ভরসন্ধ্যেবেলা বাড়িতে অয়নকে দেখে ভড়কালেন রাশিদা। একবার ছেলের দিকে, আরেকবার ছেলের বউয়ের দিকে তাকালেন। অয়ন উল্টোপাল্টা বলে তালবাহানা করে আবারও বের হলো। অয়নের কাজ কারবারে নূপুর মহা লজ্জায় পড়ে গেছে।
রাত্রিবেলা অয়ন বাসায় ফিরতেই এই নিয়ে আরেকদফা তর্কাতর্কি হলো দু'জনের মাঝে। আরও একটা রাত পার করলো ঝগড়া করেই।
দিনের পুনরাবৃত্তি ঘটলো আবার। কেটে গেলো পুরো বেলা। বিকেলে পুকুরের দিকে গেলো নূপুর। তখন পুকুরঘাটে নানান বয়সী মানুষের আনাগোনা ছিলো। বেলা পড়তেই কমতে শুরু করলো ভীড়। গৃহিণীগণ একে একে বাড়ির পথে যাচ্ছিলেন।
অবশেষে ফাঁকা হয়ে গেলো পুকুরঘাট। বেঞ্চির আকারে সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো উঁচু জায়গাটায় বসে রইলো নূপুর। সাথে লিপি৷ ভূত-প্রেতের ভয়ডর তাদের মধ্যে কোনোকালেই ছিলো না। সন্ধ্যাবেলাতে এখানটায় বসেই আলাপে মত্ত হয় দু'বান্ধবী।
গোধূলির রঙিন আকাশ রঙ পরিবর্তন করে অন্ধকার হতে থাকলো। পুকুরের পাশের বাঁশঝাড়ের মাথাতে জ্বলজ্বল করতে থাকলো ভাঙা চাঁদখানা। পাল্লা দিয়ে শোনা যেতে লাগলো ঝিঁঝিপোকার ডাক।
লিপি ও নূপুর পাশাপাশি বসে কথা বলছিলো। এমন সময় নির্জন জায়গাটায় কারো পদশব্দ পাওয়া গেলো। যা এসে থামলো নূপুরের পেছনে। গলা খ্যাঁকাড়ি দিলো একটি পুরুষালী কন্ঠস্বর।
লিপির নজর গেলো অয়নের উপর। ত্রস্থ সিমেন্ট বাঁধানো জায়গাটা থেকে নেমে দাঁড়ালো ও। মাথায় ঘোমটা ভালোভাবে টেনে সালাম দিলো। অয়ন গুরুভার স্বরে সালামের উত্তর দিতেই লিপি নূপুরকে বলল,
-"তুই থাক তাহলে। আমি বাসায় যাই। মেয়েটাকে পড়তে বসাতে হবে।"
বলেই দ্রুতগতিতে পা বাড়ালো বাড়ির পথে। নূপুর কিছু বলতে গিয়েও বলল না। অয়নকে উদ্দেশ্য করে বলল,
-"সন্ধ্যেবেলা পুকুরঘাটে কি করছেন আপনি?"
অয়ন থমথমে স্বরে বলল,
-"তোমার খোঁজে এসেছি। জানতাম এখানেই থাকবে। তাই সময়ক্ষেপণ না করে আগে পুকুরপাড়েই এসেছি।"
অয়নকে দেখেও নূপুরের মধ্যে যাওয়ার কোনো চিন্তা-ভাবনা নেই। আরামসে দু'পা তুলে বসে আছে। এবারে আরেকটু গুছিয়ে বসলো। বলল,
-"আমি একাই চলে যেতে পারতাম। আপনাকে কে বলেছিলো কষ্ট করে খুঁজতে আসতে?"
