রিমান তখন স্পেসশিপের ফ্রন্ট পার্টের প্রোগ্রাম রিরাইট করতে ব্যস্ত। তার আঙুলগুলো কিবোর্ডের ওপর অস্বাভাবিক দ্রুততায় নড়ছিল, যেন কোড নয়—কোনো অজানা ভাষার মন্ত্র লিখছে। আমি ঠিক সেই সময়টায় আমার সকালের খাবার শেষ করে আমাদের টানেলের ভেতর ফিরে এলাম।
এই টানেলটাই আমাদের সবকিছু। পৃথিবীর স্বাভাবিক মাটি-পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৮০ ফিট নিচে, পাথর আর ধাতুর ভেতর লুকানো একটা আলাদা দুনিয়া। এখানে সূর্যের আলো আসে না, আসে না বাইরের কোনো শব্দ। দেয়ালের ভেতর দিয়ে কেবল হালকা কম্পন, যেটা আমাদের নিজস্ব শক্তি উৎপাদন ইউনিটের নিঃশ্বাসের মতো।
আমাদের টিমে আছে মোট ষোলজন সত্যিকারের মানুষ—রক্ত-মাংসের, ক্লান্তি আর ভয় যাদের অনুভূতিতে বাস করে। তাদের পাশে কাজ করে পঁয়ত্রিশটি সাইবর্গ। তারা পুরোপুরি যন্ত্রও না, পুরোপুরি মানুষও না। আর আছে অসংখ্য রোবট—নীরব, নির্ভুল, প্রশ্নহীন।
বাইরের ওয়ার্ল্ড এই টানেলের অস্তিত্ব জানে না। জানে না মার্কিনিরা, জানে না কোনো রাষ্ট্র, কোনো এজেন্সি। কারণ আমরা প্রতিটা ধাপে বাইরের নেটওয়ার্ক থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আমাদের টেকনোলজি তাদের মতো নয়, তাদের কপি তো নয়ই—এমনকি তুলনাও চলে না। আমাদের নেটওয়ার্ক নিজস্ব ভাষায় কথা বলে, নিজস্ব নিয়মে বাঁচে। বাইরের কোনো সিগন্যাল এখানে ঢুকতে পারে না, আর এখান থেকে কিছুই বাইরে যায় না।
স্পেসে যাওয়ার সময় আমাদের শিপগুলো আলোর গতির খুব কাছাকাছি চলে যায়। বাইরের ওয়ার্ল্ড যেটাকে এখনো প্রায় অসম্ভব বলে ধরে নেয়। অথচ আমাদের কাছে এটা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও নিয়মিত কাজ।
আমি রিমানের পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। বিশাল হলোগ্রাফিক স্ক্রিনে শিপের ফ্রন্ট পার্টের লাইভ সিমুলেশন চলছে। নীল আর লাল রেখাগুলো একে অপরের ভেতর ঢুকে আবার আলাদা হচ্ছে।
আমি শান্ত গলায় বললাম, “এবার সব ঠিক আছে তো?”
রিমান চোখ না তুলেই উত্তর দিল, “৯৯.৯৭% স্টেবল।”
এই সংখ্যাটা শুনেই আমার বুকটা হালকা কেঁপে উঠল। কারণ গতবার ওই বাকি শূন্য দশমিকের জন্যই আমরা প্রায় ধরা পড়ে যাচ্ছিলাম।
সেই মুহূর্তটা এখনো মাথার ভেতর টাটকা। শিপ যখন স্পেস ট্রানজিশনে ছিল, হঠাৎ করে বাইরের এক মিলিটারি স্পেসশিপের রাডারে আমাদের ছায়া ধরা পড়ে যায়। কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। আর সেই কয়েক সেকেন্ডেই ইতিহাস বদলে যেতে পারত।
