বিবাহ বিভ্রাট ডটকম

পর্ব - ৩৪

🟢

ইমরোজের মনে যেটুকু সংকোচ ছিল, মায়ের কথায় তা কেটে গেছে। রাত্রিকে যে ভালোবেসে ফেলেছে এটা আগেই বুঝতে পেরেছে। ক্ষমা সে চাইতে পারবে নিঃশঙ্ক চিত্তে। কিন্তু ভালোবাসার কথা জানাতে সময় লাগবে। আগে নিজের সাথে যুঝতে হবে। সে ক্লাসে গুছিয়ে লেকচার দিতে পারে, কিন্তু নিজের একান্ত অনুভূতি প্রকাশে সে বরাবরই অজ্ঞ। দেখা যাবে ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে এমন কিছু বলে ফেলবে, পরে সব গুবলেট পেঁকে যাবে। নাহ্! এই রিস্ক নেয়া যায় না। আগে বরং নিজেকে প্রস্তুত করে নেয়া যাক।

তবে রাত্রিকে ফিরিয়ে আনতে হবে আগে। শনিবার সন্ধ্যার পরে সে রাত্রিদের বাসায় গেল। রাত্রি তখন বাইরে। মায়া ওকে যত্ন করে বসালো। হাবিব সাহেব টেলিভিশনে খবর দেখছিলেন, আবার পত্রিকাও পড়ছিলেন একসাথে। পত্রিকা থেকে চোখ তুলে তিনি বললেন,

“কেমন আছ বাবা?”

“জ্বি ভালো। আপনি কেমন আছেন?”

মায়া এলেন চা নিয়ে। তিনি ফোঁড়ন কেটে বললেন, “ডাবল নিউজের ডোজ নিলে সে ভালোই থাকে। নাও, চা নাও। যা ঠাণ্ডা পড়েছে এবার।”

“তোমার দেয়া চিনি ছাড়া চা খেয়ে ভালো থাকার উপায় আছে? নিজেকে নিজের ভালো রাখার উপায় বের করে নিতে হয়।”

“এই কথাটা শরীরে সুগার বাড়ানোর আগে মনে ছিল না?”

ইমরোজ উত্তর দিল না, মৃদু হাসল শুধু। তাদের খুঁনসুটির মধ্যে সে ঢুকে কী বলবে, পরে দেখা যাবে অপরপক্ষ নাখোশ হয়ে বসে আছে৷ এই মুহূর্তে এই দু'জনের সাপোর্টই ওর জন্য জরুরি। মধ্যপন্থা অবলম্বন করা ভালো। তাই নীরবতা পালন করা শ্রেয়।

চা শেষ করতে করতে শ্বশুরের সাথে ইমরোজের দেশ বিদেশের সাম্প্রতিক নানা ইস্যু নিয়ে আলোচনা হলো। কিছুক্ষণ পরে পায়েস নিয়ে এলেন মায়া। ঘন দুধের পায়েস খাবার মাঝপথে রাত্রি চলে এলো। উৎপল তখনো বাইরে। ইমরোজকে দেখে ওর পা থমকে গেল।

“আপনি?”

“এটা কী ধরণের প্রশ্ন হলো? যা রুমে যা, ফ্রেশ হ। তুমিও পায়েস শেষ করে ভেতরে যাও বাবা।”

মায়া ওদের দুজনকে একসাথে কথা বলার সুযোগ করে দিতে চাইছেন দ্রুত৷ হাবিব সাহেব বললেন, “তা বাবা, এই যে ইন্টারনেশনাল ইকোনমি..”

মায়া কঠিন চোখে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা দিতেই তিনি বললেন, “পরে কখনো আমরা সার্বিক আলোচনা করব ক্ষণ।”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমার আলোচনা অনুষ্ঠানের উপরে তো বিশ্বের সব সেক্টরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।”

“তুমি তো পৃথিবীতে কী চলছে কিছুই জানো না। পৃথিবীর একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে নিজের মতামত থাকবে না?”

