মহাজাগতিক স্পেসিস : পার্ট ৪

🟢

Index Null ট্রিগার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই Rad15B–র পৃষ্ঠে থাকা ইউনিটগুলোর ভেতরের লজিক বদলে গেল। এই মোডে আর কোনো প্রশ্ন নেই, কোনো অনুমতির অপেক্ষা নেই। এখানে কমান্ড আসে না, এমনকি কমান্ডের জন্য অপেক্ষাও করা হয় না। এখানে সরাসরি সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

Cyan–23 তখন আধা হাঁটুতে। ওর বাম দিকের নিউরাল–মোটর রেসপন্স ভেঙে পড়েছে। সারফেস–সেন্সর লাইভ, কিন্তু ডেটা আর অর্থ বহন করছে না। গ্রহের যে অদৃশ্য শক্তিটা ওকে আঘাত করেছে, সেটা এখনো পুরোপুরি সরে যায়নি—শুধু ঘনত্ব বদলেছে।

আমি আর রিমান বারবার চেষ্টা করছিলাম কোনো ভাবে কিছু অন্তত দেখার বা বুঝার। বাট আমাদের সেন্সরগুলো সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় হয়ে গিয়েছে। এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্য আমরা কোনো ভাবেই প্রস্তুত ছিলাম না।

Index Null–এর প্রাইমারি রিকভারি ইউনিট—RN–IX–04—প্রায় তৎক্ষণাৎ Cyan–23–এর পাশে পৌঁছে যায়। সময়টা এক সেকেন্ডেরও কম, কিন্তু সেই সময়ের ভেতরে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। কোনো কণ্ঠ শোনা যায় না, কোনো সতর্ক সংকেতও না। Index Null–এ ভাষা অতিরিক্ত। এখানে কাজই সিদ্ধান্ত।

RN–IX–04 থামে না, থামার প্রয়োজনও হয় না। ওর বাহুর ভেতর থেকে লকিং–ক্যাবল বেরিয়ে আসে—কিন্তু পরিচিত কোনো প্রযুক্তির মতো না। ম্যাগনেটিক নয়, আবার যান্ত্রিকও না। এটা নিউট্রাল ফোর্সে বাঁধা—এমন এক বন্ধন, যেটা ওজন বোঝে, কিন্তু বস্তু চেনে না।

এই ক্যাবলটা ধাতু নয়, আবার জীবও নয়। এর কোনো স্থায়ী গঠন নেই। এটা আগে ছিল না, পরে থাকবেও না। Index Null–এর হিসাব অনুযায়ী ঠিক এই পরিস্থিতির জন্যই এর অস্তিত্ব। মুহূর্ত শেষ হলেই এর প্রয়োজন শেষ।

এই ক্যাবল Cyan–23–কে ধরার সময় কোনো টান দেয় না, কোনো চাপও না। শুধু অবস্থান ঠিক করে। যেন ওকে বলা হচ্ছে—এখানে থাকো, ভেঙে পড়ো না, এখনো না।

RN–IX–04 কোনো প্রশ্ন করে না।

কারণ Index Null–এ প্রশ্নের উত্তর আগেই ঠিক করা থাকে।

RN–IX–04(রোবট), Cyan–23–কে নিজের শরীরের সঙ্গে টেনে নেয়। বুকে, কাঁধে, কোমরে—তিনটা অ্যাঙ্কর পয়েন্টে বেঁধে ফেলে। Cyan–23 কিছু বলে না। Index Null–এ কথা বলা অপ্রয়োজনীয়।

একই সময়, পেরিফেরাল রিকভারি ইউনিট ছড়িয়ে পড়ে।

Cyan-23 এর অবস্থা দেখে আমার চোখ কান্নায় ভেঙে আসছে, কিন্তু এই সময়টাতে আসলে আবেগ প্রকাশ করার কোনো সুযোগ নেই। শুধুমাত্র ম্যাথামেটিক্যাল বিবেচনা বোধ কাজ করতে হয়। কোন কাজ করলে সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে, সেদিক নিয়ে ভাবতে হয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহনের মাধ্যমে এটিকে বাস্তবায়নও করতে হয়।

RN–IX–07 একটি সাইবর্গকে ধরে—ডান পায়ের স্ট্রাকচারাল ইন্টেগ্রিটি আংশিকভাবে ভেঙে পড়েছে। জয়েন্ট এখনো যুক্ত, কিন্তু লোড নেওয়ার ক্ষমতা নেই। টান দিলে শরীরের বাকি অংশে স্ট্রেস ট্রান্সফার হবে, আর সেই স্ট্রেসে টিস্যু ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা নিশ্চিত।

Index Null দ্রুত হিসাব করে।

টানা = ক্ষতি।

বহন = সম্ভাবনা।

RN–IX–07 নিজের শরীরের লোয়ার মাস বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কোনো সংকেত না, কোনো দেরি না। ওজন কমে গেলে ব্যালেন্স নতুন করে ক্যালকুলেট হয়। রোবটটা তখন আর বহনকারী যন্ত্র না—একটা অস্থায়ী কাঠামো।

সাইবর্গটাকে টেনে নেওয়া হয় না। তুলে নেওয়া হয়।

পিঠে।

মেরুদণ্ডের অক্ষ বরাবর।

যাতে শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশে কোনো অতিরিক্ত বল না পড়ে।

