এই সপ্তাহেই ইপ্সিতার জন্মদিন বলে ইমরোজ শপিংমলে এসেছে উপহার কিনতে। ভেবেছিল রাত্রিকে বলবে সাথে আসতে। পরে মনে হলো ওর জন্যও একটা উপহার কিনবে৷ উপহার দেবার সময় নিজের অনুভূতির কথা জানাতে সহজ হবে।
ইপ্সিতার জন্য সালোয়ার কামিজ আর একটা ঘড়ি নিয়ে শাড়ি দেখছিল, একটা শাড়ি মা'য়ের জন্য পছন্দ হলো। এরপর ঘুরতে ঘুরতে লাল রঙের একটা শাড়িতে চোখ আটকে গেল। মনে হলো এই শাড়িতে রাত্রিকে খুব মানাবে।
বাসায় ফিরতে ফিরতে ভেবেছে আজই শাড়িটা রাত্রিকে দেবে। কিন্তু যদি পছন্দ না করে! এত ঘুরে ঘুরে কিনেছে, পছন্দ না হলে ওর খারাপ লাগবে।
পরক্ষণেই এই ভাবনা বাতিল করে দিল। আগে হলে মুখের উপরে বলত, এখন অন্তত তা করবে না। ইমরোজ বুঝতে পারে ওর হৃদয়ের ঢেউ অপর প্রান্তেও লেগেছে। নইলে ওর পছন্দের খাবার রান্না করে খাওয়াত না। কিন্তু কেউ বলছে না। এতকিছু বলতে পারে, কিচ্ছু মুখে আটকায় না, অথচ ভালোবাসার কথা বলতেই মহারানী বোবা!
কিন্তু নিজে থেকে বলতে ইমরোজেরও সংকোচ হচ্ছে। যদি আগের মতো উল্টাপাল্টা কথা শুনতে হয়! যদি বিদ্রুপের হাসি হাসে! সে নিতে পারবে না। থাক, এখন বলার দরকার নেই। আরেকটু অপেক্ষা করে দেখা যাক বরং। তাতে রাত্রি বললে ভালো আর না বললেও সে আরেকটু বুঝে নিতে পারবে বাতাসটা ঠিক কোন দিকে বইছে!
সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে বাসায় চলে এলো। এই সময় রাত্রি থাকে না। এটা বরং ভালো হয়েছে। ইমরোক ওয়ার্ডরোবে রাখল শাড়িটা। এটায় রাত্রি হাত দেয় না জানে সে।
***
রাত্রির আজ ভীষণ ব্যস্ত একটা দিন কাটল, দম ফেলার ফুরসৎ নেই। নতুন করে প্রচারণা বাড়িয়েছে। বিবাহ ডটকমের নতুন বিজ্ঞাপনটার শ্যুটিং হলো আজ সারাদিন। অফিস সামলে শ্যুটিং ফ্লোরে গিয়েছিল।
শোভার সাথে যা হয়েছে সেটা একদমই ঠিক হয়নি। কিন্তু সে তাদের কাছে ক্ষমা চেয়েছিল। তা সত্ত্বেও কাজটা করেছে। কিন্তু সে তো বসে থাকতে পারে না। যেটুকু ক্ষতি হয়েছে, সেটুকু পুষিয়ে নিতেই হবে।
উৎপল এই ঘটনায় একেবারে গুম হয়ে গিয়েছে। মনে হচ্ছিল ওর একটা বোকামির জন্য বোনের ক্যারিয়ারে একটা দাগ লেগে গেল। রাত্রি আজ একবার বাড়ি এলো উৎপলের সাথে কথা বলতে। যা হয়ে গেছে তা তো আর বদলানো যাবে না। শুধু শুধু এটা নিয়ে মন খারাপ করে থাকার কিছু নেই। অনুশোচনার আত্মদহন বাড়ায়। আত্মদহন আত্মশুদ্ধির পথ সম্প্রসারিত করে। সেটাই বড় বিষয়।
উৎপল শুয়ে ছিল৷ রাত্রি এসে ডাকতে উঠে বসল৷ মৃয়মান গলায় বলল,
“আমার জন্য তোর ক্ষতি হয়ে গেল।”
“ভাইয়া, এই যে এটা বুঝতে পেরেছ, এটাই সবকিছু। ভবিষ্যতে আর এমন কিছু করবে না সেটা আমি জানি। আমি তোমাকে চিনি তো। শোভার বিষয়ে যখন কথা হচ্ছিল, তখনও যদি তুমি আমাকে বলতে বিষয়টা! যাই হোক। এখন এটার জন্য মন খারাপ করে থেকো না। তোমার মন খারাপ থাকলে আমার ভালো লাগে না জানো তো!”