“যত ইচ্ছা মতামত দাও, আমার সমস্যা নেই। কিন্তু ঘর নিয়েই যে এত উদাসীন, সে বিশ্ব নিয়ে কী চিন্তা করে আমার জানা হয়ে গেছে।”

তাদের কথার যু দ্ধের মাঝেই ইমরোজ ইতস্তত করছিল দেখে মায়া বললেন, “যাও বাবা, ভেতরে যাও।”

ইমরোজ উঠে রাত্রির ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে নক করল, রাত্রি বলল, “আসুন, দরজা খোলা আছে।”

ইমরোজ ভেতরে এলো। রাত্রি উঠে ওর মুখোমুখি দাঁড়াল, “বলুন, যা বলতে চান।”

“রাত্রি, আমি সেদিন তোমাকে যা বলেছি, সেটা একদমই ঠিক হয়নি। আমি কিছু ভেবে বলিনি। ইপ্সিকে আমি কেমন করে টেক কেয়ার করি, এটা তো তুমি শুরু থেকেই জানো৷ আমি আসলে ভীষণ ধাক্কা খেয়েছিলাম। তারপর ওদের প্ল্যান জেনে রাগ হয়েছিল ভীষণ। রাগের মাথায় ওকে বকছিলাম, তুমি মাঝে এসে কথা বলছিলে বলে, ওভাবে বলে ফেলেছিলাম। ইনটেশনালি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি। স্যরি।”

“আপনাকে মা স্যরি বলার জন্য বুঝিয়েছে, তাই না?”

“হ্যাঁ, কাল মা বলল…”

এটুকু শুনে রাত্রির মুখে মেঘের ছায়া নেমে এলো, “তাই এতদিন পরে স্যরি বলতে চলে এলেন। তাই না?”

“তুমি ফিরে চলো, রাত্রি।”

“যেদিন আপনি নিজে নিতে আসবেন সেদিন যাব। তার আগে নয়।”

ইমরোজ বলতে পারল না সে নিজের গরজে ওকে নিতে এসেছে। খুব কষ্ট হলো ওর। রাত্রির ইঙ্গিতটাও ধরতে পারল না।

“ফিরবে না তাহলে?”

“আপনার প্রশ্নের উত্তর আগেই দিয়েছি।”

ইমরোজ আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না, ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেল। শুধু রাত্রির ঘর থেকে নয়, বাড়ি থেকেই। মায়া রান্নাঘরে ছিলেন, দরজা খোলার শব্দে যতক্ষণে এই পর্যন্ত এলেন, ততক্ষণে ইমরোজ চলে গেছে। তিনি জামাইয়ের আপ্যায়নের জন্য রান্না করছিলেন।

রাত্রিকে এসে জিজ্ঞেস করলেন, “ইমরোজ কোথায় গেল?”

“আমি কী করে বলব মা? উনি কি আমাকে বলে গেছেন?”

“যা খুশি কর তোরা। ছেলেটা এভাবে না খেয়ে বেরিয়ে গেল।”

মায়া রাত্রির মুখের দিকে তাকালেন এবার। মেয়ের মুখ দেখে মুহূর্তের জন্য থমকে গেলেন, এই মাত্র যেন কোনো প্রবল ঝড় রাত্রির উপর দিয়ে বয়ে গেছে। তিনি রাত্রির হাত ধরে বললেন,

“এত কষ্টই পাবি, তাহলে ধরে রাখলি না কেন?”

“পুরোটাই এক তরফা মা। আমি কেন আটকাতে যাব?”

রাত্রির ঝাপসা চোখ তার নজর এড়ায়নি। তার মেয়েটা বড্ড শক্ত ধাতের। সহজে ভাঙা যায় না, এখন ভেঙে পড়েছে ভেতর থেকে, তবুও টলতে চাইছে না। তিনি সস্নেহে বললেন,

“এক তরফা কিনা, তুই কীভাবে জানিস? খোলাখুলি কথা বলেছিস?”

রাত্রি উত্তর দিল না, সে তো ইঙ্গিত দিল, বলতে পারত না যে নিজের জন্য ওকে চায়। সেজন্যই ফেরাতে এসেছিল! কেন বুঝল না! কেন বলবে! সে না ফিরলেই তো ইমরোজ ভালো থাকে। স্বাধীনতা অক্ষত থাকে।

কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “রাত্রি, শোন, সব মানুষ একরকম হয় না৷ সবাই সব প্রকাশ করতে পারে না। তোর উচিত ছিল ওকে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়া। যাই হোক, যথেষ্ট বড় হয়েছিস। সব বুঝিস। এই যে তোর চোখে জল, এটা ওকে দেখতে দিলেও হয়তো বুঝত৷ নিজেকে প্রকাশ করতে পারত। ভেবে দেখিস।”

***

ইমরোজ রাত্রিদের বাসা থেকে বেরিয়ে বাইক নিয়ে উদ্দেশ্যহীন চক্কর দিল শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে। স্থিরতা এলো না মনে।

ঠান্ডা জাঁকিয়ে বসেছে এবার। হাড় হিম ঠান্ডায় গায়ে কাঁপন ধরে যাচ্ছে, তবুও ঘরে ফিরল না। ওই শূন্য ঘরে ফিরতে ওর ভালো লাগে না এখন আর। এটা কেন মেয়েটা বোঝে না।

***

রাত্রি বসেছিল নিজের ঘরে। হাবিব সাহেব এসে বললেন, “এভাবে গুম হয়ে বসে আছিস কেন মা?”