একই সময়, অন্য পাশে RN–IX–09 কাজ শুরু করে। ওর সেন্সর অর্ধ–গলিত একটি রোবো ইউনিটের ডেটা কোর শনাক্ত করে। বাহ্যিক কাঠামো তাপ ও অজানা ফোর্সে বিকৃত। রিকভারির মতো কিছু আর নেই। কিন্তু কোর—এখনো স্থিতিশীল। তাপমাত্রা সীমার ভেতর। সিগন্যাল ক্ষীণ, কিন্তু অক্ষত।

Index Null সিদ্ধান্ত নেয়—শরীর অপ্রয়োজনীয়।

ডেটা অপরিহার্য।

RN–IX–09 কোনো দ্বিধা করে না। বাকি অংশ কেটে আলাদা করা হয়। কাটটা রুক্ষ না, দ্রুত না—একটা ক্লিন কাট। যেন জানে, এই ডেটার উপর ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠবে। কোর সিল করা হয় মাল্টি–লেয়ার শিল্ডে। তারপর ব্যাক–পডে স্থানান্তর। সময়ের হিসাব মিলিসেকেন্ডে।

এই পুরো সময়টায় প্লানেটের পৃষ্ঠে দৃশ্যত কিছুই ঘটছে না। কোনো বিস্ফোরণ নেই, কোনো কম্পন নেই। কিন্তু সেন্সরগুলো অন্য কথা বলছে। ডেটা এক জায়গায় থাকছে না। মাটির ডেনসিটি ফ্লাকচুয়েট করছে—এমনভাবে, যেটা টেকটোনিক বা তাপজনিত কোনো মডেলের সাথে মেলে না।

বাতাসের গঠন একই, কিন্তু আচরণ আলাদা।

Atmosphere এখন আর নির্দিষ্ট নিয়মে চলছে না।

প্রেশার আছে, কিন্তু দিক নেই।

ফ্লো আছে, কিন্তু উৎস নেই।

সবকিছু স্থির দেখাচ্ছে।

আর সেই স্থিরতাটাই একটা ভুল ইমেজ।

Index Null সেকেন্ডারি কমান্ড পাঠায়— "Fallback vector confirmed.”

Cyan-23 rescue operation

এর মানে—আর এক সেকেন্ডও এখানে থাকা যাবে না।

RN–IX–04 রোবো Cyan–23–কে বুকে বেঁধে নিয়ে খুব দ্রুত পিছু হটতে থাকে যাতে আর কোনো ক্ষতির মুখে না পরে যায়। হেডঅফিসের কন্ট্রোল রুম থেকে বারবার Cyan-23 এর প্রতি স্পেশাল কেয়ার রাখতে বলা হচ্ছে, যত দ্রুত সম্ভব তাকে আমাদের সেকেন্ডারি স্পেস স্টেশনে পাঠাতে বলা হচ্ছে।

পেছনে RN–IX–07 আর RN–IX–09 ব্যাকআপ লাইন তৈরি করে। আহত সাইবর্গ, ডেটা কোর, আরেকটা আধা–গলিত রোবো—সবাই একটা চলমান কলামের মতো এগোচ্ছে।

শিপ তখন ওপরে। ল্যান্ডিং বে খোলা। আমি ভেতরে দাঁড়িয়ে আছি, তাদের শিপে ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করছি। "রবার্ট" বারবার স্পেসশিপের হেলথ চেকাপ দিচ্ছে, কারন শিপ এর ক্ষতি মানে আমরা শেষ। "রিমান" আমাকে বারবার শাউট করে করে আপডেট জানিয়ে দিচ্ছে।

প্রথমে RN–IX–04 ঢোকে। Cyan–23–কে নামিয়ে দেয় মেড–হারনেসে। সেকেন্ডের ভেতর সাপোর্ট সিস্টেম ওর শরীরের সাথে লক হয়। Cyan–23 একবার চোখ ঘোরায়।

সে কিছু বলে না।

তারপর একে একে বাকিরা। আহত সাইবর্গ, ডেটা কোর, ভাঙা রোবো ইউনিট। শিপের দরজা বন্ধ হওয়ার আগেই Index Null নিজেকে ডিঅ্যাক্টিভেট করে নেয় এবং কাজে ক্ষান্ত দেয়।

তবে হঠাত রবার্ট বলে যে -"আমাদের বাকি ২ জন সাইবর্গ "Azzer-9" এবং "Azix-4" এর কোনো সিগনাল মিলছে না।" আমি আপাতত ধরেই নিয়েছি তারা আর ব্যাক করবে না। হয়তো অদৃশ্য আঘাতে তারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। এটা কি কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিলো নাকি কোনো জৈবিক এটাক ছিলো তা বুঝার মতো অবস্থায় আমরা আর ছিলাম না। মাথায় শুধু এইটুকু ঘুড়পাক খাচ্ছে যে আমাদেরকে যত দ্রুত সম্ভব Base এ ফিরতে হবে। অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যে।

শিপের দরজা বন্ধ হতেই ভেতরের আলো লাল থেকে ধীরে ধীরে অ্যাম্বারে নামলো।

এবার সাইবর্গ বা রোবো না, আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়ার পালা।

আমি বললাম- “Robert, engine state.”

রবার্ট- “Primary drive responding. Hull stress within limit. Manual override available.”

রিমান- “Cyan–23 stabilized, but not safe. We need distance. Now.”

