লঞ্চের আগের রাতগুলো অদ্ভুত হয়। সময় যেন স্বাভাবিক গতিতে চলে না—কখনো হঠাৎ থেমে যায়, আবার কখনো খুব দ্রুত পিছলে যায় হাতের ফাঁক দিয়ে। স্টেশনের করিডোরগুলো আজ বেশি শান্ত। খুব বেশি মানুষ চোখে পড়ছে না, অথচ জানি—ভেতরে ভেতরে সবাই জেগে আছে।
ডকিং বে–এর কাঁচের দেয়ালের ওপারে স্পেসশিপটা দাঁড়িয়ে আছে। আলো জ্বলে আছে, কিন্তু ইঞ্জিন এখনো নীরব। এই নীরবতাটা আমাকে অস্বস্তিতে ফেলে। কাল এই একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকবো না—এই ভাবনাটা মাথার ভেতর ধীরে ধীরে জায়গা নিচ্ছে।
হেড-অফিস থেকে শেষ মুহূর্তের আপডেট আসছে একের পর এক। সিকিউরিটি ক্লিয়ারেন্স রিফ্রেশ, বায়োমেট্রিক রি-চেক, নিউরাল সিঙ্ক টেস্ট—সবকিছু আবার নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। মনে হচ্ছে, কেউই কিছু ঝুঁকির বাইরে রাখতে চাইছে না।
আমার রুমে ফিরে দরজা বন্ধ করি। ব্যাগটা খোলা অবস্থায় বিছানার পাশে পড়ে আছে, কিন্তু আমি এখনো কিছু গুছাইনি। গুছানোর চেয়ে চিন্তা বেশি। মিশনের কাগজপত্র নয়—কালকের দিনটা নিয়েই।
লঞ্চ। শব্দটা ছোট, কিন্তু এর ভেতরে অজানা অনেক কিছু লুকানো থাকে।
আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে স্টেশনের বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকাই। কাল এই অন্ধকারটা আর দূরে থাকবে না। তখন আমরা এর ভেতরেই থাকবো—চাপা শব্দ, সীমিত অক্সিজেন, আর এমন সব সিদ্ধান্ত, যেগুলোর ফল আর ঠিক করা যাবে না।
ঘড়ির দিকে তাকাই। সময় এগোচ্ছে। কাল খুব কাছেই।
রিমানকে আমি খুঁজে পাই অবজারভেশন ডেকে। সে একা বসে আছে, সামনে ভেসে থাকা হোলোগ্রাফিক স্ক্রিনে কিছু ডেটা ঘুরছে, কিন্তু তার চোখ সেখানে নেই। মনে হয়, সে অনেক দূরের কিছু ভাবছে।
আমি কাছে যেতেই সে মাথা ঘুরিয়ে তাকায়। স্বাভাবিক হাসিটা দেয়, কিন্তু আজ সেটা একটু দেরিতে আসে।
“কাল,” সে বলে, খুব হালকা স্বরে।
আমি মাথা নাড়ি। এই একটা শব্দেই অনেক কথা লুকানো থাকে।
আমরা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি। এই নীরবতাটা অস্বস্তিকর না—বরং পরিচিত। রিমান এমনই, বড় কথা বলার আগে সময় নেয়। আমি তাকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই, আমার কবজিতে থাকা কমিউনিকেশন ব্যান্ডটা হালকা কম্পন দেয়।
হেড-অফিস।
আমি প্রজেকশন অন করি। মিশনের ডকুমেন্টস একে একে ভেসে ওঠে—রুট ম্যাপ, থ্রেট লেভেল, টাইমলাইন। সবকিছু খুব পরিমিত, খুব নিখুঁতভাবে সাজানো। যতটা নিখুঁত হলে সন্দেহ জাগে।
রিমান স্ক্রিনের দিকে তাকায়। তার চোখ এবার পুরো মনোযোগে ডেটার ওপর।
