মাইনাসে মাইনাসে প্লাস

পর্ব - ১৬

🟢

আজ দুটো ক্লাস করে বাকিগুলোতে ফাঁকি মারতে ইচ্ছে হলো লিলির। তরী আর মিতু আগে থেকে এক পায়ে খাড়া ছিল, প্রস্তাব পেয়ে লুফে নিল। অনেকদিন ঘুরতে যাওয়া হয় না। আজ ঠিক করল সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত হুল্লোড় করবে। ভিডিওটার কাজটাও আজই হবে, কনসেপ্ট তৈরি আছে।

সোহানের এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছিল গেটের বাইরে। এসেছিল কিছু বলতে, ওদের কাছে পাত্তা পায়নি। কয়েকটা নম্বর থেকে মেসেজ পাঠিয়েছে, একবার নাকি কথা বলতে চায়।

"আরে আর বলিস না, সোহান ভাইয়ের সাথে আমার সেদিন দেখা হলো। আমাকে বলে কী জানিস?" এ পর্যন্ত বলে মিতু থেমে গেল। যেন ওর সাথে সোহানের কী কথা হয়েছে সেটা ওদের উপস্থিত না থেকে এবং ওর কাছে না শুনেও জানা সম্ভব হতে পারে। সঙ্গীরা জানে কী না, সেই উত্তর যেন খুব জরুরি, এটা নিয়ে আগে ওরা মজা করলেও ওখন হাল ছেড়ে দিয়েছে। জানে কিছু অভ্যাস অবচেতনেই থেকে যায়।

"না, জানি না। জানার ইচ্ছেও নেই।" লিলি হাঁটতে হাঁটতে বলল।

"আরে শোন না!"

"তুই বলার হলে বলে ফেল না রে!" তরী এবার তাগাদা দিল।

"বলে কিনা একবার দেখা করতে বলো না তোমার ফ্রেন্ডকে। ও তো আমাকে ছেড়ে বিয়ে করে ফেলল। এখন আমি…"

মিতু বাকিটা বলার আগেই লিলি তেতে উঠল, "এখন এই কাঁদুনি গাইছে? মিথ্যা ব্লেম দিচ্ছে আমার উপরে, নিজে সিমপ্যাথি পেতে চাইছে। ওই বান্দরের সাথে তো আমি দেখা করবই। মাথার চুল যাতে একটাও মাথায় না থাকে, সেই ব্যবস্থা করব। আমাকে চেনে নাই। ওই ছ্যাচড়ের সাহস আমি কুচিকুচি করে চিড়িয়াখানায় বিলিয়ে দেব।"

"আমাদের সাথে রাখিস কিন্তু।" তরী তাল মেলায়।

"কিন্তু দেখা করা কি ঠিক হবে? শুধু শুধু একটা ঝামেলা।" মিতু একমত হতে পারে না।

"মোটেও শুধু শুধু নয়। আজ তোদের বলেছে, দেখগে আরও অনেককেই বলেছে। এখনই কিছু না বললে দেখা যাবে আরও বড় কিছু বলছে বানিয়ে বানিয়ে। এমন লোকদের প্রশ্রয় দিতে নেই।"

বিকেল প্রায় গড়িয়ে যাচ্ছিল, এতক্ষণে মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল রোমেনা বেশ কয়েকবার কল দিয়েছিলেন। ওর মনে পড়ল আজ ফিরতে দেরি হবে বাসায় বলা হয়নি। রোমেনাকে সে ফিরতি কল দিতেই যাচ্ছিল, কিন্তু এরইমধ্যে নেহাল কল করেছে।

তরী আর মিতু ক্যামেরা আর ইন্সট্রুমেন্টগুলো গোছাচ্ছিল, যেগুলো তরীর বাসা থেকে নিয়ে এসেছিল ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়ে। লিলি একটু সরে গিয়ে কল রিসিভ করল।

"তুমি কোথায় এখন?"

