মহাজাগতিক স্পেসিস : পার্ট ৩

🟢

স্টেশনের গেট খুলে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিপের দিকে যাওয়ার করিডোরটা যেন হঠাৎ ছোট হয়ে আসে। আলো নীলচে, মেঝেতে হালকা কম্পন—সবকিছু ইঙ্গিত দিচ্ছে, সময় আর হাতে নেই। একে একে সবাই এগোতে থাকে, নির্দিষ্ট ক্রমে, নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে।

প্রথমে উঠে কমান্ড টিম। মানুষেরা নয়—নেতৃত্বের দায়িত্ব যাদের কাঁধে, তারা। তাদের চোখ সামনে, পেছনে তাকানোর সুযোগ নেই। শিপে ঢুকেই তারা কন্ট্রোল ডেকের দিকে যায়। কেউ ন্যাভিগেশন কনসোল জাগিয়ে তোলে, কেউ কমিউনিকেশন লাইনের প্রাইমারি চ্যানেল চেক করে। এই মুহূর্তে তাদের কাজ একটাই—শিপ যেন কথা শোনে, শিপ যেন সাড়া দেয়।

এরপর সাইবর্গ ইউনিটগুলো। ধাতব পায়ের শব্দ করিডোরে আলাদা করে শোনা যায়। তারা শিপে উঠেই নির্দিষ্ট পজিশনে দাঁড়িয়ে যায়, যেন জায়গাগুলো আগেই তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল। একজন সাইবর্গ ইন্টারনাল ডিফেন্স গ্রিড সিঙ্ক করে, আরেকজন নিউরাল ম্যাপ আপডেট করে নেয়। তাদের কাজ ভবিষ্যতের জন্য—যদি কিছু ভুল হয়, যদি কিছু অজানা সামনে আসে।

রোবো ইউনিটগুলো সবচেয়ে নিঃশব্দ। তারা ঢোকে, লক হয়, তারপর নিজ নিজ চার্জিং–স্ট্যান্ডবাই মোডে চলে যায়। কিছু রোবো কার্গো সেকশনে যায়—নিউট্রিশন ক্যাপসুল, ইকুইপমেন্ট, রিজার্ভ সিস্টেম সবকিছুর ওজন আর ব্যালান্স যাচাই করে। অন্যরা শিপের বাহ্যিক সেন্সর লাইনে যুক্ত হয়, যেন উড্ডয়নের মুহূর্তে কোনো ডাটা বাদ না পড়ে।

সবশেষে মানুষেরা—যারা সরাসরি কন্ট্রোল নেবে না, কিন্তু সিদ্ধান্তের বোঝা বহন করবে। তারা সিটে বসে হারনেস টাইট করে, হেলমেট লক করে। কেউ নিজের কবজির ডিসপ্লেতে শেষবারের মতো পৃথিবীর লাইভ ফিড দেখে নেয়, কেউ চোখ বন্ধ করে শ্বাস গোনে। এই কাজগুলো ছোট, কিন্তু এই ছোট কাজের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে সবচেয়ে বড় ভয়।

শিপের দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দটা ভারী। বাইরে স্টেশন, ভেতরে সবাই—দুটি জগত এখন আলাদা। কন্ট্রোল ডেক থেকে একের পর এক কনফার্মেশন আসে। “ক্রু অনবোর্ড।” “ইউনিট সিঙ্কড।” “অল সিস্টেম গ্রিন।”

এই মুহূর্তে কেউ আর আলাদা কেউ নয়। মানুষ, রোবো, সাইবর্গ—সবাই এখন একই শিপের অংশ। আর শিপটা প্রস্তুত—তাদের বহন করে অজানার দিকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

cyborg entering into the space-ship

কাউন্টডাউন শুরু হওয়ার মুহূর্তে স্টেশনটা আর একটা জায়গা থাকে না—এটা হয়ে যায় একটা শ্বাস নেওয়া–না নেওয়া জীবন্ত সত্তা। প্রতিটা সেকেন্ড যেন আলাদা করে টের পাওয়া যায়। স্ক্রিনে নামতে থাকা সংখ্যাগুলো শুধু সময় গুনছে না, মানুষের ভেতরের সাহস আর ভয়কেও একসাথে মাপছে।

