মাইনাসে মাইনাসে প্লাস

পর্ব - ২৪

🟢

নেহাল কোনোভাবেই লিলিকে সামলে নিতে পারছে না। অপ্রকৃতস্থের মতো বিলাপ করছে মেয়েটা। এই হারানোর শোক অসহনীয়, কোনো সান্ত্বনাই প্রলেপ দেবার জন্য পর্যাপ্ত নয়।

তোহিদার প্রতি নেহালের এই কয়দিনে একটা বড় শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি হয়েছিল। মেয়েকে প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসতেন। মেয়ে যা-ই করুক, তিনি সর্বক্ষণ নেহালকে বলতেন, তার মেয়েকে যেন সে একটু বুঝতে চেষ্টা করে। মেয়েকে যেন ভালোবেসে আগলে রাখে।

একজন প্রায় নিঃসঙ্গ যো দ্ধা র একমাত্র অবলম্বন ছিল। আজ স্বয়ং যো দ্ধা নিজেই বিদায় নিয়েছেন। যাবার আগে দায়িত্বের গুরুভার অর্পণ করেছেন নেহালকে। সে সর্বস্ব দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করবে। কারণ যো দ্ধা র আগলে রাখা পরম সাধনার ধনকে তো সে-ও ভালোবাসে। নিজের জন্যই করবে নেহাল। লিলি ভালো না থাকলে সে ভালো থাকে না, ওর কষ্টগুলো নিজের কষ্ট বলে মনে হচ্ছে!

"একবার উঠে আমাকে ক্ষমা চাইবার সুযোগটুকু দিয়ে যাও আম্মু৷ আমার সমস্ত জীবনের সমস্ত অর্জনের বিনিময়ে হলেও একবার চোখ খুলে আমার দিকে তাকাও আম্মু। আমি শুধু একবার বলব, আমি ভুল করেছি, আমাকে মাফ করে দাও। তোমার প্রশ্রয়ে একবার তোমার হাতটা আমার মাথায় রাখো আম্মু৷ একবার।"

"লিলি, তুমি ক্ষমা না চাইতে পারলেও তিনি ঠিকই ক্ষমা করে দিয়েছেন। উনি হাসিমুখে চলে গেছেন। এভাবে কাঁদলে উনার কষ্ট হবে। তুমি দোয়া কোরো বেশি করে, এখন এটাই প্রয়োজন।" নেহাল লিলির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল।

লিলি চোখ তুলে নেহালের দিকে তাকিয়ে বলল, "তুমি কী করে জানলে?"

"মায়েরা সন্তানের সব ভুল ক্ষমা করে দেন। তারা কিছু মনে রাখেন না। মাকে নিয়ে যেতে হবে, লিলি৷ তার ব্যবস্থা হচ্ছে।"

লিলি যেন তখন এই পার্থিব জগতে নেই। সে যেন বহুদূর থেকে কথা বলছে, "আমার মা আমাকে কোনোদিন মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তুমি তো স্বাক্ষী, তাই না? মা বলেছিল ফিরে এসে আমার সব কথা শুনবে? কই শুনল? যদি ক্ষমাই করবে তাহলে এভাবে ফাঁকি দিলো কেন?"

"এসবের উপরে আমাদের কন্ট্রোল নেই লিলি। উপরে যিনি বসে আছেন, তিনিই সব নির্ধারণ করেন। তিনি যেভাবে ইশারা করেন, সেভাবেই সব ঘটে। আল্লাহর কাছে দোয়া চাও মা'র জন্য। তুমি ছাড়া তো তার আর কেউ নেই।"

"আমারও তো কেউ রইল না। আমি কী করে থাকব? আমি কেন গেলাম না? আমি কেন রয়ে গেলাম?"

নেহাল কোনো উত্তর দিলো না, সে লিলিকে শক্ত করে ধরে রাখল। কখনো কখনো মুখে কিছু বলতে হয় না। পাশে থেকে সকল কষ্টের ভাগ নিয়ে বুঝিয়ে দিতে হয়, "তুমি একা নও। আমি আছি তো। তোমার সকল বেদনায়, কান্নায়, আনন্দে, সকল কিছুতে।"

নেহালও সেভাবেই যেন প্রায় সর্বস্বান্ত লিলিকে অনুভব করাতে চাইল সে এই বিশাল ভ্রম্মান্ডে লিলির পাশেই আছে। খুব কাছে আছে। যতটা কাছে থাকলে চোখের জলের ভাগ নেয়া যায়।