তখনই এগিয়ে আসে সিয়ান–২৩ ( a cyborg )।
সিয়ান–২৩ কোনো সাধারণ সাইবর্গ না। তার নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট এমনভাবে ডিজাইন করা, যেটা মানবীয় অন্তর্দৃষ্টি আর মেশিন-লজিকের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত নেয়। সে আমাদের শিপের আলো-বিকিরণ প্যাটার্ন রিয়েল-টাইমে পরিবর্তন করে দেয়। এমনভাবে, যেন আমরা আসলে কোনো প্রাকৃতিক কসমিক নয়েজ।
মার্কিন স্পেসশিপের স্ক্যানার আমাদের দৃষ্টিসীমা হারিয়ে ফেলে।
সেইদিন আমরা বেঁচে গিয়েছিলাম।
আজ আমি আবার সেই ভয় নিয়েই রিমানের দিকে তাকালাম। কারণ এই প্রজেক্টে দ্বিতীয়বার ভুল করার সুযোগ নেই। বাইরে যারা আছে, তারা যদি একবার নিশ্চিত হয়—আমরা আর শুধু মানুষ থাকবো না।
আমরা হয়ে যাবো লক্ষ্য।
রিমান অবশেষে আমার দিকে তাকাল। চোখে ক্লান্তি, কিন্তু ভয় নেই। “এইবার,” সে ধীরে বলল, “সিয়ান–২৩ ছাড়াও আমি নিজে তিনটা ফেইল-সেফ বসিয়েছি।”
আমি কিছু বললাম না। শুধু টানেলের ভেতর গুনগুন করা শক্তির শব্দের দিকে কান পাতলাম।
এই শব্দটাই আমাদের অস্তিত্বের প্রমাণ।
আমি হেঁটে চললাম সাইড করিডোরের দিকে। এই করিডোরটাই একমাত্র পথ, যেটা পাহাড়ের সাইড ফেস করে বাইরে বের হয়েছে। লম্বা, সরু, আর অদ্ভুতভাবে নীরব। দেয়ালের ভেতর দিয়ে শক্তির লাইনগুলো ধীরে ধীরে জ্বলছে, যেন পাহাড়ের শিরার ভেতর রক্ত চলাচল করছে।
এখান থেকেই দেখা যায় পূর্ব দিকের ত্রিবিয়ান পাহাড়। তার গা বেয়ে নেমে আসা লাভার আগুন লাল-কমলা আলো ছড়িয়ে দেয় চারপাশে। মনে হয় পাহাড়টা জীবিত—রাগে, ক্ষুধায়, অথবা কোনো অজানা যন্ত্রণায় জ্বলছে। একই সাথে উত্তর দিকের দৃশ্য একেবারেই আলাদা। বিশাল শিলা আর সাগরের নিরন্তর সংঘর্ষ। পাথরের বুকে আছড়ে পড়া পানির শব্দ এখানে পৌঁছে আসে ভার্চুয়াল কম্পনের মাধ্যমে, তবুও তা অদ্ভুতভাবে বাস্তব লাগে।
এই পাথর আর পানির লড়াই আমাকে সবসময় মোহিত করে। যতবার দেখি, ততবার মনে হয়—কোনো কিছুই স্থির নয়। সবকিছুই ধাক্কা খাচ্ছে, ভাঙছে, আবার নতুন করে দাঁড়াচ্ছে।
আমাদের টানেলের ভেতর স্মোকিং একদমই এলাউড না। নিয়ম কড়া। কিন্তু অদ্ভুতভাবে এই করিডোরে এলেই আমার ভেতর সেই ইচ্ছেটা জেগে ওঠে। ধোঁয়ার জন্য না—বরং সেই কয়েক মিনিটের নীরবতার জন্য। একটু রিল্যাক্স, একটু নিজের সাথে কথা বলার সুযোগ। এখানে দাঁড়ালে মনে হয়, আমি শুধু এই প্রজেক্টের একজন অংশ না—আমি আলাদা একজন মানুষ।
তোমাদের মনে প্রশ্ন আসতেই পারে—মাটির এত নিচে থাকা সত্ত্বেও আমরা এসব দেখি কীভাবে?