-"দরকার ছিলো। তোমাকে আগেও বলেছি সন্ধ্যার পর একা একা বের হবে না। গ্রাম তোমার চেনা-পরিচিত হলেই নিরাপদ হবে না। আর তুমি তো জানোই, চেয়ারম্যান পদে বসে এমনিতেই শ*ত্রু কতগুলো বানিয়ে ফেলেছি। তাই তোমাকে নিয়ে একটু ভয়ে থাকতে হয়।"
নূপুর হাওয়ায় উড়িয়ে দিলো বিপদের সম্ভাবনা। দাঁত কেলিয়ে বলল,
-"এটা নিয়ে একদম চিন্তা করবেন না, চেয়ারম্যান সাহেব। একটু-আধটু মারামারি কিন্তু আমিও পারি!"
অয়ন বিনিময়ে স্মিত হাসলো। বলল,
-"আচ্ছা, ভালো। এখন চলো বাসায়।"
নূপুর মুখটা গোমড়া করে বলল,
-"বাসায় যাবো? এত সুন্দর পরিবেশ, এত সুন্দর আবহাওয়া সবকিছু ছেড়ে বাসায় গিয়ে বসে থাকবো?"
অয়ন জিজ্ঞেস করলো,
-"তো কি করবে?"
-"প্রেম করবো। বসুন আমার সাথে।"
অয়ন দু'হাত পিঠে গুজে রেখেছিলো। নূপুর টান বসানোয় সামনে আসলো সেটা। তখুনি লক্ষ্য করলো হাতে থাকা একগুচ্ছ গোলাপে। বিস্মিত হয়ে বলল,
-"গোলাপ?"
অয়ন বসলো নূপুরের পাশে। গোলাপের গুচ্ছ তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,
-"হ্যাঁ। কাল তুমিই না চাইছিলে? এজন্য নিয়ে এসেছি।"
নূপুর খুশিমনে গ্রহন করলো ফুলগুলো। এরপর সেগুলো পাশে রেখে অয়নের দিকে পিঠ ঘুরিয়ে বসলো। অয়ন নিজের দু'হাত সরিয়ে দিতেই চটপট মাথা রাখলো অয়নের বুকে। একপ্রস্থ গুটিয়ে একেবারে অয়নের কাছ ঘিষে বসতেই অয়ন জড়িয়ে ধরলো নূপুরকে। দু'হাত শাড়ির উপর থেকেই স্পর্শ করলো নূপুরের পেট।
একরাশ প্রশান্তিতে লম্বা শ্বাস নিয়ে চোখ বুজলো নূপুর। বলল,
-"মা বলল, আপনি নাকি এই সপ্তাহে শহরে যাবেন?"
অয়ন জবাবে বলল,
-"হ্যাঁ। গত সপ্তাহে নির্বাচনের ঝামেলার জন্য যাওয়া হয়নি। এই সপ্তাহে তো যেতেই হবে। কতগুলো কাজ পড়ে আছে।"
নূপুর মনমরা হয়ে বলল,
-"আমি একা একা থাকবো?"
-"থাকতে পারবে না নাকি আমাকে ছাড়া? বিয়ে হতে না হতেই বরপাগল হয়ে যাচ্ছো, নেত্রী ম্যাডাম?"
নূপুর চোখ খুলল। ইতি-উতি তাকিয়ে টুপ করে চিমটি কাটলো অয়নের হাতে। অয়ন আর্তনাদ করতেই বলল,
-"আপনি তো আর বউপাগল হচ্ছেন না। এজন্য শহরে গিয়েও থাকতে পারবেন আমাকে ছাড়া।"
অয়ন নিঃশব্দে হেসে চুমু গেলো নূপুরের চুলে। বলল,
-"দু'দিনেরই তো ব্যাপার। এরপর চলেই আসবো। কয়েকটাদিন যাক। এরপর থেকে তোমাকেও নিয়ে যাবো।"
নূপুর সন্দিহান হয়ে বলল,
-"সত্যি?"
-"হ্যাঁ।"
-"এখন নিবেন না কেন? প্রেমিকার বন্দোবস্ত করবেন নাকি?"