“এমনি বাবা। তুমি বসো না।”

হাবিব সাহেব বসে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেন, মেয়েকে তিনি বোধহয় একটু হলেও বেশি ভালোবাসেন। রাত্রি ভীষণ বাবা ন্যাওটা ছিল ছেলেবেলায়। ওইটুকু বয়স থেকে তার সমস্ত খেয়াল রাখত। কাছে কাছে থেকেছে বলেই হয়তো।

“তোর মন খারাপ?”

“না তো?”

“তোকে একটা কথা বলি, দেখ, তোর মায়ের সাথে আমার ঝগড়া দেখেছিস তো সবসময়। তোর একবারও কখনো মনে হয়েছে আমাদের মধ্যে মনের টান নেই? মা একটা কথা বলতেন৷ একটা খুব প্রচলিত উদাহরণ দিতেন, দুটো হাড়ি পাশাপাশি থাকলে ঠোকাঠুকি হবেই। তাই বলে লোকে বাসনপত্র ছুঁড়ে ফেলে দেয়? দাম্পত্য হচ্ছে তেমনই, তারা এত বেশি প্রকাশ্য পরস্পরের কাছে, তাই একটু খটমট লাগেই। পরিস্থিতির জন্য অনেক কথা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়, যার সত্যিকারের ভিত্তি নেই। পরে গিয়ে অনুশোচনা হয়। কেউ যদি নিজের ভুল বুঝতে পারে, দুঃখ প্রকাশ করে, তাকে একবার সুযোগ দিতে হয়। আমি কিন্তু এটা বলছি না যে অসম্মান মেনে নিতে। শুধু পরিস্থিতি বিবেচনা করতে বলেছি। বাকিটা তোর মর্জি।”

রাত্রি বাবার কাঁধে মাথা রাখল, “বাবা, তুমি ওষুধ খেয়েছ?”

“হ্যাঁ, তোর মা সব ভুললেও এটা কখনো ভুলে না।” হেসে বললেন তিনি।

রাত্রি মৃদু হেসে বলল, “মাকে খুব ভালোবাসো, তাই না বাবা?”

“তা তো বাসিই। নইলে এতদূর এলাম কী করে?”

“আচ্ছা বাবা, তোমাদের প্রায় বত্রিশ বছরের সংসার। এখনো এভাবে ভালোবাসা যায়? কখনো একঘেয়েমি আসে না?”

“ভালোবাসলে বরং মনে হয়, শুধু বত্রিশ বছর কেন? আরও কয়েকগুণ সময়ও অল্প মনে হয়। একদিন বুঝতে পারবি। যেদিন বুঝবি, সেদিন তোরও এটাই মনে হবে।”

রাত্রি সহসা আনমনা হয়ে গেল, ইমরোজের সাথে তার এমন একটা সংসার কখনো হবে! সে ঠিক করল ইমরোজ যদি আরেকবার আসে, সে নিশ্চিত হবে একই অনুভূতি ওই প্রান্তেও আছে কি-না। যদি থাকে তবে আর ফেরাবে না।

***

ইমরোজ রাতে বাসায় ফিরল বারোটার আগে আগে, গায়ে ধুম জ্বর। ঠান্ডা লেগে একাকার। ঠান্ডার ধাত আছে ইমরোজের। শীতের সময় তা প্রকট হয়।

“কোথায় ছিলি ইমু?”

আনোয়ারা অস্থির হয়ে উঠলেন। ইমরোজ আর ইপ্সিতার কিছু হলে তার সমস্ত স্থিরতা টলে যায়। ইপ্সিতাকে সাথে নিয়ে কোনোমতে খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দিলেন। কয়দিন আগেই জ্বর থেকে উঠল। আবার জ্বর। খুব ভালো লক্ষ্মণ নয়।

তিনি বালতিতে পানি আনতে গেলেন, ইপ্সিতা পাশে বসেছিল। ইমরোজ কী কী যেন বিরবির করছিল। সব বুঝতে পারছিল না, মাথা ম্যাসেজ করে দিচ্ছিল। ইমরোজ রাত্রি ফিরেছে কিনা এমন কিছু বলছিল বলে মনে হলো।

