বিবাহ বিভ্রাট ডটকম

পর্ব - ৩৫

🟢

ইমরোজ চোখ খুলে ভূত দেখার মতো চমকে উঠল শিয়রের কাছে বসে থাকা রাত্রিকে দেখে। মুহূর্তকাল লাগল রাত্রির অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে। সমগ্র পৃথিবী যেন নিমিষেই বিস্মৃত হয়ে গেল ওর সমস্ত চেতনা থেকে! সে জ্বরক্লিষ্ট চোখেই নিষ্পলক তাকিয়ে রইল। এও সম্ভব! নিজেকে চিমটি কেটে দেখতে ইচ্ছে করল, যে মেয়ে কিছুক্ষণ আগেই ফিরে আসার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে সে এখন ওর ঘরে, ওর এত কাছে বসে আছে। ওর কপাল ছুঁয়ে দিচ্ছে পরম যত্নে! এটা বিশ্বাস করা কম দুস্তর নয়!

“নিজের উপরে এই অত্যাচার করার খুব দরকার ছিল?”

এবার বিশ্বাস হলো এটা রাত্রি, একজন অসুস্থ মানুষের কাছে কেমন জবাবদিহিতা চাইছে! নিষ্ঠুর একটা মেয়ে। কেন জানে না, প্রবল অভিমান উথলে উঠল ইমরোজের হৃদয় সমুদ্রে।

“কেন এসেছ? দয়া দেখাতে?”

রাত্রির চোখে-মুখে হতাশা ফুঁটে উঠল, “দয়া দেখাতে বুঝি কেউ এই রাত-দুপুরে ছুটে আসে?”

“তখন বলেছিলে ফিরবে না।” অভিমান জড়ানো গলা ইমরোজের।

“আমি আসায় তোমার প্রবলেম হলো বুঝি?” ইমরোজের কপাল থেকে চুল সরিয়ে দিয়ে বলল রাত্রি।

ইমরোজ ডান হাতটা তুলে ওর কপালে রাখা রাত্রির হাতটা আলতো করে স্পর্শ করল, এরপর ওর মুখের অভিব্যক্তি বুঝতে চেষ্টা করল। কিন্তু ব্যর্থ হলো, এই মেয়েকে বোঝা সহজ কর্ম নয়। এখন অসুস্থতায় কাউকে পড়তে চাওয়া ভীষণ ক্লান্তিকর বলে মনে হলো।

“আমি চাইছিলাম তুমি ফিরে আসো। তোমার সমস্যা ছিল আসতে। প্রবলেম থাকা সত্ত্বেও কেন এলে?” অভিমানী ইমরোজ শুনতে চাইছে রাত্রি ওর সাথে জীবনের বাকি পথ চলার জন্য ফিরে এসেছে। কিন্তু তেমন কিছুই বলছে না, অযথা ওর প্রশ্নের বিপরীতে পাল্টা প্রশ্ন করে যাচ্ছে। ইমরোজ শিক্ষক মানুষ, প্রশ্ন করে উত্তর পেয়ে অভ্যস্ত। এতে বিরক্ত হলো মনে মনে।

“ইমরোজ, আমি কখনো আমার মনকে ইগনোর করে কাউকে খুশি করার চেষ্টা করতে পারি না। আমার মন আজ এখানে আসতে সায় দিয়েছে। তাই চলে এসেছি। এখন এত কথা বলো না তো। চুপচাপ ঘুমাতে চেষ্টা করো।”

প্রথমবার খেয়াল না করলেও এবার সে উপলব্ধি করল, রাত্রি ওকে তুমি বলে সম্বোধন করছে। জ্বর আর রাতের অভিমানী শহর ভ্রমণে ওর শরীর মন দুটোই বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে। রাত্রির কথার পুরো মানেটা সে ধরতে পারল না। আকারে-ইঙ্গিতে কথাবার্তা বুঝতে সবসময়ই সে অপারগ। কেউ ওর সামনে ঘুরিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বললেও সে ধরতে পারে না। অনেকক্ষণ পরে যখন বুঝতে পারে, তখন আসলে পাল্টা উত্তর দেবার মতো পরিস্থিতি থাকে না। সে সবসময় সরাসরি কথা বলে।

এখন বুঝতে চেষ্টাও করল না, তবে রাত্রির মুখে তুমি শুনতে বড্ড ভালো লাগল। হঠাৎ করে কথাটার আংশিক অর্থ ধরতে পারল। রাত্রি নিজের মনের কথা শুনে ফিরে এসেছে। ওর জন্য ফিরে এসেছে এটা যদি বলত! তবুও কেন যেন ভালো লাগল।

রাত্রি এবার বলল, “অনেক শোধবোধের খেলা হলো। এবার এটা শেষ হোক নাহয়।”

“শোধবোধের খেলা শেষ হবার পরে কী হবে?”

