কফিশপে মুখোমুখি বসেছে লিলি আর নওরীন। সেদিনের কথা দুজনের কেউই আর তুলল না। তাদের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে আড্ডা জমে উঠল। যদিও সময় অল্প।
"তোর প্রিয় রঙ লাল, ওদিকে নেহালেরও লাল রঙ প্রিয়।"
"ছেলেদের লাল ভালো লাগে না বলেই জানতাম?"
"কী জানি! নেহাল বলে, লাল রঙের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক আছে, রক্তের রঙও তো লাল! ছোটবেলায় একবার একটা বিয়েতে গিয়ে তো যা তা অবস্থা! কী কাণ্ডটাই না করেছিল।"
লিলি কৌতূহলী গলায় জিজ্ঞেস করল, "কী কাণ্ড?"
"তখন ওর বয়স সাত কী আট। বিয়ের কণে লাল টুকটুকে শাড়ি পরা। সে জেদ ধরেছিল বিয়ে করার৷ তাহলে ওরও ওমন লাল টুকটুকে একটা বউ হবে! অনেক বুঝিয়ে টুঝিয়ে ক্ষান্ত করা গেছে। একটু বড় হলে এটা নিয়ে ক্ষ্যাপাতাম ওকে। কখনো তেড়ে আসত, কখনো লজ্জায় লাল হয়ে যেত। এখনো এই কাহিনী নেহালকে মনে করিয়ে দিলে লজ্জা পায়।" নওরীন হাসতে হাসতে নেহালের হাঁড়ির খবর ফাঁস করে দিল।
লিলির মন খারাপের মেঘ ধীরে ধীরে কাটছিল কথা বলতে বলতে।
"আপু, তোমার তো আবার ক্লাস আছে। আমিও আম্মুর সাথে দেখা করতে যাব একটু।"
"তুই আজ আমার বাসায় যাবি। আরেকটা ক্লাস আছে। শেষ করেই বেরুব।"
"না আপু। আজ নয়। অন্য একদিন, একা একা না যাই।"
"নেহাল সাথে নেই বলে? ওকে ফোন করে দিলে অফিস থেকে সরাসরি আমার ওখানে চলে যাবে।"
"আপু, আজ প্রিপারেশন নেই।"
নওরী হয়তো আরও জোর করত, কিন্তু লিলি দিকটা বুঝতে পেরে বলল, "ঠিক আছে, আজ যা। পরে কিন্তু কোনো কথা শুনব না।"
"পরে আমি নিজেই বারবার যাব। তুমি বিরক্ত হয়ে যাবে তখন।"
"মোটেও না। তোর সাথে কথা বলতে কখনো বিরক্ত হব না।"
একটু থেমে নওরীন প্রশ্ন করল, "আমার ভাইকে কেমন দেখলি রে? কী মনে হলো এই কয়দিনে?"
লিলি অন্যমনস্ক হয়ে গেল, নেহালকে সে সত্যিই এখন অব্দি দেখেছে তো! মানুষটার সম্পর্কে তেমন কিছুই তো সে জানে না। আবার নওরীনের মন রক্ষার জন্য সে মিথ্যে করে প্রসংশাও করতে পারছে না। এসব ওর ধাতে নেই। নওরীন হয়তো লিলির দোলাচল উপলব্ধি করতে পারল।
হাসিমুখে বিদায় নিল পরস্পরের কাছ থেকে।
***
নেহালের মনে পৃথিবীর সবটুকু অনুশোচনা এসে যেন আজ ভর করেছে। নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে লিলির দিকে অবচেতনেই দুই পা এগিয়ে গিয়েছিল বলে বিষাদটুকুও আজ বড্ড পোড়াচ্ছে।
কাজের প্রতি অত্যন্ত সচেতন নেহাল আজ বারবার মনোযোগ থেকে বিচ্যুত হচ্ছিল। লিলির কথাগুলো শেলের মতো ওর হৃদপিণ্ডে এসে আঘাত হানছিল। হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হবার ব্যথা সে এই প্রথম অনুভব করল। কী ভীষণ ব্যাথা।
যে দুই পা সে এগিয়েছিল, সে মনকে কড়া শাসনে বেঁধে চার পা পিছিয়ে এলো।
"কী ব্যাপার নেহাল সাহেব, নতুন বিয়ে করেছেন। এখন তো হাসিখুশি থাকার কথা। তা মন মরা কেন?"
আতিক সাহেব মধ্যবয়সী মানুষ। তবে লোকটাকে নেহালের একেবারেই পছন্দ নয়। অন্যের পেছনে নানারকম কথা বলে বেড়ানো এই লোকের কাজ। ওর কাছে কখনো তেমন পাত্তা পায় না। আজও অল্পে এড়িয়ে যাবার পায়তারা করে বলল,
"কাজের চাপটা বেশি পরে যাচ্ছে তাই।"
"ভাবিকে সময় কম দিচ্ছেন বলে নিশ্চয়ই অভিযোগ করছে? তাই আপনার মন খারাপ বুঝতে পারছি। নতুন নতুন বিয়ের পরে সবাই রোমান্টিসিজমের ঘোরে থাকে। দুই একটা বাচ্চা কাচ্চা হয়ে গেলে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাবে। তখন আপনি আবার ফ্রি-বার্ড হয়ে যেতে পারবেন। সে খোঁজও নেবে না।"
লোকটার এই অযাচিত কথাবার্তায় ভারি বিরক্ত হলো নেহাল। কিন্তু মুখের উপরে কটু কথা বলতে ওর ভীষণ বাধোবাধো লাগে। লিলির কাছ থেকে বিষয়টা রপ্ত করতে পারলে একটা কাজের কাজ হতো। কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয়। মেয়েটা ওকে সহ্যই করতে পারছে না।
শুকনো মুখে নেহাল বলল, "আতিক ভাই, আমার মন খারাপ না। আপনার কনসার্নের জন্য ধন্যবাদ।"
লোকটা আরেকবার কিছু বলতেই যাচ্ছিল, বাঁচিয়ে দিল আরেক কলিগ। সে বসের চেম্বার থেকে বেরিয়ে এদিকে এসে বলল,
"নেহাল ভাই, স্যার আপনাকে দেখা করতে বললেন।"
নেহাল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে উঠে সেদিকে চলে গেল। সবার সাথে ব্যক্তিগত কথাবার্তা বলতে ওর ভারি অনীহা। সে কতবার বুঝিয়ে দেয়, তবুও বোঝে না লোকটা নাকি না বুঝতে পেরেও বিরক্ত করে মজা পায়! কে জানে কোন মানুষের কেমন প্রকৃতি!
