ইমরোজ তেড়েফুঁড়ে ইপ্সিতার রুমে এলো আজ হয় এসপার নয় ওসপার করে ফেলতে। ভেতরে এসে বোনকে কাঁদতে দেখে ওর মাথায় জ্বলতে থাকা আগ্নেয়গিরি দপ করে নিভে গেল। যাই কিছু হয়ে যাক, বোনকে সে অসম্ভব ভালোবাসে। সবসময় প্রকাশ করতে পারে না, কিন্তু মিথ্যে তো নয়। এত আদরের ছোট্ট বোনকে এভাবে ফুঁপিয়ে আকুল হয়ে কাঁদতে দেখে এগিয়ে গিয়ে বিছানায় বসল।
এই কয়দিন সে ইপ্সিতার সাথে পারতপক্ষে কথাই বলেনি। যেটুকু বলেছে, সবসময় রূঢ় আচরণই করেছে। ইপ্সিতা কিছু বলতে চাইলেও সুযোগ দেয়নি। ইমরোজ গলা যথাসম্ভব নমনীয় রেখে সস্নেহে ডাকল,
“ইপ্সি..”
ইপ্সিতা মুখ তুলে ইমরোজের দিকে তাকিয়ে খানিকটা সিঁটিয়ে গেল, “কাঁদছিস কেন এভাবে?”
ইপ্সিতার কান্নার বেগ বেড়ে গেল, ওকে ভয় পাচ্ছে। ইমরোজের খারাপ লাগল। উৎপল আর রাত্রির সম্পর্কটা কত সহজ! সে বোধহয় একটু বেশিই শাসন করে ফেলেছে বোনকে। ওকে এখন এতটাই দূরের মানুষ ভাবছে যে মন খুলে কথাও বলতে পারছে না।
ইমরোজ ইপ্সিতার মাথায় হাত রেখে বলল, “ইপ্সি, কথা বল।”
“আমার খুব খারাপ লাগছে ভাইয়া। আমার জন্য তোমার জীবনটা এভাবে এলোমেলো হয়ে গেল।”
ইমরোজ ভাবছিল, আসলেই কি ওর জীবন এলোমেলো হয়ে গেছে! যদি এলোমেলোই হতো, তাহলে রাত্রিকে এতটা মিস করছে কেন! মনে হচ্ছে ঝগড়া করার জন্য হলেও মেয়েটা ওর পাশে থাকুক। পৃথিবীর বুকে রাত নামলেই অদ্ভুত এক শূন্যতা নেমে আসে ওর পুরো ঘর জুড়ে, মন জুড়ে।
এটা ঠিক রাত্রির সাথে ওর খটমট ছিল৷ কিন্তু তারপর তো সব বলাচ্ছিল ধীরে ধীরে। সেদিন রিকশায় রাত্রির প্রশ্রয়ের কথা মনে পড়ল। রাত্রি ভীষণ বুদ্ধিমতী, সে যখন দেখেছে ওর জ্বর নেই, তখন কি সে ওর সুপ্ত ইচ্ছেটা ধরতে পারেনি! তবুও এক শাল গায়ে জড়িয়ে কাঁধে হাত রাখতে দিয়েছিল। রাত্রিও চাচ্ছিল সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দিতে।
“ভাইয়া, আমি ভয় পেয়েছিলাম। আমি জানতাম তুমি মেনে নেবে না। তারমধ্য তোমাদের ঝগড়া দেখে আমি ঘাবড়ে গিয়েছিলাম৷ উৎপলকে আমিই ইনসিস্ট করেছিলাম। তখন ভেবেছিলাম তোমাদের মধ্যে সব ঠিকঠাক হয়ে গেলে আমাদেরও সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে। তখন এতটা ভাবিনি। জানি ক্ষমা চাইবার মুখ আমার নেই। তবুও পারলে ক্ষমা কোরো।”
এই পর্যন্ত বলে আবারও ফুঁপিয়ে উঠল ইপ্সিতা, “কয়েকদিন থেকেই কথাগুলো তোমাকে বলতে চাইছিলাম। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছিলাম না।”
ইমরোজ ইপ্সিতার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলল, “তোরা যেটা করেছিস সেটা ভুল না, অন্যায়। আমাদের মধ্যে কেমন সম্পর্ক ছিল সেটা তো দেখেছিস। যদি এরচাইতেও বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যেত!”