স্টেশনের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা। কেউ কথা বলছে না, তবু চারপাশ ভরা চাপা শব্দে—দম আটকে রাখা শ্বাস, শক্ত করে চেপে ধরা হাত, হেলমেটের ভেতর চোখের নড়াচড়া। মানুষগুলো জানে, এই লঞ্চের পর আর কিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।

মানুষদের মুখে ভিন্ন ভিন্ন গল্প লেখা। কারও চোখে ভয়—খোলাখুলি নয়, বরং দায়িত্বের আড়ালে লুকানো। কারও মুখে ক্ষীণ হাসি—স্বপ্ন ছুঁয়ে দেখার আনন্দ। আবার কারও মুখে কোনো অভিব্যক্তিই নেই, যেন নিজেকে আগেই পাথর বানিয়ে নিয়েছে, যাতে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে হাত না কাঁপে।

রোবো ইউনিটগুলো একদম স্থির। তাদের চোখের সেন্সর নীল আলো ছড়াচ্ছে, প্রতিটা সিস্টেম সবুজ সংকেতে। তাদের কাছে এই মুহূর্তটা আবেগের না—এটা নিখুঁত হিসাবের ফল। কোনো ভয় নেই, কোনো প্রত্যাশাও নেই। শুধু আদেশ আর তার বাস্তবায়ন।

সাইবর্গদের অবস্থা সবচেয়ে জটিল। মানুষের স্মৃতি আর যন্ত্রের যুক্তি একসাথে কাজ করছে তাদের ভেতরে। হৃদস্পন্দন স্বাভাবিক, কিন্তু নিউরাল ইন্টারফেস দেখাচ্ছে অতিরিক্ত সচেতনতা। তারা ভয় পাচ্ছে—এই সত্যটা অস্বীকার করার চেষ্টা করছে না। বরং ভয়কে নিয়ন্ত্রণে রেখে সামনে তাকিয়ে আছে।

শেষ কয়েক সেকেন্ডে হঠাৎ সবকিছু শান্ত হয়ে যায়। এমন নীরবতা, যেখানে যন্ত্রের শব্দও দূরের মনে হয়। কেউ চোখ বন্ধ করে, কেউ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকে, কেউ আবার নিজের ভেতরের কণ্ঠটাকে শেষবারের মতো শোনে।

তিন… দুই… এক…

ঠিক সেই একের পরের ক্ষণটুকুতে—যখন কিছুই এখনো শুরু হয়নি, আবার সবকিছু শুরু হয়ে গেছে—স্টেশনের ভেতর সবাই বুঝে যায়, তারা আর আগের মানুষ, আগের রোবো, আগের সাইবর্গ নেই। এখন তারা সবাই একটাই জিনিস—একটা যাত্রার অংশ।

ইঞ্জিনের চাপটা হঠাৎ নেই হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার শরীরটা অদ্ভুতভাবে হালকা হয়ে উঠল। মনে হলো, কেউ যেন ভেতর থেকে ওজন খুলে নিয়েছে। সিটে বাঁধা না থাকলে হয়তো আমি নিজেই বুঝতে পারতাম না—আমি ভেসে আছি।

আমি ধীরে হাতটা সামনে তুললাম। আঙুলগুলো ঠিকমতো নিচে নামতে চায় না। এই অনুভূতিটা বইয়ে পড়া, সিমুলেশনে দেখা—কিন্তু বাস্তবে? এটা একেবারে আলাদা।

রিমান আমার ডান পাশে। ওর কণ্ঠটা হেলমেটের ভেতর দিয়ে ভেসে এলো— “গ্র্যাভিটি… gone।” কথাটা বলার সময় ওর গলায় চাপা বিস্ময়। ভয় না, আবার পুরোপুরি স্বস্তিও না।

রবার্ট কিছুক্ষণ চুপ করে ছিল। তারপর ধীরে বলল, “Ship is stabilizing।” ওর চোখ স্ক্রিনে আটকানো, কিন্তু আমি জানি—ওর মন অনেক দূরে চলে গেছে। রবার্ট এমনই। সবচেয়ে বিপদের সময় ওর কণ্ঠ সবচেয়ে শান্ত।

