পুষ্পিতাকে তৈরি করে দিল নওরীন। অনেকদিন স্কুলে যাওয়া হয়নি। এখন আবার মূলস্রোতে ফিরতে হবে মেয়েটাকে।
"স্কুলকে মিস করছিলি?"
"আমার কোনো বন্ধু নেই।"
"আমি তোর বন্ধু নই বুঝি?"
"হ্যাঁ তো।"
"এখন তোর ক্লাসের বাকি সবার সাথে বন্ধুত্ব করবি। ঠিক আছে?"
"আচ্ছা।"
"কই তোমাদের মা মেয়ের হলো?" রিয়াদ ওদের আজকে স্কুলে দিয়ে এরপর অফিসে যাবে।
"আর দুই মিনিট। মেয়েকে নিয়ে বেরোও, আমি আসছি।"
"এই দুই মিনিট আর শেষ হলো না তোমার।"
"তোমারও তাড়া দেয়ার অভ্যাস আর গেল না।"
"চল, মা, আমরা যাই। তোর মা অলওয়েজ লেট।"
রিয়াদ হেসে কথাটা বলে বেরিয়ে গেল পুষ্পিতার হাত ধরে।
নওরীন চোখ রাঙিয়ে বলল, "রিয়াদ..."
বাকিটা আর বলল না, তৃপ্ত হাসি ফুটল মুখাবয়বে। এতদিন স্বপ্নে দেখে আসা সুখী পরিবারের ছবিটা এত দ্রুত পার্থিব জগতে ধরা দেবে নওরীন ভাবতে পারেনি।
***
নেহাল অফিসে এসেছে। কিন্তু ওর মন জুড়ে গতকাল রাতের আবেশ ছড়িয়ে আছে। ডাকাবুকো লিলি এমন কাণ্ড ঘটাবে এটায় তেমন বিস্মিত হয়নি, কিন্তু এরপর থেকে মেয়েটা কেমন লাজুক লতার মতো নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। এই নতুন রূপেও মেয়েটা অনন্য।
লিলি ভয়ংকর, লিলি অকপট আবার অন্য আরেকটা লাজুক সত্তাও ওর মধ্যে বিদ্যমান। ওদিক থেকে গ্রিন সিগনাল যখন এসে গেছে নেহালও এবার আর কোনো দ্বিধা রাখতে চায়নি।
সে লিলিকে একটা প্রশ্ন করেছিল রাতে, "তোমার মনে কোনো দ্বিধা, সংশয় নেই তো।"
উত্তরে লিলি আরেকবার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে বলেছিল, "আমি অনেক ভেবেই এগিয়ে এসেছি। আর একবার যখন পা বাড়িয়েছি, তখন দ্বিধা, সংশয় সব চুকিয়ে বুকিয়ে বিদায় করেছি।"
নেহাল লিলির হাত দুটোকে নিজের হাতের মধ্যে ধরে গভীর আবেগে বলেছিল, "আমিও সকল সংকোচকে ছুটি দিয়ে দিলাম। আজ থেকে আমরা একাত্ম হলাম।"
দুটো ঋণাত্মক মানসিকতার মানুষ সেই মুহূর্তে একটা মোহনায় এসে মিশে গেল। কাগজে কলমে পরিণয় সূত্রে তারা আগেই আবদ্ধ হয়েছিল, গতকালের জোৎস্নাশোভিত রাতটা যেন এসেছিল অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে। দুটো মানুষের সমস্তটা একাকার হয়ে গেল ভালোবাসায়, বিশ্বাসে। আলোকবর্ষ দূরত্বও ভালোবাসার এই প্রবল স্রোতের কাছে যেন নস্যি।
তা না হলে ক'দিন আগেই যে এতটা দূরের মানুষ ছিল, সামান্য সময়ের ব্যবধানে লিলির হৃদয়ের সমস্তটা জুড়ে নেহালের বিস্তার কী করে হতো!
