বিবাহ বিভ্রাট ডটকম

পর্ব - ৩৮

🟢

রাত্রি আর ইমরোজের মধ্যে এখন দারুণ একটা বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে। পরস্পরের জন্য শ্রদ্ধাবোধ তৈরি হয়েছে। একজন অপরজনের মতামতকে ভীষণভাবে গুরুত্ব দেয়। তবে খুঁনসুটিটা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

ইমরোজ তার আগের প্রেমের কথাও খুলে বলেছে। যেটার এখন কোনো গুরুত্ব নেই ওদের কারোর জীবনেই, সেটা নিয়ে রাত্রির মাথাব্যথা নেই। তবে ওদের এখন কথা কাটাকাটি হয় অন্য বিষয়ে নিয়ে। যেমন ইপ্সিতার জন্মদিনে রাত্রি ইমরোজের সেদিনের দেয়া শাড়িটা পরে সুন্দর করে সেজে এলো। ইমরোজ তখন পরেরদিনের ক্লাসের লেকচার তৈরি করছিল।

রাত্রি এসে জিজ্ঞেস করল, “আমাকে কেমন লাগছে?”

ইমরোজ মুখ না তুলেই উত্তর দিল, “সুন্দর লাগছে।”

রাত্রি ভীষণ রেগে গেল, “তুমি আমাকে না দেখেই কী করে বললে সুন্দর লাগছে? দায়সারা উত্তর দেবে না কখনো।”

ইমরোজ আবহাওয়া যে প্রতিকূলে চলে যাচ্ছে তা বুঝে রাত্রির দিকে তাকালো, সত্যিই ভীষণ সুন্দর লাগছে রাত্রিকে। মেয়েটা তখন রেগে চলে যাচ্ছিল, সে পেছন থেকে ওর হাতটা ধরে বলল,

“তোমাকে সবসময়ই সুন্দর লাগে আমার কাছে। তাই না দেখেই বলে দিয়েছি।”

“এসব কিশোরী মেয়েদের পটানো টাইপ কথাবার্তা আমার সাথে বলবে না, খবরদার। আমি কিশোরী নই।”

রাত্রি ইমরোজের জন্য সেজেছিল, যার জন্য এত সাজ, সে এমন কিছু করলে অভিমান তো হবেই।”

“আরে আমি সত্যি কথা বলছি।” এবার ইমরোজ রাত্রির মুখটা নিজের দুই হাতে ধরে ওর চোখের দিকে বলল,

“এটাই সত্যি। সত্যি কথা যদি মেয়ে পটানো টাইপ হয় তো হোক, আমি তবুও বলব।”

রাত্রি ওর হাত নামিয়ে দিয়ে বলল, “থাক, এখন আর ঢং করতে হবে না। তুমি যে অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছিলে সেটা করো।”

“এখন তোমাকে ভালো করে দেখার চাইতে গুরুত্বপূর্ণ কাজ আমার কাছে আর কিচ্ছু নেই। ওই কাজ একটু পরেও করা যাবে।”

রাত্রি হেসে ফেলল, “খুবই চিজি ডায়লগ।”

“উহু, বলো রোমান্টিক ডায়লগ।”

রাত্রি ইমরোজের নাক টিপে দিয়ে বলল, “আমার আনরোমান্টিক বরটা রোমান্টিক হচ্ছে তাহলে!”

ইমরোজ এবার আর অপ্রতিভ হলো না, সেও পাল্টা হেসে স্ত্রীর চোখে চোখ রেখে বলল,

“রোমান্টিসিজম জিনিসটা বোধহয় ছোঁয়াচে, তোমার কাছ থেকে আমার মধ্যে সংক্রমিত হয়েছে।”

রাত্রির অভিমান গলে গেল, প্রেম পর্ব চলল কিছুক্ষণ।

***

ইপ্সিতা বসে আছে গোমড়া মুখে। আজ ওর জন্মদিন। ঘরোয়া আয়োজনে হলেও রাত্রির পরিবারকে জানানো হয়েছে। সে ভেবেছিল আজ উৎপলের সাথে সামনা-সামনি কথা বলতে পারবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। কেউ না কেউ হয় ওর সাথে নয়তো উৎপলের সাথে বসে থাকছে।

সে একা কথা বলার সুযোগই পেল না। সবাই যেহেতু সব জানে, তাই সবার সামনে কথা বলার চেষ্টা কেউই করল না।

ওদের কথা হলো হোয়াটসঅ্যাপের মেসেজে। উৎপল লিখল, “তোমার জন্য গিফট এনেছি। সেটা কী করে দেব?”