অয়ন ভ্রুদ্বয় কুঁচকে ফেলল। বলল,
-"এখানে আবার প্রেমিকা কোত্থেকে এলো?"
নূপুর টিটকারির সুরে বলল,
-"মিথ্যে বলছেন কেন? নেই আপনার প্রেমিকা?"
-"দেখো, নূপুর! আরেকবার যদি প্রেমিকা প্রেমিকা করেছো, তো এই পুকুরে ফেলো দেবো এখন। আশেপাশে কেউ নেই। কেউ জানবেও না।"
নূপুর এবার চিমটির আশেপাশে গেলো না। সোজা খামচি বসালো অয়নের হাতে। উত্তর দিলো,
-"সুবিধা করতে পারবেন না। আমি সাঁতার জানি, চেয়ারম্যান সাহেব।"
-"পুকুরে ফেলে দেখবো, আসলেই সাঁতার পারো কি না?"
-"আপনিও চলুন। যদি সাঁতার না পারি তো আমাকে তুলতে হবে না?"
-"কেউ এসে দেখলে ভাববে, বাড়িতে রোমান্স করার জায়গা নেই। পুকুরে ডুব দিয়েছে।"
অয়নের বলার ভঙ্গিতে হাসি আটকাতে পারলো না নূপুর। বলল,
-"কেউ দেখতে আসবে না। মানুষজন ভূত-প্রেতে একটু বেশিই বিশ্বাস করে আর ভয় পায়। সন্ধ্যার পর ভুলেও পুকুরপাড়ের আশপাশে উঁকি দিবে না। আপনি আর আমি কি করছি, কেউ দেখবেও না জানবেও না।"
অয়নের হাত শক্তভাবে চেপে বসে নূপুরের পেটে। কাঁধ, গলায় উষ্ণ নিশ্বাস পড়তে লাগলো লাগাতার। নূপুরের পক্ষে শ্বাস নেয়াও দুষ্কর হয়ে পড়লো। অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করলো,
-"চেয়ারম্যান সাহেব, একটু বেশি বেশি হচ্ছে!"
অয়ন ধীরস্বরে নূপুরের কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল,
-"তুমিই তো উস্কানি দিলে।"
-"ভরসন্ধ্যার শয়তানটা আবার চেপেছে মনে হচ্ছে। কালকের মতো কান্ড করছেন। উফফ, ছাড়ুন আমাকে।"
নূপুর একটু জোর প্রয়োগ করতেই অয়ন ছেড়ে দিলো তাকে। নূপুর এটা আশা করে নি। দূরে সরে উলটো ঘুরে চাইল অয়নের দিকে। হতাশ হয়ে বলল,
-"সত্যিই ছেড়ে দিলেন?"
অয়ন কপালে ভাজ ফেলে বলল,
-"ধরলেও দোষ, আবার ছাড়লেও দোষ। এ দেখি উভয় সংকট।"
নূপুর ত্যক্ত হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বিড়বিড়িয়ে বলল,
-"বললেই ছেড়ে দিতে হবে?"
নির্জনতার মাঝে অয়ন ঠিকই শুনতে পেয়েছে নূপুরের কথা। জবাবও দিলো ঠিক-ঠিক,
-"হ্যাঁ। কারণ তুমি তো এখনো আমাকে অনুমতি দাওনি।"
নূপুর আহত নজরে চাইল অয়নের দিকে,
-"মুখে বলতে হবে?"
নূপুরকে জ্বালাতে অয়ন বেশ মজা পাচ্ছে। বহু কষ্টে হাসি চেপে থমথমে স্বরে বলল,
-"জি।"
নূপুর এগিয়ে এসে হুট করে অয়নের পাঞ্জাবির কলার টেনে ধরলো। রাগান্বিত হয়ে বলল,
-"নিজে যে ভালোবাসার কথা স্বীকার করছেন না, তার বেলা? দুনিয়াদারির সব কথা বলতে পারেন। একটু ভালোবাসার কথা বলতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হবে?"