উৎপলের মুখে এবার হাসি ফুটল। সব জানাজানি হবার পরে এই প্রথম রাত্রি ওর সাথে ভালো করে কথা বলল। রাত্রি শুধু ওর ছোট বোন নয়, ওর প্রিয় বন্ধু, ওর ঢাল, মেন্টরও বলা যায়। এই দূরত্ব ওকে ভেতরে ভেতরে কুরে কুরে মারছিল। এখন ভালো লাগছে।
“তুই আমার উপরে আর রেগে নেই তো?”
রাত্রি মৃদু হেসে বলল, “আমি আরেকবার তোমায় বিশ্বাস করছি ভাইয়া। এবার বিশ্বাস রেখো কিন্তু।”
উৎপল হেসে রাত্রির মাথায় হাত রেখে বলল, “তুই আমার কাছে কী এটা তুই জানিস?”
“জানি, এখন চকলেট দাও।”
উৎপল হেসে ড্রয়ার খুলে চকলেট বের করে রাত্রিকে দিল, “পাগল।”
মা বাবা থাকতে বললেও সে থাকল না। ইমরোজ ওকে মিস করে সে জানে। এখন ওকে কিছুটা সময় দিতে চায় রাত্রি। ফেরার পথে ট্রাফিক জ্যামে বসে বসে ইমরোজের মুখটা মনে পড়ল। সেদিন ইমরোজ বাজার করে আনার আগে সে আনোয়ারার কাছে গিয়ে বলেছিল,
“মা, তোমার ছেলের পছন্দের খাবার কোনটা?”
“আমার হাতের বিরিয়ানি খুব পছন্দ করে, গরুর মাংস দিয়ে ভুনা খিচুড়ি, ইলিশ, চিংড়ি, পায়েস এগুলোই পছন্দ করে।”
“তোমার হাতের রান্নার কিছু একটা আমাকে শিখিয়ে দেবে?”
“তুই রান্না করবি নাকি?”
“হ্যাঁ মা।”
“আচ্ছা, তুই ওকে বাজার করে আনতে বল। কিছু জিনিস লাগবে।”
রাত্রি ইচ্ছে করেই গুছিয়ে বাজারের লিস্টটা দিয়েছিল, দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে চোখ রেখেছিল, ইমরোজের ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখটা দেখতে মজা লেগেছে। নিজে বলতে পারছে না, আশা করছে সে বলবে! সবসময় ছেলেরা বলে এসব, বুদ্ধুটা তাও জানে না!
সে খিচুড়ি, বিরিয়ানি মোটামুটি পারে, কিন্তু ততটা মজা হয় না। আনোয়ারার কাছ থেকে শিখে নিয়ে রান্না করেছিল। ইমরোজ যখন শুনল রাত্রি ওর জন্য রান্না করেছে, তখনকার অভিব্যক্তিটা কী যে ভালো লেগেছে ওর। মনে হচ্ছিল কষ্টটা স্বার্থক।
বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে রাত্রি একটু শুবে ভাবছিল, কিন্তু ইমরোজ ভেতরে এলো। রাত্রি জিজ্ঞেস করল,
“কিছু বলবে?”
ইমরোজ ইতস্তত করে বলল, “একবার বারান্দায় আসবে? আজকের আকাশটা সুন্দর। অনেক তারা দেখা যাচ্ছে।”
রাত্রির শরীর অবসন্ন, ইচ্ছে করছিল না উঠতে, কিন্তু ওর মনে হলো, এটাই বোধহয় কাঙ্ক্ষিত দিন। তাই সে উঠে এলো।
“একটু বসো, আমি ভেতর থেকে আসছি।”
রাত্রি মনে মনে উদগ্রীব হয়ে আছে আকাঙ্ক্ষিত কথা শুনতে। বিশাল আকাশে ফুটে থাকা অসংখ্য তারাদের ভীষণ আপন বলে মনে হচ্ছিল।
ইমরোজ এসে বলল, “তোমার জন্য একটা শাড়ি কিনেছি।”
বলে বাড়িয়ে দিল রাত্রির দিকে।
“লাইটটা অন করে দিচ্ছি, দেখো তো পছন্দ হয় কিনা!”