***

তৌহিদাকে যখন জানাযার জন্য নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন লিলির আহাজারিতে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছিল। একসময় সে চেতনা হারিয়ে ফেলে।

নেহাল, আশফাক আর লিলির মামা, চাচা মিলে সব সম্পন্ন করল। রোমেনা বাড়ির সমস্তকিছু দেখাশোনা করল।

নওরীন পুষ্পিতাকে নিয়ে বসে রইল লিলির কাছে। ছোট্ট পুষ্পিতা কেঁদে উঠেছিল, নিজের মায়ের কথা মনে পড়েছিল। এমন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে সে একবার গিয়েছে। নওরীন ওকে রিয়াদের সাথে বাসায় পাঠিয়ে দিতে চেয়েছিল। তারপর থেকে সে শান্ত হয়ে লিলির বিছানায় ওর পাশে ঘুমিয়ে পড়েছে।

লিলি জেগে উঠল চিৎকার করে। বোধহয় দুঃস্বপ্ন দেখেছে।

নওরীন ওকে আগলে নিল।

"আম্মু কোথায় নওরীন আপু? আমি খুব বাজে একটা দুঃস্বপ্ন দেখেছি। আম্মুকে দেখলে শান্তি পাব। আমি আম্মুর কাছে যাই।"

নওরীন কী বলবে বুঝতে পারল না। ওর কেবল মনে হলো, এটা যদি সত্যিই দুঃস্বপ্ন হতো! লিলির কাছ থেকে সরে গিয়ে এক গ্লাস পানি এনে দিল।

"লিলি, পানিটা খা।"

লিলি সেটা নিয়ে ঢকঢক করে পানি পান করল। মেয়েটার চোখ দুটো ফুলে আছে, লাল টকটকে হয়ে আছে কান্নার ফলে। মুখটা ভীষণ মলিন। সেভাবেই মৃদু হাসল, ভীষণ বিষন্ন সেই হাসি। মন কেমন করে উঠল নওরীনের। সেই সাথে বুঝতে পারল কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে লিলির মধ্যে। এখানে ঠিক নিজের মধ্যে ফেরেনি মেয়েটা৷

"মাথাটা কেমন লাগছে। একটু আম্মুকে ডেকে দাও না।"

নওরীন বলল, "লিলি, আমি তোর জন্য খাবার আনি। কিছু খা। সেই সকালের পরে তোর খাওয়া হয়নি।"

"সকালে? এখন কয়টা বাজে?"

"সাতটা আটত্রিশ।"

অনেক মানুষের কথাবার্তা ভেসে আসছে। যারা দেখতে এসেছিল, তারা চলে যাচ্ছে। পাশের ঘরে কেউ কোরআন তেলাওয়াত করছে।

লিলি কিছু মনে করার চেষ্টা করল। এরপর চোখ বেয়ে অশ্রু নামল।

"আম্মুর…"

"হ্যাঁ, সব…" লিলি বলার আগেই নওরীন বুঝতে পেরে উত্তর দিতে গিয়ে বাধাপ্রাপ্ত হলো।

"সব আমার জন্য হয়েছে। আমি আম্মুকে কোনোদিন শান্তি দেইনি। কোনো কথাও সেভাবে শুনিনি। আমার জন্য চিন্তা করতে করতে…" থেমে গিয়ে লিলির মুখে যন্ত্রণার ছাপ পড়ল,

"আমি নিজের হাতে তাকে মেরে ফেলেছি।"

রোমেনা আর নেহাল ভেতরে এলো এই সময়। রোমেনার হাতে খাবার।

"মা রে, আমাদের হাতে এত ক্ষমতা নেই। তৌহিদার অনেক স্বপ্ন ছিল তোকে নিয়ে। তৌহিদা নেই, ওর স্বপ্নগুলো তো রয়ে গেছে। তোর হাতে কতবড় দায়িত্ব, বল?"

