বৈরীতা ও অনুরক্তি

পর্ব - ২

🟢

গ্রামের নাম সূর্যনগর। তৎকালীন প্রেক্ষাপটে বলতে গেলে অজপাড়াগাঁ। গ্রামে সিমেন্ট ও ইটের ঘর হাতে গোনা কয়েকটা। এটাই তাদের স্বচ্ছলতার প্রতীক। এছাড়া বেশিরভাগ মাটির ও টিনের ঘর। বাইরে উঠোন। অধিকাংশ কাজ সারা হয় গ্রামের পুকুরে৷

বাচ্চাদের স্কুলও মাত্র একটা। তাও দশম শ্রেণী পর্যন্ত। কারো উচ্চশিক্ষার ইচ্ছে থাকলে শহরে যেতে হয়। যেমন গিয়েছে নূপুর ও অয়ন।

অয়নদের বাড়িটা বেশ বড়। ভেতরে চারটা রুম। বাইরে বিশাল উঠোন। অয়নের মা রাশিদার শখের অনেকগুলো গাছ সেথায়। একপাশে একটা বড় জলচৌকি রাখা। সন্ধ্যা নাগাদ সেখানে বসেই গভীর ভাবনায় মগ্ন অয়ন।

রাশিদা সবে রান্না শেষ করে বেরিয়েছেন। অয়নকে বসা দেখে বললেন,

-"কি এত ভাবছিস বসে বসে?"

-"ভাবছি, চেয়ারম্যান হলে কিভাবে সব সামলাবো?"

রাশিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

-"শোন বাবা, তুই যাই কর। আগে বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করিস। সারাদিন যেমন-তেমন, সন্ধ্যাটা নামলেই আরও বেশি জ্বালায়। এজন্য রান্নাটাও বিকেল বিকেল শেষ করতে হয়।"

অয়ন ভাবুক হয়ে বলল,

-"দেখছি ব্যাপারটা। আমি সবার আগে কারেন্টের সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করবো। তবে এটা একটু কঠিনই হবে, মা।"

খ্যাঁক করে উঠলেন ভদ্রমহিলা,

-"সমস্যা সমাধান করা কঠিন হলে চেয়ারম্যান হচ্ছিস কেন? শুধু বড়বড় ডায়লগ দিতে?"

-"আহহা! রেগে যাচ্ছো কেন?"

তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বললেন,

-"বিয়ে করে একটা বউমা এনে দে আমায়। তাহলে আর তোকে কিছু বলবো না।"

অয়ন বিরক্ত হয়ে বলল,

-"আবার বিয়ের কথায় যাচ্ছো কেন?"

-"তো যাবো না? নিজের বয়সটা দেখেছিস? চল্লিশে গিয়ে বিয়ে করবি নাকি? নাকি আমি ম*রার পর করবি? নাতি-নাতনীর মুখ দেখে মরার সৌভাগ্য আমার আর হবে না বোধহয়!"

-"এসব বাদ দাও তো মা। নির্বাচনটা শেষ হোক। পরে ভাববো বিয়ে-শাদি নিয়ে।"

রাশিদা আবেগাপ্লুত হয়ে বললেন,

-"সত্যি? নির্বাচন শেষে বিয়ে করবি তুই?"

-"আগে নির্বাচন শেষ হোক। পরে জানাচ্ছি।"

*********

সেদিন সন্ধ্যাটা নামতেই প্রতিদিনকার ন্যায় বিদ্যুৎ চলে গেলো। পুরো গ্রামজুড়ে নেমে এলো অন্ধকার। হারিকেন ও মোমের টিমটিমে আলো জ্বলছে প্রত্যেকটা বাড়িতে। সকলে নেমে এসেছে উঠোনে আড্ডা জমাতে। চায়ের দোকানেও দেখা গেলো ভীড়।

নূপুর বাড়ি এসে শাড়ি বদলেছে। এখন পড়েছে একটা থ্রি-পিস। বিদ্যুৎ যেতেই মহাবিরক্ত হলো সে। হারিকেনটা জ্বালিয়ে নিয়ে এলো উঠোনে। খোলা হাওয়ায় বসতেই ভাবলো, একটু গ্রামের পথ ধরে হেঁটে আসা উচিত।

অতঃপর ওড়নাটা গায়ে জড়িয়ে বের হলো বাসা থেকে। রেহানা আরও দু'জন মহিলার সাথে আলাপে ব্যস্ত। তাই নূপুরকে ডেকে কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। নূপুর গেলো তার ছোটবেলার বান্ধবী লিপির বাসায়।