“লাস্ট আপডেট?” সে জানতে চায়।
“হ্যাঁ,” আমি বলি। “এটাই ফাইনাল হওয়ার কথা।”
সে আর কিছু বলে না, কিন্তু তার ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে যায়। আমি সেটা খেয়াল করি। রিমান সাধারণত এমন ডিটেইল চোখ এড়িয়ে যেতে দেয় না।
ডকুমেন্টের শেষ পাতাটা লোড হয়। সিস্টেম ক্লোজ করার আগেই আমি দেখি—মিশনের স্ট্যাটাসে একটা ছোট নোট যোগ করা হয়েছে। নতুন টাইমস্ট্যাম্প। খুব সাম্প্রতিক।
আমি ব্যান্ডটা বন্ধ করি।
রিমান আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন কিছু বলতে চায়, আবার চায় না।
“হেড-অফিস আজ বেশি অ্যাক্টিভ,” সে শেষে বলে।
আমি কোনো উত্তর দিই না। শুধু মনে হয়—এই ডকুমেন্টসগুলো যতটা বলছে, তার চেয়ে বেশি কিছু লুকিয়ে রেখেছে।
আমরা দু’জনই সেটা বুঝতে পারি।
আমি আবার ডকুমেন্টসগুলো খুলে দেখি। প্রথমবার যেটা চোখ এড়িয়ে গিয়েছিল, এবার সেটা ইচ্ছে করেই খুঁজছি। নামের তালিকা। ইউনিট বিভাজন। অ্যাসাইনমেন্ট কোড।
একটা একটা করে স্ক্রল করি।
মানুষ—আমি। রবার্ট।
তারপর… আর কেউ নেই।
মুহূর্তের জন্য মনে হয়, হয়তো চোখ ভুল করছে। আবার শুরু থেকে দেখি। আবার শেষ পর্যন্ত। কোনো জায়গাতেই রিমান-এর নাম নেই। না অপারেশন লিডে, না সাপোর্টে, না রিজার্ভেও না।
হঠাৎ স্টেশনের ভেতরের বাতাসটা ভারী মনে হয়।
রিমান তখনো আমার পাশেই দাঁড়িয়ে। সে আমার মুখের দিকে তাকায়—আমি বুঝতে পারি, সে বুঝে গেছে। আমি কিছু বলার আগেই সে বলে না, শুধু অপেক্ষা করে। এই অপেক্ষাটাই সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিকর।
“তোমার নাম নেই,” আমি শেষ পর্যন্ত বলি।
শব্দগুলো বেরোতেই নিজের কানে কেমন ফাঁকা শোনায়।
রিমান ধীরে শ্বাস নেয়। তার চোখে বিস্ময় নেই, রাগও নেই—বরং একটা অদ্ভুত স্থিরতা। যেন সে ভেতরে ভেতরে এই সম্ভাবনাটার জন্য প্রস্তুত ছিল।
“অফিশিয়ালি?” সে প্রশ্ন করে।
আমি মাথা নাড়ি।
“লিস্টে নেই। কোথাও না।”
সে কিছুক্ষণ চুপ থাকে। স্ক্রিনের দিকে তাকায়, তারপর জানালার বাইরে। অন্ধকার স্পেসে। সেই অন্ধকার, যেটার ভেতরে কাল আমরা ঢুকবো।
“হেড-অফিস সাধারণত এমন ভুল করে না,” সে ধীরে বলে।
এই কথাটাই আমার মাথার ভেতর চিন্তার ভাঁজ আরও গভীর করে দেয়। ভুল হলে ঠিক করা যেত। কিন্তু এটা যদি ভুল না হয়?
আমি ডকুমেন্টস ক্লোজ করি, কিন্তু মাথার ভেতর ফাইলটা বন্ধ হয় না। প্রশ্নগুলো একটার পর একটা উঠে আসে—কেন? কখন সিদ্ধান্তটা নেওয়া হলো? আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্তটা এত সহজে নেওয়া হলো?