আমি মাথা নেড়ে বললাম,

“Secondary station vector lock করো। কোনো হোল্ড নয়।”

শিপ কাঁপে। প্রথমে খুব হালকা। তারপর এক টানে। স্টার্ট–আপ সিকোয়েন্স চলতে থাকে—একটার পর একটা সাব–সিস্টেম লাইভ।

ভেতরের শব্দ বদলে যায়।

এটা আর ল্যান্ডিং সাউন্ড না—এটা পালানোর শব্দ।

রবার্ট বলে,

“Velocity climbing. We’re past conventional burn.”

আমি চোখ সরাই না সামনে থেকে।

“Push it. Just don’t tear us apart.”

শিপ আলো ভেঙে এগোয়। স্পেস সামনে আর দূরত্ব না—এটা এখন একটা চাপ। স্পিড বাড়ে। সময় টান পড়ে।

রিমান নিচু গলায় বলে,

“We’re nearing light threshold.”

আমি শুধু বলি,

“Don’t announce it. Just keep it clean.”

কয়েক সেকেন্ড কোনো কথা নেই। শুধু সিস্টেমের রেসপন্স। আমাদের শরীর ভারী লাগে না—হালকা লাগে না—কিছুই ঠিক মতো লাগে না।

তারপর—

রবার্টের কণ্ঠ বদলায়।

“Approaching secondary station perimeter. Initiating deceleration.”

আমি শ্বাস ছাড়ি। খুব ধীরে। ডেসেলারেশন শুরু হওয়ার কথা ছিল ধাপে ধাপে—প্রথমে থ্রাস্ট কাট, তারপর ইনর্শিয়া শোষণ, তারপর ভেক্টর কারেকশন। কিন্তু সেই ক্রমটা ভেঙে যায়।

ঠিক তখনই শিপের ভেতর একটা অস্বাভাবিক শব্দ হয়। কোনো বিস্ফোরণ না। কোনো ধাতব আঘাতও না। বরং যেন কোনো বড় সিস্টেম হঠাৎ নিজের ওপর নিজেই তালা মেরে দিয়েছে। অ্যালার্ম বাজে না, কারণ অ্যালার্ম ট্রিগার করার মতো কোনো নির্দিষ্ট ত্রুটি ধরা পড়ছে না।

শুধু—সব থেমে যায়।

স্পিড রিডিং এক লাফে নেমে আসে। শূন্যের কাছাকাছি। কিন্তু ইনর্শিয়া কাটে না। শরীর বোঝে—আমরা থামিনি, আমাদের থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভেতরের ফিল্ড এখনো গতি বহন করছে, কিন্তু ইঞ্জিন সেই গতিকে আর সমর্থন করছে না।

রিমান হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে,

“What the hell just happened?!”

রবার্টের কণ্ঠ দ্রুত, কিন্তু টোন পাল্টায় না।

“Internal fault. Auto-brake triggered. Not by command.”

আমি চেয়ার আঁকড়ে ধরি। বেল্ট বাঁধা ছিল, তবু আকস্মিকতায় শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে যায়। মাথার ভেতর একটাই হিসাব ঘুরতে থাকে—এই অবস্থাটা কোনো প্রশিক্ষণ মডেলে ছিল না। এটা পরিকল্পিত থামা না, আবার পুরো ব্যর্থতাও না।

স্ক্রিনে সেকেন্ডারি স্টেশন পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। দূরত্ব বিপজ্জনকভাবে কম, কিন্তু সেই দূরত্ব কাটানোর মতো গতি আমাদের হাতে নেই। ড্রিফট করার জায়গাও নেই। ভেক্টর লক নেই। আমরা ঠিক মাঝখানে আটকে আছি।

স্টেশন এত কাছাকাছি, অথচ পৌঁছানো যাচ্ছে না।

এই মুহূর্তে বুঝতে পারি—যা ঘটেছে, সেটা শুধু শিপের সমস্যা না। এটা অবস্থানের সমস্যা। সময়ের সমস্যা। আর সম্ভবত এমন কিছুর প্রভাব, যেটা আমরা এখনো মাপতে পারছি না।

কিন্তু একটা বিষয় পরিষ্কার—

আমাদের সেখানে পৌঁছাতেই হবে।

যেভাবেই হোক।

আমি বলি—

“Distance?”

রবার্ট এক মুহূর্ত থামে। এই থামাটা চিন্তার না, হিসাবের। তারপর বলে,

“Too close to drift. Too far to dock.”

এই কথাটার মানে আমরা তিনজনই বুঝি। ড্রিফট করার মতো জায়গা নেই—কারণ খুব কাছাকাছি থাকলে সামান্য ভেক্টর লসেই শিপ স্টেশনের স্ট্রাকচারের দিকে টেনে যেতে পারে। আবার ডক করার মতো কাছেও না—কারণ ল্যান্ডিং সিস্টেম কাজ করার জন্য যে ন্যূনতম কন্ট্রোল দরকার, সেটা আমাদের হাতে নেই।

ককপিটে হঠাৎ নিস্তব্ধতা নামে।

এই নিস্তব্ধতা ভয় থেকে আসে না—এটা আসে হিসাব শেষ হয়ে গেলে।

আর কোনো স্বাভাবিক অপশন নেই।

এই সময়েই সেকেন্ডারি স্টেশন আমাদের জন্য ল্যান্ডিং প্যাড ওপেন করে দেয়। ওরা প্রস্তুত ছিল। আমরা যেভাবে এপ্রোচ করছিলাম, সেটা তাদের জন্য পরিচিত। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই পরিচিত প্যাটার্ন ভেঙে যায়।

স্টেশন সেন্সর আমাদের শিপের মুভমেন্ট ট্র্যাক করতে থাকে। স্পিড প্রায় শূন্য, অথচ অবস্থান বদলাচ্ছে। ভেক্টর ডাটা মিলছে না। শিপ কোনো নির্দিষ্ট লাইনে এগোচ্ছে না—ধীরে ধীরে ভিন্ন দিকে সরে যাচ্ছে।

ওরাই আগে বুঝে ফেলে।

আমাদের দিক থেকে কোনো সংকেত যায় না, কিন্তু ওদের সিস্টেমে অ্যালার্ট উঠে যায়—এই মুভমেন্ট স্বাভাবিক না। এই পরিস্থিতিতে কোনো শিপ এমনভাবে স্লো–মুভ করে না।

Something is wrong.