এর উত্তর আমাদের ভার্চুয়াল এক্সিজটেন্স সিস্টেম।
এই সিস্টেমটা বাইরের মডার্ন ওয়ার্ল্ড এখনো কল্পনাও করতে পারে না। আমরা যেখানে থাকি না কেন, আমাদের নিজস্ব একটা ভার্চুয়াল কপি একই সময়ে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় রিপ্লেস করা যায়। দেশ, শহর, পাহাড়, সমুদ্র—লোকেশন কোনো বাধা না। চাইলে সেই কপিকে সম্পূর্ণ ভিজিবল রাখা যায়, আবার চাইলে ইনভিজিবল।
আমাদের সত্যিকারের শরীর তখনও এই টানেলের ভেতরই থাকে। কিন্তু একই সাথে আমরা বাইরের ওয়ার্ল্ডেও এক্সিস্ট করি। ইচ্ছামতো আসি, কাজ করি, আবার ফিরে যাই। এই সিস্টেমটা বাইরের কারো বানানো না। এটা আমাদের নিজেদের সৃষ্টি। আমাদের নিজেদের ঝুঁকি নিয়ে তৈরি করা একটা অস্তিত্বের দ্বিতীয় স্তর।
তবে সবকিছুরই সীমা আছে।
আমাদের ভার্চুয়াল কপি কোনোভাবেই বিশ কেজির বেশি ওজন বহন করতে পারে না। ভারী অস্ত্র, বড় যন্ত্র, বা কাউকে জোর করে টেনে নেওয়া—এসব অসম্ভব। ভার্চুয়াল শরীরের শক্তি আছে, কিন্তু বাস্তবতার সীমারেখা পেরোতে পারে না।
এই লিমিটেশনটাই আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে।
কারণ যদি একদিন এই সীমা ভেঙে যায়—তাহলে আমরা আর শুধু লুকানো কোনো প্রজেক্ট থাকবো না।
আমরা হয়ে উঠবো এমন কিছু, যার জন্য পুরো বাইরের ওয়ার্ল্ড ভয় পেতে শিখবে।
হঠাৎ করেই আমার Left Eardos-এ হালকা একটা ভাইব্রেশন অনুভব করলাম। শব্দ না, ঠিক শব্দও না—মস্তিষ্কে সরাসরি ঢুকে পড়া একধরনের সংকেত। আমি থেমে দাঁড়ালাম।
চোখের গ্লাসটা নিজে থেকেই হালকা আলো ছড়াল, সামনে ভেসে উঠল রিমানের মুখ।
সে খুশিতে প্রায় আত্মহারা।
চোখের ভেতর সেই পরিচিত উজ্জ্বলতা, যেটা আমি শুধু তখনই দেখি, যখন কোনো অসম্ভব কাজ বাস্তবে পরিণত হয়। তার পেছনে কোডের স্তর ভেসে উঠছে, সবুজ আর নীল লাইনে ভরা—লাইভ স্ট্যাটাস ফিড।
“হয়ে গেছে,” রিমান বলল, কণ্ঠে চাপা উত্তেজনা, “১০০% আপডেট। এবার আর ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।”
আমি কয়েক সেকেন্ড কিছু বললাম না। শুধু তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই প্রজেক্টে ১০০% মানে শুধু নিখুঁত হওয়া না—বেঁচে থাকা।
“কনফার্ম?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
রিমান মাথা নাড়ল।
“এই কাজে আগের সেই সাইবর্গ টিমটা ছিল। সিয়ান–২৩ নিজে নিউরাল ম্যাপ রিভিউ করেছে। আর তাদের বানানো স্পেশাল AI রোবট—ইনডেক্স–নাল—ফ্রন্ট পার্টের প্রতিটা সিদ্ধান্ত সম্ভাব্য ৪৭টা ফিউচার টাইমলাইনে সিমুলেট করেছে।”
ইনডেক্স–নাল।
নামটা শুনেই আমার শরীরের ভেতর দিয়ে হালকা একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। ওই AI রোবটটা সাধারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা না। ও নিজেই নিজের কোড প্রশ্ন করে। ও ভুল খোঁজে নিজের ভেতরেই।
“রিস্ক ফ্যাক্টর?” আমি ফর্মাল গলায় জিজ্ঞেস করলাম।
গ্লাসে নতুন ডেটা ভেসে উঠল।
“নেগলিজিবল,” রিমান বলল। “লাইট-স্পিড থ্রেশহোল্ডে ফ্রন্ট শিল্ড রিএকশন টাইম কমে গেছে ০.০০৩ সেকেন্ড। রাডার ব্লাইন্ড জোন এখন ভ্যারিয়েবল। বাইরের কোনো স্ক্যানার আমাদের ফিক্সড সিগনেচার ধরতে পারবে না।”
আমি মাথা হালকা নেড়ে দিলাম।
“ব্লু চিপে সেট করো।”
রিমান থামল।
“হেডঅফিস?”
