মা মেয়েতে আরও অনেকক্ষণ কথা হয়েছে, কিন্তু কী কথা তা নেহাল জানে না। তবে তৌহিদার মুখের অভিব্যক্তিতে এটুকু স্পষ্ট যে যাই হোক, সেটা সুখী সুন্দর কোনো কথা নয়। তার মুখ থমথমে। বেরিয়ে এসেই চলে যাবার জন্য তোরজোর শুরু করলেন৷ অনেক বলে-কয়ে খেয়ে যাবার জন্য রাজি করানো গেল।
সকলেই তৌহিদাকে থাকার জন্য অনুরোধ করলেও, লিলি একবারও কিছু বলেনি। নেহালের বিষয়টা একদমই ভালো লাগেনি। খাবার টেবিলে সমস্ত তদারকি রোমেনা করলেও এবার লিলি খানিকটা সরব হলো। সে মা'কে এটা সেটা তুলে দিল। তার কোনটা পছন্দ, কোনটা বেশি খাওয়া বারণ এসবে তীক্ষ্ণ নজর রাখল। ওর মা যেন তাতেই খুশি হলেন, তার মুখের থমথমে ভাব কিছুটা হলেও কাটল।
নেহাল এলো তাকে বাসায় পৌঁছে দিতে। সিএনজিতে বসে সে শাশুড়িকে বলল,
"আপনি আজ থেকে গেলে লিলির ভালো লাগত।"
"সুতো খানিকটা ঢিলে করে রাখতে হয়। যত শক্ত করে ধরবে তত ছিঁড়ে যাবার সম্ভাবণা বেড়ে যাবে। আমি নাহয় সম্পর্কের অদৃশ্য সুতোটুকু আলগা করেই ধরে রাখি, তবুও বাঁধনটুকু থাকুক।" দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন তৌহিদা।
নেহাল কথাটা গভীরভাবে উপলব্ধি করল। লিলিকে সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না। কখনো ভীষণ চপলতা ভরা খিলখিলিয়ে হেসে ফেলা, কখনো ঠাট্টাচ্ছলে ওকে নিয়ে মেতে উঠা, কখনো ছেলেমানুষী জেদ, আবার কখনো অদ্ভুত শীতল কাঠিন্য। একই মানুষ অথচ একেকটা রূপে যেন আলাদা মানুষ। কোনটা আসল লিলি সে জানে না।
এই তো মনে হচ্ছিল লিলি বুঝি ধীরে ধীরে ওর কাছে চলে আসছে, আজকে নিজের মায়ের সাথে ওর আচরণে নেহাল যেন নিমিষেই কয়েক আলোকবর্ষ দূরে ছিটকে পড়ল। যদি ওকে মেয়েটা পছন্দই করতে শুরু করত, তাহলে নিশ্চয়ই এই কারণে মা'য়ের সাথে এমন আচরণ করত না। তবে কি সে ভুল পড়েছিল লিলিকে?
ওর যে মনে হয়েছিল রিনিকঝিনিক ছন্দ তুলে ওর হৃদয়ের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছিল মেয়েটা, নেহাল তো তার শব্দও পেয়েছিল। হৃদয়ের দরজা খুলে নৈবেদ্য সাজিয়ে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল কখন রাণী এসে প্রবেশ করবে ওর রাজ্যে, অধিকার করে নেবে সিংহাসন। অলংকৃত করবে নেহালকে! পুরোটাই কি কেবলই ভ্রম!