“বন্ধুত্ব। অবশ্য তোমার আপত্তি না থাকলে।”

ইমরোজ অবসন্ন চোখে আরেকবার স্ত্রীর দিকে তাকাল। বুঝতে চেষ্টা করল রাত্রির মনে আবার কোনো দুষ্টু বুদ্ধি উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে কি-না! না, আগের মতো যুদ্ধংদেহী মুখাবয়ব নয়, বরং অত্যন্ত মায়া নিয়ে ব্যথাতুর আপন মানুষের দিকে কেউ যেভাবে তাকায় তেমন দৃষ্টি। রাত্রির অভিব্যাক্তিতে এই দৃষ্টি সে আগে কখনো দেখেনি। চেনা রাত্রির অচেনা মুখ দেখতে ওর ভালো লাগছে। অবচেতনেই সে বলল,

“আপত্তি কেন থাকবে?”

“আমি তোমার স্টুডেন্ট নই, এত প্রশ্ন করছ কেন? উত্তর চাই আমার।” এবারের বলায় কাঠিন্য থাকলেও সেটুকু ছাপিয়ে গেল মায়ার আড়ালে।

“তোমার সাথে বন্ধুত্ব হলে আমারও ভালো লাগবে।”

“এবার সুবোধ ছেলের মতো ঘুমানোর চেষ্টা করো দেখি। এখন সেটা জরুরি।”

ইমরোজ চোখ বন্ধ করল না সহসা, রাত্রি বলল, “মা কত চিন্তা করেন, তুমি জানো? এভাবে রাগ করে এমন কিছু করা ঠিক নয়, যাতে তোমার সাথে সাথে তারও কষ্ট হয়। তুমি কলেজের লেকচারার হয়েও কিচ্ছু বোঝো না, তোমার চাইতে স্কুলে পড়া বাচ্চাদেরও মাথা ভালো।”

রাত্রি কথার মধ্যে বোঝাতে চেষ্টা করল এই রগচটা গাধাটার জন্য ফিরে এসেছে। অথচ কিছুই বুঝল না। বন্ধুত্বেই তিনি খুশি৷ কেন, সে বলতে পারল না, “বন্ধুত্ব তো চাই, তবে বন্ধুত্বের সাথে সাথে তোমাকেও চাই।”

এটা এর মুখ থেকে বের করতে কত অপেক্ষা করতে হয় কে জানে!

ওদিকে তার মুখে আবারও অভিমানের ছাপ পড়েছে, “আমি মাথা খারাপ মানুষ। তাহলে বন্ধুত্ব করলে কেন?”

রাত্রি এবার বিরক্ত হতে হতেও হেসে ফেলল, ওর চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল, “সাধে বলিনি। আগে সুস্থ হোন আপনি। তারপর আপনাকে পড়ার বইয়ের বাইরের অ আ ক খ থেকে শুরু করে ব্যকরণ পর্যন্ত শিখিয়ে দিতে হবে।”

“বন্ধুত্ব করেও আবার আক্রমণাত্মক হচ্ছো তুমি।”

রাত্রি নিজের মুখটা কিঞ্চিৎ নামিয়ে আনলো, এরপর ফিসফিস করে বলল, “তোমাকে ভীষণ ইনোসেন্ট দেখাচ্ছে এখন। আমাদের পাশের বাসায় একটা কিউট বাচ্চা আছে৷ রাগলে ওরকম লাগে তোমাকে।”

বলে ইমরোজের নাক টেনে দিল রাত্রি। এরপর সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল, “তোমার আজকের কাণ্ডে রাগ হয়েছে আমার। এমন কাজ আর কখনো করবে না। এখন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছো। এটা ছেলেমানুষি নয়? কী লাভ হয়েছে তাতে?”

ইমরোজ অবচেতনেই বলে ফেলল, “লোকসান কিছু হয়নি।”

এরপর মনে মনে বলল, “এই যে তুমি আমার পাশে আছ। আমার শূন্যতা নেমে আসা ঘর পূর্ণ করেছ। এটা তো লাভ-ই।”

রাত্রি দেখল ইমরোজের জ্বর আবার বাড়ছে, কথাবার্তা অসংলগ্ন মনে হচ্ছে। সে উঠে নরম কাপড় ভিজিয়ে এনে ওর মাথায় দিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে ইমরোজ ঘুমিয়ে পড়ল। রাত্রি পাশে বসে রইল ঘুমন্ত ইমরোজের দিকে তাকিয়ে।

হঠাৎ করে উপলব্ধি করল, সে ডুবে যাচ্ছে অতলান্তিক সমুদ্রে, যে সমুদ্র ভর্তি ভালোবাসার জলে। অন্য আরেক সমুদ্রের জল এসে এই জলে মিশে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে ভালোবাসার মহাসমুদ্র।

Story Cover