***
তৌহিদা কিছু পড়ার সময় আর সেলাই ফোড়াই করলে কেবল চশমা পরেন। প্রায় দুই বছর থেকে চম্পা তার কাজে সাহায্য করে। লিলির বিয়ের পর থেকে তার সাথেই থাকছে।
স্বামী আরেকটা বিয়ে করেছে, ওর সাথে বনিবনা হয় না, তিনি প্রস্তাব দিতেই লুফে নিয়েছে৷ একটু কথা বেশি বলে, কিন্তু সময় কেটে যায়।
তার আজ সকাল থেকেই মন বলছিল লিলি হয়তো আজ আসতে পারে। গত কিছুদিন থেকে তার রান্না করতে একদমই ইচ্ছে করে না। চম্পা যা রান্না করে তাই খেয়ে নেন।
আজ বেশকয়েকদিন পরে তিনি নিজে রান্নাঘরে এলেন। লিলির খুব পছন্দের কিছু খাবার রান্না করলেন। রান্না যখন প্রায় শেষের দিকে তখন কলিং বেল বাজল।
দরজা খুলে লিলিকে দেখে তিনি একদমই আশ্চর্য হলেন না, খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মেয়ের হাত ধরে ভেতরে নিয়ে এলেন। লিলির মনে হলো রোমেনার সাথে কথা হয়েছে কিনা।
"তুমি জানতে?"
"হঠাৎ করে কেন যেন মনে হলো আজ তুই আসবি। রোমেনাকে ফোন করে জানতে ইচ্ছে হলো না। নিজের মনে আসা অনুভূতিটা ঠিক কিনা দেখতে ইচ্ছে হলো।"
"খাবারের গন্ধে তো বাড়ি একেবারে ভরে গেছে!"
"তোর জন্য করেছি। তুই না এলে পাঠিয়ে দিতাম।"
লিলি মাকে গভীর আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে কয়েক মুহূর্ত স্থির দাঁড়িয়ে রইল। মা মেয়েতে এটা-সেটা গল্প হলো।
খাবার সময় তৌহিদা নিজের হাতে লিলিকে যত্ন করে খাইয়ে দিলেন। লিলি তার শরীরের খোঁজ নিল, ওষুধ ঠিকঠাক চলছে কিনা চেক করল।
এরপর হুট করে বলল, "এখন যাই আম্মু।"
"সে কী! আজ থেকে যা।"
"সন্ধ্যায় ফিরব বলে এসেছি।"
"আমি রোমেনাকে বলে দিচ্ছি।"
লিলি ম্লান হাসল, এরপর খুব কঠিন গলায় বলল, "তুমি নিজেই আমাকে দূরে ঠেলে দিয়েছ। আমিও তোমার কথামতো চলে গিয়েছি। এখন মায়াকান্না কীসের এত তোমার? আপদ বিদায় হয়েছে, শান্তি এবার তোমার।"
লিলি আর দাঁড়ালো না৷ নিজের ঘরে একবার উঁকি দিয়েই বেরিয়ে গেল বাইরে। তৌহিদার চোখ ভিজে যাচ্ছে। লিলি আজ আসার পর থেকেই বড্ড বেশি স্বাভাবিক আচরণ করছিল, এটাই তার কাছে অস্বাভাবিক ঠেকছিল।
শেষবেলায় এসে স্পষ্ট হলো কারণটা। লিলির আগে রাগ হলে চিৎকার চেঁচামেচি করত, ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকত, মাথা ঠান্ডা হলে এসে তার কোলে আশ্রয় খুঁজে নিত। কিন্তু এবার মেয়েটা ভেতরের রাগ বাইরে আনেনি। তাই বোধহয় ভেতরে ভেতরে দানা বাঁধছে সবটা।
তিনি সবসময় চেয়েছেন লিলি একটু ঘরমুখো হোক, উড়নচণ্ডীপনা কমুক। কিন্তু এভাবে নিজের সত্তাকে মে রে ফেলুক সেটা তিনি কোনোদিন চাননি।
অভিমানের গাঢ় চাদরে নিজেকে আবৃত করে নিয়েছে লিলি, তিনি কী আর কোনোদিন সে চাদর ভেদ করে মেয়ের অন্তরে আরেকবার প্রবেশ করতে পারবেন! কত সময় লাগবে, এত সময় কী তার আছে! আশঙ্কায় দম বন্ধ হয়ে আসে তৌহিদার, বুক ভারি হয়ে আসে গভীর দুঃখী এক দীর্ঘশ্বাসে।