বিবাহ বিভ্রাট ডটকম

পর্ব - ৩২

🟢

আগে নানান অজুহাতে উৎপলের সাথে দেখা করতে বাইরে যেতে পারত ইপ্সিতা। সব জানাজানি হয়ে যাবার পরে সেটা সম্ভব হচ্ছে না৷ মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে ইমরোজ ওর মোবাইলটা নিয়ে নিজের কাছে রেখেছে। ফলে গত দশ-বারো দিনে উৎপলের সাথে একবারই শুধু আনোয়ারার মোবাইল দিয়ে যোগাযোগ করতে পেরেছিল। এরপর সেটাও সম্ভব হয়নি। ভেতরে ভেতরে কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছে সে।

ইপ্সিতার একটা পুরোনো নষ্ট মোবাইল আছে, কিন্তু তাতে সিমকার্ড নেই। সে তক্কে তক্কে থাকে যদি কোনো সুযোগ পাওয়া যায়। আজ বসার ঘরে বসে ইমরোজ খবর দেখছিল, ইপ্সিতা উঠে লুকিয়ে ইমরোজের ঘরে গিয়ে দেখল টেবিলে তার মোবাইল।

দ্রুতহাতে সেটা নিয়ে সে উৎপলের নম্বরে ডায়াল করল। প্রথমবার কেউ রিসিভ করল না বলে আরেকবার কল করল৷ এবার কেটে দিল।

উৎপল ইমরোজের কল কাটল কেন? ভয়ে? কিন্তু ওর কাছে ফোন নেই সেটা তো জানে সে। অবশ্যই রিসিভ করা উচিত ছিল। ইপ্সিতা ছাড়া এখন এই বাড়ি থেকে আর কে কল করবে! রাগ হলো ওর। বেরুচ্ছিল এরমধ্যে দরজায় ইমরোজের সাথে দেখা হয়ে গেল,

“তুই কী করছিলি এখানে?”

“কী করব? তোমার ঘরে আসতে পারি না আমি?”

“পারিস। কিন্তু যখন দেখলি আমি রুমে নেই, তখন চোরের মতো আসাটা অবশ্যই সন্দেহজনক।”

“চোরের মতো কেন আসব?”

ইমরোজ ওর মোবাইলটা নিয়ে হিস্ট্রি চেক করল, ইপ্সিতা উৎপলের নম্বর ডায়াল লিস্ট থেকে ভাগ্যিস ডিলিট করে দিয়েছিল।

এবার কিছুটা সাহস নিয়ে বলল, “সবসময় আমাকে সন্দেহ করা বন্ধ করো।”

“অনেক বিশ্বাসের কাজ করেছিস যে।”

ইপ্সিতা মন খারাপ করে বেরিয়ে গেল। ওর কান্না পাচ্ছিল৷ সবাই ওকে কত বিশ্বাস করত। আর এখন!

***

রাত্রির সাথে উৎপলের সম্পর্কে উন্নতি হয়নি খুব একটা, তবে চা বানিয়েছিল, তাই দিতে এসেছিল রুমে। উৎপল রুমে নেই৷ সম্ভবত ছাদে গেছে। বেরুচ্ছিল এরমধ্যে বিছানায় থাকে মুঠোফোন বেজে উঠল। রাত্রি ভাবল ছাদে গিয়ে ভাইকে চায়ের সাথে মোবাইলটাও দিয়ে দেবে।

হাতে নিতেই দেখল ইমরোজের কল৷ সে ধরল না। ভাবতে চেষ্টা করল উৎপলকে ইমরোজ কেন কল দিচ্ছে। ভাবতে ভাবতে আরেকবার কল এলো। গতকাল ইমরোজ ওর অফিসে এসেছিল।

নিজের ভাই তো ষড়যন্ত্র বিশেষজ্ঞ। দুটো মিলে নিশ্চিত কোনো ঘোঁট পাকাচ্ছে। পরের দুইবারই কেটে দিয়ে বেরিয়ে গেল নিজের ঘরে। কোনো ষড়যন্ত্রকারীকে সে নিজের হাতে বানানো চা খাওয়াবে না।

ওই বাড়িতে থাকা নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলো আনতে হবে ভাবল রাত্রি। কী মনে করে নিজেকে লোকটা! যখন যা খুশি তাই বলে অপমান করা যায়! সে এত সস্তা না।

যতই মিষ্টি মিষ্টি ইনোসেন্ট মার্কা কথা বলুক, সে গলবে না। বলা তো যায় না আগে যেভাবে মা'য়ের কথায় বিয়ে করেছে এবারও হয়তো মা'র কথা রাখার জন্যই ওকে নিতে এসেছিল। যার কাছে ওর গুরুত্ব নেই, তার কাছে সে কেন যাবে!

তবুও কোথাও যেন একটা ক্ষীণ মন কেমন করা ব্যথা হচ্ছে। যার উপরে অসম্ভব রাগ, তার জন্যই মনে এমন বিরহ কীসের লক্ষ্মণ! মাঝের ওই অল্প কিছুদিন বাদ দিলে তো সে আগের মতোই আছে। শুধু কয়েকদিনের একটা সম্পর্কের জন্য হৃদয়ে এমন ওঠাপড়া কেন হয়!