“মা ভাবিকে আগে থেকেই চেনে। তোমাকে আমরা চিনি। আমি জানতাম তোমরা কেউই হার্মফুল নও পরস্পরের জন্য। সবদিক ভেবেই এগিয়েছিলাম। কিন্তু এখনকার মতো একটা পরিস্থিতি আসতে পারে সেটা ভাবিনি। অন্যের জীবনকে প্রভাবিত করার অধিকার আমরা কেউই রাখি না। এটা বুঝতে একটু দেরি হয়ে গেছে।”
ইমরোজের ভেতরের রাগ থিতিয়ে এলো, “যা হয়ে গেছে তা তো বদলে যাবে না। কাঁদিস না। সামনে এমন সব না ভেবে কিছু করিস না, তাহলেই হবে।”
এরপর উঠে বেরিয়ে আসছিল, এরমধ্যে একটা কথা মনে পড়ায় বলল, “তুই তখন উৎপলকে কল দিয়েছিলি আমার ফোন থেকে। এটা আর করিস না।”
বলে বেরিয়ে গেল। নিজের ঘরে এসে বসল। বিছানা কুঁচকে আছে, দেখেও আগের মতো লাফিয়ে টানটান করতে উদ্যত হলো না। অদ্ভুত এক আলস্য নেমেছে মন জুড়ে। কিছুই ভালো লাগছে না। ভাবনারা ঘুরেফিরে একজনেই গিয়ে থেমে যাচ্ছে বারবার। ঘরের পাশাপাশি ওর মনটাও যেন ওর নেই। সেখানে সর্বদা অন্যের আনাগোনা। যে অভিমানে চলে গেছে ওকে একা ফেলে।
“ইমু, কী করছিস? ঘর অন্ধকার কেন?”
চেয়ারে বসে হেলান দিয়ে চোখের উপরে দুই হাতের পাতা রেখে অবাধ্য ভাবনার রাশ টানতে চাইছিল। মায়ের কথায় সচকিত হলো।
“মা, তুমি কখন ফিরলে?”
“কিছুক্ষণ আগে। ইপ্সির সাথে কথা বলে তোর ঘরে এলাম।”
“ওহ্! বসো মা।”
আনোয়ারা বিছানায় বসে বললেন, “এদিকে এসে বোস ইমু। তোর সাথে কিছু কথা বলি।”
ইমরোজ মায়ের পাশে এসে বসল। মা খুব কম সময়ই এতটা সিরিয়াস থাকেন। নিশ্চয়ই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবেন।
আনোয়ারা ছেলের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মৃদু গলায় বললেন, “ইমু, ইপ্সি কিন্তু যথেষ্ট বড় হয়েছে। শাসন করলেও কখনো কখনো রাশ ছাড়তে হয়। নইলে ছিঁড়ে একেবারে হাত থেকে বেরিয়ে যায়। ও যেটা করেছে সেটা অন্যায়। ওর উচিত ছিল নিজের কথাটা আমাদের জানানো। কোনো কারণে সাহস পায়নি। ওকে যা বলার আমি সেদিনই বলেছি। একটা কথা ভেবে দেখেছিস, ওরা কিন্তু সাহস না পেয়ে নিজেরা নিজেরা অনেককিছু করতে পারত। পালিয়ে গেলে বা না জানিয়ে বিয়ে করে ফেললে তখন কী হতো? কেন কাজটা করেনি জানিস? কোথাও আমাদের সম্মতির জন্য অপেক্ষা করছিল। পথটা ভুল অবশ্যই।”
এটুকু বলে হাতে সস্নেহে চাপ দিয়ে বললেন, “এই যে তুই ওর উপরে নজরদারি করছিস, ফোন কেড়ে নিয়েছিস৷ এটা কি ঠিক হয়েছে? এই বয়সী মেয়েকে এভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবি? এখন যদি ভুল কোনো স্টেপ নেয়, কেমন হবে সেটা? ওকে বুঝিয়ে বলতে হবে যে ও ভুল করেছে, ভুলটা কোথায় সেটা ধরিয়ে দিতে হবে বুঝিয়ে শুনিয়ে। প্রেসার দিতে গেলে হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবণাই বেশি। তাই না?’’
ইমরোজ মায়ের কোলে মাথা রাখল, “আমি ওর ফোন দিয়ে আসব।”
“শুধু দিয়ে আসলে হবে না। তুই ওর বড় ভাই। ওকে বুঝিয়ে ভুলটা ধরিয়ে দিবি। পারবি না?”
“পারব মা।”
কোলে রাখা মাথায় তিনি হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “দেখ, যা হয়েছে, তাতে তোর সাথে যেমন অন্যায় হয়েছে, রাত্রিও কিন্তু তোর মতোই ভিক্টিম। তুই তবুও নিজের বাড়িতেই ছিলি। রাত্রিকে কিন্তু নিজের কমফোর্ট জোন ছেড়ে আসতে হয়েছে। এখন ইপ্সি আর উৎপল মিলে যা করেছে, তার জন্য যদি তুই মেয়েটাকে ব্লেম করিস, জিনিসটা কি ঠিক? ও কিন্তু তোকে ব্লেইম দেয়নি। এখন এটা ভাব, রাত্রি যদি তোকে বলত, তোকে বিয়ে করে ওর জীবনটা শেষ হয়ে গেছে, তোর কেমন লাগত? যখন তুই ওকে মিস করছিস তখন?”