অয়ন অবাক হওয়ার ভান করে বলল,
-"ভালোবাসার কথা? কি বলছো? এত সুন্দর করে বিয়ের প্রপোজাল দিলাম, বিয়ে করলাম, তাও বলছো ভালোবাসার কথা বলি না?"
নূপুর তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে বলল,
-"কিসের ভালোবাসার কথা হ্যাঁ? ওটা প্রপোজাল না হুমকি ছিলো। সুন্দর করে বলেন নি।"
অয়ন ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
-"বলতে হবে? তুমি বুঝো না?"
নূপুর ঘনঘন মাথা নেড়ে জানালো,
-"বুঝতে চাইনা। শুনতে চাই।"
অয়ন নূপুরকে নকল করেই বলল,
-"বলতে চাই না। বুঝাতে চাই।"
নূপুর কটমট করে বলল,
-"চেয়ারম্যান সাহেব, ত্যাড়ামির জন্য এবার আপনাকে সত্যি সত্যি পুকুরে ফেলে দিবো।"
-"চেয়ারম্যান সাহেবা, আমি সাঁতার জানি। পুকুরে ফেলে সুবিধা করতে পারবেন না।"
নূপুর তিতিবিরক্ত হয়ে বলল,
-"উফফ! আপনি একটা যাচ্ছেতাই!"
অয়ন ঠোঁট উল্টে বলল,
-"এই যাচ্ছেতাই এর সাথে তোমাকে সারাজীবন সংসার করতে হবে। কিছু করার নেই।"
নূপুর গর্জে উঠলো,
-"করবো না। বাপের বাড়ি চলে যাবো আমি।"
নূপুর বাঁধানো শানের উপর থেকে নামতে উদ্যত হলো। আকস্মিক অয়ন তার কোমড় চেপে কাছে টেনে আনলো। কপালে কপাল ঠেকিয়ে দৃঢ়তার সাথে বলল,
-"এমন কথা কখনো ভুলেও বলবে না। আমাকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তা করলে ঠ্যাং ভেঙে বসিয়ে রাখবো, বলে দিলাম। এতগুলো বছর পর তোমাকে নিজের করে পেয়েছি। ছেড়ে দেয়ার জন্য?"
নূপুর ফুঁপিয়ে উঠলো,
-"ভয় পাই না আপনাকে।"
অয়ন দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
-"এজন্যই বলি, এত বড় হয়ে গেছো কিন্তু কিশোরীদের মতো গাল ফুলানোর স্বভাবটা একটুও যায়নি তোমার। এখনো আগেরমতোই আছো।"
-"আমার স্বভাব বিরক্তিকর? ভালো লাগে না আমাকে?"
-"আদুরে লাগে।"
নূপুর নাক টানতে টানতে বলল,
-"বাসায় যাওয়া উচিত। রাত হয়ে গেছে।"
এবারে নূপুর ছাড়াতে চাইলেও অয়ন ছাড়লো না। গভীর স্বরে বলল,
-"শুনবে না?"
নূপুর কৌতুহলী হয়ে বলল,
-"কি?"
অয়ন আরও কাছে টানলো নূপুরকে। মিশিয়ে ফেলল নিজের সাথে। নূপুরের নিশ্বাস গভীর হয়ে উঠলো। দু'হাতে অয়নের পাঞ্জাবির বুকের কাছটা শক্ত করে চেপে ধরলো। অয়ন বেশ সময় লাগিয়ে ধীরে-সুস্থে বলল,
-"আমি...তোমাকে... ভালোবাসি। এই তিনটা শব্দ শোনার জন্য এত উতলা হয়ে ছিলে তুমি? কাজ-কর্মে প্রমাণ পাও না?"