রিমান এবার আমার দিকে তাকায়।
“তুমি কী ভাবছো?” সে জিজ্ঞেস করে।
আমি জানি, এই প্রশ্নটার উত্তর এখনই দেওয়া যাবে না। কারণ উত্তরটা শুধু তার জন্য না—পুরো মিশনের জন্য।
আর সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি অস্থির করে তোলে।
রিমান চলে যাওয়ার পরও আমি অবজারভেশন ডেকেই দাঁড়িয়ে থাকি। সে ইচ্ছে করেই একা থাকতে চেয়েছে—আমি বুঝেছি। কিছু মুহূর্ত এমন থাকে, যেখানে পাশে দাঁড়ানো মানে সাপোর্ট না, বরং চাপ।
আমি ধীরে কবজির কমিউনিকেশন ব্যান্ডটা অ্যাক্টিভ করি। ডাইরেক্ট লাইন। হেড-অফিস।
কয়েক সেকেন্ডের নীরবতা। তারপর পরিচিত কৃত্রিম কণ্ঠ—
“Special Command Channel acknowledged. Identity confirmed.”
হোলোগ্রাফিক ইন্টারফেস খুলে যায়। একটার পর একটা অথোরিটি লেয়ার পাস হয়। এই মুহূর্তে বুঝি—আমি যা করতে যাচ্ছি, সেটা ‘রুটিন’ না।
“আমি মিশন ফাইল নিয়ে প্রশ্ন তুলছি,” আমি সরাসরি বলি।
“Specify,” কণ্ঠটা ঠান্ডা।
“রিমান। কেন তার নাম নেই?”
একটু দেরি হয়। খুব সামান্য। কিন্তু আমি সেটা ধরতে পারি। হেড-অফিস কখনো দেরি করে না—যদি না কিছু রিক্যালকুলেট করতে হয়।
“Asset RIMAN-7 is not included in current deployment protocol.”
আমি দাঁত চেপে ধরি।
“সে এই মিশনের জন্য ট্রেইন্ড। এই টেরেইন, এই থ্রেট প্যাটার্ন—সবকিছুর লাইভ এক্সপেরিয়েন্স ওর আছে।”
আরও একবার সেই ক্ষুদ্র নীরবতা।
“Risk index exceeds acceptable range.”
এই কথাটা আমি আগেও শুনেছি। অনেকবার।
কিন্তু আজ এটা মানতে ইচ্ছে করে না।
“ঝুঁকি ছাড়া কোনো মিশন হয় না,” আমি বলি।
“আপনারা আমাকে, রবার্টকে পাঠাচ্ছেন। সিয়ান-২৩ পাঠাচ্ছেন। তাহলে শুধু রিমানই ঝুঁকি?”
কণ্ঠটা এবার একটু বদলায়। খুব সূক্ষ্ম।
“Human variables are being minimized.”
এই লাইনটা আমার ভেতরে কিছু একটা নড়িয়ে দেয়।
“তাহলে এটা মিশনের সিদ্ধান্ত, নাকি পরিসংখ্যানের?” আমি জিজ্ঞেস করি।
কিছুক্ষণ কোনো উত্তর আসে না। শুধু ইন্টারফেসে ডেটা স্ট্রিম বদলাতে থাকে। আমি জানি—ওরা হিসাব করছে, সম্ভাবনা মেলাচ্ছে, বিকল্প তৈরি করছে।
আমি আর অপেক্ষা করি না।
“এইটা স্পেশাল রিকোয়েস্ট,” আমি পরিষ্কার করে বলি।
“রিমান ছাড়া এই মিশনের ডাইনামিক বদলে যাবে। সে শুধু একজন সদস্য না—সে একটা ব্যালেন্স।”
শেষ কথাটা বলার সময় আমি নিজেই থমকে যাই।
‘ব্যালেন্স’—এই শব্দটা অফিসিয়াল রিপোর্টে লেখা যায় না।
অনেকক্ষণ পর উত্তর আসে।
“Request logged. Under review.”