Again.

এই মুহূর্তে আমরা শুধু আটকে নেই।

আমরা নজরে পড়ে গেছি।

শিপের ভেতরের নিস্তব্ধতাটা ভাঙে হঠাৎ। কোনো অ্যালার্মে না—একটা পরিষ্কার, স্থির কণ্ঠে। সেকেন্ডারি স্টেশনের কন্ট্রোল ফ্রিকোয়েন্সি নিজে থেকেই ওপেন হয়। ওরা আমাদের অস্বাভাবিক মুভমেন্ট ধরে ফেলেছিল।

কন্ট্রোলার বলে,

“Unidentified drift detected. Confirm your status.”

এই প্রশ্নটা আনুষ্ঠানিক না। স্টেশন সেন্সর ইতিমধ্যে সব দেখে ফেলেছে। এটা একটা শেষ ভেরিফিকেশন—আমরা এখনো নিয়ন্ত্রণে আছি কি না, নাকি পুরোপুরি সিস্টেমের বাইরে চলে গেছি।

আমি এক সেকেন্ডও দেরি করিনি।

“Internal fault. Auto-brake engaged without command. We’re dead in vector—too close to drift, too far to dock.”

লাইনটা সংক্ষিপ্ত, কিন্তু ভেতরে সব আছে। ম্যানুয়াল কন্ট্রোল নেই। ভেক্টর নেই। অবস্থান আছে, কিন্তু দিক নেই।

Auto Brake

ওপাশে কয়েক মিলিসেকেন্ড নীরবতা। এটা ভয় না। এই সময়টায় স্টেশনের কোর সিস্টেম আমাদের ডাটা ক্রস–চেক করছে—ভর, দূরত্ব, স্ট্রাকচারাল রিস্ক, আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—আমরা যদি হঠাৎ ভেঙে পড়ি, তার প্রভাব কোথায় যাবে।

তারপর কন্ট্রোলার আবার বলে,

“Copy that. Do not attempt manual correction. Assistance en route.”

এই কথাটা শুনেই বুঝে যাই—ওরা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। এই এড়িয়াতে টোইং কোনো স্ট্যান্ডার্ড অপারেশন না। সামান্য ভুল মানে শুধু আমাদের শিপ না—স্টেশনের ল্যান্ডিং সেকশনও ঝুঁকিতে পড়বে।

কিন্তু সময় নেই।

Cyan–23 আমাদের ভেতরে। মেড–হারনেসে হলেও ও এখনো স্থিতিশীল না। শিপ স্থির, কিন্তু নিরাপদ না। আমরা কোনো কক্ষপথে নেই, কোনো সেফ জোনেও না। আমরা একটা থেমে থাকা ভর—যার চারপাশে স্পেস কাজ করছে, কিন্তু আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে না।

এই অবস্থায় কিছু না করাও একটা সিদ্ধান্ত।

আর ভুল সিদ্ধান্তের জায়গা এখানে একটাও নেই।

রবার্ট হঠাৎ বলে ওঠে,

“Six micro-signatures detected. Station-launched.”

কণ্ঠে উত্তেজনা নেই, কিন্তু গতি আছে। স্ক্রিনে চোখ রাখতেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়ে যায়। ছয়টা আলাদা সিগনেচার—একসাথে নয়, সামান্য অফসেট রেখে ছড়ানো। মানে ওরা এক ইউনিট না, ছয়টা স্বাধীন কন্ট্রোল পয়েন্ট।

ওগুলো স্টেশনের Helping Hand ইউনিট। আকারে ছোট, প্রায় আমাদের শিপের একটা সাব–সিস্টেমের সমান। কিন্তু কাজের দিক থেকে অনেক বেশি সংবেদনশীল। প্রতিটা ইউনিটই একেকটা মোবাইল গ্র্যাভিটি কন্ট্রোল প্ল্যাটফর্ম।

এদের কোনো তার নেই, কোনো হুক নেই, কোনো শারীরিক সংযোগও নেই। কারণ এই দূরত্বে শারীরিক সংযোগ মানেই অনিশ্চয়তা। ওরা ধরে ফিল্ড দিয়ে—নিউট্রাল গ্র্যাভিটি ফিল্ড, যেটা ধাক্কা দেয় না, টানও দেয় না। শুধু ভরকে “ধরে রাখে”।

স্ক্রিনে ডেটা আপডেট হতে থাকে।

প্রতিটা ইউনিট আমাদের শিপের ভরের একটা অংশ আলাদা করে ম্যাপ করছে। সামনে–পেছনে নয়—উপরে, নিচে, পাশে। ছয় দিক থেকে। যেন আমাদের শিপটা আর একটা যান না, একটা চলমান সমস্যা—যেটাকে ভারসাম্যে রাখতে হবে।