“তুমি সুযোগ পেলে কোথাও রেখে যেও। আমাকে জানিয়ে দিও। আমি নিয়ে নেব।”

উৎপল তক্কে তক্কে ছিল কোথায় রাখা যায়। ভেবেচিন্তে রান্নাঘরের পাশে যে কমন ওয়াসরুমে আছে, সেখানে রেখে এলো।

সেটা ইপ্সিতাকে জানিয়ে দিল। সে একটা ব্রেসলেট কিনেছে। আগে কখনো দামী উপহার দেয়া হয়নি, ইপ্সিতা নিষেধ করত। এখন যেহেতু বিয়ে ঠিক হয়েই গেছে আর এটা খুব পছন্দ হয়েছিল, তাই কিনে ফেলেছে।

উৎপলরা চলে যাবার পরে নূরী ওয়াশরুমে গিয়েছিল। সে র‍্যাপিং করা ছোট্ট বক্সটা দেখে কৌতূহলী হয়ে নিয়ে এলো। আনোয়ারা, রাত্রি আর ইমরোজ তখন অতিথি বিদায় করে বসার ঘরে বসেছিল। ইপ্সিতা অপেক্ষা করছিল সবাই যার যার ঘরে গেলেই সে জিনিসটা উদ্ধার করবে। এখন ওর মুখের রঙ উড়ে গেল।

নূরী আনোয়ারার কাছে এসে বলল, “খালাম্মা, এইডা বাথরুমে আছিল। আপার মনে হয়।”

সে এই বাড়িতে দুই মাস ধরে কাজ করছে। আনোয়ারা হাতে নিলেন, ইমরোজ তার কাছ থেকে সেটা নিয়ে বলল,

“গিফট বক্স বাথরুমে কী করে যাবে? তারমানে কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে লুকিয়ে রেখে গেছে। এতে যদি এমন কিছু থাকে যে আমাদের ক্ষতি হয়! আমি বরং ফেলে দিয়ে আসি বাইরে নিরাপদ কোথাও।”

রাত্রি ইপ্সিতার ফ্যাকাসে অভিব্যক্তি দেখে যা বোঝার বুঝে গেল। সে বলল,

“তোমার কী ধারণা এইটুকু বক্সে বো*মা লুকানো আছে?”

“তা না থাকুক, কেউ ফাসানোর চেষ্টা করতে পারে।”

রাত্রি মাথায় হাত দিয়ে ইমরোজকে ফিসফিস করে বলল, “আরে, বাড়িতে বাইরের কেউ এসেছিল নাকি? বুঝতে পারছ না?”

ইমরোজও ফিসফিস করে বলল, “নূরী তো বাইরের। এখন কত উদ্দেশ্য নিয়ে লোকে বাড়িতে ঢুকে কত ক্ষতি করে দিয়ে যায়।”

রাত্রি ইঙ্গিতে উৎপলের কথা বোঝাতে চেয়েছিল, এই লোক কী বুঝল!

আনোয়ারাও ততক্ষণে বুঝতে পেরেছেন ঘটনাটা কী। তিনি বললেন,

“ইমু, আমাদের কারো সাথে অত শত্রুতা নেই বোধহয় যে মে রে ফেলার চেষ্টা করবে। তবে… আচ্ছা, অনেক রাত হয়ে গেল, চল ঘুমাতে যাই।”

“কিন্তু মা, অন্তত একবার খুলে দেখি! এভাবে…..”

রাত্রি ইমরোজের হাত ধরে টেনে বলল, “খুলতে হবে না। চলো তো। কথা আছে।”

“আরে, কী আছে…”

বাকিটা বলতে পারল না, রাত্রি ওকে টেনে ভেতরে নিয়ে এলো।

“আরে, তুমি বুঝতে পারছ না? ওটা ইপ্সিতার জন্য ভাইয়া এনেছে।”

“আনলে সেটা তখন দিত না?”

“সবার সামনে দিতে লজ্জা পেয়েছে হয়তো। তুমি এমন প্রেম কখনো করোনি তাই জানো না বোধহয়।”

“তুমি কয়টা করেছ? এত এক্সপেরিয়েন্স বলছ!”

“এক্সপেরিয়েন্স লাগে না। চোখ কান খোলা রাখলেই দেখা যায়।”

ইমরোজ হঠাৎ করে গুম হয়ে গেল, রাগ হয়েছে ওর। নিজের উপরে।

“কী হলো তোমার?”

রাত্রির প্রশ্নে ইমরোজ বলল, “তুমি বোধহয় ঠিকই বলো। আমার বাস্তব বুদ্ধি কিছুটা কম।”

রাত্রির আচমকা মন খারাপ হয়ে গেল। ইমরোজের মুখে মেঘের আভাস দেখলে ওর মনেও মেঘের আনাগোনা শুরু হয়। ভালোবাসা সত্যিই বোধহয় একটা সংক্রামক রোগ। প্রিয় রোগ। যে রোগ থেকে কেউ পরিত্রাণ চায় না।

“ইমরোজ, এভাবে ভাবছ কেন? তুমি পিওর হার্টেড মানুষ। পৃথিবীর অনেক জটিলতা থেকে বহু দূরে কয়জন থাকতে পারে! তুমি পেরেছ। আমি তোমাকে নিয়ে গর্বিত।”

“সান্ত্বনা দিচ্ছ?”