নূপুর স্তব্ধ হয়ে পড়লো। আকস্মিক ঘটনাটায় মস্তিষ্ক ভুলে গেলো প্রতিক্রিয়া দিতে। চুপচাপ মিশে রইলো অয়নের বুকে।
অয়ন পূর্ণবার বলল,
-"চুপ হয়ে গেলে যে? পছন্দ হলো না নাকি?"
নূপুর আস্তে করে বলল,
-"একটুও না। আবার বলুন।"
অয়ন খানিক উঁচু আওয়াজে বলল,
-"আমি তোমাকে ভালোবাসি, নেত্রী ম্যাডাম। শুনো, গ্রামের চেয়ারম্যান হয়েছি পাঁচ বছর মেয়াদে। তোমার পদের কিন্তু নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই৷ চেয়ারম্যান হতে পারো নি দেখে মন খারাপ করার দরকার নেই। তুমি আমার ঘরের প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেছো। সারাজীবনের জন্য। কোনটা ভালো হলো?"
নূপুর মাথা নুইয়ে হাসলো। উত্তরে জানায়,
-"চেয়ারম্যান নির্বাচনে হারার আফসোস নেই। ওই বিজয় হতো সাময়িক। তবে এখন কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে জিতে গেছি। শুনুন, আমি কিন্তু আপনাকে একটুও ভালোবাসি না। ওই একটু হুমকি-ধমকির মুখে পড়ে সংসারটা না হয় চালিয়ে নিবো। ভালোবাসা-টাসা নেই।"
অয়ন প্রতিত্তোরে বলল,
-"দরকার নেই। আমি জোর করে আদায় করে নিবো নাহয়! এখন তো অনুমতি পেয়েই গেছি!"
নূপুর অবাক হয়ে বলল,
-"অনুমতি? কে দিলো? কখন দিলো? আমি তো দেইনি।"
এমনসময় হন্তদন্ত হয়ে আসা মিন্টুর কন্ঠস্বর পাওয়া গেলো দূর থেকে। অয়ন ভাই, অয়ন ভাই করে গলা ফাটাচ্ছে। অমনি দু'জন একে-অপরকে ছেড়ে যথেষ্ট দূরত্বে গিয়ে বসলো। মিন্টু এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
-"ভাই-ভাবী, আপনেরা এখানে? কাকী কতক্ষন যাবত আপনেগোরে খুঁজতাছে৷ বাড়ি যাইবেন না?"
অয়ন গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বলল,
-"খুঁজতে খুঁজতে তোকেও পাঠিয়ে দিলো?"
-"হ। আবার ভাবী সেই বিকালে বের হইছে বাসা থেকা। এল্লেগা চিন্তা করতাছে৷ আপনেরা কি বাসায় যাইবেন এহন? নাকি আমি গিয়া কইয়া আমু?"
-"না থাক। আমরাই যাচ্ছি। নূপুর, চলো।"
-"আপনেরা তাইলে যান। আমার একটা কাম আছে। পরে যামু বাসায়।"
-"আচ্ছা।"
বলেই অয়ন নূপুরের হাত ধরে পা বাড়ালো সামনে, বাড়ির পথে। মিন্টু পেছন থেকে অবাক নজরে চেয়ে রইলো দু'জনের গমনপথের দিকে। আপনমনে ভাবলো,
-"বাপ্রে, নির্বাচন নিয়া কি করলো দুইজনায়। আর এহন দেহো? কেউ কইবো ওরা বিরোধীপক্ষে খারাইছিলো? নির্বাচনে জিতলো একজনে। কিন্তুক জীবনে জিতলো দুইজনেই।"
**********
চেয়ারম্যান হওয়ার পর অয়ন প্রথমেই বিদ্যুতের সমস্যা নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করেছে। এরমধ্যে দুয়েকদিন যাবত বিদ্যুৎ একটু কমই জ্বালাচ্ছে। আজ সন্ধ্যার পর থেকে দুইবার গিয়েছিলো। রাত্রিবেলা ঘুমাতে যাওয়ার সময় আর যায়নি।
অয়নের ঘরের বড় বাতিটা জ্বলছে। অয়ন খাটে হেলান দিয়ে বসে অপেক্ষা করছে নূপুরের৷ সে রান্নাঘরে ব্যস্ত শাশুড়ীর সাথে। এলো আরও দশমিনিট পর। অয়ন তাকে দেখামাত্রই বলল,
-"এতক্ষণে আসার সময় হলো?"
