স্বরে বলল,
-"আমার চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে কিছু দরকার ছিলো। বড় বিপদে পড়ে এসেছি। একটু ডেকে দেবেন উনাকে?"
মিন্টু খানিক বিস্মিত হলো। চেয়ারম্যান হতে না হতেই অয়নের বাড়িতে বিপদগ্রস্তা হাজির? ব্যাপারটায় একটু ঘটকা লাগলো। তবুও বলল,
-"আপনি বাড়ির ভেতরে যেতে পারেন।"
নূপুর ত্রস্থ মাথা নেড়ে বলল,
-"না না। ভেতরে যাবো না। শুধু একটু চেয়ারম্যান সাহেবের সাথে কথা বলবো। আমার বড় বিপদ। মানা করবেন না দয়া করে!"
তার কান্নাভেজা, কাতর, অসহায় কন্ঠস্বরে একটু হলেও গললো মিন্টু৷ নিজে গিয়ে অয়নকে বলল,
-"ভাই, আপনার সাথে একজন দেখা করতে এসেছে। এত রাতে..আমি ঘটনা কিছু বুঝলাম না!"
অয়ন গা ঝাড়া দিয়ে উঠলো। বলল,
-"সমস্যা নেই। গিয়ে দেখা করছি।"
-"ভাই, সাবধান। এসব ব্যাপার কিন্তু সুবিধার না! আমার তো চিন্তা হচ্ছে।"
-"চিন্তা করিস না৷ আমি সামলে নিবো।"
মিন্টু রইলো বাড়ির ভেতরে। অয়ন একাই বের হলো বাসা থেকে। মিটিমিটি একটা হাসি ঠিক লেগে রয়েছে তার ঠোঁটের আগায়। যেন আগে থেকেই জানতো এমন কিছু হবে। খুব আড়ম্বরপূর্ণভাবে হাজির হলো নূপুরের সামনে।
-"আপনি শুনলাম আমার সাথে দেখা করতে এসেছেন৷ কি দরকার?"
নূপুর ঘুরে চাইল। অন্ধকারে মুখোমুখি হলো দু'জন। চেনা মুখটা অয়নের দর্শন করা হলো না। শুধুমাত্র নূপুরের চোখ। কাজলটানা চোখদুটোই স্রেফ দৃষ্টিগোচর হলো তার।
নূপুর প্রথমে অভিনয় শুরু করলো। কাঁদোকাঁদো স্বরে বলল,
-"চেয়ারম্যান সাহেব বড় বিপদে পড়ে এসেছি। একটু সাহায্য করুন আমায়।"
অয়ন বরাবরের ন্যায় দু'হাত পেছনে গুজে বলল,
-"আদেশ করুন। জান দিয়ে হলেও সাহায্য করবো।"
ঝট করে পরিবর্তিত হলো নূপুরের চোখের ভাষা। কাছাকাছি এসে সরাসরি তাকালো অয়নের চোখের দিকে। পেছন থেকে বের করলো ছু*রি ধরা হাতটা। পরপর চেপে ধরলো অয়নের কন্ঠনালী বরাবর। নিষ্ঠুরের ন্যায় বলল,
-"তাহলে দিন নিজের জান।"
অয়ন ঘাবড়ালো না। উলটো হাসলো। নির্ভীক স্বরে বলল,
-"খু*ন করবেন, বিরোধীদলীয় নেত্রী? তবে
যে নারী কেবলমাত্র চোখ দিয়ে মানুষ খুন করার ক্ষমতা রাখে, তার ছুরি আনার কি প্রয়োজন?"
নূপুর চমকালো। একবারের জন্য কেঁপে উঠলো হাতখানা। অতঃপর নিজেকে সামলে নিয়ে শুধালো,
-"কিভাবে চিনলেন আমায়?"
অয়ন অবলীলায় বলল,
-"আপনার চোখ দুটোই যথেষ্ট নিজের পরিচয় দেয়ার জন্য। যে চোখের নজরে নিজেকে হাজারবার ক্ষত-বিক্ষত করতে রাজি।"
নূপুরের হাত তখনও শিথিল হয় নি। ক্ষণে ক্ষণে চেপেই বসছে অয়নের কন্ঠনালীতে। অয়নের কথার বিপরীতে বলল,
-"বড় কবি কবি ভাব দেখাচ্ছেন আজ-কাল! চেয়ারম্যান হওয়ার সাথে সাথে কবি হওয়ার স্বপ্নও দেখছেন বুঝি?"
-"নির্দিষ্ট একজনের জন্য মানুষ কবি, প্রেমিক, দেবদাস অনেককিছুই হতে পারে। এসব বোঝা আপনার কাজ নয়, বিরোধীদলীয় নেত্রী।"