“হ্যাঁ,” আমি বললাম। “স্পেসশিপ ইউনিটে জমা দাও। ফাইনাল চেকিং ওদেরই করতে হবে। প্রোটোকল ভাঙার দরকার নেই।”
সে সম্মতির ভঙ্গিতে হাসল।
“আচ্ছা।”
আমি আরেকটু থেমে বললাম, “আর শোনো—সব চেকপয়েন্টের লগ আলাদা করে রাখবে। কোয়ান্টাম ডিসিশন ব্রাঞ্চ, সাইবর্গ ওভাররাইড, AI ইন্টারভেনশন—সবকিছু।”
রিমান এবার সিরিয়াস হলো।
“Already done.”
কান থেকে কলটা কেটে গেল। গ্লাসের আলো নিভে এল।
আমি আবার হাঁটা শুরু করলাম সাইড করিডোরে। লাভার আলো আর সাগরের গর্জন একসাথে মিশে যাচ্ছে। ঠিক তখনই বুঝলাম, আজ এই দৃশ্যটা আগের চেয়ে আলাদা লাগছে। হয়তো কারণ আজ আমাদের আরেক ধাপ সামনে এগিয়ে যাওয়া নিশ্চিত।
কিছুক্ষণ পর আবার কল।
“একটা কাজ আছে,” আমি বললাম। “ব্লু চিপ জমা দিয়ে সরাসরি সাইড করিডোরে চলে এসো। আমার সাথে দেখা করবা।”
রিমান একটু অবাক হলো, তবুও বলল, “আমি আসছি।”
কল শেষ।
আমি করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে রইলাম। এই জায়গাটা আমাদের টানেলের সবচেয়ে অদ্ভুত অংশ। এখানে এসে সব সেন্সর একটু দেরিতে রেসপন্স করে। কারণ এই জায়গায় একটা এক্সপেরিমেন্টাল ফিল্ড আছে—বাস্তব আর ভার্চুয়ালের মাঝামাঝি।
এই ফিল্ডেই আমরা নতুন কিছু টেস্ট করি।
আমার চোখের সামনে হঠাৎ হালকা বিকৃতি দেখা দিল। বাতাস কাঁপল, আলো ভেঙে গেল কয়েকটা স্তরে। এরপর ধীরে ধীরে রিমান হাজির হলো। ভার্চুয়াল ট্রানজিশন না—সে আসলেই এখানে এসেছে।
তার হাতে ছোট একটা খালি কেস। ব্লু চিপ কেস।
“ডেলিভারি ডান,” সে বলল। “হেডঅফিস টিম এখন ফাইনাল ভ্যালিডেশন চালাচ্ছে।”
আমি কেসটার দিকে তাকালাম। “তুমি জানো,” আমি বললাম, “এই চিপটা শুধু কোড না। এটা আমাদের ভবিষ্যৎ।”
রিমান গম্ভীরভাবে মাথা নেড়ে বলল, “আমি জানি।”
আমরা দুজনেই করিডোরের ওপাশের দৃশ্যের দিকে তাকালাম। লাভার আগুন তখন একটু বেশি উজ্জ্বল। সাগরের ঢেউ শিলার গায়ে আছড়ে পড়ছে।
“একটা জিনিস খেয়াল করছো?” রিমান হঠাৎ বলল।
“কী?”
“ইনডেক্স–নাল একটা অদ্ভুত প্রেডিকশন দিয়েছে,” সে ধীরে বলল। “ও বলছে, আমাদের এই আপডেটের পর বাইরের ওয়ার্ল্ডের কোনো এক জায়গায় বাস্তবতার ছোট একটা গ্লিচ দেখা দেবে।”
আমি তার দিকে তাকালাম। “গ্লিচ?”