আমি জানি, এই বাক্যের মানে অনেক কিছু হতে পারে। অনুমোদনও, সম্পূর্ণ বাতিলও।
ইন্টারফেস বন্ধ হয়ে যায়।
স্টেশন আবার আগের মতো শান্ত।
কিন্তু আমার মাথার ভেতর আর শান্তি নেই।
কারণ আমি বুঝে গেছি—এই সিদ্ধান্তটা শুধু হেড-অফিস নেবে না।
এর প্রভাব পড়বে আমাদের সবার ওপর।
হলরুমটা ধীরে ধীরে ভরে উঠছে। এটা কোনো সাধারণ ব্রিফিং স্পেস না—এটা এমন একটা জায়গা, যেখানে মানুষ কম, মেশিন বেশি কথা বলে। আলোটা সাদা নয়, হালকা নীলচে। যেন আবেগের জায়গা নেই—শুধু স্পষ্টতা।
প্রথমে ঢোকে সিয়ান-২৩ ইউনিট। একসাথে, একই গতিতে। তাদের বুটের শব্দ আলাদা করে শোনা যায় না—সবকিছু যেন সিঙ্ক করা। চোখগুলো স্বাভাবিক মানুষের মতো, কিন্তু দৃষ্টিতে মানবিক দ্বিধা নেই।
তাদের সামনে এগিয়ে আসে সিয়ান-২৩ এর লিড। নাম বলা হয় না—শুধু আইডেন্টিফায়ার।
“Unit C-23, Operational Cluster: Active.”
পরের মুহূর্তেই হলের অন্য প্রান্তে ইন্টেলিজেন্স রোবো ইউনিটগুলো অনলাইন হয়। কোনো হাঁটা নেই, কোনো চোখে চোখ রাখা নেই। শুধু বাতাসের ভেতর ভেসে ওঠা ডেটা-পালস, হালকা গুঞ্জন।
“Collective Intelligence Grid initialized.”
আমি রবার্টের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। রবার্ট চুপচাপ, যেমন থাকে সবসময়। তার মুখে সেই পরিচিত অভিব্যক্তি—যেটা বলে দেয়, সে ইতিমধ্যে নিজের ভেতরে সব কিছু আলাদা করে সাজিয়ে ফেলেছে।
রিমান একটু দূরে দাঁড়িয়ে। এখনো অফিসিয়ালি তালিকায় নেই, কিন্তু এখানে আছে। হয়তো শেষবারের মতো—এই ভাবনাটা মাথায় এসে অস্বস্তি তৈরি করে।
হলরুমের মাঝখানে প্রজেকশন অন হয়। টিম স্ট্রাকচার ভেসে ওঠে।
মানুষ—তিনজন।
আমরা তিনজনই দাঁড়িয়ে থাকি, কিন্তু আমি স্পষ্ট বুঝতে পারি—এই তিনজনের ভূমিকা এক নয়।
আমি সিদ্ধান্ত নিই।
রবার্ট কার্যকর করে।
রিমান… ব্যতিক্রম।
সিয়ান-২৩ ইউনিটগুলোর দিকে তাকাই। তারা আমাদের দিকে তাকাচ্ছে না—তারা ডেটার দিকে তাকায়। মানুষের মুখ তাদের জন্য রেফারেন্স, অগ্রাধিকার নয়।
রোবো ইউনিটগুলো ইতিমধ্যেই নিজেদের মধ্যে তথ্য আদান–প্রদান শুরু করে দিয়েছে। কোনো শব্দ নেই, কিন্তু আমি জানি—
তারা কথা বলছে। সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এবং আমাদের চেয়েও দ্রুত।
এই মুহূর্তে বুঝি—এই মিশনে মানুষ সংখ্যায় কম, কিন্তু দায় সবচেয়ে বেশি আমাদেরই।
আর এই অসমতা নিয়েই আমাদের সামনে এগোতে হবে।
হলরুমটা ধীরে ধীরে ভাগ হয়ে যায়—দৃষ্টিতে না, কিন্তু কাজে। মানুষ, সাইবর্গ আর রোবো ইউনিট—তিনটা আলাদা স্তর, একই মিশনের ভেতর।
আমি সামনে এগোই। রবার্ট আর রিমান আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমাদের সামনে কোনো কৃত্রিম স্ক্রিন নেই—শুধু আমি, আর আমার কণ্ঠ।
“আমরা এখানে এসেছি একটা নির্দিষ্ট কাজের জন্য,” আমি শুরু করি। “এই মিশনে কোনো ‘হিরো’ নেই। ভুল হলে—ভুলটা সবার।”
রবার্ট মাথা নিচু করে শুনছে। সে সবসময় এভাবে শোনে—চোখে নয়, ভেতরে।
রিমান আমার দিকে তাকায়। তার চোখে প্রশ্ন আছে, কিন্তু এখন সে প্রশ্ন করছে না।
আমি ম্যাপের দিকে ইশারা করি।
“প্রথম ধাক্কাটা আসবে আমরা ঢোকার আগেই। তখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় থাকবে না—শুধু প্রতিক্রিয়া থাকবে।”
আমি থামি। শব্দগুলো যেন জায়গা নেয়।
হলরুমের অন্য পাশে, একই সময়ে—সিয়ান-২৩ ইউনিটগুলো নিজেদের মধ্যে মুখ ফেরায়। কোনো শব্দ নেই, কিন্তু আমি জানি—ওরা ব্রিফিং নিচ্ছে।
“Cognitive sync: 98%.”