আমি বুঝে যাই—এই ইউনিটগুলো আমাদের টানবে না।

এরা আগে আমাদের ওজন ভাগ করে নিজেরা বহন করবে।

তারপর দিক ঠিক করবে।

এটা রেস্কিউ না। এটা কন্ট্রোল ফিরিয়ে আনার চেষ্টা।

আর এই ধরনের অপারেশন স্টেশন তখনই করে,

যখন অন্য সব অপশন শেষ হয়ে যায়।

একটার পর একটা ইউনিট আমাদের চারপাশে পজিশন নেয়। সামনে, পেছনে, দুই পাশে, নিচে আর ওপরে—ছয় দিক থেকে। এই বিন্যাসটা এলোমেলো না। এটা ভারসাম্যের হিসাব। যেন আমরা আর কোনো শিপ না—একটা অস্থির সমীকরণ, যেটাকে ছয়টা আলাদা ভেরিয়েবল একসাথে ধরে রেখেছে।

কন্ট্রোলার আবার বলে,

“Magnetic lock denied. Switching to neutral-grip field. Do not resist.”

এই কথার মানে পরিষ্কার। ম্যাগনেটিক লক হলে ধাতব কাঠামোয় টান পড়তো, মাইক্রো–ফ্র্যাকচার তৈরি হতো। নিউট্রাল–গ্রিপ ফিল্ড তার ঠিক উল্টো—এটা ধরে রাখে, কিন্তু চাপ দেয় না। শিপের ভর অনুভব করে, কিন্তু কাঠামোকে বিশ্বাসঘাতকতা করে না।

আমি শুধু বলি,

“We’re with you.”

এই কথার ভেতরে অনুমতি নেই, আছে আস্থা। এই মুহূর্তে কন্ট্রোল আমাদের হাতে নেই—আর সেটা মেনে নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।

তারপর টান শুরু হয়।

হঠাৎ না।

একদম ধীরে।

এমনভাবে, যেন স্পেস নিজেই আমাদের সরাচ্ছে।

শিপ কাঁপে না—সরে। কোনো ঝাঁকুনি নেই, কোনো ধাক্কা নেই। শুধু অবস্থান বদলায়। এই মুহূর্তে বুঝি—থেমে থাকা আর স্থির থাকা এক জিনিস না। আমরা আগে থেমে ছিলাম। এখন আমরা স্থির।

ছয়টা মিনি শিপ একসাথে আমাদের ভর ভাগ করে নেয়। প্রত্যেকটা ইউনিট আমাদের শিপের ওজনের একটা অংশ বহন করছে। গতি নেই, কিন্তু দিক আছে। আমরা এগোচ্ছি—কিন্তু নিজের জোরে না।

রিমান খুব নিচু গলায় বলে,

“They’re carrying us.”

আমি চোখ সরাই না।

“Let them.”

কারণ এখন আমাদের চলার দায়িত্ব ওদের।

ল্যান্ডিং স্পেস ধীরে ধীরে সামনে আসে। খোলা গেটটা দিয়ে টানেলের মতো একটা বিশাল জায়গায় চলে আসি। ঠিক যখন আমরা নির্ধারিত করিডোরে ঢুকি, কন্ট্রোলার ঘোষণা করে,

“Landing corridor secured. Proceeding with enclosure.”

Pulling to Space Station

আমাদের শিপ ভেতরে ঢুকতেই ল্যান্ডিং স্পেস এর গেট বন্ধ হয়ে যায়। ভারী, নিঃশব্দে।

পৃথিবী পৃষ্ঠের মতো এখানেও স্বাভাবিক গ্রাভিটি ফিল করলাম। অর্থাৎ এখানে আর্টিফিসিয়াল গ্রাভিটি ব্যবহার করা হয় সব কাজ স্বাভাবিক ভাবে চলার জন্য।

বাইরের স্পেস এর ফিলিংসটা এক মুহূর্তেই কেটে যায়। আমি তখনই প্রথমবার একটু লম্বা শ্বাস নিই। আমরা এখনো নিরাপদ না। কিন্তু আমরা আর ভেসে নেই।

শেষবার কন্ট্রোলার বলে,

“Welcome to our space station. Medical and engineering teams are standing by.”

ল্যান্ডিং গেট পুরোপুরি সিল হতেই স্টেশনের ভেতর এক ধরনের নিয়ন্ত্রিত কোলাহল কানে আসে। এই শব্দে কোনো আতঙ্ক নেই। এটা প্রস্তুতির শব্দ—যেন স্টেশন নিজেই জানে, এখন ভুল করার সময় না। প্রতিটা ধ্বনি নির্দিষ্ট কাজের ইঙ্গিত বহন করে।

গেটের অপর পাশ থেকে প্রথমেই ঢোকে ইমার্জেন্সি মেডিকেল ইউনিট। ওরা পুরো মানুষ না, আবার সাধারণ রোবোও না—মেডিক্যাল সাইবর্গ। চোখে কোনো আবেগ নেই, কারণ এখানে আবেগের জায়গা নেই। কিন্তু গতিতে একটুও দ্বিধা নেই। প্রতিটা মুভমেন্ট মেপে নেওয়া, প্রতিটা পদক্ষেপ আগেই হিসাব করা।

ওদের ঠিক পেছনেই ঢোকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটগুলো। কাজ আলাদা, লক্ষ্য আলাদা, কিন্তু লাইনে কোনো বিশৃঙ্খলা নেই। কেউ কাউকে পাশ কাটায় না, কেউ থামে না। যেন প্রত্যেকেই জানে—এই মুহূর্তে এক সেকেন্ডের দেরি মানে একটা ডাটা হারানো, কিংবা একটা জীবন।