শিপটা ধীরে ধীরে স্থির হতে থাকে। প্রথমে হালকা দুলুনি, তারপর সবকিছু যেন জায়গা খুঁজে পায়। কন্ট্রোল ডেকের আলো নরম হয়ে আসে। স্ক্রিনে একটার পর একটা সবুজ সিগন্যাল জ্বলে ওঠে। এই সবুজগুলো আমাদের জন্য শুধু রং না—এগুলো বেঁচে থাকার প্রমাণ।

আমি গভীর শ্বাস নিলাম। এই প্রথম মনে হলো, লঞ্চটা শেষ হয়েছে। বুকের ভেতর জমে থাকা চাপটা একটু ঢিলে হলো। ভয়টা যায়নি, কিন্তু সেটা এখন আর গলা চেপে ধরছে না।

রোবো ইউনিটগুলো একদম নিখুঁত। কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, কোনো থমকে যাওয়া নেই। তারা ইতিমধ্যেই ফ্লাইট–অবজারভেশন মোডে। সেন্সর ডাটা বইছে, হিসাব চলছে। তাদের কাছে এই মুহূর্তটা নতুন না—শুধু আরেকটা স্টেট।

সাইবর্গদের দিকে তাকিয়ে আমার চোখ একটু থেমে যায়। ওরা মানুষের মতো শ্বাস নেয়, আবার যন্ত্রের মতো হিসাবও করে। গ্র্যাভিটি কাটার পর ওদের নিউরাল ইন্টারফেসে মাইক্রো-অ্যাডজাস্টমেন্ট চলছে। মুখ শান্ত, কিন্তু ভেতরে কী চলছে—আমি সেটা বুঝতে পারি। কারণ ভয়টা আমরা ভাগাভাগি করি।

আমি রিমান আর রবার্টের দিকে তাকালাম। কেউ হাসল না, কেউ কিছু বলল না। তবু আমরা তিনজনই বুঝে গেলাম—এই একটা মুহূর্ত পার হওয়া মানে, আর ফেরার কোনো সহজ রাস্তা নেই।

আমি হেলমেটের ভেতর নিজের কণ্ঠটা একটু জোরে শুনতে পেলাম— “Alright… next phase.”

এই কথাটা বলার সময় আমি জানতাম—লঞ্চ শেষ। কিন্তু মিশন… এখনই শুরু।

শিপটা স্থির হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আমি বুঝে গেলাম—এই শান্তিটা অস্থায়ী। সামনে যে ধাপটা, সেটার জন্য এই নিস্তব্ধতা দরকার ছিল। কন্ট্রোল ডেকের স্ক্রিনে সেকেন্ড স্টেশনের অরবিট ধীরে ধীরে পরিষ্কার হয়ে উঠছে।

আমি রিমানকে তাকালাম। ও আগেই বুঝে গেছে। কোনো প্রশ্ন নেই, শুধু মাথা নেড়ে সাড়া। রবার্ট তখন ডান পাশের কনসোলে—ডেটা স্ট্রিম দেখছে, দূরত্ব, টাইম উইন্ডো, সেপারেশন ভেক্টর।

“Special unit ready,” রবার্ট বলল শান্ত গলায়। এই শান্তটাই আমার সবচেয়ে বেশি ভয় লাগায়।

স্পেশাল ইউনিটটা আমাদের শিপের পেটের ভেতরেই ছিল—একটা আলাদা অস্তিত্ব, আলাদা উদ্দেশ্য নিয়ে। ওটা আমাদের সঙ্গে Rad15B যাবে না। ওটার কাজ সেকেন্ড স্টেশন। নিউট্রিশন ক্যাপসুল, খাবার, আর কিছু জরুরি সাপোর্ট—ওই মানুষগুলো এখন পুরোপুরি এর ওপর নির্ভর করছে।

আমি গভীর শ্বাস নিলাম। “Begin separation sequence.”

