মাইনাসে মাইনাসে প্লাস

পর্ব - ১১

🟢

নওরীন নিজের ঘরে এসে দেখল রিয়াদ এসেছে ওকে নিতে। কোনো প্রশ্ন করার আগেই সে রিয়াদকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, শার্ট ভিজে যাচ্ছে চোখের জলে।

রিয়াদ একরাশ উৎকণ্ঠা নিয়ে বারবার প্রশ্ন করে যাচ্ছে, "কী হয়েছে? নওরীন, এই নওরীন.. কথা বলো প্লিজ, চিন্তা হচ্ছে তো।"

কিন্তু কোনো উত্তর এলো না, নওরীন নিজেকে কোনোভাবেই ধাতস্থ করে উঠতে পারছে না, অনেক কথা গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে।

রিয়াদ স্ত্রীকে আগলেই বিছানায় এনে বসালো। এরপর উঠে গিয়ে টেবিলে রাখা জগ থেকে পানি ঢেলে তার দিকে এগিয়ে দিল।

গ্লাসটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে পানিটা খুব ধীরে ধীরে শেষ করল নওরীন। এরপর বলল, "কিছু হয়নি, তুমি চিন্তা করো না।"

"আচ্ছা, করলাম না চিন্তা। কিন্তু তোমার কী হয়েছে সেটা কি জানতে পারি?"

একটু সময় নিয়ে গ্লাসটাকে দুই হাতের তালুর মধ্যে ঘোরাতে ঘোরাতে নিজেকে খানিকটা ধাতস্থ করে নিয়ে বলল,

"আমাদের সংসারটা কখনো পরিপূর্ণ হবে না, তাই না?"

"তুমি আবার এসব বলছো? ডাক্তার তো আমাদের শতভাগ নিরাশ করেননি। তাহলে?"

"আমার স্কুলে সব বাচ্চাদের মায়েরা মেয়েকে কী সুন্দর করে সাজিয়ে হাত ধরে ধরে স্কুলে নিয়ে আসে। টিফিনের সময় মুখে তুলে খাইয়ে দেয়। আশেপাশে কত মানুষ সন্তানদের নিয়ে খেলে, হাসে। ব্যথা পেলে কেঁদে ফেলে। আমার কোলটা বড্ড খালি খালি লাগে। আমি কেন পেলাম না? একটা ছোট্ট প্রাণ আমার মধ্যে বেড়ে উঠছিল। আমি ওকে অনুভব করতাম, জানো? কিন্তু ধরে রাখতে পারলাম না। তোমারও তো কষ্ট হয়েছে, বলো?"

কেমন অপ্রকৃতস্থের মতো কথা বলে যাচ্ছে নওরীন। বাচ্চাদের স্কুলে সে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছিল, অনেক অনেক শিশুদের মাঝে থাকলে নিজের অভাবটুকু খানিকটা ভুলে থাকা যাবে ভেবে। কিন্তু ফলাফল উল্টো হয় মাঝেমধ্যে। অন্যের প্রাচুর্যতার মাঝে নিজেকে কখনো কখনো বড্ড দীনহীন বলে মনে হয়। তবুও নিষ্পাপ মুখগুলো ওকে স্বস্তি দেয়। তাদের হাসি-কান্না, দুষ্টুমি সবকিছু যে ওকে প্রশান্তি দেয়। তাদের সে ভীষণ মমতায়, যত্নে পড়ানোর চেষ্টা করে। সবার কথা মন দিয়ে শোনে।

রিয়াদ দুই হাতের মধ্যে নওরীনের চিবুক ধরে মুখটা আলতো করে তুলে গভীর আবেগে বলল, "তুমি আমার পাশে আছো, এটা ভাবলে আমার কষ্ট হয় না। সত্যি বলছি। মাঝেমধ্যে যে কিছুটা খারাপ লাগে না সেটা বললে মিথ্যে বলা হবে। আমাদের সম্পর্কে কোনো মিথ্যে নেই, তাই বলতেও চাই না। তবে একটা কথা কি জানো? তুমি আমার জীবনে এসেছ, এই প্রাপ্তির যে প্রশান্তি, এর তুলনা নেই। এই শান্তি অন্য অপ্রাপ্তিকে ছাপিয়ে যায়। তখন কোনো কষ্ট থাকে না। তখনই কেবল কষ্ট হয়, যখন তুমি এভাবে কাঁদো, মনমরা হয়ে বসে থাকো। একটু হাসো প্লিজ? তোমার হাসি খুব সুন্দর!"