ভলিউম একেবারে কমিয়ে দিয়েই সে ইউটিউবে চলে এলো লিলির ভিডিও দেখতে। নতুন ভিডিও বাদে সবগুলো বেশ কয়েকবার করে দেখা হয়ে গেছে ওর।
***
লিলির পরীক্ষা দু'দিন পরেই, কিন্তু গতকাল কিচ্ছু পড়া হয়নি। তাই আজ অন্য ভাবনায় মন দিতে পারেনি। যদিও বারবার উড়ুক্কু মনটা উড়ে উড়ে ছুটতে চাইছে, কিন্তু বেরসিক পরীক্ষার তো কোনো সময় জ্ঞান নেই। তাই মনকে কষে পড়ার টেবিলে বাঁধতে চাইছে।
ফোনটা বাজছে অনবরত, সোহানটাকে এবার আচ্ছা মতো সিধে করতে হবে। এত নম্বর ব্লক করেছে, তবুও ব্যাটা ছ্যাঁচোড় কল দিয়েই যাচ্ছে, দিয়েই যাচ্ছে।
"ফোনটা ধরছো না কেন? অনেকক্ষণ থেকে বাজছে।"
"বাজুক, সব ফোন ধরতে নেই।"
নেহাল কখন এসেছে লিলি খেয়ালই করেনি। এখন কথা বলায় ঘুরে তাকিয়ে উত্তর দিল।
"কে?"
লিলির মাথায় একটা ছোট্ট পোকা আছে, সেটা আরেকবার ঘ্যানঘ্যান করে ওকে মন্ত্রণা দিতে লাগল।
"তোমাকে বলেছিলাম না, আমার এক্স..."
বাকিটুকু বলার আগেই নেহাল গুরুগম্ভীর গলায় বলল, "কেন কল দিচ্ছে?"
"সেটা আমি কী করে জানব। তোমার জানতে ইচ্ছে হলে কলটা রিসিভ করে ওকে জিজ্ঞেস করো।"
নেহাল সত্যি সত্যি ফোনটা হাতে নিল, কল কেটে গেছে ততক্ষণে।
"আমি এর ব্যবস্থা করছি, তুমি চিন্তা করো না।"
"তোমার বুদ্ধি আমি জানি। আমি ছ্যাচড়াদের নিয়ে চিন্তা করি না। আমি নিজেই হ্যান্ডেল করতে পারব।"
"আমার বুদ্ধি জানো মানে?"
"তুমি গুগলে হয়তো এবার সার্চ করে বসবে, 'বউয়ের এক্স বয়ফ্রেন্ডকে কীভাবে শায়েস্তা করা যায়?' আমি শিওর।" বলেই হেসে ফেলল লিলি।
নেহাল আরেকবার অপ্রস্তুত হলো। এটা নিয়ে কতবার কতভাবে বিচ্ছু মেয়েটা কথা শোনাবে কে জানে!
"মোটেও না।"
"মোটেও হ্যাঁ।"
"ভুলভাল বাক্য।"
"কেন? তুমি কি ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ আর সুনীতিকুমারের কাছ থেকে বাংলার কোর্স করেছ নাকি যে তোমার সাথে কথা বলতে হলে অভিধান মেনে ব্যাকরণ গুলে খেয়ে কথা বলতে হবে?"
"হয়েছে। যা ইচ্ছে তাই বলো।"
"আমি কি বাচাল নাকি, যা ইচ্ছে তাই বলব।"
"আগে ওইটার ব্যবস্থা করো।"
"কোনটার?" নেহালের হঠাৎ প্রসঙ্গ পরিবর্তনে লিলি বুঝতে পারল না প্রথমে।
"তোমার ফোন যে বারবার বাজাচ্ছে।"
"তুমি কি জানো, তুমি অন্নেক কিউট একটা পোলা। কথাবার্তায় আরকি।"
নেহালকে জ্বালাতন করতে, কিঞ্চিৎ নাজেহাল করতে লিলি এখনো মজা পায়। উপভোগ করে ছেলেটার অপ্রস্তুত ভ্যাবাচেকা খাওয়া মুখটা। একগাল হেসে লিলি আবার বলল,
"দেখতেও। ছেলেদের এত সুন্দর হতে নেই।"
"সৌন্দর্যে বুঝি কেবল মেয়েদের অধিকার?"