কোনো নাটকীয় শব্দ হলো না। কোনো ঝাঁকুনি না। শুধু একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন—যেন শিপের ভেতর থেকে কিছু একটা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। স্ক্রিনে দেখি, স্পেশাল ইউনিটটা ধীরে ধীরে পিছিয়ে যাচ্ছে, আমাদের থেকে দূরে সরে নিজের পথ ধরছে।

রোবো ইউনিটগুলোর কিছু অংশ ওটার সঙ্গে সিঙ্কড। তারা কোনো আবেগ ছাড়াই ট্রান্সফার মোডে ঢুকে গেল। তাদের কাছে এটা শুধু আরেকটা টাস্ক।

সাইবর্গদের একজন হালকা থেমে গেল। ওর চোখের আলো একটু বদলাল। আমি বুঝলাম—ওরা জানে, এই ইউনিটটা ফিরে আসবে কিনা, সেটা নিশ্চিত না। তবু কোনো আপত্তি নেই। আদেশ আদেশই।

আমি চোখ সরালাম না। স্পেশাল ইউনিটটা ছোট হতে হতে একসময় আলাদা একটা আলোর বিন্দু হয়ে গেল।

রিমান ধীরে বলল, “Once it docks… there’s no margin left.”

আমি মাথা নেড়েছি। জানি।

আমাদের শিপে তখন নজরদারি শুরু। কমিউনিকেশন সিঙ্ক ওপেন রাখা হলো। ডাটা আসছে—স্পেশাল ইউনিটের অবস্থান, স্টেশন থেকে সিগন্যাল, লাইফ সাপোর্ট স্ট্যাটাস।

এই মুহূর্তে আমরা কিছু করতে পারি না। শুধু দেখতে পারি। শুধু অপেক্ষা করতে পারি।

আমি নিজের মনে একটা কথা বললাম—এই মিশনে আমরা সবাই একসাথে শুরু করেছিলাম। কিন্তু এখন থেকে… সবাই একসাথে ফিরবে—এই নিশ্চয়তা আর নেই।

স্পেশাল ইউনিটটা সেকেন্ড স্টেশনের কাছে পৌঁছাতেই কন্ট্রোল ডেকের বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল। আমরা কেউ কথা বলছি না—শুধু স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছি। ডকিং ভেক্টর ঠিকঠাক বসছে কি না, ক্লিয়ারেন্স মিলছে কি না—সবকিছু সেকেন্ডের হিসেবে বদলাচ্ছে।

রবার্ট প্রথম নীরবতা ভাঙল। “Docking window stable… initiating final approach।” ওর কণ্ঠে কোনো নাটক নেই। কিন্তু আমি জানি, এই কয়েকটা সেকেন্ডেই সবকিছু নির্ধারিত হয়।

ডকিংয়ের ধাতব শব্দটা দূর থেকে শোনা গেল না—শুধু স্ক্রিনে একটা ছোট সবুজ চিহ্ন জ্বলে উঠল। Connected.

আমি হালকা নিঃশ্বাস ছাড়লাম। রিমান আমার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়েছে—একটা ছোট স্বীকৃতি, এর বেশি কিছু না।

স্টেশন থেকে ভিডিও ফিড খুলতেই প্রথম যেটা চোখে পড়ল, সেটা আলো না—মানুষের মুখ। ক্লান্ত, শুকনো, তবু জীবিত। কারও চোখে স্বস্তি, কারও চোখে লুকানো লজ্জা—এতটা নির্ভরশীল হয়ে পড়ার লজ্জা।

নিউট্রিশন ক্যাপসুলগুলো একে একে ট্রান্সফার হচ্ছে। রোবো ইউনিটগুলো নিখুঁত গতিতে কাজ করছে—ওজন ব্যালান্স, সিল ইন্টিগ্রিটি, সব চেক। খাবারের কন্টেইনারগুলো স্টেশনের ভেতরে ঢুকছে মানেই—ওখানকার সময় আরও কিছুদিন বাড়ল।

Products Unloaded to Space-station

স্টেশনের কমান্ড লাইন থেকে একজন কথা বলল। গলা ভারী, শব্দ কম। “Delivery confirmed. You don’t know what this means for us।” আমি কিছু বলিনি। কী বলব? আমরা সবাই জানি—এই ‘means’ শব্দটার ভেতর কতটা desperation লুকানো।

