মাইনাসে মাইনাসে প্লাস

পর্ব - ১৭

🟢

পূরবী সেদিনের পরে আর মাত্র দুইদিন ছিল পৃথিবীতে, এরপর সব মায়া কাটিয়ে তাকে চলে যেতে হয়েছে ওপারে। এরমধ্যে একদিন অল্পস্বল্প কথা বলতে পেরেছে, পরেরদিন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল পুষ্পিতার দিকে। মুখে কথা না থাকলেও চোখে অজস্র বোবা আকুতি মাখা ছিল। ছোট্ট পুষ্পিতা অবশ্য সেই ভাষা বুঝতে পারেনি।

তবে নওরীনের হাত ধরে রেখেছিল কিছু সময়ের জন্য, যেন অব্যক্ত ভাষায় বোবা আর্জিতে বলতে চাইছিল,

"আমার মেয়েটাকে ভবিষ্যতে একটু মমতার আশ্রয় দিও বোন।"

সেই অভিব্যক্তি নওরীন যেন স্পষ্ট শুনতে পেল, নাকি এমন কিছু শুনতে চাইছিল বলে ভেবে নিল নিজের মতো করে। সে জানে না, জানতে চায় না। কেবল আর্জিটুকু সে প্রাণপণে ধরে রাখতে চায়।

নওরীন স্কুল শেষ হলেই ছুটে আসত এখানে। কীসের যেন একটা অদ্ভুত টান তৈরি হয়েছিল এই অসহায় মায়ের জন্য, ছোট্ট ফুলের মতো মেয়েটার জন্য।

অনেকেই হয়তো অবিশ্বাস করে বলতে পারে, না চেনা একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের জন্য আবার এমন আদিখ্যেতা কীসের! কিন্তু মানুষের মন ভারি অদ্ভুত, কখন কার জন্য কী অনুভূতি তৈরি হয় কেউ জানে না৷ এসব কারণ খুঁজেও বের করতে চায় না নওরীন। ওর মনে হয় পূরবী যদি আরেকটু বেঁচে যেত!

কিন্তু ওর চাওয়া পূরণ হয় না। মাকে ঠিকঠাক বুঝতে পারার আগেই পুষ্পিতা মাতৃহীন হয়ে গেল। মেয়েটা ঠিকঠাক বুঝতেও পারল না পৃথিবীতে তার আসলে নিজের বলতে কেউ রইল না। বৃদ্ধা নানী নিজেই বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ওর বাবাও এই সম্পর্ক নিয়ে অত্যন্ত উদাসীন।

মেয়েটার ভবিষ্যৎ চিন্তায় কাতর হয় নওরীন। মনে একটা সুপ্ত বাসনা উঁকি দেয়, কিন্তু এভাবে কি সেটা সম্ভব! অন্য একজনের সন্তান চাইলেই কী ওকে দিয়ে দেবে!

তবে সে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে। আপাতত এসব মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে কেবল মেয়েটার পাশে রইল অতৃপ্ত মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। কিছুটা অন্তত ভরসা তো দিতে পারে।

পূরবী যেন ওর নিজের বোন হয়ে গিয়েছিল। ওকে ভরসা করেছিল। ওর নানীর কাছ থেকে আজ এসে শুনল পুষ্পিতার বাবা এসেছিল মেয়ের ব্যবস্থা করতে। একটা ট্রাস্টের সাথে কথা হয়েছে নাকি! অরফানেজে রেখে আসার ব্যাপারে। সে নাকি দেশের বাইরে যাচ্ছে তাই মেয়ের দায়িত্ব নেয়া সম্ভব নয়। তবে পাঁচ হাজার টাকা নাকি দিয়ে গেছে।

একটা অচেনা রাগ নওরীন নিজের মধ্যে অনুভব করল। নিজের জন্ম দেয়া সন্তানের প্রতি এতটুকু দায়বদ্ধতা নেই, ভালোবাসা নেই! স্ত্রীর সাথে তার সম্পর্ক স্থায়ী হয়নি, কিন্তু পুষ্পিতা তো তার নিজেরই রক্ত! কীভাবে মানুষের মধ্যে এমন অমানুষ বাসা বাধে!

রিয়াদের সাথে পরামর্শ করতে হবে ভাবল নওরীন।

***

নেহাল প্রতি মাসে বেতন পেয়েই সবার জন্য টুকিটাকি কেনাকাটা করে। ওর এটা খুব ভালো লাগে। বাবাকেও দেখেছে সবসময় এটা করতে। পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, কর্তব্য এসব পরিবারের অগ্রজদের মধ্য থেকেই পরবর্তী প্রজন্মের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ে বলেই বোধটুকু ওর মধ্যে প্রোথিত হয়ে গেছে।

একজনের জন্য অন্যের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো এভাবে মুখে না বলেও প্রকাশ করা যায় ছোট্ট ছোট্ট কাজের মাধ্যমে। এমন নয় যে সেই উপহারগুলো খুব দামী। কিন্তু অনুভূতির দাম তো আর বাহ্যিক দরদামের মধ্যে পড়ে না। সেটা কেবল যত্ন আর মমতায় ধরা পড়ে। নেহাল করে ওর ব্যক্তিগত ভালোলাগার জায়গা থেকে। গিফটগুলো হাতে পেয়ে তাদের মুখে যে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠে, সেটা তো কোনো মূল্য দিয়ে সে মাপতে পারবে না!