আমি তাকিয়ে দেখি—শিপের ভেতর থেকে স্টেশনের দিকে একটা এক্সটেন্ডেড লাইন তৈরি হয়ে গেছে। চোখে পড়ার মতো কোনো দেয়াল নেই, কোনো স্থায়ী করিডোরও না, কিন্তু পথটা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। প্রতিটা ইউনিট জানে কোন দিক দিয়ে এগোতে হবে, কোথায় থামতে হবে, আর কাকে আগে যেতে দিতে হবে। এইটা এলোমেলো কোনো চলাচল না, পুরোটা স্টেশনের প্রোটোকল অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত।

এই লাইনটা শুধু যাতায়াতের জন্য তৈরি হয়নি। একদিকে শিপের ভেতর থেকে আহত সাইবর্গ, ক্ষতিগ্রস্ত রোবো ইউনিট আর ডেটা কোর বের করে আনা হচ্ছে, আর অন্যদিকে স্টেশনের মেডিক্যাল আর ইঞ্জিনিয়ারিং টিমগুলো ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে। প্রতিটা মুভমেন্টে বোঝা যাচ্ছে—কী আগে দরকার, কী অপেক্ষা করতে পারে।

এই মুহূর্তে আমি বুঝতে পারি, আমরা শুধু ল্যান্ডিং শেষ করিনি। আমরা একটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা থেকে ধীরে ধীরে একটা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে ঢুকে পড়ছি। পরিস্থিতি এখনো স্বাভাবিক হয়নি, কিন্তু অন্তত আর অগোছালো না। এই লাইনের ভেতর দিয়েই স্টেশন পুরো অপারেশনটা নিজের হাতে নিচ্ছে।

“Start with Cyan–23,” আমি বলি।

কণ্ঠটা শান্ত রাখার চেষ্টা করি, কিন্তু ভেতরে চাপ জমে আছে।

দু’টা মেডিকেল ইউনিট একসাথে মেড–হারনেসে লক করে। সাপোর্ট লাইনগুলো একে একে শিপের সিস্টেম থেকে স্টেশনের সিস্টেমে ট্রান্সফার হয়। কোনো ঝাঁকুনি না, কোনো তাড়াহুড়ো না। Cyan–23-এর শরীর এখন আর আমাদের হাতে না—স্টেশনের মেডিকেল টিমের হাতে।

ওর চোখ আধখোলা। সে কিছু বলে না।

আমিও কিছু বলি না।

পেছন থেকে আহত সাইবর্গটাকে নামানো হয়। ডান পায়ের স্ট্রাকচারাল ফেইলিউর স্পষ্ট। ওকে হাঁটানো হয় না—ভাসিয়ে নেওয়া হয়। গ্র্যাভিটি সাপোর্ট ফিল্ডে। ওর শ্বাসের শব্দটা আমি এখনো শুনতে পাই।

ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিটগুলো তখন অন্য কাজে ব্যস্ত। ইনজুরড রোবো গুলোকে নির্দিষ্ট প্লেসে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কন্ট্রোল রুমের নির্দেশমতো আহত অংশ ঠিক করা হবে বা রিপ্লেস করা হবে এবং ডাটাগুলো কপি করে Earth এ হেডঅফিসে পাঠিয়ে দেয়া হবে। ওরা জানে, শরীর রিপ্লেস করা যায়। ডেটা না।

একটা ইউনিট কোর কন্টেইনারে সিল করছে। আরেকটা সাথে সাথে স্ক্যান চালাচ্ছে। কেউ কথা বলছে না, কিন্তু প্রত্যেকটা মুভমেন্টে একটা স্পষ্ট ভাষা আছে—সময় নষ্ট করা যাবে না।

রিমান আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। নিচু গলায় বলে,

“They’re prioritizing cores over shells.”

আমি মাথা নেড়ে দিই।

“ঠিকই করছে। শরীর বানানো যায়। স্মৃতি না।”

একটার পর একটা ইউনিট শিপ থেকে নামছে। কেউ স্ট্রেচারে, কেউ ফিল্ডে, কেউ শুধু একটা ছোট কন্টেইনারে—কিন্তু প্রত্যেকটারই ওজন আছে। শারীরিক না হলেও, হিসাবের।

রবার্ট তখনো শিপের সিস্টেমে চোখ রেখে আছে।

“Engineering wants full access,” সে বলে।

-- “They think the brake anomaly wasn’t local.”

ইনজুরড ইউনিটগুলো স্টেশনের ভেতরে। কোরগুলো আলাদা সিকিউরড লাইনে চলে গেছে।

আমি একবার পেছনে তাকাই। শিপটা দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ।

কিন্তু অক্ষত না। বেশ কিছু ক্ষত দেখতে পাচ্ছি এখন নিচের দিকের, অথচ আমার জানামতে আমরা আগে এগুলা আগে পর্যবেক্ষন করিনি, এমনকি আমাদের শিপের ইন্টার্নাল রিপোর্টেও এমন কিছু দেখা যায়নি।

Watching the Ship

স্টেশনের ভেতরের করিডোর ছেড়ে আমরা তিনজন রেস্টরুমে ঢুকি। দরজাটা বন্ধ হতেই বাইরের সেই নিয়ন্ত্রিত কোলাহলটা দূরে সরে যায়। ভেতরে আলো নরম। শব্দ কম। ঠিক যেন স্টেশনটাও বুঝে গেছে—এখানে এখন শব্দের দরকার নেই।