“Threat-response hierarchy aligned.”
রোবো ইউনিটগুলো তখন আরেক স্তরে চলে গেছে। গিবারলিংক মোড। মানুষের চোখে এটা নীরবতা, কিন্তু বাস্তবে—
লক্ষ লক্ষ হিসাব। সম্ভাবনার শাখা। সিদ্ধান্তের খসড়া।
ডেটা স্ট্রিম সরাসরি সিয়ান-২৩ ইউনিটগুলোর নিউরাল রিসিভারে ঢুকে যাচ্ছে। সাইবর্গরা চোখ বন্ধ করে নেয় এক সেকেন্ডের জন্য—এটাই তাদের সম্মতি।
আমি আবার কথা বলি।
“আমরা যদি বিচ্ছিন্ন হই,” আমি বলি, “তাহলে কমিউনিকেশন ফেরানোর দায়িত্ব আমার। কভার তোমরা।”
রবার্ট হালকা করে বলে, “যেমন সবসময়।”
রিমান কিছু বলে না। শুধু আমার দিকে তাকায়। তার দৃষ্টিতে আমি একটা প্রশ্ন পড়ি—‘আমি এখানে থাকবো তো?’
আমি উত্তর দিই না। এখন না।
হঠাৎ সিয়ান-২৩ ইউনিট লিড এগিয়ে আসে। তার কণ্ঠ মানুষের মতো, কিন্তু আবেগহীন।
“Command acknowledgment required.”
আমি তার দিকে তাকাই।
“রিপোর্ট।”
এক সেকেন্ডের ভেতর ডেটা আমার সামনে ভেসে ওঠে। রোবো ইউনিটের সিদ্ধান্ত, সাইবর্গদের প্রস্তুতি—সব কিছু প্রস্তুত।
সবাই প্রস্তুত।
সবাই।
এই মুহূর্তে শুধু একটাই জিনিস অনিশ্চিত।
আর সেটা কোনো মেশিন না—একজন মানুষ।
হলরুমের আলো হঠাৎ বদলে যায়। নীলচে সাদা আলো গাঢ় হয়ে আসে—এটা সংকেত। ব্যক্তিগত ব্রিফিং শেষ। এখন কেন্দ্রীয় নির্দেশনা।
একটার পর একটা চ্যানেল লাইভ হয়। দেয়ালের চারপাশে ভেসে ওঠে হেড-অফিসের সিল। শব্দহীন, কিন্তু ভারী।
তারপর সে আসে।
হোলোগ্রাফিক প্রজেকশন নয়—ডাইরেক্ট প্রেজেন্স ফিড। আলবার্ট ফ্লেমিয়ান।
এই নামটা কেউ উচ্চারণ করে না। সবাই বলে—
“আলফা।”
সে দাঁড়িয়ে আছে একেবারে স্থিরভাবে। বয়স বোঝা যায় না। চোখে এমন এক দৃষ্টি, যেটা মানুষকে মাপতে শেখে—শব্দ দিয়ে না, নীরবতা দিয়ে।
“আপনাদের সামনে আমি কোনো ভাষণ দিতে আসিনি,” আলফা বলে। “কারণ আপনারা কেউই এখানে ভুল করে আসেননি।”
হলরুমে কেউ নড়ে না। এমনকি সিয়ান-২৩ ইউনিটগুলোরও মাইক্রো-মুভমেন্ট থেমে যায়।
“এই মিশনে,” সে চালিয়ে যায়,
“মানুষ, সাইবর্গ, রোবো—সবাই একই উদ্দেশ্যে বাঁধা। কিন্তু দায় এক নয়।”
তার দৃষ্টি আমাদের দিকে আসে। মানুষের সারিতে।
“দায় পড়ে তাদের ওপর—যারা সিদ্ধান্ত নেয়।”
আমি তার চোখের দিকে তাকাই।
সে জানে, আমি কী প্রশ্ন করেছি।
সে জানে, আমি কী রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি।