"বাবা, আমি একজন মা তো। স্বার্থপরের মতো নিজের দিকটা ভেবে তোমার জীবনকে বিরূপ করে দিলাম।"
"মা, এভাবে বলে আমাকে কষ্ট দেবেন না, প্লিজ। লিলি পুরোপুরি নিজের খেয়ালে চলে। এই কয়দিনে আমি যেটুকু বুঝতে পেরেছি ও ভীষণ অভিমানী আর জেদি। ভীষণ অকপট, যা মনে হয় কোনোকিছুই সে লুকিয়ে রাখে না। নিয়ন্ত্রণও করে না৷ আপনি আমার উপরে ভরসা রেখেছেন, দেখবেন ও খুব দ্রুত আপনার সাথে আগের মতো স্বাভাবিক হবে। ও চমৎকার একটা মেয়ে।"
নেহাল এই প্রথমবার মা বলে সম্বোধন করল তাকে৷ লিলি তো ওর মাকে এভাবেই বলে। সে-ও নাহয় এগিয়ে গেল। তাছাড়া তৌহিদার জন্য কষ্টও হচ্ছিল।
"আমি ভুল নির্বাচন করিনি। এটাই আমার জন্য স্বস্তির। পাগল মেয়েটাকে বুঝতে চেষ্টা করছো, এটাই সবচাইতে বড় ব্যাপার। লিলি যেদিন তোমাকে বুঝতে পারবে সেদিনটা যেন তাড়াতাড়ি আসে, এটাই দোয়া করি।"
"আপনি চিন্তা করবেন না মা। আমি সবসময় আছি।"
তৌহিদা স্নেহময় স্পর্শ করলেন নেহালের মাথায়৷ তাতে মিশে রইল একরাশ স্নেহ আর এক পৃথিবী শুভাশিস।
নেহালের ভালো লাগল সেটা। ফিরতে ফিরতে ওর মনে হলো লিলির ইচ্ছে কী সেটা জানতে হলে আগে লিলিকে পুরোপুরি বুঝতে হবে। মেয়েটার মধ্যে একটা জটিল গোলকধাঁধার বাস। সেই রহস্য আগে ভেদ করতে হবে! এটাই এখন ওর লক্ষ্য।
***
লিলি বিছানায় মনমরা হয়ে শুয়ে ছিল। খাবার পরে তৌহিদাকে বিদায় দিয়ে এসে শুয়েছে। নওরীন ধরে ধরে শুইয়ে দিয়ে গেছে। পায়ের ব্যথাটা বেড়ে গেছে অনেক। ফুলেও উঠেছে।
পুষ্পিতাকে নিয়ে নওরীন এপাশে রেখে তৈরি হতে গেল। তারাও চলে যাবে এখন।
লিলির মায়ের জন্য খুব কষ্ট হচ্ছে। সে বারবার চায় জড়িয়ে ধরে আগের মতো সমস্ত ভালোবাসা আর আদর গায়ে মাখবে। কিন্তু কেন যে সে কিছুতেই এটা পারছে না। ওর মনে হয় ওর আচরণে অতিষ্ট হয়ে শিক্ষা দেবার জন্য বিয়েটা দিয়েছে। এটাই ওকে তাতিয়ে দেয় বারবার। মনটা বিষিয়ে দেয়। কিছুই ভালো লাগে না। মনে হিয় এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সে কেবলই একা, নিঃসঙ্গ একজন মানুষ। ও কারোর নয়, কেউ ওরও নয়।
"তোমার পায়ে কী হয়েছে?"
ছোট্ট মিষ্টি কণ্ঠের কথায় ওর সম্বিত ফিরল, "পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছি।" হেসে উত্তর দিল লিলি।
"আমার মতো দুষ্টুমি করতে গিয়ে?"
"তুমি অনেক দুষ্টু বুঝি?"
"মা বলত, দুষ্টুমি করলে আমাকে ফেলে যেদিকে চোখ যায় চলে যাবে। মায়ের যখন অসুখ হলো৷ তখন আমি আর দুষ্টুমি করিনি। তাও মা চলে গেল। কত ডাকি তাও ফেরে না।"
লিলির ভেতরে টনটনে ব্যথা হলো। নিজের মাকে আচমকা উপলব্ধি করল। সে আধশোয়া হয়ে বসে পুষ্পিতাকে ইশারায় কাছে ডাকল। এরপর দুই হাত ধরে বলল,
"তোমার নাম কী?"
"পুষ্পিতা।"
"পুষ্প মানে জানো?"
"জানি, ফুল।"
"বাহ্! তুমি তো অনেককিছু জানো। অনেক বুদ্ধি তোমার। বুদ্ধিমতী মেয়েরা কী করে জানো?"
"কী করে?" পুষ্পিতার মুখ এখনো কাঁদোকাঁদো।
"তারা মিষ্টি করে হাসে। দেখি একটু হাসো তো?"