আমি, রিমান আর রবার্ট—কেউ কথা বলি না।

ফ্রেশ হওয়ার সময়টুকু শুধু শরীরের জন্য না, মাথার জন্যও।

জল মুখে দিতেই বুঝি, ক্লান্তিটা কতটা গভীরে ঢুকে গিয়েছিল। আয়নায় নিজের দিকে তাকাই। চোখে ঘুম নেই, ভয়ও নেই—আছে হিসাব। এই মিশনে ভয় কাজের না।

হালকা খাবার নেয়া হয়। খুব সাধারণ। কোনো স্বাদ মনে থাকে না। শুধু শরীরটা চলার মতো শক্তি পেলেই যথেষ্ট।

রিমান প্রথম নীরবতা ভাঙে।

“Cyan–23 is still in stabilization loop,” বলে।

আমি মাথা নেড়ে দিই।

“ও বেঁচে থাকলেই আপাতত যথেষ্ট।”

রবার্ট তখনো অভ্যাসমতো ট্যাবলেটটা হাতে ঘুরাচ্ছে।

“Station logs synced,” বলে।

“Whenever you’re ready.”

আমি দাঁড়াই।

“Let’s not wait.”

আমি আমার রিস্টব্যান্ড এর মাধ্যমে পৃথিবীতে আমাদের স্টেশনের কনফারেন্স চ্যানেল কানেক্ট করে ফেলি এবং হেডঅফিস লিংক ওপেন করি।

ফ্রিকোয়েন্সি ক্লিয়ার হতেই বুঝে যাই, আর অপেক্ষা করার সময় নেই। নিয়ম অনুযায়ী আগে প্রসিডিউরাল রিপোর্ট যাওয়ার কথা, কিন্তু এই পরিস্থিতিতে শুধু ফর্মাল আপডেট যথেষ্ট না। আমার দরকার ছিল সরাসরি কন্ট্রোলারের সাথে কথা বলা—যাতে কোনো ফিল্টার ছাড়া পুরো ঘটনাটা একবারে তাকে জানানো যায়।

স্ক্রিনে প্রধান কন্ট্রোলারের মুখ ভেসে ওঠে। চোখে স্পষ্ট জিজ্ঞাসু ভাব। এমন না যে সে কিছু জানে না—বরং মনে হচ্ছিল, সে শুরু থেকেই আমাদের মুখ থেকেই সব শোনার জন্য অপেক্ষা করছিল।

আমি কথা শুরু করি শুরু থেকে, কোনো শর্টকাট না নিয়ে।

Rad15B-তে নামা।

Index Null ট্রিগার হওয়া।

সেই অদৃশ্য আঘাত, যেটা সেন্সরে ধরা পড়েনি কিন্তু ইউনিটগুলোকে ভেঙে দিয়েছে।

Cyan–23-এর অবস্থা।

নিখোঁজ দুই সাইবর্গ।

তারপর শিপের অটো-ব্রেক অ্যানোমালি।

আর শেষে সেকেন্ডারি স্টেশনের ইন্টারভেনশন।

আমি কোনো অংশ এড়িয়ে যাইনি। কোথায় কী ঘটেছে, কখন সিদ্ধান্ত বদলাতে হয়েছে, কোন জায়গায় আমাদের সিস্টেম কাজ করেনি—সব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে ব্যাখ্যা করি। এটা কোনো নাটকীয় বর্ণনা ছিল না, ছিল একটা সম্পূর্ণ চিত্র—যেটা না জানলে পরের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়।

কন্ট্রোলার মাঝখানে একবারও থামাননি। তিনি শুধু শুনছিলেন।

আর আমি বুঝতে পারছিলাম—এই রিপোর্টটা শুধু ঘটনার হিসাব না, এই মিশনের ভবিষ্যৎ দিকও ঠিক করে দেবে।

কন্ট্রোলার আমাকে মাঝখানে একবারও থামান না। তিনি পুরো সময়টা নীরবে শোনেন—এমনভাবে, যেন প্রতিটা শব্দ মাথার ভেতর আলাদা করে ওজন করে রাখছেন। আমি কথা শেষ করতেই তিনি বুঝিয়ে দেন, এই মুহূর্তে আর কোনো লেয়ার বা ডিপার্টমেন্টের মধ্যে ঘোরানোর সময় নেই। দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার, আর সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার সরাসরি কমান্ডো হেড আলফার।

লাইন সুইচ হয়।

Alpha চ্যানেল ওপেন হয়।

ওর কণ্ঠ শোনা মাত্রই আমি বুঝে যাই—এটা আর সাধারণ ব্রিফিং না। এখন যা বলা হবে, সেটার ওপর পুরো মিশনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

Alpha বলে,

“You encountered something that doesn’t follow planetary models.”

(তোমরা এমন কিছুর মুখোমুখি হয়েছো, যেটা কোনো পরিচিত গ্রহগত মডেল মেনে চলে না।)

এই কথাটার ভেতরে কোনো প্রশ্ন নেই। সে ধরে নিয়েছে—যা ঘটেছে, সেটা ব্যতিক্রম। আমি কোনো শব্দ সাজাই না, কোনো নিরাপদ ভাষা ব্যবহার করি না। সরাসরি বলি,

“Whatever it was, it learned faster than we could measure.”