সেখানে উপস্থিত হতেই দেখলো লিপিও তৈরী হচ্ছে বের হওয়ার জন্য। তার আট বছরের মেয়ের মাথায় ঝুটি করে দিচ্ছে। নূপুর গিয়ে তাকে বলল,

-"লিপি, চল একটু গ্রামের রাস্তা ধরে ঘুরে আসি।"

-"হ্যাঁ, যাবো। মা তো মনে হয় তোদের বাসায়। নিশিতা কে উনার কাছে রেখে যাই।"

-"আচ্ছা চল।"

নিশিতাকে তার দাদির কাছে রেখে লিপি আর নূপুর বের হলো বাইরে। গ্রামের মেঠোপথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে অনেক গল্প করলো দুই বান্ধবী। শেষমেশ পুকুরঘাটে এসে বসলো। এখানটায় বাতাস একটু বেশিই।

দুর্ভাগ্য কিংবা সৌভাগ্যবশত অয়নও কিছুক্ষণ পরে নিজের সাগরেদ মিন্টুকে নিয়ে বেরিয়েছে। বিদ্যুতের সমস্যাটা নিয়ে গ্রামবাসীর কতটুক অভিযোগ সেটাই অবলোকন করছে। এবং সবশেষে তারাও এসে থামলো পুকুরঘাটের কাছে।

রাত্রিবেলা সাধারণত এখানে কেউ থাকে না। তন্মধ্যে অন্ধকারে দুটো নারীর ছায়া স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। মিন্টু ঘাবড়ে গিয়ে চিৎকার ছুড়লো,

-"হায় আল্লাহ! পুকুরপাড়ে ভূত!"

লিপি ও নূপুর ঘুরে তাকালো। অয়নকে দেখামাত্র মেজাজ সপ্তমে চড়ে বসলো তার। উত্তর দিতে যাবে তার আগেই অয়ন বলল,

-"মিন্টু, দেখছিস না উনি মেয়ে? মেয়েরা কি ভূত হয়? পেত্নী হয় পেত্নী!"

লিপি মুচকি হেসে নূপুরকে বলল,

-"নূপুর, তোকে বলল বোধহয়!"

নূপুর রেগে-মেগে এগিয়ে এলো অয়নের দিকে। প্রতিবাদের জন্য মুখ খুলতেই অয়ন অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

-"আরেহ! এ তো পেত্নী নয়। আমার বিরোধীদলীয় নেত্রী!"

নূপুর গর্জে উঠলো,

-"নিজেকে আয়নায় দেখেছেন, আপনি? তাহলে অন্তত আমাকে পেত্নী না বলে নিজেকে ভূত বলতেন।"

মিন্টু মিনমিনিয়ে বলল,

-"দেশে মানুষের অভাব পড়েছিলো। তাই এখন ভূত-পেত্নীও নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে।"

নূপুর ও অয়ন দু'জনেই মিন্টুর দিকে এমনভাবে তাকালো যেন এক্ষুনি চোখ দিয়ে ভস্ম করে দিবে। ঘাবড়ে গেলো ছেলেটা। জ্বিভে কামড় দিয়ে বলল,

-"সরি, বড় ভাই। আমি কিছু বলিনি৷"

অয়ন নূপুরের দিকে তাকালো। গলা খ্যাঁকাড়ি দিয়ে বলল,

-"তা নেত্রী ম্যাডাম, এত রাতে পুকুরপাড়ে কি করছেন? কাউকে ডুবানোর প্ল্যান?"

নূপুর ভণিতাহীন বলল,

-"হ্যাঁ, আপনাকে ডুবানোর প্ল্যান করছি। কাছে আসুন।"

অয়ন জেনে-বুঝে বলল,

-"কার কাছে? আপনার?"