রাত্রি ইমরোজের পাশে বসে ওর কাঁধে মাথা রেখে বলল, “না। সত্যি কথা বলছি। তোমার মধ্যে কিছু না থাকলে কি আমি তোমার প্রেমে পড়তাম? অতিরিক্ত অপ্রয়োজনীয় চিন্তা করা বাদ দাও। নিজের ভালোকে আবিষ্কার করো। সেটাকে নার্চার করো। তাহলেই হবে। আমি যেমন তোমার ভেতরের ভালোকে আবিষ্কার করেছি সেভাবে। প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যেই কিছু না কিছু অপূর্ণতা থাকে। কোনো মানুষই শতভাগ পারফেক্ট হয় না। তোমার ভেতরের সৌন্দর্য তোমার শক্তি। তাই নিয়ে আলো ছড়াচ্ছ। মিছেমিছি অন্ধকারকে আমন্ত্রণ জানাবার দরকার কী! কিপ গ্লোয়িং।”

ইমরোজের মুখে এবার হাসি ফুটল। রাত্রির দিকে তাকিয়ে বলল, “আমি তোমাকে ভালোবাসি রাত্রি। এভাবেই আমার পাশে থেকো সবসময়।”

রাত্রিও হেসে বলল, “যতদিন বেঁচে আছি, তোমার হাত ধরে বাঁচতে চাই।”

ইমরোজ মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া চাইল, এভাবেই ভালোবাসা আর ভরসায় যেনো বহুদিন ওর পাশাপাশি চলতে পারে একই পথে।

***

সবাই যাবার পরে ইপ্সিতা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। ছোট্ট বক্সটা নিয়ে দ্রুত পায়ে ভেতরে চলে এলো। খুলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, উৎপলকে কল করল।

“আমি এখন রেখে দিলাম এটা। তোমার হাতে পরব। বলে। আমাদের যেদিন বিয়ে হবে সেদিন এটা তুমি আমার হাতে পরিয়ে দেবে।”

সময়টা ওদের কাছে এত লম্বা বলে মনে হচ্ছে! সুতীব্র অপেক্ষার সময়টা এত দীর্ঘ আর ক্লান্তিকর! এই সময়টায় ওরা স্বপ্ন জমাচ্ছে। সুন্দর একটা ভবিতব্যের স্বপ্ন।

ইপ্সিতা ভাবল, আগে তো মা আর ভাইয়া বিয়ে বিয়ে করে অস্থির করে তুলছিল। আর এখন কেউ বিয়ের নাম মুখেও নেয় না। অবশ্য যা করেছে, তারপরও যে বিয়েটা দিতে তারা রাজি হয়েছে, এটাই বড্ড স্বস্তির।

***

ক্যালেন্ডারের পাতা ঘুরে নয় মাসে পা দিয়েছে রাত্রি আর ইমরোজের দাম্পত্য। এমনই এক রৌদ্রজ্জ্বল দিনে রাত্রি ইমরোজকে একটা সুখবর দিল। নতুন অতিথির আগমনী বার্তা।

ইমরোজ শিশুর মতোই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। ওর চোখ বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়াচ্ছিল। রাত্রিও।

আনোয়ারা ভীষণ খুশি, তার ছেলেটা একসময় বিয়ে করতে চায়নি। এখন তার সন্তানের ঘর পূর্ণ হতে যাচ্ছে। তিনি দোয়া করলেন, নাতি বা নাতনি যে-ই আসুক, তার ঘর আলোকিত করুক শিশুটি।

সামনেই ইপ্সিতার বিয়ের আয়োজন করতে হবে। সেটা নিয়ে সবাই পরিকল্পনায় মত্ত হয়ে উঠল। আজ ইমরোজ আনোয়ারা আর রাত্রি, রাত্রিদের বাড়ি যাচ্ছে।

মেয়ের এমন খুশির দিনে মায়া আর হাবিব তাদের দাওয়াত দিয়েছেন। সাথে উৎপল ইপ্সিতার বিয়ে নিয়েও আলোচনা হবে।

………

(ক্রমশ)

(আর এক বা দুই পর্ব বাকি ইনশাআল্লাহ)

বইটই থেকে আমার ই-বুক গুলো পড়তে পারেন।

‘জেন্টেলম্যান ক্যাটাগরি’র একেবারে প্রথম শ্রেণির বাসিন্দা রিহানের সাথে উড়নচণ্ডী মিতুলের বিয়ে ঠিক করেছেন তার মা, যে কিনা ওর দুই চোখের বিষ। ছেলেবেলা থেকে তারা একসাথে বেড়ে উঠেছে, স্কুল, কলেজও একই ছিল। তবুও দুজনের বন্ধুতা ঠিক গড়ে উঠেনি কোনোদিন। শত্রুতাও বলা যায় কি! নাকি শুধুই বিতৃষ্ণা!

অদ্ভুত এক সমীকরণে দাঁড়ানো সম্পর্ককে বিয়েতে বেঁধে দিলেই কি সমীকরণ বদলে যায়! দুই বিপরীত মেরুর মানুষের মধ্যে মেলবন্ধন

ঘটে? দেখা যাক দুটোতে পরস্পরের মনের থৈ পায় কিনা! স্বপ্নময় কোনো রাতে পৃথিবীপ্লাবী জোছনার জলে তাদের হৃদয়ে অবগাহনের সাধ হয় কি-না!

Story Cover