কথা বলতে বলতে দুইবার মুখে ভাত তুলে দিলেন রোমেনা। কিন্তু এরপর আর সম্ভব হলো না। লিলি আবারও ডুকরে কেঁদে উঠল।

"আমার মাকে কোথায় রেখে এসেছো, আমাকে সেখানে নিয়ে যাও।"

লিলিকে তৌহিদার কবরের পাশে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে গিয়ে সে শক্ত রইল। দোয়া পড়ল, দোয়া করল। এরপর ফিরে এলো।

***

রাতে লিলির একফোঁটা ঘুম এলো না। বলতে গেলে সারারাত প্রায় বসে রইল। একটু পরপর কেঁদে উঠছিল। নেহালও পুরো রাত জেগে রইল।

"আমি যদি আরেকটু আগে নিজেকে বুঝতাম, তাহলে আম্মু আজ আমার সাথে থাকতে পারত।"

নেহাল সযত্নে লিলির হাত দুটোকে নিজের মুঠোয় টেনে নিল, এরপর অন্য হাতে সে চোখের পানিটুকু মুছে দিল।

"লিলি, আমার মা একটা কথা মাঝেমধ্যে বলে, মানুষের জীবনটা খুব ছোট। এই আছি এই নেই। আমাদের সকলের প্রিয় মানুষের প্রতি রাগ হয়, অভিমান হয়। কিন্তু সেসবকে বাড়তে দিতে নেই। আমি সেটা খুব মেনে চলি।"

"আম্মু তো জানত আমি এমনই। আর একটু সুযোগ যদি আমাকে দিতো।"

"নিজেকে দোষ দিও না। আল্লাহ আমাদের একটা নির্দিষ্ট আয়ু দিয়ে পৃথিবীতে পাঠান, সেটা ফুরিয়ে গেলে তিনিই একদিন তুলে নেন। আমরা কেবল যদি, কিন্তু, ইশ এসব বলে সমীকরণ মেলানোর চেষ্টা করি। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে আমরা অনেক সময় মানুষের ইনটেনশন বুঝতে পারি না। একটা কাজ হয়তো তোমার পছন্দ হয়নি। কিন্তু সেটা যদি আমাদের ভালোর জন্য তারা করেন তাহলে মেনে নিতে না পারলেও বা কষ্ট হলেও তাদের কাছ এতটা দূরে যাওয়া উচিত নয়, যত দূরে গেলে হুট করে কাছে ফেরার মতো সময় পাওয়া যায় না। অন্তত বুঝতে চেষ্টা করতে পারি আমরা। যদি ইনটেনশন ভালো না হয়, সে অন্য কথা। এভাবেই একদিন সময় ফুরিয়ে যাবে, আর আমরা আমাদের আচরণ শুধরে নেবার সুযোগ হয়তো পাব কিন্তু সারাজীবনের জন্য ওই একটাবার কথা না বলতে পারার আক্ষেপ আমাদের পোড়াবে। তাই মান, অভিমান সবকিছুর একটা সীমারেখা টানতে শিখতে হয়। সময় এত দ্রুত চলে যায়, তার সাথে পাল্লা দিয়ে দ্রুত নিজেকে বুঝতে জানতে হয়।"

লিলি চোখ ভরা জল নিয়ে অধোমুখে বসে রইল। নেহালের মনে হলো কথাগুলো আজকের জন্য একটু রূঢ় হয়ে গেল বোধহয়। তবে লিলি এতে খানিকটা শান্ত হয়ে এসেছে।

"লিলি, যা চলে যায় সেটা একেবারেই যায়। আর কখনো ফিরে আসে না। কিন্তু তোমার পুরো জীবনটা সামনে পড়ে আছে। তোমার সাথে আমিও আছি। আমরা সকলেই আছি। আমি হয়তো মা'র মতো করে ভালোবাসতে পারব না, কিন্তু আমি আমার সমস্তটা দিয়ে তোমাকে ভালোবাসি। তোমার সবকিছু তে আমি আছি। আমার সমস্তটায় তুমি আছো। তাই এটা ভাববে না যে তুমি একা। একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো।"

লিলি সেভাবেই বসে রইল। শুধু চোখের পানি পড়া বন্ধ হলো। গাল বেয়ে পানির ছাপ শুকিয়ে এসেছে। এখন একেবারে প্রাণহীন পুতুল বলেই মনে হচ্ছে, যার চোখে মুখে অভিব্যাক্তির লেশমাত্র নেই। চোখের দৃষ্টিতে অদ্ভুত এক শূন্যতা।

এই লিলি যেন ভীষণ অচেনা কেউ, অন্য মানুষ। একটা ধাক্কা ওকে যেন এই সামান্য কয়েক ঘণ্টায় সমূলে বদলে দিয়েছে।

নেহাল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল, তাতে মিশে রইল সহানুভূতি। সেও পাশে বসে রইল একরাশ চিন্তা নিয়ে।

…….

Story Cover