থতমত খেয়ে গেলো নূপুর। লিপি আর মিন্টু কাশতে শুরু করেছে। মিন্টু আমতা-আমতা করব বলল,

-"বড় ভাই, আমি যাই। আপনে কথা শেষ করে আসেন।"

মিন্টু যেতেই নূপুর ক্ষেপে গিয়ে বলল,

-"আপনি একটা চূড়ান্ত বে*য়াদব লোক। বুড়ো বয়সে চেয়ারম্যান হচ্ছেন, তাও ভদ্রতা অর্জন করতে পারলেন না। আপনাকে পুকুরেই চুবানো উচিত।"

-"সব মেনে নিবো। কিন্তু বয়স নিয়ে কথা নয়। নাহলে পানিতে চুবাতে আমিও পারি, নেত্রী ম্যাডাম।"

তাদের তর্ক চলতে চলতেই বিদ্যুৎ চলে আসলো। হৈ-চৈ শোনা গেলো আশেপাশের বাড়ি থেকে। অয়ন আদেশ করার মতো করে বলল,

-"বাড়িতে ফিরে যান। এত রাত করে ঘোরাফেরা করা উচিত নয়। এটা গ্রামাঞ্চল। নিরাপত্তারও একটা ব্যাপার আছে। যাচ্ছি আমি, খোদা হাফেজ।"

একটু অবাক হলো নূপুর। হা করে চেয়ে রইলো শুভ্র পাঞ্জাবি পরিহিত শ্যামপুরুষটির ফিরতি পথপানে। খানিকবাদে মিলিয়ে যেতেই লিপি এসে বলল,

-"নূপুর, চল বাসায় যাই। আমার মেয়েকে পড়তেও বসাতে হবে।"

নূপুরের সৎবিৎ ফিরতেই বলল,

-"হ্যাঁ, চল যাই।"

ভ্রমে ডুবে থাকা নূপুর বাড়ি এলো খানিক বাদে। নিশিতা ও তার দাদি ইতিমধ্যেই চলে গেছে নিজেদের বাড়িতে।

মেয়েকে সামনে দেখেই নেওয়াজ সিকদার খুব উৎফুল্ল হয়ে বললেন,

-"কোথায় ছিলি এতক্ষণ নূপুর? তোর নির্বাচনী প্রচারণার কি খবর?"

নূপুর উত্তর দেয়ার আগেই তার মা ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললেন,

-"নির্বাচনের খবরও জিজ্ঞেস করছো তুমি? মেয়ে তোমার উচ্ছন্নে যাচ্ছে তোমার আশকারা পেয়েই। এখন বলছে তোমার টাকাও ব্যয় করবে সমাজসেবায়।"

নেওয়াজ সিকদার বিন্দুমাত্র বিচলিত না হয়ে বললেন,

-"করুক না। আমার টাকা মানেই তো ওর টাকা। একটা মাত্র মেয়ে আমার। যেভাবে ইচ্ছা খরচ করবে। সমস্যা কি?"

ভীষণ খুশি হলো নূপুর। এগিয়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বলল,

-"তুমি কত্ত ভালো বাবা! আমার সব ইচ্ছে পূরণ করো।"

-"হ্যাঁ, হ্যাঁ! আরও লাই দাও মেয়েকে। আজ চেয়ারম্যান নির্বাচনে দাঁড়াচ্ছে। দু'দিন পর প্রধানমন্ত্রী হতে চাইবে। হায় খোদা, সেদিন দেখার আগে আমায় তুলে নিও তুমি।"

গল্পের বাহার এর গল্প (বৈরিতা ও অনুরক্তি) লেখিকা তিয়াশা চৌধুরী

দেখতে দেখতে মাঝে কেটে গেলো পনেরোদিন। সময় ঘনিয়ে এলো নির্বাচনের। মাঠে তখন আরও ক'টা দল আছে। কিন্তু প্রত্যেকেরই ভিত নড়বড়ে। কেবলমাত্র অয়ন ও নূপুরেরই শক্ত অবস্থান আছে। তাই তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতাটাও বেশি। বাকিদের গণায়ও ধরছে না তারা।

মাঝ দিয়ে দলের লোকই প্রচার করেছে প্রতিনিয়ত। তাদের ইউনিয়ন পরিষদের অন্তর্ভুক্ত দশগ্রামেই প্রচারণা চালিয়েছে সবাই৷ নিজেদের গ্রাম ব্যতীত আশে-পাশের দু'তিন গ্রামে ভালো পরিচিতি আছে নূপুর ও অয়নের। এছাড়া বাকি গ্রামগুলোতে পরিচিতি ছড়িয়েছে নির্বাচনের ফাঁকে ফাঁকে। তাও কম ঝক্কির কাজ নয়। দশগ্রামের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়া কি কম ঝামেলার কাজ?

