মাইনাসে মাইনাসে প্লাস

পর্ব - ২০

🟢

"আজকে তোমাকে বেশ খুশি খুশি লাগছে। ব্যাপার কী?" আশফাক পত্রিকা থেকে চোখ তুলে রোমেনাকে প্রশ্ন করলেন।

"খুশি হবো না? মেয়েটা আজ কতদিন পরে এতটা খুশি বলো তো? সবসময় যদিও হাসিখুশি থাকে, কিন্তু আমি তো বুঝি ওর মনের কষ্টটা। তুমিও তো বুঝতে বলো?"

"সন্তানের আনন্দ বিষাদ তো আমরাই বুঝব, সমব্যথী হব তাই না!"

দু'জনেই নির্মল হাসলেন। রোমেনার মুখে হঠাৎ খানিকটা বিষাদের ছাপ পড়ল,

আশফাক বিচলিত হয়ে প্রশ্ন করলেন, "কী হলো?"

"পুষ্পিতা আর ওর মায়ের কথা ভাবলাম৷ জীবনটা কত বিচিত্র তাই না? একজন পুরোপুরি নিঃস্ব হয়ে গেল, সেটাই অন্য একজনের পূর্ণতা হয়ে ধরা দিল।"

"হ্যাঁ। আমার তো মেয়েটার জন্য খারাপ লেগেছে খুব। কিন্তু মানুষের হাতে তো এসব থাকে না।"

ঘরজুড়ে নীরবতা নেমে এলো সহসাই। রোমেনা প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে প্রশ্ন করলেন,

"তোমার শরীরটা এখন কেমন?"

"সবার খুশি দেখে এখন ঝরঝরে মনে হচ্ছে নিজেকে।"

"খারাপ লাগলে বলো। দেখো, টেনশন করব ভেবে লুকাবে না কিন্তু!"

"আরে না। পুরোপুরি সুস্থ আমি।" হাসিমুখে স্ত্রীকে আশ্বস্ত করলেন আশফাক। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে সাড়া দিলেন।

নেহাল ভেতরে এলো বিতৃষ্ণ মুখে। রোমেনা জিজ্ঞেস করলেন,

"তোর আবার কী হলো? মুখটা এমন তেতো বানিয়ে রেখেছিস কেন? মনে হচ্ছে কেউ জোর করে তোকে এক জগ চিরতার রস গিলিয়ে দিয়েছে।"

নেহাল মনে মনে বলল, "আমার জীবনে এখন চিরতার রস কেন, চিরতার আস্ত একটা বনের মালিক আছে। সেই বনের প্রত্যেকটা গাছ রোজ চিবিয়ে চিবিয়ে খেতে হয়।"

মুখে অবশ্য সেটা বলল না।

"লিলিকে একটু দেখে শুনে হাঁটতে চলতে বোলো তো মা। এখন আবার জ্বর বাধিয়ে বসে আছে।"

"এইজন্য তোর মন খারাপ?"

"হবে না? এমন কেয়ারলেস কেউ হয়?"

"তা বাপ, যার জন্য এত চিন্তা, তাকেই একটু সেটা দেখা না! তোর এমন চিন্তায় পাগল হবার দশা দেখলে তোর জন্য হলেও মেয়েটা একটু সাবধানে চলবে। মনে করবে ওর কিছু হলে আরেকজন পাগল হয়ে যাবে।"

নেহাল লজ্জা পেয়ে গেল। সে কোনোকিছু ভেবে এখানে আসেনি। মা-বাবার সাথে ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ সময় কাটানো আর সব শেয়ার করা হয়। তাই উদ্বেগটুকু প্রকাশ করে ফেলেছে।

ওর ভেতরটাকে মা এমনভাবে বুঝতে পারে যে জীবনে কোনো অনুভূতি সে আড়াল করতে পারেনি। এখন তো বিষয়টা হৃদয়ের, এটা কী করে চাপা থাকবে!

"তেমন কিছু না মা।"

"কেমন কিছু তাহলে?"