"জবাবদিহি করতে হবে?"

"নাহ্! শুধু কি জবাবদিহি-ই চায় মানুষ? অপরপ্রান্তে কেউ তো চিন্তায় পড়ে যেতে পারে, রাস্তায় কত কী ঘটতে পারে। বাসার কেউ একজনের জানা থাকলে তখন তারা একটু নির্ভার থাকতে পারে৷ মা চিন্তা করছিল। কোনো সমস্যা হলো কিনা!"

লিলির প্রথম প্রশ্ন শুনে রাগ হয়েছিল ভীষণ, কিন্তু পরের কথায় সেটা মিলিয়ে গেছে। আকাশের দিকে তাকালো সে। সারাদিন উত্তাপ ছড়িয়ে ক্লান্ত সূর্যটায় রঙ ধরছিল। নরম হয়ে আসা সেই সূর্যের মতো লিলিও যেন শান্ত হয়ে গেল নিমিষেই। সেটা নেহালকে বুঝতে দিল না। বরং পরশুর সেই কান্ডের পরে ছেলেটাকে নানাভাবে নাজেহাল করতেই ওর বড্ড আনন্দ হয়।

"শুধু মা চিন্তা করছিল? মায়ের ছেলে কিছু ভাবছিল না?"

ওপ্রান্তে মুহূর্ত কয়েকের নীরবতা, খানিক বাদে নেহাল বলল, "মায়ের ছেলের কি সেই অধিকার আছে?"

"মায়ের ছেলে কি ভাবে? সেই অধিকার তার আছে নাকি নেই?"

"সে এই ব্যাপারে নিতান্ত অজ্ঞ।"

"বিজ্ঞ ব্যক্তিদের পরামর্শ নিন, অজ্ঞতা কাটান।"

"আমার আশেপাশে বিজ্ঞ লোক তেমন একটা দেখি না যারা টিপস দেবে এসব ব্যাপারে।"

"কী বেদনাদায়ক জীবন আপনার! ইশ!"

"তুমি কখন ফিরবে?" আর কথা খুঁজে না পেয়ে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করল নেহাল।

"এই তো, বন্ধুদের সাথে এসেছিলাম ঘুরতে। এখন ফিরব, রাস্তায় যেতে যেটুকু সময় লাগে।"

খানিকটা থেমে লিলি আরও বলল, "এরপর থেকে এরকম হুটহাট প্ল্যান হলে মাকে জানিয়ে দেব। টেনশন করতে হবে না।"

"অনেক ধন্যবাদ, লিলি। সাবধানে এসো।"

গোধূলির রঙ আকাশ জুড়ে। লিলির প্রিয় মুহূর্ত দিনের এই সময়টা। আজ ওর মনে হলো কোনো কারণ ছাড়াই মুহূর্তটা যেন জৌলুশ পূর্ণ হয়ে গেছে। নাকি গভীর কোনো কারণ তৈরি হচ্ছে অবচেতনে, সে জানতেও পারেনি।

***

নওরীন আজ পুষ্পিতার মায়ের বাসায় এসেছে। কিন্তু বাসায় কেউ নেই। বাড়িওয়ালার কাছ থেকে জানলো অবস্থা বেশ খারাপ হয়ে যাওয়ায় আজ ভোরের দিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

নওরীন বিস্তারিত জেনে নিয়ে ছুটল হাসপাতালে। মহিলা ওয়ার্ডে গাদাগাদি করে অনেকগুলো বেডের একটার পাশে পুষ্পিতাকে বসে থাকতে দেখে চিনতে আর অসুবিধা রইল না।

নওরীনকে দেখে পুষ্পিতার শুকনো মুখে কিঞ্চিৎ হাসি ফুটল। ওর মায়ের স্যালাইন চলছিল তখন। চোখ বন্ধ, কিন্তু পাতা কাঁপছিল। একজন প্রৌঢ়াও বেডের উপরে বসে আছেন। ইনি বোধহয় নানি।