নূপুর কেবল দু-একদিন প্রত্যেক গ্রামে গ্রামে চক্কর কেঁটেছে। এরমধ্যে একদিনও অয়নের মুখোমুখি হয়নি। অন্যদিকে অয়ন প্রচারণায় বেরিয়ে মাঝেমধ্যেই খুঁজেছে পরিচিত মুখটা। কিন্তু একবারও দেখে নি তার বিরোধীদলীয় নেত্রীর মুখ।

নির্বাচনের ঠিক একদিন আগে অধৈর্য হয়ে পড়লো অয়ন। নূপুরকে খোঁচা না মেরে এমনি এমনি প্রচারণাটা তার কাছে যুৎসই মনে হচ্ছে না। শেষমেশ না পেরে মাত্র একদিন বাকি থাকতেই চলে এলো নূপুরের বাসার কাছাকাছি এক জায়গায়।

গোধূলিলগ্নে পুকুরপাড় থেকে ফিরছিলো নূপুর। আশ-পাশটা তখন খালিই। ভরসন্ধ্যের আগে কেউ পুকুরের কাছে আসে না। জ্বিন-ভূতের ব্যাপারটা গ্রামাঞ্চলে একটু বেশিই প্রচলিত কি না!

পুকুরের আশেপাশে বড়বড় গাছ আছে অনেকগুলো। তাদের ফাঁক দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে বেগুনী বর্ণ ধারণ করা আকাশটা। ছিমছাম আলোতে মেঠোপথ ধরে এগিয়ে যাচ্ছে নূপুর। হঠাৎ থমকালো পেছন থেকে পাওয়া পরিচিত এক কন্ঠস্বরে। ঘুরে তাকালো তৎক্ষনাৎ। উচ্চারণ করলো,

-"আপনি এখানে?"

বিরাট এক বটগাছে হেলান দিয়ে দাঁড়ানো অয়ন। গায়ের পাঞ্জাবিটা বদলেছে। লুঙ্গির সাথে একটা নীল শার্ট পড়া। সে এগিয়ে এলো গা ঝাড়া দিয়ে। নূপুরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল,

-"নির্বাচনের আগে একটু শুভেচ্ছা জানাতে হয় না, বিরোধীদলীয় নেত্রী? শুভেচ্ছা তো দূর, আপনি তো নিজের দর্শনটা অব্দি দিলেন না।"

নূপুর রাশভারী গলায় বলল,

-"আমার দর্শন পেলে নির্বাচনে জয়ী হয়ে যাবেন বুঝি?"

-"হতেও পারি। কি নিশ্চয়তা?"

-"এসব বলতে আসেন নি নিশ্চয়ই?"

-"না। আগামীকালকের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছি।"

-"গ্রহণ করলাম। এবার আপনি যেতে পারেন।"

-"বিপরীতে শুভেচ্ছাও দেবেন না?"

-"আশ-পাশের দশগ্রামের মানুষের শুভেচ্ছা আছে আপনার সাথে। তাহলে শত্রুর শুভেচ্ছা নেয়ার কি দরকার?"

-"বলবো কোনো একদিন। কাল নির্বাচন শেষে হারি বা জিতি, নিজের দর্শনটা একবার দেবেন। কেমন?"

নূপুর অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকালো অয়নের দিকে। অয়নের কথার আগাগোড়া বোধগম্য হচ্ছে না তার। কিয়ৎক্ষণ এভাবেই অতিবাহিত হওয়ার পর নূপুর বলল,

-" মাগরিবের আজান দিবে এখন। আমাদের ফিরে যাওয়া উচিত।"

বলেই মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা ধরলো। চুলগুলো তার খোঁপা করা। তার উপর ওড়নাটা ভালোভাবে টেনে ঘোমটা দিলো। অয়ন তার পথপানে চেয়ে বলল,

-"এমন পথে টেনেছো আমায়, যেখান থেকে ফিরে যাওয়া অসম্ভব।"

নূপুর তখন অনেকটাই দূরত্বে। অয়নের কথা শুনতে পায় নি। তবুও কি মনে করে ঘুরলো। অয়ন তা দেখে হাত উঁচিয়ে বিদায় জানালো। নূপুর উত্তর দিলে তো? সে মুখ বাঁকিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করে আবারও ঘুরে গেলো।

অয়ন দাঁড়িয়ে রইলো যতক্ষণ না নূপুর অদৃশ্য হলো। এরপরই হাঁটা ধরলো নিজের বাড়ির পথে। যেতে যেতে ভাবলো, তার অনুভূতির নাম কি দেয়া যায়? আর পরিনামই কি দেয়া সম্ভব? যেখানে দু'জনের মাঝে বৈরীতার দেয়াল। বিপক্ষদল তারা। নির্বাচনে হারলে অয়ন হবে নূপুরের উপহাসের পাত্র। আর নির্বাচনে জয়ী হলে হবে ঘৃণার পাত্র। উভয়সংকট তার। দু'জনের মাঝে এতগুলো বছর না দেখা হলো, না কথা হলো, না তো বন্ধুত্ব হলো।

আর যেই পরিচয়ের ভালোমতো সুযোগ এলো, তাও বিরোধীপক্ষ হিসেবে। প্রথম ধাপেই বৈরীতা। তার পরবর্তী ধাপ হবে কি?