ইপ্সিতার মোবাইল গতকাল রাতেই একগাদা উপদেশ শুনিয়ে ফেরত দিয়েছিল ইমরোজ। সে রাত্রিকে কল দিয়ে ইমরোজের অবস্থার কথা জানালো।

***

ইপ্সিতার কল পাওয়ার পরেই রাত্রি ভীষণ চিন্তিত হয়ে উঠল। কক্সবাজারের কথা মনে পড়ল। এই লোকটা ভীষণ খারাপ। অন্যের উপরে রেগে নিজেকে কষ্ট দিতে ওস্তাদ। এত কষ্টই যদি পেয়েছে, কষ্টে এত অলিগলি ঘোরা সহজ মনে হয়েছে, ওকে ফিরিয়ে নিতে নিজের মনের কথা বলার চাইতে! সুস্থ হোক এবার শুধু, সে মনের কথা টেনে বের করবে। এসব সে একেবারে সহ্য করবে না।

কিন্তু মনকে প্রবোধ দিতে পারছে না কিছুতেই। মনে হচ্ছে ইমরোজের এই দুর্ভোগের জন্য কোথাও না কোথাও সে দায়ী।

রাত্রি পুরোনো জামাও পরিবর্তন করল না, কোনোমতে চোখেমুখে পানি দিয়ে বেরিয়ে মায়ের ঘরের দরজায় কড়া নাড়ল। মায়া হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এসেছেন।

“মা, আমার ওই বাসায় যেতে হবে। ইমরোজ নাকি খুব অসুস্থ।”

“অসুস্থ? এই না সন্ধ্যায় সুস্থ মানুষ এলো। কী হয়েছে?”

“অনেক জ্বর। সেদিনই জ্বর থেকে উঠল। আমাকে যেতে হবে মা।”

ততক্ষণে উৎপল বেরিয়ে এসেছে, “রাত বারোটার বেশি বাজে। এখন?”

“তুমি চলো তাহলে আমার সাথে। যাবে?”

মায়া বললেন, “সাবধানে যা।” মেয়েকে বাধা দিলেন না। সাথে যেহেতু উৎপল যাচ্ছে।

***

রাত্রি এসে সরাসরি ওদের ঘরে এলো। আনোয়ারা মাথায় পানি ঢালছিলেন। ইপ্সিতা পাশে বসেছিল।

প্রায় আধাঘণ্টা পরে রাত্রি বলল, “মা, তুমি ঘুমিয়ে পড়ো। আমি দেখছি।”

আনোয়ারা বললেন, “আচ্ছা, তুই দেখ তাহলে। আমি তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ি।”

আনোয়ারা বেরিয়ে গেলে, ইপ্সিতাকেও বলল, “তোমাকে ক্লান্ত দেখাচ্ছে। যাও৷ ঘুমিয়ে পড়ো।”

ইপ্সিতারও মনে হলো, দু'জন থাকুক। তাই সে চলে গেল, যাবার আগে বলল, “কোনো সমস্যা হলে ডেকো ভাবি।’’

উৎপল ওকে দিয়েই চলে গেছে। থাকতে রাজি হয়নি। ওকে আর ইপ্সিতাকে নিয়ে কোনো ভুল বোঝাবুঝি আবার হোক সে চায় না।

রাত্রি ইমরোজের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল, কিছুক্ষণ পরে ইমরোজ রাত্রির হাতের উপরে হাত রাখল, অস্ফুটস্বরে বলল,

“রাত্রি?”

চোখ এখনো নীমিলিত। স্পর্শেই চিনে ফেলল!

“হুম।”

ইমরোজ ঘোরগ্রস্ত গলায় বিরবির করে বলে চলেছে, “স্বপ্ন দেখছি বোধহয়। যদি স্বপ্ন হয়, আমি চাই না আমার ঘুমটা ভাঙুক। অসুখ থাকুক সবসময়। অসুখ হলেই কেবল তুমি এভাবে পাশে থাকো।”

তবুও রাত্রি স্পষ্ট বুঝতে পারল কথাগুলো। ওর চোখ থেকে এক ফোঁটা অশ্রুবিন্দু ইমরোজের কপালে পড়তেই ঝট করে চোখ তুলে তাকালো ইমরোজ। চোখ দুটো টকটকে লাল, মুখ মলিন, তবুও যেন একটা বিচিত্র হাসি ফুটে আছে সুন্দর মুখটায়। রাত্রি মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল সেই মুখের দিকে।

Story Cover