লাইট জ্বালানোর কথা শুনে রাত্রির আশা ভঙ্গ হলো। তারমানে এটা দেবার জন্য!
“এটার কী দরকার ছিল?”
“না, পছন্দ হলো। মনে হলো তোমাকে খুব মানাবে তাই..”
“আমাকে কীসে মানাবে এটা নিয়ে ভাবছ কেন?”
ইমরোজ লাইট জ্বালাতে গিয়েও থেমে গেল, কী উত্তর দেবে বুঝতে না পেরে বলল,
“বন্ধুর জন্য ভেবেছি।”
রাত্রির গা জ্বলে গেল! এই নিরামিষ ব্যাটার জন্য অপেক্ষা করতে করতে চুলে পাক ধরে যাবে, তবুও তিনি মুখ ফুটে বলতে পারবেন না। রাত্রি সহসা বলল,
“আমি একজনের প্রেমে পড়েছি।”
“কার?” প্রশ্নটা করেই বুঝল ভুল প্রশ্ন করে ফেলেছে, সে এই প্রশ্ন করতেও চায়নি। মুখ থেকে নিজে নিজেই বেরিয়ে গেছে।
রাত্রি কঠিন চোখে ওর দিকে এক পলক তাকিয়ে নিমিষেই দূরত্ব কমিয়ে ইমরোজের কাছে চলে এলো। এরপর ওর কলার ধরে নিজের কাছাকাছি নিয়ে এলো। রাত্রি ওর মুখটা ইমরোজের কানের কাছে নিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“একটা গাধার। যাকে সবকিছু গুলে খাইয়ে না দেয়া পর্যন্ত তিনি কিচ্ছু বুঝতে পারেন না।”
বলে ইমরোজের গালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে প্রায় ছুটে চলে গেল ভেতরে।
হতবিহ্বল ইমরোজ দাঁড়িয়ে রইল গালে হাত দিয়ে। কথাটা মাথায় প্রসেস হতে সময় লাগল খানিকটা। ওকে গাধা বলেছে বলে ভীষণ রাগ হলো প্রথমে। ঝগড়া করার প্রস্তুতি নিয়ে হাঁটতে শুরু করতেই আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। রাত্রি ওর প্রেমে পড়েছে, এটাই বলল না! তাই তো! নিমিষেই মৃদু হাসি ফুটল ইমরোজের মুখে, সেই হাসি ছড়িয়ে পড়ল মনে, মস্তিষ্কে।
বুঝতে দেরি হয়েছে, কিন্তু ওর কী দোষ। এভাবে হুমকি দিয়ে কেউ এমন মিষ্টি কথা বলে! আজ অব্দি কেউ এমন তেতো স্বরে ভালোবাসার কথা বলেছে! সে কথাটা হজম করে দ্রুত পায়ে ভেতরে চলে এলো।
রাত্রি ভেতরে এসে কতক্ষণ দু'হাতে মুখ ঢেকে বসে রইল। সে কখনো লজ্জা পায় না। লজ্জাবতী, লাজুকলতা সে কখনোই নয়। তবুও প্রথমবার কারো এতটা কাছে এসে সেই অচেনা লজ্জার সাথে প্রথমবার পরিচিত হলো।
ইমরোজকে ভেতরে এসে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে সেটা বাড়ল আরও। ইমরোজ এগিয়ে আসতেই রাত্রি উঠে বলল,
"তোমার শাড়িটা দেখব, লাইট জ্বালাই।"
ইমরোজ ওর হাত ধরে কাছে টেনে নিয়ে বলল, "সেটা পরেও দেখা যাবে। এই সুন্দর মুহূর্তটা আর আসবে না। আজকের রাতে নতুন করে শুরু করবে সব?"
রাত্রি মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। পৃথিবীর সমস্ত ভালোবাসা যেন নেমে এলো পৃথিবীর এই ছোট্ট ঘরটায়!