যোগাযোগটা ছোট ছিল। দরকারের কথাই শুধু। আবেগের জন্য সময় নেই। আমরা কেউই চাইনি এই লাইনটা বেশি লম্বা হোক—কারণ যত বেশি শোনা যাবে, তত বেশি বোঝা যাবে, ওখানকার মানুষগুলো কতটা ভেঙে পড়েছে।

স্পেশাল ইউনিটের রিটার্ন প্রস্তুতি শুরু হলো সঙ্গে সঙ্গে। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা রোবো ইউনিটগুলো আবার নিজের জায়গায় ফিরছে। কোনো বিদায় নেই, কোনো দেরি নেই। এই মিশনে থেমে থাকার মানে ঝুঁকি।

ডকিং ছাড়ার মুহূর্তে আমি স্ক্রিনে শেষবারের মতো স্টেশনটার দিকে তাকালাম। ছোট, পুরনো, ক্লান্ত—তবু মানুষের আশা ধরে রেখেছে।

রিমান খুব নিচু গলায় বলল, “They’ll survive… for now.”

আমি কিছু বললাম না। কারণ আমরা জানতাম—আমাদের সামনে যে পথ, সেখানে ‘for now’ শব্দটার দাম সবচেয়ে বেশি।

স্পেশাল ইউনিটটা আমাদের দিকে ফিরে আসতে শুরু করল। আর আমাদের শিপ—ধীরে ধীরে পরের বাস্তবতার দিকে ঘুরে দাঁড়াল।

স্পেশাল ইউনিট ফিরে আসার পর শিপের ভেতরের পরিবেশটা বদলে গেল। ডেলিভারির চাপ শেষ, কিন্তু সামনে যে কাজ—ওটা আরও ভারী। আমি নিজের সিট থেকে উঠে কন্ট্রোল ডেকের মাঝখানে ভেসে গেলাম। এখানে দাঁড়ানো মানে সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে থাকা।

রবার্ট ডেটা স্ট্রিমগুলো একসাথে টেনে আনল। সেকেন্ড স্টেশন থেকে পাওয়া সব তথ্য, আমাদের নিজস্ব স্ক্যান, আর্থ টানেলের হেডকোয়ার্টার থেকে আসা নির্দেশ—সবকিছু একটাই ফিডে জড়ো হতে শুরু করল। স্ক্রিনে Rad15B ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। রঙ অস্বাভাবিক, পৃষ্ঠের প্যাটার্ন অসমান, যেন গ্রহটা নিজেই কিছু লুকিয়ে রেখেছে।

আমি চোখ সরাতে পারলাম না। “Integrate everything,” আমি বললাম। এই গ্রহের সামনে কোনো আলাদা তথ্য রাখা যাবে না।

রোবো ইউনিটগুলো সঙ্গে সঙ্গে ল্যান্ডিং সেটাপে ঢুকে গেল। থ্রাস্টার ক্যালিব্রেশন, হুল স্ট্রেস চেক, অটো-ডিফেন্স গ্রিড অ্যাক্টিভেশন—সবকিছু একটার পর একটা নিখুঁতভাবে চলছে। তাদের কাছে Rad15B একটা ভ্যারিয়েবল মাত্র, কিন্তু ঝুঁকির মানটা অস্বাভাবিকভাবে উঁচু।

সাইবর্গদের প্রস্তুতি আলাদা। তাদের শরীরের ওপর বাড়তি লেয়ার যুক্ত হচ্ছে—রেডিয়েশন শিল্ডিং, সারফেস-অ্যাডাপ্টিভ বুট, নিউরাল সেফটি লক। আমি দেখছিলাম, ওরা জানে—ওখানে নামার মানে শুধু কাজ করা না, টিকে থাকার লড়াই।

এই মুহূর্তেই বাস্তবতাটা পুরোপুরি সামনে এসে দাঁড়াল। মানুষ নামবে না।

আমি নিজের কথাটা নিজেই শুনলাম। এটা কোনো নিয়ম না, এটা বাধ্যবাধকতা। Rad15B মানুষের জন্য নয়—অন্তত এখন না। শিপের ভেতরে যারা মানুষ, তাদের কাজ হবে অপেক্ষা করা, দেখা, সিদ্ধান্ত নেওয়া। নামার অধিকার শুধু সাইবর্গ আর নির্বাচিত রোবো ইউনিটদের।

রিমান আমার পাশে এসে থামল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “We stay up here… and watch them go down.”