নওরীনের নিজের ভাগ্যের উপরে কখনো কখনো রাগ হয়, তবে রিয়াদের মতো একজনকে জীবনের সহযোদ্ধা হিসেবে পেয়েছে এটা ভাবলে সেই খেদ নিমিষেই হারিয়ে যায় কোন মহাশূন্যে। সে নিশ্চয়ই সৌভাগ্যবতী, নইলে রিয়াদকে সে কী করে পেল জীবনে! ওর মুখ জুড়ে আঁধার কেঁটে গিয়ে ঝলমলে আলোকের দ্যুতি খেলে গেল মুহূর্তেই।

***

লিলি নিচে এসে নওরীনের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে দেখল ভেতরে রিয়াদ আছে। ওর আর কথা বলে মনের ভার হালকা করা হয় না। সে নিজের ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে বালিশে মুখ গুঁজে কেঁদে ফেলে।

চারদিক থেকে এত এত চাপে ওর মানসিক স্থিতি যেন হারিয়ে যাচ্ছে। বড্ড অবসন্ন লাগছিল, সেভাবেই সে ঘুমিয়ে পড়ে। নওরীন যাবার আগে এসে ওকে ঘুমাতে দেখে আর জাগায় না। চলে যায়।

সন্ধ্যায় নেহাল ঘরে এসে দেখে লিলি আজ বড্ড নীরব। অন্যদিনের মতো আ ক্রো শে ওর দিকে তাকায় না, সে এসেছে বুঝতে পেরেও বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই। বড্ড বেশি নিস্পন্দ বসে রয়েছে।

নেহালের একবার মনে হলো কথা বলবে না, বললেই হয়তো কথায় কথা বাড়বে, অশান্তি হবে। কিন্তু সে এড়িয়ে যেতে পারল না। লিলির মায়ের কাতর আকুতি মনে পড়ল, একজন মাতৃস্নেহে কাতর মায়ের কাছে প্রতিজ্ঞা করেছে, সেটা থেকে সে পিছিয়ে আসতে পারে না৷ তাছাড়া যেভাবেই হোক, মেয়েটা ওর জীবনের সাথে জুড়ে গেছে। এই দায় সে কোনোভাবেই এড়াতে পারবে না।

"কিছু কি হয়েছে?"

লিলি একবার তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নিল। নেহাল আরেকটু এগিয়ে গিয়ে বিছানার পাশে এসে দাঁড়িয়ে আরেকবার প্রশ্ন করল,

"আন্টিকে মিস করছো, লিলি?"

এবার সে নেহালের দিকে গাঢ় দৃষ্টিতে তাকালো। কেন যেন প্রশ্নটা বন্ধুসুলভ মনে হলো লিলির কাছে৷ মন থেকে সাড়া না এলেও সে মুখ খুলল,

"নওরীন আপুর ব্যাপারটা আমি জানতাম না। আজ পাশের ছাদে একটা বাচ্চাকে দেখে এক্সাইটমেন্টে একটা কথা বলে ফেলেছিলাম। আপু কষ্ট পেয়েছে।"

নেহাল খানিকটা বিস্মিত হলো লিলির কথায়৷ এই কয়দিনে দেখে মনে হয়েছিল, মেয়েটা কাউকে পরোয়া করে না। কে কী ভাবল সেসবও ভাবে না। কিন্তু আজ নেহালের সেই দৃষ্টিভঙ্গি যেন হোঁচট খেল। কেবল ওর সাথেই মেয়েটা এমন রূঢ়, বাকিদের জন্য সে অন্তর দিয়ে ভাবে। নইলে কয়েকদিনের চেনা একজনের জন্য এভাবে বিমর্ষ হয়ে পড়ত না।

নেহালের ইচ্ছে করল হাত ধরে সান্তনা সূচক কিছু কথা বলে। কিন্তু এটা করল না, প্রথম দিনে বলা কথাটা মনে পড়ল। যেচে পড়ে কে অপমানিত হতে যায়।

"যেটা বলে ফেলেছ সেটা তো আর ফেরত নেবার কোনো উপায় নেই। তুমি ওর সাথে একবার সামনা-সামনি কথা বলে নিও। তাহলেই হবে। ও যে ধরনের মানুষ, এসব কথা পুষে রাখবে না।"

"আপু তো চেলে গেছে।"

"কাল যাবে আমার সাথে? সকালে আমি বেরুবার সময় ওর স্কুলে নামিয়ে দিয়ে যাব। নাহয় স্কুল টাইমের পরে ওর বাসায় যেয়ো।"

"কথা বলার পরে সেটা ফেরত নেবার কোনো যন্ত্র থাকা প্রয়োজন ছিল।"

নেহাল হেসে ফেলল, "যেহেতু নেই, তাই কথা বলার আগে একটু ভেবে নিলে ভালো হয়।"

লিলির নিজেকে কিছুটা হলেও নির্ভার লাগল। ও নেহালকে এই কয়দিন যেভাবে কটাক্ষ হেনে কথা বলেছে, তার শোধ লোকটা আজ চাইলেই নিতে পারত। কিন্তু কোনোটাই করেনি। মনে মনে কিছুটা যেন কৃতজ্ঞতাবোধ করল। যদিও হাবেভাবে তা প্রকাশ করতে সে অপারগ।

"চা খাবেন?"