আলফা হাত তোলে। স্পেসশিপের ব্লুপ্রিন্ট ভেসে ওঠে।
“আপনারা যে জাহাজে উঠতে যাচ্ছেন,” সে বলে, “ওটা শুধু বাহন না। ওটা একটা চলমান যুদ্ধক্ষেত্র।”
এক এক করে সিস্টেম লেয়ার হাইলাইট হয়। প্রতিটা নাম, প্রতিটা কোড খুব পরিচিত—কিন্তু আজ এগুলোর অর্থ আলাদা।
সে থামে। খুব অল্প সময়।
তারপর বলে—
“এবং মনে রাখবেন—এই মিশনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোনো বাইরের শত্রু না।”
হলরুম নিঃশব্দ।
“সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো—অসম্পূর্ণ সিদ্ধান্ত।”
এই কথাটা আমার ভেতরে আলাদা করে ধাক্কা দেয়।
কারণ আমি জানি—এখনো একটা সিদ্ধান্ত অসম্পূর্ণ।
আলফা হাত নামাতেই স্পেসশিপের ব্লুপ্রিন্টটা বদলে যায়। এবার সেটা শুধু কাঠামো না—ভেতরের সবকিছু একে একে উন্মুক্ত হতে থাকে, যেন জাহাজটা নিজেই নিজের গোপন কথা বলছে।
“এই জাহাজকে আমরা আর্মড বলি না,” আলফা বলে। “আমরা একে বলি—প্রস্তুত।”
প্রথম স্তরটা হাইলাইট হয়।
“প্যাসিভ ডিফেন্স।”
শিপের চারপাশে অদৃশ্য একটি স্তর জ্বলে ওঠে।
“রাডার-বেন্ডিং হাল। থার্মাল সিগনেচার ব্রেক। আর নিউরাল-নয়েজ মাস্ক।”
সে থামে।
“মানে—আপনাদের দেখার আগেই শত্রু আপনাদের হারিয়ে ফেলবে।”
দ্বিতীয় স্তরটা ভেসে ওঠে। এবার আলোটা লালচে।
“অ্যাক্টিভ ডিফেন্স।”
হলরুমে সিয়ান-২৩ ইউনিটগুলোর দৃষ্টি একসাথে সিস্টেমের দিকে যায়।
“অটো-ট্র্যাক লেজার গ্রিড। মাল্টি-ডাইরেকশনাল পালস ক্যানন। এবং শেষ স্তরে—ম্যানুয়াল ওভাররাইড।”
এই জায়গায় আলফা আমাদের দিকে তাকায়।
“এই ওভাররাইড কোনো মেশিন চালায় না। এইটা চালায় মানুষ।”
রবার্ট হালকা করে শ্বাস নেয়। আমি সেটা শুনতে পাই।
ব্লুপ্রিন্ট আবার বদলায়। এবার ভেতরের অংশ।
“ইন্টারনাল ডিফেন্স।”
করিডোরগুলো লাল হয়ে ওঠে।
“সেকশনাল লকডাউন। গ্র্যাভিটি শিফট। আর লাস্ট-রেজল্ট—লাইফ-সাপোর্ট আইসোলেশন।”
হলরুমে চাপা নীরবতা।
আলফা এবার শেষ সিস্টেমটা হাইলাইট করে। নামটা ভেসে ওঠে—কোডেড।
“এইটা আমি চাই না কখনো ব্যবহার হোক,” সে বলে। “কিন্তু আপনাদের জানা দরকার।”
সে আমাদের চোখে চোখ রাখে।
“এই জাহাজ নিজেকে ধ্বংস করতে পারে।”
এক মুহূর্তের জন্য মনে হয়, বাতাস থেমে গেছে।