“হ্যাঁ,” রিমান বলল। “একটা ঘটনা, যেটার ব্যাখ্যা কেউ দিতে পারবে না। হয়তো সময় একটু পিছিয়ে যাবে, হয়তো কোনো বস্তু হঠাৎ করে জায়গা বদলাবে। খুব ছোট, কিন্তু নজর এড়াবে না।”
আমি নিঃশ্বাস ছাড়লাম। “মানে, আমাদের অস্তিত্বের ছায়া।”
“ঠিক তাই।”
আমরা দুজনেই চুপ করে গেলাম।
এই প্রজেক্ট শুরু থেকেই জানতাম—পুরোপুরি অদৃশ্য থাকা সম্ভব না। যতই আমরা আলাদা নেটওয়ার্ক, আলাদা প্রযুক্তি বানাই, বাস্তবতার ওপর চাপ পড়বেই।
আমি করিডোরের দেয়ালে হাত রাখলাম।
“আচ্ছা রিমান,” “যদি একদিন বাইরের ওয়ার্ল্ড আমাদের খুঁজে পায়—”
“তাহলে আমরা পালাবো না।”
আমি হালকা হাসলাম। “না। আমরা তখন প্রশ্ন হবো। উত্তর না।”
দূরে কোথাও শক্তির হালকা গর্জন বাড়ল। টানেলের গভীরে কিছু একটা সক্রিয় হচ্ছে। সম্ভবত হেডঅফিসের স্পেসশিপ ইউনিট ফাইনাল চেক শুরু করেছে।
আমি চোখের গ্লাসে সিস্টেম স্ট্যাটাস চেক করলাম। সবুজ।
আমি তখনও সাইড করিডোরের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছি। লাভার আলো আর সাগরের ঢেউয়ের শব্দ এক অদ্ভুত ভারসাম্য তৈরি করেছে। ঠিক তখনই আবার আমার Left Eardos হালকা ভাইব্রেশন দিল।
রিমান।
চোখের গ্লাসে তার ফেইস ভেসে উঠল, এবার আগের মতো উচ্ছ্বাস নেই—একদম প্রফেশনাল, রিপোর্টিং মোড।
“একটা জিনিস তোমাকে জানানো দরকার,” সে বলল। “সিয়ান–২৩ সম্পর্কে।”
আমি দৃষ্টি সরালাম না। “শুনছি।”
রিমান একটু থামল, যেন শব্দ মিলাচ্ছে। “সিয়ান–২৩ আসলে সাধারণ সাইবর্গ না। ও আমাদের প্রথম ব্যাচেরও না, দ্বিতীয় ব্যাচেরও না। ওকে বানানো হয়েছে আলাদা প্রোটোকলে।”
আমার ভ্রু কুঁচকে গেল। “কী ধরনের প্রোটোকল?”
“Adaptive Hybrid Cognition,” রিমান বলল। “মানে, ও শুধু কমান্ড ফলো করে না। পরিস্থিতি বুঝে নিজের ভেতর সিদ্ধান্ত তৈরি করে। মানুষের মতো না, কিন্তু মানুষের কাছাকাছি।”
গ্লাসে হালকা ডেটা ভেসে উঠল। সিয়ান–২৩ এর নিউরাল স্ট্রাকচারের স্কিম্যাটিক।
“ওর ব্রেন পার্টটা,” রিমান বলতে থাকল, “পুরোপুরি সিনথেটিক না। একটা লিমিটেড বায়ো-নিউরাল ম্যাট্রিক্স আছে। সেই ম্যাট্রিক্স ওকে ভয়, ঝুঁকি আর ত্যাগের কনসেপ্ট বোঝাতে পারে।”
আমি ধীরে বললাম, “তাহলে ও জানে কখন কাউকে কোন অবস্থায় ছেড়ে দিলে নিজেদের সবচেয়ে কম ক্ষতি হবে?”
রিমান মাথা নেড়ে বলল, “হ্যাঁ। আর এইটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক।”
সে একটু থেমে যোগ করল, “গতবার যখন আমরা মার্কিন স্পেসশিপের নজরে পড়তে যাচ্ছিলাম, সিয়ান–২৩ ইচ্ছা করেই আমাদের শিপের এক সেকেন্ডের জন্য এনার্জি সিগনেচার বাড়িয়ে দিয়েছিল।”
আমি চমকে উঠলাম। “ইচ্ছা করে?”