-"কাজ করছিলাম।"
ঘরের দক্ষিণদিকের জানালাটা খোলা। সেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে। অতঃপর ঘরের বাতিটা বন্ধ করে অল্প পাওয়ারের বাতিটা অন করে বিছানায় এলো নূপুর। হাঁটু ভাজ করে বসলো অয়নের মুখোমুখি।
মৃদু টিমটিমে আলোয় ঘরের পরিবেশ ভীষণ মোহনীয় হয়ে উঠেছে। অয়ন কাছাকাছি আসতে শুরু করলো নূপুরের। তৎক্ষনাৎ নূপুর তাকে বাঁধা দিয়ে বলল,
-"চেয়ারম্যান সাহেব, আমি কিন্তু আজও ছু*রি নিয়ে এসেছি।"
-"লাভ নেই৷ তুমি ওটা দিয়ে কিছুই করতে পারবে না।"
বলেই নূপুরের দু'বাহু ধরে কাছে টানলো। ছু*রির নাম-নিশানাও দেখা গেলো না৷ নূপুর ঘাবড়ে গিয়ে ঢোক গিলল। বলল,
-"সত্যি এনেছি কিন্তু!"
-"সে তো দেখতেই পাচ্ছি।"
শক্ত স্পর্শে নিজেকে ছাড়ানোর বল হারাচ্ছে নূপুর। নিশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো তার। অয়নের গালের খোঁচা খোঁচা চাপদাড়ি নূপুরের গাল ও কন্ঠদেশ ছুঁয়ে দিতেই অস্থির হয়ে উঠলো সে। ছটফট করে বলল,
-"উমাহ! ছাড়ুন আমাকে। লাগছে।"
-"আজকে বাঁধা দিও না, নেত্রী ম্যাডাম। যা করছি, করতে দাও।"
অয়নের কথায় রীতিমতো পুরো দেহ বিবশ লাগতে শুরু করলো নূপুরের। অয়নের মধ্যে তেমন হেলদোল নেই। নূপুর যত নিজেকে ছাড়াতে চাইছে, অয়ন ততই তাকে নিজের সাথে শক্ত করে মিশিয়ে নিচ্ছে। ধীরে-ধীরে বাঁধা দেয়ার সক্ষমতাও হারাচ্ছে নূপুর। অয়নের স্পর্শে শিউরে উঠছে বারংবার। জমে বরফশীতল তার পুরো শরীর।
শেষে দিশে হারালো নূপুর। চক্ষুদ্বয় খিঁচে বন্ধ করে ফেলল নিজের। খপ করে আঁকড়ে ধরলো অয়নের পাঞ্জাবির কলার। সময়ে সময়ে গভীর হলো দু'জনের মিশে যাওয়ার প্রবণতা।
***********
মাঝে কেটে গেলো আরও দুটো সপ্তাহ। অয়ন গত দু'দিন আগে শহরে গিয়েছে। আজকে গ্রামে ফেরার কথা। তার অপেক্ষায় সময় গুনছে নূপুর। কেমন আমূল-পরিবর্তন হয়ে গেছে তাদের সম্পর্কের। কখনো ভাবেই নি, এই পুরুষটার আসার অপেক্ষায় তাকে দিন পার করতে হবে।
বিকেলবেলায় রাশিদা বললেন,
-"অয়নের নাকি আসতে আসতে সন্ধ্যা হবে। আমি ততক্ষণে একটু ওইবাড়ি থেকে আসছি।"
নূপুর সম্মতি দিতেই রাশিদা বের হলেন নিজের বোনের বাড়ি যাওয়ার জন্য৷ নূপুর ব্যস্ত হলো কাজে৷ এর ফাঁকে প্রহর গুনতে লাগলো সন্ধ্যা হওয়ার।
বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। রাশিদা যাওয়ার আধাঘন্টা পরেই চলে এলো অয়ন৷ চমকে দিলো নূপুরকে। চমক কাটিয়ে নূপুর একছুটে এসে জড়িয়ে ধরলো অয়নকে। জিজ্ঞেস করলো,
-"এত জলদি? আপনার না সন্ধ্যার পর আসার কথা?"