ইমরোজ বলল, “আমি রাগের মাথায় কী বলেছি, সেটা ধরে ও চলে গেল।”
আনোয়ারা হেসে বললেন, “মানুষ অভিমান কার উপরে করে জানিস? যাকে সে কাছের মানুষ ভাবে, আপন মনে করে। দেখ, বিয়ের পরে কতবার তোরা পরস্পরের দিকে কাদা ছুঁড়েছিস। কই তখন কিন্তু কেউ মান অভিমান করে বসে থাকিসনি। কারণ তখন তোরা কেউ কাউকে আপন ভাবিসনি। কারোর উপরে ভরসা করিসনি। এখন করতে শুরু করেছিস বলেই দু'জনেই কষ্ট পাচ্ছিস।”
“ও কষ্ট পাচ্ছে না মা।”
ইমরোজের মুখে হাত বুলিয়ে বললেন, “সেটা তুই এখানে বসে তো বুঝবি না বাবু। খোলাখুলি কথা বল। আরেকটা কথা সংসার করতে গেলে দোষ যার, বুঝতে পারার সাথে সাথে তাকেই স্যরি বলতে হয়। স্যরি বললে কেউ খাটো হয় না। বরং অনেক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় কেবল নিজের ভুলটা এক্সেপ্ট করতে না পারায়। আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজে একটা খুবই প্রথাগত নিয়ম সেট করা আছে। পুরুষ হলে এটা করা যাবে না, সেটা করা যাবে না। তাতে নাকি পৌরুষে আঘাত লাগে। বিশ্বাস কর, এসবের কোনো ভিত্তি নেই। ইগো আর ব্যক্তিত্ব আমরা গুলিয়ে ফেলি বেশিরভাগ সময়। এটাও একটা বড় সমস্যা আমাদের। মানুষ সকলেই, ভুল সবার হয়। আবেগ সবার আছে। কষ্ট পেলে কাঁদার অধিকার, ভুল করলে স্যরি বলার সাহস দুই পক্ষেরই থাকতে হয়। সংসারটা দুজনের। দুইজনকেই স্যাক্রিফাইস করতে জানতে হয়। দুই পক্ষ থেকেই স্যরি বলার প্র্যাকটিস থাকতে হয়। তাহলে দেখবি, সম্পর্কটা খুব সুন্দর হয়।”
ইমরোজ এই জন্যই মাকে এতটা ভালোবাসে। মা ওর সবচাইতে কাছের বন্ধু। সে মৃদু হেসে বলল, “মা, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। সেটা কি তুমি জানো?”
হাসলে ইমরোজকে এত সুন্দর দেখায়, তিনি মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকেন। তার ছেলে-মেয়েকে কোনোদিন তিনি প্রথাগত নিয়মে বড় করেননি। সময়ে সময়ে শাসন করেছেন, সময়ে সময়ে নিজেদের বিবেচনার উপরে ছেড়ে দিয়েছেন যেন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারে। এই যে এবারের এত গোলমেলে বিষয়, তিনি চাইলেই রাত্রিকে বুঝিয়ে বলে নিয়ে আসতে পারতেন। মায়া রাত্রিকে বোঝাতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তারা আলোচনা করে বিরত থাকলেন।
দূরত্ব অনেক সময় কাছে আনে। অপর প্রান্তের মানুষটা তার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা অনুধাবন করতে সুবিধা হয়। কাছে থেকে লড়াই করেই হয়তো আরও অনেকটা সময় কেটে যেত, নিজেদেরকেই উপলব্ধি করতে।
এখন দূরে থেকে এই যে মিস করছে একজন আরেকজনকে, এটাই তারা চেয়েছিলেন। নিজের ছেলেকে তো অবলোকন করেছেন, আজ রাত্রির কাছে গিয়েছিলেন ওর মনোভাব বুঝতে। দেখলেন, দুই পক্ষেই ঘন মেঘ, একটু ঝোড়ো বাতাসেই বৃষ্টি নামবে ঝুমঝুমিয়ে।
যেটুকু বোঝানো প্রয়োজন বুঝিয়েছেন। এখন দেখা যাক কী হয়।
ইপ্সিতা আর উৎপলকে নিয়েও দুই মা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রথম কথা তারা বড় একটা ভুল করেছে, এটা তাদের বুঝাতে হবে। বাকিটা সময়ে ঠিক হয়ে যাবে।