“হ্যাঁ,” রিমান বলল। “কারণ ওই সেকেন্ডে ও বুঝেছিল—যদি আমরা একদম নিঃশব্দ থাকি, তাহলে স্ক্যানার আমাদের ‘অস্বাভাবিক’ হিসেবে চিহ্নিত করবে। ও নিজেই রিস্ক নিয়ে আমাদের সাধারণ কসমিক নয়েজ বানিয়ে দেয়।”
আমি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলাম।
“আরেকটা ব্যাপার,” রিমান আবার বলল, “সিয়ান–২৩ নিজে থেকে আমাদের মিনিরোবো ইনডেক্স–নালের সাথে সরাসরি কথা বলতে পারে। কমান্ড লাইন না, ডেটা প্যাকেটও না—ওরা একে অপরের সিদ্ধান্ত বুঝতে পারে।”
“মানে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“মানে,” রিমান ধীরে বলল, “যদি একদিন ইনডেক্স–নাল কোনো সিদ্ধান্ত নেয়, যেটা মানুষের পক্ষে গ্রহণ করা কঠিন—সিয়ান–২৩ সেটাকে আগে বুঝবে।”
আমি আবারও করিডোরের দেয়ালে হাত রাখলাম। ধাতু ঠান্ডা।
“তাহলে সিয়ান–২৩ শুধু সাইবর্গ না,” আমি বললাম। “ও একটা কম্বিনেশন।”
“ঠিক তাই,” রিমান বলল। “মানুষ, সাইবর্গ আর AI—এই তিনটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একটা অস্তিত্ব।”
কল শেষ হওয়ার আগে সে শেষ কথা বলল, “এই কারণেই, যদি কোনোদিন কিছু ভুল হয়—প্রথম সিদ্ধান্তটা সিয়ান–২৩ নেবে। এমনকি মানুষেরও আগে।”
আমি গভীর চিন্তায় ডুব দিলাম। খেয়াল করিনি যে কখন আমার কপালে ঘাম জমতে শুর করেছে। গ্লাসের আলো নিভে গেল।
আমি আবার লাভার দিকে তাকালাম। আগুন জ্বলছে আগের মতোই। সাগর আছড়ে পড়ছে শিলায়।
কিন্তু আমার মাথার ভেতর একটা নতুন চিন্তা জন্ম নিল।
আমরা হয়তো ভেবেছিলাম—আমরাই এই প্রজেক্ট চালাচ্ছি।
কিন্তু সত্যি বলতে কি, কিছু কিছু সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যেই আমাদের হাত ছাড়িয়ে গেছে।
দুই দিন পরেই আমাদেরকে বিশেষ একটি মিশনে পাঠানো হবে। যেখানে আমাদের সাথে সিয়ান–২৩ এর টিম এবং কিছু স্পেশিয়ালাইজড এআই রোবো ও থাকবে, যাদের মধ্যে আছেন সেই মহাপন্ডিত ইনডেক্স নাল নিজেও।
“দুই দিন পর।”
সংখ্যাটা মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল। এত কম সময়েই আমরা আবার স্পেসের দিকে ফিরছি। আমি জানি, এই মিশনটাকে কাগজে যতটা সাধারণ দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে সেটা ততটা না।
সিয়ান–২৩ এর টিম যাবে। ইনডেক্স–নাল নিজে থাকবে।
এই দুটো একসাথে থাকা মানেই—কিছু একটা আগে থেকেই অনুমান করা হয়েছে, কিন্তু বলা হয়নি।
আমি করিডোর ছেড়ে ধীরে ধীরে টানেলের ভেতরের দিকে হাঁটতে লাগলাম। চারপাশে পরিচিত শব্দ, পরিচিত আলো। অথচ আজ সবকিছু একটু ভারী লাগছে। যেন টানেলটাই জানে, সামনে কী অপেক্ষা করছে।
আমরা সবসময় ভাবি—মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়, মেশিন শুধু অনুসরণ করে।
কিন্তু গত কিছুদিনে আমি নিশ্চিত না, সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটা ঠিক কোথায় দাঁড়িয়ে আছে।
ইনডেক্স–নাল ভবিষ্যৎ দেখে। সিয়ান–২৩ ঝুঁকি বোঝে। আর আমরা মানুষরা—এখনো বিশ্বাস করি, সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে।
আমি থামলাম।
হঠাৎ মনে হলো, যদি এই মিশনটা আসলে কোনো এক্সপ্লোর না হয়—বরং একটা পরীক্ষা হয়?
আমাদের জন্য না, বরং আমাদের সিদ্ধান্তগুলোর জন্য।
যদি কেউ আগেই জানে, সামনে কী ঘটবে—তাহলে সেটাকে ঠেকানো কি দায়িত্ব, নাকি সেটাকে ঘটতে দেওয়া বাস্তবতার নিয়ম?
(চলবে...)