"ছেলেটাকে জ্বালাচ্ছ কেন বলো তো?" আশফাক রোমেনার দিকে তাকিয়ে কথাটা বললেন, তার মুখে অবশ্য স্ত্রীর জন্য প্রশ্রয়ের আভাস।

"ছেলে বিয়ে করে ফেলেছে, কিন্তু ওর অবস্থা দেখো। স্কুল পড়ুয়া ছেলেরা প্রথমবার প্রেমে পড়লে যেরকম মেয়েদের স্কুলের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, দূর থেকে এক নজর দেখার জন্য। সামনে গিয়ে দাঁড়ালে গলা কাঁপে, হাঁটু কাঁপে। বুক ফাঁটে তো মুখ ফুটে না অবস্থা। এরও সেম।"

"তোমরা কি একজোট হয়ে আমার পিছনে লেগেছ নাকি মা?" নেহাল নাখোশ গলায় প্রশ্ন করল।

রোমেনা হাসি চেপে রেখে প্রশ্ন করলেন, "আমি ছাড়া আমার ভালো ছেলেটার পেছনে আর কে লেগেছে শুনি?"

"তুমি তো আছোই। এখন আবার লিলি…" এটুকু বলে চট করে থেমে গেল। এরবেশি বললে সর্বনাশের চূড়ান্ত হবে। মা খুঁচিয়ে মা"র"বেন।

"তাই নাকি? কী করেছে?"

"কী করবে আবার! কিছুই করেনি।"

রোমেনা সশব্দে হাসলেন, এরপর বললেন, "মিথ্যা বলার আর্টটা তুই শিখিসনি বাপধন। থাক, বলার প্রয়োজন নেই। সব কথা আমি জেনে কী করব। আয় লিলিকে দেখে আসি।"

রোমেনা সাথে এসে দেখলেন লিলি আধা অচেতনের মতো ঘুমুচ্ছে। জ্বর বাড়ছে, তিনি মাথায় পানি দিতে চাইলে নেহাল বলল,

"তুমি ঘুমিয়ে পড়ো মা। অনেক ধকল গেছে সারাদিন। তাছাড়া বাবার শরীরটাও তো অসুস্থ। আমি সামলে নিচ্ছি।"

রোমেনা চলে গেলেন, ছেলে পারবে তিনি জানেন। নেহাল আর নওরীন যখন ছোট, তখন তিনি প্রায়ই অসুখে পড়তেন৷ তিনজন মিলে তখন থেকেই ছোট্ট সংসারের সব সামলে নিতে শিখেছে।

***

নেহাল বালতিতে করে পানি এনে বিছানার পাশে রেখে আলতো করে লিলিকে ডেকে এদিকে মাথা রেখে শুতে বলল। এরপর খুব যত্ন করে মাথায় পানি ঢালতে থাকল। মেয়েটা এখন জেগে আছে বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু কোনো কথা বলছে না।

অনেকটা সময় নিয়ে মাথার পানিটুকু মুছে দিল, আবার না ঠান্ডা লেগে যায় ভেবে। লিলি উঠে বসে মাথায় তোয়ালে প্যাঁচিয়ে নিল।

"আমার জ্বর এলে কখনো মরার মতো ঘুমাই, আবার কখনো একফোঁটাও ঘুম আসে না। এখন ঘুম ভেঙে গেছে। আর আসবে না। আমি জেগে থাকলে আমার পাশে কেউ ঘুমিয়ে থাকলে ভীষণ একা একা লাগে। আম্মু সবসময় জেগে বসে থাকত, কখন আমার ঘুম ভাঙে সেজন্য।"

নেহাল বালতিটা বাথরুমে রেখে এসে অল্প পানি ফ্লোরে পড়েছে, সেটুকু মুছে বিছানায় পা তুলে লিলির পাশে বসল।

"আমি আছি লিলি। আজ আমার সাথে গল্প করলে চলবে?"