************

পরদিন ছিলো নির্বাচন। গোটা ইউনিয়ন পরিষদের সবগুলো গ্রামে একটা উৎসব উৎসব আমেজ। বড়রা ভোট দেয়া নিয়ে তুমুল আগ্রহী। ছোটরা ভিন্ন ভিন্ন দলের লিফলেট হাতে এদিক-সেদিক ছুটোছুটি করছে। প্রত্যেকের মুখে মুখে শুধু ভোটের কথাই।

প্রত্যেক গ্রামের যেক'টা স্কুল আছে, সেগুলোকেই ভোটকেন্দ্র বানানো হয়েছে। এই উপলক্ষে আজ বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। তারা তো বেজায় খুশি। নির্বাচন কমিশনের লোকেরা, প্রার্থীদের এজেন্ট, নিরাপত্তা বাহিনীরা ভাগ ভাগ হয়ে একেকটা কেন্দ্রে উপস্থিত। ভোট গ্রহণ চলবে সকাল আটটা থেকে বিকাল চারটা পর্যন্ত। এরপর প্রতিটি ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত প্রিজাইডিং অফিসারের তত্ত্বাবধানে ব্যালট বাক্স খুলে গণনা হবে। একেক কেন্দ্রের গণনা শেষে ফলাফল সংরক্ষণ করে তা পাঠানো হবে রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে। সবকটি কেন্দ্রের ভোট গণনা শেষ হলে রাতের মধ্যেই চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষনা করা হবে। যাতে সময় লাগতে পারে দশটা বা এগারোটা পর্যন্ত।

নিজেদের পার্টির নির্ধারিত জায়গায় প্রার্থীরা উপস্থিত। অয়ন একটা চেয়ারে মাথা এলিয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে। মিন্টু এসে দাঁড়ালো তার পাশে। জিজ্ঞেস করলো,

-"ভাই, চা খাবেন?"

-"উহু। নির্বাচনের কি অবস্থা সেটা বল!"

-"সে তো ভালোই। গ্রামবাসীরা খুব আগ্রহ নিয়ে ভোট দিচ্ছে। আমি ঘুরে ঘুরে আশেপাশের কেন্দ্রও দেখে এলাম। আমাদের পার্টির দু'জন করে লোক আছে সব কেন্দ্রে। এখন পর্যন্ত ফলাফল ভালোই। ওদের কথা-বার্তায় বুঝা যাচ্ছে, তাদের পছন্দের প্রার্থী আপনিই। বাকিটুক আল্লাহর হাতে। বিকাল চারটায় ভোট শেষ। সব শেষে ফলাফল দিতে দেরি হবে সম্ভবত।"

অয়ন স্বল্প শব্দে "হু" করলো শুধু। আপাতত দুশ্চিন্তায় তার মাথা ফেঁটে যাচ্ছে। ভেবে পাচ্ছে না নির্বাচনের ফলাফল বের হওয়ার পর কি হবে? জিতলে তো অবশ্যই তাদের পার্টির লোক আনন্দ মিছিল নিয়ে বের হবে গ্রামে গ্রামে। যদি সে জিতে যায়, তাহলে কি নূপুর আবারও শহরে চলে যাবে?

আর ভাবতে পারলো না অয়ন। গ্রামে এত সুন্দর সুন্দর মেয়ে রেখে কেন যে ওই মেয়ের প্রতিই দুর্বল হতে হলো! কিই-বা আহামরী রূপ-গুণ আছে ওর মধ্যে? বিনা কারণেই কেন পাগল হতে হলো তাকে? তাও প্রেম-প্রেম অনুভূতিটা ভালোভাবে জাগ্রত হওয়ার আগেই জানা গেলো মেয়ে তার বিরোধীদলের নেত্রী। ভাগ্যটা যে কেন এমন উপহাস করলো অয়নকে!

Story Cover