পুষ্পিতা এক চিলতে হাসল।
"এই তো। ভীষণ সুন্দর দেখাচ্ছে তোমাকে।"
"তুমিও সুন্দর।"
"তাই নাকি। আমাকে আন্টি বলবে, কেমন?"
"কিন্তু মা তো বলল তুমি আমার মামি হও!" চিন্তিত হয়ে বলল পুষ্পিতা।
লিলি এই ধরনের বিবাহসম্পর্কিত ডাকগুলোর সাথে অভ্যস্ত নয় বলে একটু কেমন যেন লাগল। তবে নিষেধ করল না। বিছানার পাশের টেবিলে হাত বাড়িয়ে ব্যাগটা নিয়ে সে একটা চকলেট বের করে দিল পুষ্পিতাকে। মেয়েটাকে ওর ভালো লেগেছে। এত ভালো মেয়ে, অথচ কতটা কষ্ট পেয়েছে জীবনকে ঠিকঠাক চেনার আগেই।
"মামি, তোমার নাম কি?"
"লিলি।"
"লিলি ফুল?"
"হ্যাঁ। দেখেছো, আমাদের নামের মিল?"
পুষ্পিতা বুঝল কিনা লিলি জানে না, কিন্তু ঠিকই হেসে মাথা নাড়ল।
"আমি তোমাকে পুষ্প বলে ডাকব, কেমন?"
এই পর্যায়ে নওরীন ভেতরে এলো৷
"এরমধ্যে মামির সাথে ভাব হয়ে গেল বুঝি?"
"হ্যাঁ, মামি খুব ভালো।"
"আর মা?"
"মা'ও ভালো ছিল। তুমিও ভালো।"
নওরীন পুষ্পিতার হাত ধরে বললেন, "লিলি, আসি রে। বাসায় যাবি কিন্তু। আর সাবধানে চলাফেরা করিস।"
"আচ্ছা। তুমিও এসো পুষ্পকে নিয়ে।"
ওরা বেরিয়ে যেতেই লিলি নিজের জগতে ডুবে গেল। একটা মন খারাপের বাষ্প কোত্থেকে এসে ঢুকে পড়ল ওর মনে। জ্বর আসবে মনে হচ্ছে। অসুখে সে মা'কে ছাড়া কোনোদিন থাকেনি। কেন সে মা'কে যেতে দিল, এখন আফসোস হচ্ছে ভীষণ। একবার সে বললেই মা আজ থাকতেন, লিলি জানে। কিন্তু সে বলেনি। কীসের এত জেদ ওর? সে আসলে কী চায়!
নেহালকে তো ওর খারাপ লাগছে না। এবাড়ির প্রত্যেকেই এমন চমৎকার মানুষ! ওর অবারিত স্বাধীনতা আছে। তবুও কেন তার মনে এত দোলাচল! সে বুঝতে পারে না, অন্য লোক ওকে কী বুঝবে, সে নিজেই কি নিজেকে বুঝতে পারে!
***
"আয়, তোর চুলগুলো আঁচড়ে দেই।" নওরীন বাসায় এসে ফ্রেশ হয়েই পুষ্পিতাকে নিয়ে পড়ল।
"ওই বাসায় ওই যে নতুন নানি আছে না? সে তো চুল বেঁধে দিলো।"
নওরীন নিজের অস্থিরতা লুকিয়ে রেখে বলল, "তাে কী হয়েছে? শোবার আগে আগে চুল ঠিকঠাক করতে হয়। তাহলে চুল অনেক বড় হয়।"
"তোমার চুলের সমান হবে?" এরইমধ্যে পুষ্পিতা ওকে আপন ভাবতে শুরু করেছে৷ অবশ্য হাসপাতালের দিনগুলোতেই সখ্যতা গড়ে উঠেছে, সাথে ভরসার জায়গা। এখন কী সুন্দর টুকটুক করে তুমি বলছে, মা ডাকছে! নওরীনের অপূর্ণ বুকটা যেন ভরে উঠছে প্রাপ্তিতে।
"হ্যাঁ, আরও বড় হবে।"
নওরীনের সামনে এসে বসে পুষ্পিতা বলল, "তাহলে চুলে চিরুনি করে দাও।"
নওরীন চিরুনী চালাচ্ছে, কিন্তু ওর চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছে৷ মনে হচ্ছে পুষ্পিতা যে জন্ম থেকেই ওর সন্তান। একে সে বুক দিয়ে আগলে রাখবে। কে কী বলল তাতে ওর কিছুই যায় আসে না।