"হুম।"

"আচ্ছা, তোমার গল্প বলো।"

"আমার আম্মু ভীষণ একা, জানেন? আমাকে ঘিরেই তার পুরো পৃথিবী। উঠতি তারুণ্যের প্রভাবে কিছু বেপরোয়া কাজকর্ম করেছি। আম্মু কষ্ট পেয়েছে। আমি বুঝতাম সবই, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত চালচলনে অভ্যস্ত হতে পারিনি। আমি আম্মুর পৃথিবীতে আরও কয়েকবছর তো থাকতে পারতাম। কিন্তু আমায় বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল।"

"আসলেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে? একটু চিন্তা করে দেখো তো লিলি, তোমাদের পৃথিবীতে আর কেউ ছিল না৷ তার কি তোমাকে এত দ্রুত হাতছাড়া করে ভালো থাকার কথা? তুমি যতটা তার কাছে যেতে চাও, থাকতে চাও, তিনিও ততটাই চান। তবুও তিনি কেন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলো তো? তার বয়স হয়ে যাচ্ছে, মা'র কাছে শুনলাম তাদের আরেকজন বান্ধবী ছিলেন আয়েশা আন্টি। চট্টগ্রামে থাকতেন। তিনি বছর দুই আগে মারা গেছেন। এতে তৌহিদা আন্টি ভয় পেয়েছেন নিজেকে নিয়ে। তোমাদের পৃথিবীতে তুমি একলা না হয়ে যাও, এই ভয় পেয়েছেন তিনি। কিংবা কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে তুমি না তাকে একলা করে দাও। একজন মায়ের জন্য এই ভয়টা কি অমূলক? বলো তো? হয়তো তোমার সময় হয়নি, কিন্তু তিনি তোমার ভালো চান বলেই কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার কি কম কষ্ট হচ্ছে তোমাকে ছেড়ে থাকতে?"

লিলির পুরো মুখ থমথমে, কিন্তু চোখে ধীরে ধীরে জল জমছে। ভরে আসছে চোখ দুটো। মায়ের সাথে এখনই কথা বলতে ইচ্ছে করছে।

"এখন কয়টা বাজে?"

নেহাল মোবাইলে সময় দেখে বলল, "একটা বায়ান্ন।"

"এখন তো আম্মু ঘুমিয়ে পড়েছে। আমি সকাল হলেই আম্মুর কাছে যাব।"

"তোমার পা…"

"এটা কোনো সমস্যা না। আমি আম্মুর সাথে অত্যন্ত বাজে আচরণ করেছি। আমি…"

প্রাণপণে কান্না আটকে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে মেয়েটা।

"আমি নিয়ে যাব। তুমি চিন্তা করো না একদম। এখন একটু ঘুমানোর চেষ্টা করো প্লিজ।"

"আমি ঘুমাব না। আমার ভেতরে কেমন অস্থির লাগছে। কান্না আসছে। কিন্তু আমি কাঁদতে পারি না।"

নেহাল লিলির কোলের উপরে রাখা একটা হাত নিজের হাতে নিল। এরপর বলল,

"কান্না পেলে কাঁদতে হয় লিলি। দেখবে কষ্টগুলো বাষ্প হয়ে বেরিয়ে যায়। অনেকটা হালকা লাগে। একটু কেঁদে দেখো। কাঁদলেই লোকে দুর্বল হয়ে যায় না। এটা একটা মানবীয় অনুভূতি। নিজেকে হালকা করার জন্যও কখনো কখনো কাঁদতে হয়।"

লিলির কী হলো সে জানে না, আচমকা নেহালের বুকে মাথা রেখে সে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। মায়ের প্রতি রাগ, ক্ষোভ, অভিমান সব যেন চোখের জলে ধুয়েমুছে পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে৷ লুকিয়ে লুকিয়ে সে কেঁদেছে অল্পস্বল্প। মা'য়ের কোলে মাথা রেখেও কেঁদেছে, আজ ভিন্ন একজনের বুকে মাথা রেখে নিজের মনের আগল খুলে দিলো লিলি।