অয়ন নূপুরকে জড়িয়ে ধরে বলল,
-"কেন? খুশি হওনি জলদি এসে সারপ্রাইজ দিয়েছি বলে?"
নূপুর অয়নকে ছেড়ে দাঁড়ালো। ভাবুক হয়ে বলল,
-"উমম! এমন সারপ্রাইজ মাঝেমধ্যে দিলে মন্দ হয় না। জানেন, দুটোদিন ধরে শুধু সময় গুনছি, কখন ফিরবেন আপনি।"
-"এই যে এখন ফিরেছি। এই খুশিতে কয়েকটা চুমু খেতে পারো।"
অয়নের কথায় লজ্জা পেলো নূপুর। নজর ঝুঁকিয়ে কানের পিঠে চুল গুজলো। মিনমিনিয়ে বলল,
-"কি যে বলেন না আপনি! যান গিয়ে ফ্রেশ হন।"
-"ফ্রেশ হলে চুমু দিবে তো?"
নূপুর মেকী রাগ দেখিয়ে বলল,
-"উফফ! যাবেন আপনি?"
নূপুর ঠেলেঠুলে অয়নকে পাঠালো ফ্রেশ হতে। এরমাঝে ব্যাগপত্র সব গুছিয়ে রেখে দিলো। নাস্তা তৈরী করতে করতে অয়ন গোসল সেরে বেরিয়ে এলো। নিঃশব্দে এসেই পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো নূপুরকে৷ বলল,
-"দু'দিন তোমার থেকে দূরে ছিলাম। যা কষ্ট হয়েছে না!"
নূপুর চমকে গিয়ে বলল,
-"হচ্ছে টা কি? দু'দিন দূরে ছিলেন বলে দিনে-দুপুরে এ কি শুরু করেছেন?"
-"ভালোবাসা-বাসি। নেত্রী ম্যাডাম, আম্মু বাসায় নেই। যেকোনোসময় চলে আসবে। তার আগে একটা চুমু..."
নূপুর তাকে থামিয়ে হাঁসফাঁস করে বলল,
-"কি করছেন?! চেয়ারম্যান সাহেব! আমি কিন্তু সাধে বলি না, চেয়ারম্যান সাহেবের চরিত্র, ড্রেনের পানির মতো পবিত্র!"
-"রাখো তোমার ড্রেনের পানি, আগে আমার কাজ করতে দাও।"
নূপুরের দুর্বল প্রতিবাদ অগ্রাহ্য করে মূহুর্তের মাঝে তার ওষ্ঠপুটে দখলদারিত্ব চালালো অয়ন। বেশ সময় লাগিয়ে নূপুরকে ছাড়লো অয়ন। ততক্ষণে লাজুকলতার মতো একেবারে নেঁতিয়ে গেছে নূপুর। লজ্জায় লাল হওয়া মুখশ্রীখানা ঢাকতে ঠাঁই খুঁজলো অয়নের বুকের মাঝেই।
বেশিক্ষণ টিকলো না তাদের রোমান্সের সুযোগ। বাইরে থেকে খবর পেয়েই আফতাব ফিরে এলেন বাড়িতে। এর কিছুক্ষণ পর রাশিদাও চলে এলেন। মা-বাবা ব্যস্ত হলেন ছেলের সাথে আলাপে। নূপুর নাস্তা হাজির করলো।
সূর্য ঢলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। জ্যোৎস্নার চাঁদের আলো পড়ছে উঠোনে। রাত্রের খাওয়া-দাওয়ার পর রুমে এলো অয়ন। এর বেশ কিছুক্ষণ পর নূপুরও এলো। দরজা আটকে প্রস্তুতি নিলো ঘুমানোর।
বিছানায় শুয়ে অয়নের পাশে ঘুরলো নূপুর৷ অয়ন তখন এক হাতে ভর দিয়ে মনোযোগ দিয়ে বউকে দেখছে। তার কান্ড-কারখানা দেখে ভ্রু নাঁচালো নূপুর। জিজ্ঞেস করলো,
-"ওভাবে কি দেখছেন?"