আমি মাথা নেড়েছি। জানি। এই অপেক্ষাটাই সবচেয়ে কঠিন।

ল্যান্ডিং স্ক্যান শুরু হলো। গ্রহের পৃষ্ঠ থেকে অদ্ভুত রিডিং আসছে—কিছু স্বাভাবিক, কিছু একেবারেই না। ডিফেন্স সিস্টেম ফুল মোডে। কোনো কিছু অপ্রস্তুত রাখতে চাই না আমরা।

আমি শেষবারের মতো পুরো টিমের দিকে তাকালাম—মানুষ, রোবো, সাইবর্গ। এই শিপে সবাই প্রস্তুত, কিন্তু সবাই একভাবে নয়।

Rad15B সামনে। আমরা প্রস্তুত হচ্ছি নামার জন্য—আর একই সাথে, অজানার মুখোমুখি হওয়ার জন্য।

Rad15B প্রথমবার চোখে পড়তেই আমি বুঝে গেলাম—এই গ্রহটা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল না। শিপের জানালার বাইরে ধীরে ধীরে ভেসে উঠল তার পৃষ্ঠ। রঙটা ঠিক ধরা যায় না—মাটির মতো, আবার ধাতবও। কোথাও ঘন মেঘ, কোথাও ফাঁকা বিস্তার, যেন গ্রহটা নিজের শরীর ঢেকে রেখেছে অর্ধেক সত্য দিয়ে।

রবার্ট খুব ধীরে বলল, “Visual confirmed।” এই কথার ভেতরে কোনো স্বস্তি নেই।

আমি চোখ সরালাম না। এই দৃশ্যটা সিমুলেশনে ছিল, ডেটাতেও ছিল—কিন্তু বাস্তবের সামনে সেগুলো ফিকে। Rad15B যেন নড়ছে না, অথচ তাকিয়ে আছে।

ল্যান্ডিং বে খুলতেই শিপের ভেতরের আলো বদলে গেল। লাল আর নীল সিগন্যাল একসাথে জ্বলে উঠল। এই আলো মানে—ফেরার পথ খোলা আছে, কিন্তু নামার ঝুঁকি সম্পূর্ণ।

রোবো ইউনিটগুলো আগে এগিয়ে গেল। একে একে, নির্দিষ্ট ক্রমে। কোনো থেমে যাওয়া নেই, কোনো দ্বিধা নেই। তাদের পা ল্যান্ডিং প্ল্যাটফর্মে ছোঁয়ার সঙ্গে সঙ্গে গ্রহের মাধ্যাকর্ষণ ডেটা আপডেট হতে শুরু করল। ভারী না, হালকা না—অস্বস্তিকর।

এরপর সাইবর্গরা। ওদের দিকে তাকিয়ে আমার বুকটা অকারণেই শক্ত হয়ে গেল।

ওরা নামার সময় মানুষের মতো শ্বাস নেয়, আবার যন্ত্রের মতো স্থির। পা মাটিতে পড়তেই সারফেস-সেন্সর জেগে উঠল। নিউরাল লিংক লাইভ। আমি ওদের চোখ দিয়েই Rad15B দেখছি।

মাটিটা শক্ত, কিন্তু ভেতরে যেন ফাঁপা কিছু আছে। প্রতিটা পদচারণায় সূক্ষ্ম কম্পন। বাতাস আছে—কিন্তু সেটা শ্বাস নেওয়ার জন্য বানানো না। শুধু ছুঁয়ে যায়, ঠান্ডা, নির্লিপ্ত।

শিপে আমরা মানুষগুলো অপেক্ষা করছি। এই অপেক্ষাটা কোনো নিষ্ক্রিয়তা না—এটা বাধ্যতামূলক দূরত্ব।

রিমান আমার পাশে দাঁড়িয়ে। ওর কণ্ঠ নিচু, কিন্তু স্পষ্ট। “They’re down.”