আজও সবার জন্য কেনাকাটা শেষ করে লিলির কথা মাথায় এলো। ওর জন্য কী কেনা যায় ভাবতে ভাবতে একটা শাড়ি কিনে ফেলল। লাল রঙের তাঁতের শাড়ি। দেখতে খুব ভালো লাগল। মনে হলো লিলিকে ভীষণ মানাবে। এই প্রথম উপহার কিনল স্ত্রীর জন্য, কেনার সময় কেন যেন অন্যরকম একটা আন্দোলন হলো বুকে। কীসের সে জানে না।

বাড়ি ফিরতে ফিরতে অবশ্য অন্য একটা ভাবনায় ভালোলাগাটুকু দ্বিধা আর সংশয়ে বদলে গেল। লিলি কি পছন্দ করবে! যা মেয়ে, যদি রেগে যায়। মনে হলো এটা সে কিছুতেই নিজের হাতে লিলিকে দিতে পারবে না।

আশফাক আর রোমেনার ঘরে এসে তাদের জন্য আনা উপহারগুলো তাদেরকে দিল নেহাল।

রোমেনা জিজ্ঞেস করলেন, "তা বউয়ের জন্য কিছু এনেছিস তো?"

নেহাল সলজ্জ হেসে বলল, "এনেছি।"

"বাহ্! এই তো বুদ্ধি খুলেছে।"

নেহাল ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, "কিন্তু মা, একটা বিপদে পড়েছি। তোমার হেল্প লাগবে।"

"কী বিপদ?" উদ্বিগ্ন গলায় প্রশ্ন করলেন রোমেনা।

"একটা শাড়ি কিনেছিলাম লিলির জন্য।"

"এখানে বিপদের কী হলো?"

নেহাল রোমেনার হাত ধরে কাতর গলায় বলল, "মা, তুমি এটা একটু ওকে দিয়ে দিও, প্লিজ।"

"আগের কমপ্লিমেন্ট উইথড্র করলাম। তোর একটুও বুদ্ধিশুদ্ধি হয়নি৷ এটা কেমন কথা হলো?"

"মা, প্লিজ, ও যদি কিছু মনে করে? রেগে গেলে পরে দেখা যাবে…"

"বউকে ভয় পাস নাকি? ছি ছি বাবু, তুই তো ফ্যামিলির রেপুটেশন বঙ্গোপসাগরের ঢেউয়ে ভাসিয়ে দিলি রে!"

"বউকে ভয় পেলে সমস্যা কী? আমিও তোমাকে ভয় পাই, যা মানুষ তুমি, ভয় না পেয়ে উপায় আছে?" পাশ থেকে আশফাক স্ত্রীকে টিপ্পনী কেটে বললেন, মুখে হাসি।

"চাপাবাজী কম করো তো। ছেলেটা এমন বোকা বোকা কথাবার্তা বলছে, আর তুমি মজা নিচ্ছো? ছেলেটা কি আমার একার?"

"আরে, আমি তো ওর সমব্যথী হতেই সত্যি কথাটা বললাম।"

"বলে আমাকে উদ্ধার করেছো!"

"সেটা বহুবছর ধরেই করে আসছি।

রোমেনা, আশফাকের দিকে কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে ততোধিক কঠিন প্রতি উত্তর দেবার জন্য মুখ খুলতে যাচ্ছিল। নেহাল তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,

"মা, তোমরা এটা পরে কন্টিনিউ কোরো। এখন আমার একটা ব্যবস্থা করো।"

রোমেনা আশফাকের দিকে তাকিয়ে থেকেই বললেন, "বিরতি থাকল, পরে দেখছি তোমার ব্যাপারটা।"

এবার ছেলের দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন, "তুই কিনেছিস, তুইই দে। বিয়ে দিয়েছি ঘটকালি করে। ঘটক তকমা গায়ে মেখেছি। ছেলে আর ছেলের বউয়ের গিফট দেয়া-নেয়ার জন্য এখন ডাকপিয়ন হতে পারব না।"

নেহালের মুখ জুড়ে হতাশা নেমে এলো, রোমেনা ছেলের হাত ধরে আবার মুখ খুললেন, "মেয়েরা ডিরেক্ট একশন পছন্দ করে ভায়া বা মেসেঞ্জার না। বুঝলি?"