"সকলের অধিকার।"
"তাহলে সমস্যা কোথায়?"
"পড়তে বসেছি। পরে কথা বলব তোমার সাথে। তোমার প্রসংশা করলাম, আমাকে মিথ্যা করে হলেও কিছু স্তুতিবাক্য বলতে পারতে। কিচ্ছু পারো না তুমি।"
নেহাল এবার লিলির কানের কাছে এগিয়ে এসে বলল, "মিথ্যে করে বলছি না, সত্যি সত্যি সত্যি, তিন সত্যি করে বলছি, আমার চোখে তোমার মতো করে কেউ কখনো পড়েনি। একটা সুতীব্র কৌতূহল আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে গেছে তোমার দিকে। কোনোভাবেই এড়িয়ে যেতে পারিনি। আমার জন্য তোমার চাইতে সুন্দর আর কেউই নেই।"
লিলি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। কেন জানে না, এর উত্তর দিতে পারল না। ভালোবাসার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া স্তুতিবাক্যে সে বুঁদ হয়ে রইল মুহূর্তকাল। জানে না সে সত্যিই সুন্দরী কিনা। কিন্তু যে ভালোবাসে তার চোখে মুগ্ধতা দেখতে ভালো লাগে।
***
সকালে লিলি মাকে কয়েকবার কল করল। একবার কথা হয়েছে। আজ ফিরবেন দুপুরের আগেই।
ওর মাথায় কেবল এটাই ঘুরছে মা কতটা খুশি হবেন। লিলির চিন্তায় মা'য়ের বিষন্ন মুখটা বারবার ভেসে উঠছে মানসপটে। আজ নিশ্চয়ই ভীষণ খুশি হবেন।
মা'য়ের আনন্দের প্রকাশ কেমন হবে! লিলি যেই কথাটা প্রথম বলবে তা হলো,
"আম্মু, তোমার পছন্দ আমার জন্য খারাপ হতেই পারে না। তুমি যাকে আমার জন্য বাছাই করেছ, আমার জন্য এর থেকে ভালো কেউ হতেই পারত না। তোমাকে অনেক ভালোবাসি আম্মু।"
মাকে কখনো কোনো কথা বলতে সংকোচ হয়নি ওর। তবে আজ বেশ কয়েকবার মনে মনে আওড়ে নিয়েছে, তবুও বুকে ঢিপঢিপ ঢিপঢিপ শব্দ হচ্ছে।
গতকালের পরীক্ষা ভালোই হয়েছে প্রস্তুতি অনুযায়ী। পরের পরীক্ষা তিনদিন পরে। আজ বাসাতেই ছিল। টেবিল এলোমেলো লাগছিল বলে সেটা গোছাচ্ছিল।
হঠাৎ খেয়াল করল হন্তদন্ত হয়ে রোমেনা ঢুকলেন, তার এলোমেলো অভিব্যক্তি দেখে লিলির ভেতর থেকে যেন অশুভ ইঙ্গিত এলো।
"কী হয়েছে মা, তোমাকে এমন দেখাচ্ছে কেন?"
ভাঙা গলায় রোমেনা কেবল বলতে পারলেন, "চল, আমাদের এক্ষুণি বেরুতে হবে।"
"কোথায়?" কোনোমতে উচ্চারণ করল লিলি।
"তৌহিদা হাসপাতালে।"
লিলির হাত থেকে বই পড়ে গেল, হাঁটুতে জোর পাচ্ছে না৷ রোমেনা এগিয়ে এসে ওকে আগলে নিলেন।