নওরীন তাকে যেন কিছুটা ব্যাখ্যা দেবার মতো করে বলল, "আমি পুষ্পিতার স্কুলে পড়াই। ও অনেকদিন ধরে স্কুলে যায় না, তাই এলাম।"

"পূরবীর অবস্থা ভালো না। ডাক্তারও তেমন আশা দেয় না। আমার নাতিনডা কই যাইব তাইলে ভাইবা পাই না।" বলতে বলতে কেঁদে ফেললেন।

"আহ্, মা। কী শুরু করলে? আপনি কিছু মনে করবেন না আপা।" পুষ্পিতার মা পূরবী নিজের মাকে কিছুটা ধমকের সুরে শাসিয়ে শেষের কথাটা বলল নওরীনের দিকে তাকিয়ে। তার কোটরে ঢুকে থাকা চোখের নিচে কালি, মুখ শুকনো, মলিন।

"না, না। আপনি ব্যস্ত হবেন না। এখানে আমার একজন ফ্রেন্ড আছে। ওকে বললে হয়তো কিছু ফেবার পাওয়া যাবে। আমি কি কথা বলব?"

"আপনি কেন করবেন আপা? এখন অনেক আপন মানুষই এসব ঝামেলা মনে করে।"

নওরীন এগিয়ে এলো, পূরবীর মাথায় আন্তরিক ভঙ্গিতে হাত রেখে বলল, "আপা ডাকলেন তো এইমাত্র। সব সম্পর্কে দেওয়া নেয়া থাকতে হবে কেন! পুষ্পিতাকে আমি খুব পছন্দ করি। মেয়েটার মুখে যদি একটু হাসি ফোটাতে পারি, আমার ভীষণ ভালো লাগবে।"

"আমার আর কোনো আশা নেই। জানি না কেন, সারাক্ষণ মনে হয়, আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। আমি হয়তো আরেকটু ভালো চিকিৎসা নিতে পারি। কিন্তু আমি এমনিতেও চলে যাব। মাঝখান থেকে ওর ভবিষ্যতটা সাথে করে নিয়ে যাবার কোনো মানে হয়!"

"আপনি যদি আর কিছুদিন বেশি করে বাঁচেন, মেয়েটার সাথে আপনার সময় আরেকটু দীর্ঘ হতো।"

নওরীনের মরিয়া হয়ে বলা কথাটায় পূরবীর কোটরে চলে যাওয়া চোখে যেন কিঞ্চিৎ হাসি ঝলকে উঠল। অদ্ভুত, এমন অবস্থাতেও মহিলার হাসিটা সুন্দর মনে হলো।

"উপর থেকে আল্লাহ আমাদের আয়ু নির্ধারণ করে দিয়েছে। যেটুকু আয়ু, চেষ্টা করলে কি তার বেশি বাঁচব?"

"আল্লাহ তো মানুষকে হাল ছাড়তে বলেননি। কার কতটা আয়ু সেটা তো আমরা কেউ জানি না।"

পূরবী নিজের মুক্ত হাতটা দিয়ে নওরীনের হাত ধরে ফেলল, "আপা, আপনার সাথে আমার একটু সময়ের পরিচয়। কিন্তু আপন মনে হচ্ছে। কী অদ্ভুত জানেন, বহুদিন একসাথে চললেও অনেককে আপন ভাবা যায় না। আপনি খুব ভালো মানুষ।"

হাঁপাতে হাঁপাতে বলল পূরবী। তার নিশ্বাস ভারি হয়ে আসছে।

"আপনি প্লিজ, কথা বলবেন না এখন। আমি আসছি এক্ষুণি।"

নওরীন বেরিয়ে এসে দ্রুত হাতে ফোন করল ওর বন্ধুকে।

Story Cover