নেহাল হার মেনে নিয়ে কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি প্রকাশ করল। এরপর নিজের ঘরে ফিরে এলো।

লিলি তখন নিজের মুঠোফোনে কী যেন করছিল৷ সারাক্ষণ ফোনে এত সময় নষ্ট করে মেয়েটা, মনে হলো ওর৷

নেহালের ভয় হলো কী করে জিনিসটা দেবে কাঙ্খিত হাতে! সে শপিং ব্যাগটা বিছানার পাশের টেবিলটায় রাখল। লিলি একবার মুখ তুলে তাকিয়ে আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ল নিজের জগতে।

নেহাল হাত-মুখ ধুয়ে এসে পায়চারি শুরু করল। পায়চারি করলে নাকি মাথা খুলে যায়। প্রায় মিনিট দশেক এই টেকনিক এপ্লাই করেও কোনো ফল পেল না। ডাহা ফ্লপ টেকনিক। ধূর!

লিলি এই পর্যায়ে ফোন স্ক্রল করতে করতেই প্রশ্ন করল, "কী ব্যাপার? যু দ্ধে র প্রস্তুতি নিচ্ছেন নাকি?"

নেহাল এবার থামল, কিন্তু এতটুকু সুস্থির হতে পারল না।

"আমি আজ পুডিং বানিয়েছিলাম। খাবেন?" মোলায়েম শোনায় লিলির গলাটা।

"ঠিক আছে।" মৃদু গলায় বলল নেহাল।

লিলি উঠে দাঁড়িয়ে নেহালকে অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল। এরপর বলল,

"আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে, আপনি নতুন নতুন প্রেমে পড়েছেন। প্রেমটা এক তরফা। কী করে মেয়েটাকে প্রপোজ করবেন সেই ভাবনায় পড়ে গেছেন।"

নেহালের হৃদযন্ত্র ক্ষণেকের জন্য থেমে গেল যেন! নিঃশ্বাস ফেলতে ভুলে গেল। ওকে পড়ে ফেলছে নাকি! সর্বনাশ!

"শুনুন, একটা ওয়ার্নিং দেই, আমাদের সম্পর্ক যেমনই থাকুক, স্ত্রী বর্তমান থাকা অবস্থায় অন্য কোনো মেয়ের জন্য এসব ভাবনা এলে আমি কিন্তু আপনার চোখ গেলে দেব। মনে থাকবে?"

নেহালের বলতে ইচ্ছে করল, "অন্য মেয়ের প্রেমে পড়লে আগেই পড়তাম৷ আমি আমার একমাত্র বিয়ে করা বউয়ের প্রেমে পড়েছি।"

কিন্তু কথাটা মুখে বলার মতো দুর্ধর্ষ সাহস হয়ে উঠল না। নাক বরাবর যদি একটা ঘুষি মেরে বসে মেয়েটা! অবচেতনেই নিজের নাকে হাত চলে গেল নিমিষেই।

লিলি খানিকটা এগিয়ে এসে গাঢ় স্বরে বলল, "আমি কিন্তু ভীষণ ডেঞ্জারাস! মনে থাকবে?"

বলেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। তা আর বলতে! এই মেয়ে সাক্ষাৎ টর্নেডো।

বুদ্ধি বের করার অন্য কোনো উপায় না পেয়ে গুগলের দ্বারস্থ হলো নেহাল। সেখানে তো সব কিছুর সমাধান থাকে। এটার থাকবে নিশ্চয়ই।

সে গুগলে তাড়াহুড়ো করে সার্চ করল 'কীভাবে ভয়ংকর স্ত্রীকে উপহার দেয়া যায়?'

লোডিং হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই লিলি পেছন থেকে এসে প্রশ্ন করল, 'কী করেন?"

প্রবল আতঙ্কে নেহালের হাত থেকে মোবাইলটা নিচে পড়ে গেল। ওর মুখের রঙ্গ উড়ে গেল, ইতিকর্তব্য ঠিক করার আগেই লিলি তড়িৎ বেগে ফোনটা কুড়িয়ে নিয়ে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

নেহালে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল। এভাবেই তাহলে ওর মান-ইজ্জত সব ভূলুণ্ঠিত হওয়ার ছিল! সে মনে মনে প্রার্থনা করল, ইন্টারনেট যেন কাজ না করে।

কিন্তু মোবাইলের দিকে লিলির বিস্ফারিত দৃষ্টি বলে দিচ্ছিল ওর প্রার্থনা কবুল হয়নি।

নিজেকে ছেলেবেলায় বিটিভিতে দেখা মীনা কার্টুনে দেখা সেই মুরগি চোর বলে মনে হলো! নিজেকে একবার কল্পনায় সেভাবে দেখতেও পেল।

পড়বি তো পড়, সোজা মালির ঘাড়েই পড়তে হলো! ওর ভাগ্যটা এত খারাপ কেন! গ্যাঁড়াকলে ফেঁসে যাওয়া ইঁদুরও মনে হয় ওর চাইতে ভালো অবস্থায় থাকে!

নিজের নির্বুদ্ধিতায় রাগ হলো ভীষণ, এমন বোকা বোকা বুদ্ধি নিয়ে সে এই মেয়েকে কী করে পটাবে!

মনে মনে বলল, "আল্লাহ, আমার প্রতি একটু দয়া করে সদও হও। এই মেয়ের হাত থেকে রক্ষা করো আল্লাহ্। আমার ইজ্জত, সম্মান যেন কিছুটা হলেও অবশিষ্ট থাকে।"

Story Cover