“ক্যাপ্টেনের অনুমতি ছাড়া নয়,” আলফা যোগ করে। “কিন্তু সিদ্ধান্তের সময়… খুব কম।”
প্রজেকশন বন্ধ হয়ে যায়। আলো আবার আগের মতো।
আলফা শেষবারের মতো বলে—
“ডিফেন্স সিস্টেম আপনাদের বাঁচাতে পারে। কিন্তু কখন বাঁচাবে, আর কখন ছাড়বে—সেটা আপনাদের সিদ্ধান্ত।”
আমি বুঝি—এই মিশনে শত্রু বাইরে যেমন আছে, তেমনি ভেতরেও।
আর দুটোরই মুখোমুখি হতে হবে একই জাহাজে।
আলফা কথা শেষ করলেও কেউ নড়ে না। হলরুমে এমন এক নীরবতা নামে, যেটা ব্রিফিংয়ের পর আসে না—যেটা আসে সিদ্ধান্তের আগে।
আলো আগের মতো আছে, সিস্টেমগুলো অনলাইন, কিন্তু মানুষের ভেতরে একটা অদৃশ্য থামা।
আলফা আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে। বিশেষ করে মানুষের সারির দিকে। তার চোখ থামে আমার ওপর—এক সেকেন্ডের জন্য, হয়তো একটু বেশি।
“আপনাদের আর কিছু জিজ্ঞেস করার নেই,” সে বলে। “কারণ প্রশ্নের সময় শেষ।”
এই বাক্যটা ঘোষণা না, সতর্কতা।
সে ঘুরে দাঁড়াতে যাচ্ছিল, হঠাৎ থামে।
“একটা কথা মনে রাখবেন,” আলফা ধীরে বলে, “হেড-অফিস সবসময় তথ্য দেয়। কিন্তু সব তথ্য একসাথে দেয় না।”
এই লাইনটা সরাসরি কাউকে উদ্দেশ্য করে বলা নয়।
তবু আমার মনে হয়—এইটা আমার জন্যই।
প্রেজেন্স ফিড বন্ধ হয়ে যায়। হেড-অফিসের সিল মিলিয়ে যায় দেয়াল থেকে। আলো আবার স্বাভাবিক হয়, কিন্তু হলরুম আর আগের মতো লাগে না।
সিয়ান-২৩ ইউনিটগুলো একসাথে ঘুরে দাঁড়ায়।
“Awaiting deployment command,” লিড ইউনিটের কণ্ঠ শোনা যায়।
রোবো ইউনিটগুলো তখনো গিবারলিংকে। তাদের সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই পাঠানো হয়ে গেছে—আমি জানি, কিন্তু আমি সেটা এখনো দেখিনি।
রবার্ট আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। নিচু স্বরে বলে, “আলফা সাধারণত এমন কথা বলে না।”
আমি মাথা নাড়ি।
“আজ সে বলেছে।”
আমি চারপাশে তাকাই। সবাই প্রস্তুত। সবাই জানে কী করতে হবে।
সবাই—শুধু একটা বিষয় ছাড়া।
আমি আমার কমিউনিকেশন ব্যান্ডে নতুন নোটিফিকেশন টের পাই। হেড-অফিস থেকে নয়। ভিন্ন চ্যানেল। অঘোষিত।
আমি স্ক্রিন অন করি না।
এখনো না।
কারণ আমি বুঝে গেছি—এই মিশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা এখনো নেওয়া হয়নি।
আর সেটা নেওয়ার দায়িত্ব হয়তো আবার আমার কাছেই এসে পড়বে।