নেহাল একটা হাত লিলির মাথায় রেখে আলতো করে সান্ত্বনার পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। হাড় কাঁপানো শীতের সকালে এক চিলতে মিঠে রোদ্দুর যেমন করে শীতার্তের গায়ে পেলব স্পর্শ মেখে আদুরে অনুভূতি দিয়ে যায়, তেমনই নেহালের এই সান্ত্বনার স্পর্শটুকু লিলিকে যেন অদ্ভুত সঞ্জীবনী শক্তি যুগিয়ে দিল, ভরসা মেখে রইল।

না বলা এই স্পর্শটুকুতে যেন নেহালের অব্যক্ত একটা কথা মিশে রইল,

"লিলি, আমি আছি তো। এভাবেই থাকব। সবসময়।"

নৈশব্দের এই শব্দটুকু লিলি নিজেই হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করে নিল। গত কিছুদিন মনে যে অন্তর্দাহ ছিল সেটুকু মিলিয়ে গেল বহুদূরে।

ওর সম্বিত ফিরলেও সে মাথা সরিয়ে নিল না৷ সেভাবেই বসে রইল। কেন যেন ভীষণ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে এই জায়গাটুকু কেবলই ওর একান্ত নিজস্ব সম্পদ। মনে হলো এমন কারোর বুকে সে মাথা রেখেছে, সে মানুষটার জন্যই যেন ও জন্ম থেকে অপেক্ষায় ছিল। আরও একটা উপলব্ধি লিলির প্রগাঢ় হলো, আমৃত্যু সুখে দুঃখে, আনন্দে, বিষাদে সে এভাবেই এখানে নিজের মাথা রেখে নিজের সুখটুকু খুঁজে নিতে চায়।

নেহালের চোখে লিলি মুগ্ধতা দেখেছে কেবল, তাতে মোহ কিছুটা থাকলেও লোলুপতা একবিন্দু ছিল না। সবচাইতে যেটা লিলিকে স্পর্শ করেছে, ওর হাজারটা বাড়াবাড়ি, অভিযোগ, অপমানের পরেও মানুষটা কখনো এটা ফেরত দেবার চেষ্টা করেনি। বরং ওকে বুঝতে চেষ্টা করেছে, ওর আচরণের পেছনের কারণটুকু অনুধাবন করেছে। আজ ওর কষ্টগুলোকেও ভাগ করে নিল।

কতক্ষণ সময় কাটল সে জানে না, ঘুম পেয়ে গেল লিলির। সে আলিঙ্গন মুক্ত করল নেহালকে, এরপর ঘুমিয়ে পড়ল। সকালে বাসায় যেতে হবে মায়ের সাথে অভিমান চুকিয়ে দিতে, এই চিন্তা এবং পায়ের ব্যথায় সারারাত কাটল ছাড়া ছাড়া ঘুমের মধ্যে। তবে ঘুম ভেঙে নেহালকে জেগে বসে থাকতেই দেখেছে প্রতিবার। একবার মনে হলো ঘুমিয়ে পড়তে বলবে। কিন্তু ওর জন্য মা'য়ের পরে আরেকজন কেউ নির্ঘুম রাত পার করছে, এটা দেখতে ভীষণ ভালো লাগল।

একটা রাত জাগুক নাহয় ওর জন্য। কী এমন ক্ষতি হবে!

এটাকেই কি ভালোবাসা বলে! ভালোবাসা এমন আচমকাই বুঝি হয়ে যায়! আলোকবর্ষ দূরত্ব কেমন এক নিমিষেই পাড়ি দিয়ে হৃদয়ের শক্ত কপাট ভেদ করে অনায়াসেই হৃদয়ে প্রবেশ করল লোকটা।

লিলির কঠিন হৃদয় কেমন তরল হয়ে এসেছে, তাতে নেহাল দ্রবীভূত হচ্ছে যেন ক্রমশ।

Story Cover