(যাই হোক না কেন, সেটা আমাদের মাপার ক্ষমতার চেয়েও দ্রুত নিজেকে মানিয়ে নিতে শিখেছে।)

কয়েক সেকেন্ড নীরবতা নামে। এই নীরবতা চাপের, কিন্তু অস্বস্তির না। বুঝতে পারি, ওখানে বসে কেউ সম্ভাবনার হিসাব করছে—এই মিশন কতটা এগোনো উচিত, আর কতটা থামা উচিত।

তারপর Alpha প্রশ্ন করে,

“Can the mission continue?”

(এই মিশন কি এভাবে চালিয়ে যাওয়া সম্ভব?)

আমি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিই না। আগে রিমান আর রবার্টের দিকে তাকাই। দুজনের মুখেই ক্লান্তি আছে, কিন্তু দ্বিধা নেই। ওরা দুজনই জানে—এই প্রশ্নটার উত্তর ভুল হলে তার দায় শুধু আমার না, আমাদের সবার।

আমি আবার স্ক্রিনের দিকে তাকাই।

“Not like this.”

(এই অবস্থায় না।)

আমি ব্যাখ্যা করি,

“We need new parameters. New thresholds. And time.”

(আমাদের নতুন সীমা দরকার, নতুন হিসাব দরকার—আর সময় দরকার।)

Alpha ধীরে কথা বলে। ওর কণ্ঠে কোনো আবেগ নেই, কিন্তু বাস্তবতা খুব স্পষ্ট।

“Time is the one thing Rad15B may not allow. I think you should wait for Cyan–23’s recovery. We need updates from him too.”

(সময়ই একমাত্র জিনিস, যেটা Rad15B হয়তো আমাদের দেবে না। Cyan–23 পুরোপুরি সুস্থ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো। ওর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য আমাদের দরকার।)

এই কথার পর আর কিছু বলার থাকে না। সিদ্ধান্তটা আপাতত স্থগিত নয়—হস্তান্তরিত। Cyan–23 এখন শুধু একজন আহত ইউনিট না, সে হয়ে উঠেছে এই মিশনের একমাত্র জীবিত সাক্ষী।

আমি রবার্ট আর রিমান এর দিকে তাকিয়ে তাদের ফেইস এক্সপ্রেশন দেখে তারপর সম্মতি জানালাম। আমাদের কনফারেন্স শেষে আমরা ৩ জন মিলে রেস্ট নিতে নিতে আলাপ করতে থাকলাম।

আমি- "সিয়ান-২৩ এর কথা বলাতে আমি নিশ্চিত হলাম, সম্ভবত সে এমন কিছু দেখেছে, যা আমরা শিপের মধ্যে থেকে দেখতে পাইনি। তার বেচে ওঠা আর আমাদেরকে পুরোটা জানানো উচিত। এরপরে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারবো যে আমরা মিশন কন্টিনিউ করবো নাকি এবোর্ট করবো।"

মাথা নেড়ে রবার্ট সম্মতির ভঙ্গিতে বললো- "Cyan এর কোর চেক করেও সব ডাটা আউট করা যাবে না, কারন আমি যতটুকু জানি- সে প্রায়ই লজিক্যাল সমস্যা সমাধানে তার ব্রেইন পার্ট এর হেল্প নেয়, ভাগ্য ভালো যে তার মাথা ক্ষতিগ্রস্থ হয় নি। তা না হলে আমরা Cyan কে চিরতরে হারিয়ে ফেলতাম এবং ডাটা উদ্ধার ও সম্ভব হতো না।"

রিমান বললো- "আমাদের শিপ ড্যামেজ এর পথে ছিলো অথচ আমরা কোনো রিপোর্ট দেখলাম না স্ক্রিনে, খুব অস্বাভাবিক ব্যাপার, আমার কোডে এমন কোনো ভুল ছিলো না। আমি নিজে সব কয়েকবার করে চেক করে এসেছিলাম, তাছাড়া হেডঅফিস সব ফাইনাল চেকিং দিয়েছে, তারাও কোনো ভুল দেখেনি। বিষয়টা আমাকে ভাবাচ্ছে।"

আমি বললাম- "নিজেকে ব্লেইম দিও না, এখানে অন্য কোনো ফ্যাক্ট আছে, সেই প্লানেটে এমন কিছু বিষয় আছে যা আমাদের অত্যাধুনিক সিস্টেম্যাটিক লজিকেও ধরা দিচ্ছে না। হতে পারে এমন কিছু আছে সেখানে যা জানতে পারলে আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিধর গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে ..."

ইশারা দিয়ে তাকে আর কিছু বলতে না করলাম, কারণ আমরা জানি যে আমাদের বাইরের ওয়ার্ল্ড এ নিজেদের গবেষণা প্রকাশ এর সুযোগ নেই। তাছাড়া যদি কখনো প্রকাশ পায়, আমাদের উপর কঠিন দিন নেমে আসবে।

রবার্ট এইটা দেখে হাসতে লাগলো, বললো - "হাসালেন রিমান স্যার, আপনি খুব সহজ সরল মানুষ।"

হঠাত বাইরে শোরগোল শুনা গেলো, যদিও ভিতর থেকে বুঝার উপায় নেই, তবে আমাদের কাছে সেকেন্ডারি স্টেশনের কন্ট্রোল থেকে মেসেজ এসেছে- "Cyan-23 is fully recovered now!"

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। উফফফ এবার অন্তত অনেক হিডেন ডাটা কালেক্ট করা যাবে, যা জানার জন্য আমরা সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি। আমি দ্রুত রিমান আর রবার্ট কে নিয়ে মেডিকেল ইমার্জেন্সি রুমের দিকে ছুটলাম...

Story Cover