আমি মাথা নেড়েছি। যোগাযোগ লাইভ, ডাটা আসছে, সবকিছু ঠিকঠাক দেখাচ্ছে—এখনও।

Rad15B-র মাটিতে প্রথম পদচিহ্ন পড়েছে। মানুষের না—সাইবর্গ আর রোবোর।

আমি জানতাম, এই অবতরণ ইতিহাস হবে। কিন্তু কেন জানি মনে হচ্ছিল—এই ইতিহাসের মূল্য আমরা এখনো পুরোটা বুঝে উঠতে পারিনি।

Rad15B–র মাটিতে নামার পর প্রথম কয়েক সেকেন্ড কেউ কথা বলেনি। এটা ভয়ের নীরবতা না—এটা অভ্যাসের নীরবতা। নতুন জায়গায় নামলে আমরা সবাই আগে শুনি, দেখি, অনুভব করি। কথা পরে।

আমি হেলমেটের ভেতর দিয়ে ধীরে বললাম, “Alright… slow sweep. No rush.”

সাইবর্গ ইউনিটগুলো ছড়িয়ে পড়ল। খুব বেশি দূরে না, খুব কাছেও না। ঠিক যেভাবে ট্রেনিংয়ে শেখানো হয়েছে। রোবো ইউনিটগুলো নিচু হয়ে স্ক্যান শুরু করল—মাটি, বাতাস, তাপমাত্রা। ডাটা আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

প্রথম দেখায় পরিবেশটা… স্বাভাবিক মনে হলো। এইটাই সমস্যা।

মাটির টেক্সচার অচেনা, কিন্তু শত্রুভাবাপন্ন না। আকাশ নিস্তব্ধ, বাতাসে কোনো ঝড় নেই। সেন্সর বলছে—রেডিয়েশন সীমার মধ্যে। আমি নিজের অজান্তেই রিমানকে বললাম, “Too calm.”

রিমান হালকা হেসে উত্তর দিল, “Yeah… planets like this never stay polite.”

রবার্ট তখন ডেটা দেখছে। ওর কণ্ঠটা হেলমেটে ভেসে এলো— “Surface readings consistent… but I’m seeing minor fluctuations.” মাইনর। এই শব্দটা আমরা জানি। এটা মানে—এখনো ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না।

Landing on Planet Rad15B

সাইবর্গ ইউনিট সিয়ান–২৩ সামনে এগোচ্ছে। ওর পদচারণা স্থির, সেন্সর ফুল অ্যাক্টিভ। হঠাৎ ও থামল।

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “Hold position. What do you see?”

এক সেকেন্ডের দেরি। তারপর উত্তর— “Data is… normal. But pattern mismatch detected.”

আমি রিমান আর রবার্টের দিকে তাকালাম। এই লাইনটা ভালো না। স্বাভাবিক ডাটা, কিন্তু প্যাটার্ন ভুল—মানে কিছু আছে, যেটা আমরা এখনো বুঝতে পারছি না।

রোবো ইউনিটের একটার সেন্সর হঠাৎ তাপমাত্রা স্পাইক দেখাল। খুব ছোট, খুব দ্রুত। চোখে পড়ার মতো না—কিন্তু আমাদের চোখ এটাই ধরার জন্য ট্রেন্ড।

আমি গলা শক্ত রেখে বললাম, “Everyone, raise alert level. Keep visuals tight.”

এই মুহূর্তে আমার ভেতরের এস্ট্রোনটটাই কথা বলছে। ভয় পেলে গলা চড়া হয় না। বরং আরও ঠান্ডা হয়।

পরিবেশ তখনো শান্ত। খুব শান্ত।

Rad15B–র ভূখণ্ড আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে—কিন্তু কোনো ভাষায় না। আর আমরা ধীরে ধীরে বুঝতে শুরু করছি—এই গ্রহটা যতটা পরিচিত দেখাচ্ছে, তার চেয়ে অনেক বেশি অচেনা।

এই এক্সপ্লোরেশন মাত্র শুরু। আর আমার বুকের ভেতর একটা পুরোনো অনুভূতি ফিরে আসছে—যেটা সাধারণত বিপদের ঠিক আগেই আসে।

সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল—ঠিক যতক্ষণ না হঠাৎ ডেটা চিৎকার করে উঠল।

রবার্টের কণ্ঠ এক ধাক্কায় বদলে গেল। “Spike detected. That’s not normal.”