"তুমি বানাবে?"

"হ্যাঁ। যদিও খুব একটা ভালো হয় না। তবে আম্মু পছন্দ করে।"

"আচ্ছা, খাবো।"

লিলি বেরিয়ে গেল, নেহাল স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক, আজ কোনো কথা কাটাকুটির মধ্য দিয়ে যেতে হলো না। নেহাল একবুক সাহস নিয়ে 'তুমি' বলেছে আজ। মেয়েটা খেয়াল করেছে কিনা বুঝতে পারছে না। ওর বলতে ইচ্ছে করছিল তাকেও যেন লিলি 'তুমি' করে বলে। কিন্তু সাহস করে উঠতে পারেনি। পাছে আবার বয়স নিয়ে কথা শুনতে হয়।

মেয়েটার ভালো মুড আজ দীর্ঘস্থায়ী হোক। সেটাই মঙ্গল নেহালের জন্য।

***

নওরীন কিছুদিন থেকে চলে গেল বলে রোমেনার মন কিছুটা খারাপ ছিল। তবে এখন ঠিক আছে৷ তিনি সন্ধ্যার নাস্তার ব্যবস্থা করছিলেন। মালতি সাহায্য করছিল।

"তুমি আমাকে ডাকলে পারতে। এসে গল্প করতাম।"

লিলিকে দেখে রোমেনা একগাল হেসে বললেন, "তোর শরীর ঠিক আছে? সারাদিন দেখা নেই। আমি একবার গিয়ে দেখলাম ঘুমিয়ে পড়েছিলি।"

নওরীন কি রোমেনাকেও কিছু বলেননি, নাকি তিনি জেনেও এড়িয়ে গেলেন! লিলিও আর সে প্রসঙ্গে গেল না।

"মন খারাপ ছিল এখন ঠিক আছে।"

"তৌহিদা কল করেছিল। তুই একবার দেখা করে আসিস। আমি ওকে কত করে আসতে বললাম। সে রাজি হয় না। আরে আমি তোর মেয়ের শাশুড়ির আগে তো তোর প্রাণের বান্ধবী। সেটা কি ভুলে গেছিস?"

লিলিরও মন কেমন করে মায়ের জন্য। কিন্তু জেদ ওকে বাঁধা দেয়। তবে কাল সে নওরীনের সাথে কথা বলে মায়ের সাথে দেখা করে আসবে বলে ঠিক করল।

"আমি পাশের চুলায় চা করি?"

"কর।"

"তোমার ছেলে কেমন চা পছন্দ করে বলো তো?"

রোমেনা লিলির দিকে তাকিয়ে নিজের স্বস্তি গোপন করে বললেন, "ঘন দুধের চা ওর বেশি পছন্দ। তুই পারবি?"

"যা পারি তাই খাবে। আজ নাহয় পাতলা চা-ই খেলো। সে কোন দেশের রাজাধিরাজ, যে সব মেপে মেপে দিতে হবে?"

লিলির বলার ভঙ্গিতে রোমেনা ঘর কাঁপিয়ে হাসলেন।

"সেটাই। আমার ছেলেটা সারাক্ষণ নিয়মের মধ্যে থাকতে চায়। মাঝে মাঝে অনিয়ম না করলে আর জীবনের মজা কোথায়। তুই ঘাড়ে ধরে হতচ্ছাড়াটাকে একটু অনিয়ম শিখিয়ে দিস তো।"

তার কথা শেষ হতে লিলি মনে মনে দেখেও ফেলল সে নেহালকে ঘাড়ে ধরে ট্যালট্যেলে চা খাওয়াচ্ছে আর বেচারা কাঁচুমাচু মুখে নিতান্ত অনিচ্ছায় চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে। বেচারা নেহাল! লিলি যে কে এবার ঠিক সে বুঝিয়ে দেবে! আজকের জন্য কেবল মাফ করেছে প্রতিদান হিসেবে।

কল্পদৃশ্যটা ভাবা মাত্রই লিলিও রোমেনার সাথে হেসে লুটোপুটি খেল।

শাশুড়ি আর বউয়ের এমন যৌথ হাসির শব্দে আশফাক আর নেহালও ততক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে রান্নাঘরের সামনে।

নেহাল বিয়ের আগে দেখা সেই ছবিতে এমন হাসি দেখেছিল লিলির, আজ চোখের সামনে দেখল। কী উচ্ছল, প্রাণবন্ত হাসি! একরাশ স্নিগ্ধতা মেয়েটার চোখেমুখে লেপ্টে আছে যেন। সুখ সুখ একটা কীসের যেন ব্যাথা বেজে উঠল নেহালের হৃদয়পটে!

Story Cover