রিয়াদের বাবা মা থাকেন গাজীপুরে। রিয়াদ কর্মসূত্রে এখানে। তারা স্বাভাবিকভাবেই সব নিয়েছেন। কিন্তু রিয়াদের বড় বোন নওরীনের প্রতি নাখোশ। বিশেষ করে এক্সিডেন্টের পরে থেকে। কখনো মুখে কিছু বলেনি, কিন্তু তার হাবেভাবে সেটা ঠিকই বোঝা যায়। আজ রিয়াদকে কল করে বাচ্চা দত্তক নেয়া নিয়ে অনেক কথাই শুনিয়েছে। ওর কানেও এসেছে কথাগুলো।
শ্বশুর, শাশুড়ি ভিডিও কলে পুষ্পিতার সাথে ভালো মতোই কথা বললেন। রিয়াদ তো খুশি। ওর ননদ আছে একজন। সে পুষ্পিতাকে দেখার জন্য বাসায় আসবে। কিছুদিন মাস ছয়েক হয় ওর বিয়ে হয়েছে। সমস্যা শুধু একজনেরই।
নওরীন মনস্থির করল, পুষ্পিতাকে সে ভীষণ শক্ত মনের মানুষ হিসেবে তৈরি হতে সাহায্য করবে। যার মধ্যে মানবিকতাবোধ থাকবে, মমতা থাকবে, ভালোবাসা থাকবে, কিন্তু দুর্বলতা থাকবে না একেবারেই৷
***
নেহাল ফিরে এসে দেখল লিলি ঘাপটি মেরে শুয়ে আছে। কেমন যেন জবুথবু লাগছে। নেহাল সাহস করে কাঁথাটা টেনে দিল গায়ে। সাথে সাথে লিলি চোখ মেলে তাকালো।
"আপনি কখন এলেন? আম্মু কিছু বলল আমাকে নিয়ে?"
"এমন অস্থিরতায় যদি ভুগবে, তাহলে ওমন করলে কেন?"
"জানি না। কিছু বলে থাকলে বলুন, না হয় এত কথার প্রয়োজন নেই। আমার জ্বর এসেছে। এত কথা ভালো লাগছে না।"
নেহাল তৎক্ষনাৎ সম্পূর্ণ অবচেতনেই নিজের হাতটা লিলির কপালে রাখল। জ্বর সত্যিই আছে। লিলির চোখে ওর চোখ পড়তেই সে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে হাত সরিয়ে নিল। এরপর ইতস্তত করে বলল,
"তোমার জ্বর শুনে দেখলাম। কিছু মনে কোরো না প্লিজ।"
লিলি উত্তর দিল না, সে স্থির, ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়েই আছে।
"ওষুধ খেয়েছো?"
"ব্যথার জন্য খেয়েছি যেগুলো ডাক্তার প্রেসক্রাইব করেছে।"
"জ্বরের জন্য?"
"না।" নেহালকে উঠতে দেখে লিলি বলল,
"কোথায় যাচ্ছেন?"
"মা'র ঘরে।"
"কেন, আপনার গুগল কাজ করছে না বুঝি?"
নেহাল হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। এই মেয়ে এমন অসুস্থতা নিয়ে ওকে খোঁচা দিতে ছাড়ে না৷ কোন কুক্ষণে যে সে এই অকাজ করেছিল আল্লাহ জানে! মোক্ষম উত্তরও খুঁজে পায় না।
মেয়েটা আর কী বলে না বলে তার ঠিক নেই। সে পা বাড়ালো রোমেনার ঘরের দিকে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল আর কোনোদিন কোনো বিষয়ে সে গুগলের সাহায্য নেবে না। সম্ভব হলে ফোন থেকেই এটা ভ্যানিস করে দেবে। গুগল ওর বিরুদ্ধ শক্তির হাতিয়ার। অথচ সে কিনা এখন অব্দি নিরস্ত্র।