***

উৎপল রুমে এসে ফোন হাতে নিয়ে ইপ্সিতার ফোন খুলেছে কি-না দেখার জন্য কল দিতে যাচ্ছিল। দেখল ইমরোজ কল করেছিল। কিন্তু কল নোটিফিকেশন নেই কেন! বুঝে নিল যা বোঝার৷ কিন্তু ইমরোজ ওকে কেন কল দিল! রাত্রির সাথে মিটমাট করতে চাইছে! সে আর কোনোকিছু না ভেবেই কল দিল।

ইমরোজ ফোন ধরতেই উৎপল বলল, “ইমরোজ, কল দিয়েছিলে কেন? কোনো দরকার?”

“আমি কল দিইনি তো!”

উৎপলের মনে হলো আরেকটা ব্লান্ডার করে ফেলেছে, ইপ্সিতা হয়তো ওর সাথে কথা বলতে চাইছিল লুকিয়ে। কী হবে এবার!

“ওহ! আসলে তোমাকে কল দিয়েছিলাম আমি। কীভাবে কথা শুরু করব বুঝতে পারছিলাম না। সেজন্য।”

উৎপলকে থামিয়ে দিয়ে ইমরোজ বলল, “অনেক বোকা বানিয়েছ তোমরা দুইজন আমাদের। এখন শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করো না।” কড়া গলায় বলল ইমরোজ।

উৎপলও রেগে কিছু বলতে যাচ্ছিল, কিন্তু সুযোগ পেল না, তার আগেই ওপাশ থেকে কল কেটে গিয়েছে। ইপ্সিতার জন্য চিন্তা হলো। বেচারি এমনিতেই ফ্যামিলি প্রেসারে আছে। সে কোথায় কোনো উপায় ভেবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করবে। তা না করে মেয়েটার জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলল।

ইমরোজের উপরে রাগও হলো, এই যুগে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের উপরে এত নজরদারি কেন করতে হবে!

এরমধ্যে কলিংবেলের শব্দে উৎপল এসে দরজা খুলতেই থমকে গেল। বাইরে আনোয়ারা দাঁড়িয়ে আছেন হাসিমুখে। উৎপলের ভীষণ নার্ভাস লাগছিল। আগে খুব স্বাভাবিকভাবেই তার সাথে কথা বলেছে, কিন্তু এখন ইপ্সিতার মা তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ভেবেই ভয় পাচ্ছে।

“কেমন আছ?”

“ভালো, আন্টি। আপনি কেমন আছেন?”

“ভালো থাকতে দিচ্ছ কই তোমরা? যা করছ সবাই মিলে।”

“আন্টি, আমি আসলে.. মানে.. ওই… আসলে…”

ওকে এভাবে কসরত করতে দেখে আনোয়ারা বললেন, “থাক বাবা। রাত্রি আছে বাসায়? তোমার মা-বাবা?”

“আন্টি, আপনি বসুন। আমি রাত্রিকে ডেকে দিচ্ছি। মা বাবা একটু বাইরে গেছেন।”

আনোয়ারা বসলেন, উৎপল গিয়ে রাত্রিকে ডেকে দিল।

রাত্রি এসে বলল, “মা, আপনি? কেমন আছেন?”

“এত চমকে যাচ্ছিস কেন? তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করল তাই এলাম। আগেই বলে নেই, কারো হয়ে কিন্তু আমি আসিনি। তাই রিল্যাক্স।”

তার বলার ভঙ্গিতে রাত্রি হেসে ফেলল।

“আমিও আপনাকে ভীষণ মিস করছিলাম। আজ এসেছেন, আমি খুব খুশি হয়েছি।”

“মুখে মুখেই। একদিনও মনে করলি না তো!”

“আমি ভেবেছিলাম। কিন্তু…” এটুকু বলে থেমে গেল রাত্রি। ওর মুখ ম্লান হলো।

আনোয়ারা ওর গালে সস্নেহে হাত রেখে বললেন, “শোন, গাধাটা কী করল না করল, সেটা ওই গাধাটার বিষয়। আমি এরমধ্যে নেই। তোর সাথে আমার সম্পর্ক কিন্তু আলাদা। তাই না?”

রাত্রি আবার হেসে ফেলল, “ছেলেকে আমার সামনে গাধা বলছ, শুনলে কী হবে বুঝতে পারছ?”

আনোয়ারা এত আন্তরিক রাত্রি তুমিতে নেমে এলো।

“কী আর করবে! আহাজারি করবে একটু। কিন্তু ওরও তো বোঝা উচিত স্ত্রী অমূল্য। টেকেন ফর গ্র‍্যান্টেড নয়। তাই না?”

রাত্রি শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরল, শুধু যদি ইমরোজের ঘটে রাগ কম আর একটু বুদ্ধি বেশি থাকত, তবে নিজেকে সে সেরা ভাগ্যবতী মেয়ে বলে ভাবত! এমন ভালো শাশুড়ি ভাগ্য কয়জনের হয়!

***

ইমরোজের মেজাজ প্রচণ্ড খারাপ হচ্ছে৷ ইপ্সিতা এতটা পেঁকে গেছে, এটা ভেবেই রাগ হচ্ছে। এতকিছুর পরেও সাহস আর স্পর্ধা দেখিয়েছে উৎপলের সাথে আবার যোগাযোগ করার। এখন আরও সিরিয়াস হতে হবে ওকে৷ সে রেগে-মেগে ইপ্সিতার রুমে গেল।

Story Cover