আমি চোখ নামালাম লাইভ ফিডে। গ্রাফটা হঠাৎ করে ওপরে উঠে গেছে—একেবারে সোজা লাইন ভেঙে। “Where?” আমি জিজ্ঞেস করলাম, অপ্রয়োজনীয় শব্দ বাদ দিয়ে।

“Under the surface… moving,” রবার্ট বলল। এই ‘moving’ শব্দটাই বুকের ভেতর ঠান্ডা ঢুকিয়ে দিল।

ঠিক তখনই সিয়ান–২৩ থেমে গেল। একেবারে স্থির।

আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম, “Cyan–23, status.”

কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর নেই। তারপর ওর কণ্ঠ—ভাঙা না, কিন্তু অদ্ভুতভাবে ফাঁকা। “External force detected. Not mechanical. Not biological.”

এই লাইনটা শোনার পর রিমান গালি চাপা দিল। “Great. So what is it then?”

উত্তর পাওয়ার আগেই প্রথম আঘাতটা এল।

সিয়ান–২৩ হঠাৎ পেছনের দিকে ছিটকে গেল। যেন কেউ বা কিছু ওকে ছুঁয়েই ফেলে দিল—কিন্তু স্ক্রিনে কিছুই নেই। কোনো অবজেক্ট, কোনো ছায়া না। শুধু একটা বিকৃত ডিস্টরশন।

আমি চিৎকার করলাম না। “All units, defensive spread. Do NOT rush.”

একই মুহূর্তে ডান পাশের রোবো ইউনিটের শরীরে অ্যালার্ট জ্বলে উঠল। তার বাহুর ধাতব অংশটা… গলতে শুরু করল। আগুন নেই, অ্যাসিড নেই—তবু ধাতু তরল হয়ে ঝরে পড়ছে।

রিমান শক্ত গলায় বলল, “That’s corrosion without a source.”

আরেকটা রোবো ইউনিট দুই সেকেন্ডের মধ্যে অফলাইন। ডাটা স্ট্রিম হঠাৎ কেটে গেল, যেন কেউ মাঝখান থেকে ছিঁড়ে দিয়েছে।

আমি দাঁত চেপে বললাম, “Index Null… trigger it. Now.”

শিপের ভেতরে সঙ্গে সঙ্গে লাল আলো জ্বলে উঠল। Index Null মানে—এই পরিস্থিতির জন্য কোনো নাম নেই। মানে আমরা অজানার ভেতরে ঢুকে পড়েছি।

Rad15B তখন আর শান্ত দেখাচ্ছে না। মাটি কাঁপছে না, আকাশ বদলাচ্ছে না—কিন্তু সেন্সরগুলো পাগল হয়ে যাচ্ছে। নিয়ম ভাঙছে। পদার্থ তার স্বাভাবিক আচরণ ভুলে যাচ্ছে।

সিয়ান–২৩ আবার নড়ল। ওর এক পাশ কাজ করছে না।

আমি বললাম, “Hold on. We’re pulling you back.”

ওর উত্তর খুব ছোট। “Copy.”

এই একটা শব্দ শুনে বুঝলাম—ও এখনো আমাদের সঙ্গে আছে। কিন্তু কতক্ষণ থাকবে… সেটা কেউ জানে না।

এইটা আর এক্সপ্লোরেশন না। এইটা কনট্যাক্ট।

আর Rad15B প্রথমবারের মতো জানিয়ে দিল—আমরা এখানে স্বাগত নই।

Writer photo

তৈয়বুর রহমান

বিজ্ঞান ভিত্তিক কাল্পনিক গল্প লিখতে পছন্দ করেন। থ্রিলার, বৈজ্ঞানিক কল্পকথা এবং উপস্থাপনা সৌন্দর্য তার গল্পের মূল আকর্ষণ।

Writer Code: GB-A001