অয়ন ভণিতাহীন উত্তর ছুড়লো,
-"তোমাকে।"
-"রোজ রোজ দেখে মন ভরছে না?"
-"উহু।"
নূপুর উঠে এলো। অয়নের গলা জড়িয়ে ধরে বলল,
-"কোনোদিন না ভরুক। সারাজীবন ঠিক এভাবেই আমার হয়ে থাকুন।"
অয়ন বিপরীতে বলল,
-"একটা কথা বলবো তোমাকে?"
-"বলুন।"
নূপুর সম্মতি দিতেই নড়ে-চড়ে বসলো অয়ন। বলল,
-"এবারের শহরে যাওয়াটায় একটা বিশেষত্ব ছিলো। জানো, সেটা কি?"
-"কি?"
-"এতদিন শহরে গেলে শুধু মা-বাবা অপেক্ষায় থাকতো। কিন্তু এখন আরেকজন যোগ হয়েছে। শহরে বসেও ভাবছিলাম, ঘরে বউ রেখে এসেছি। সে নির্ঘাত আমার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে আছে।"
নূপুর মুচকি হেসে উত্তর দিলো,
-"এই অপেক্ষার মাঝেও শান্তি আছে, জানেন আপনি? দু'দিনে মনে হচ্ছিলো দু-দু'টো যুগ পেরিয়ে গেছে।"
অয়ন ভ্রু কুঁচকে চাইল। আচমকা অদ্ভুত একটা প্রশ্ন করে বসলো,
-"ঘুমিয়েছো দু'দিন?"
নূপুর কিছু একটা আন্দাজ করে বলল,
-"আমার কি আপনার অপেক্ষায় না ঘুমিয়ে বসে থাকা উচিত ছিলো?"
অয়ন জোর গলায় বলল,
-"অবশ্যই। বরের অপেক্ষায় রাত জেগে তারা না গুনতে পারলে সে আবার কিসের ভালোবাসা?"
-"আচ্ছা? তো আপনিও কি গত আটবছর আমার অপেক্ষায় তারা গুনেছিলেন?"
-"এখানে আবার পুরোনো কাহিনি কোত্থেকে এলো?"
-"আপনি এনেছেন, তাই এসেছে। আগে নিজের হিসাব দিন, এরপর আমি দিবো।"
-"দেখো, নেত্রী ম্যাডাম!! আমি..."
-"চেয়ারম্যান সাহেব, বাহানা না।"
সুযোগ পেতেই শুরু হয়ে গেলো তাদের আরেকদফা তর্কাতর্কি। যাতে ঠিক-ঠিক ধরা পড়ে পুরোনো বৈরীতার রেশ। একে-অপরের প্রতি সীমাহীন অনুরক্তি থাকা স্বত্ত্বেও পুরোনো বৈরীতার রেশ কোনোভাবেই কাটে না। দুটোর সংমিশ্রণে দারুণভাবে এগিয়ে চলেছে তাদের ভালোবাসার ও পথচলার সম্পর্ক। যেই সম্পর্কে পাশাপাশি ঠায় পেয়েছে অয়ন ও নূপুরের #বৈরীতা_ও_অনুরক্তি-র গল্প।