উৎপলের ভাগ্যাকাশে দুর্যোগের ঘনঘটা, নইলে সব ঠিকঠাক করার চক্করে এমন কাণ্ড আবার ঘটায়! যদি শোভার সাথে সত্যি সত্যি এঙ্গেজমেন্ট করিয়ে দেয়, এই ভয়ে পরেরদিনই উৎপল জাহিদের কাছ থেকে শোভার মোবাইল নম্বর নিয়ে কল দিয়েছিল। বলেছিল দেখা করতে চায়, জরুরি কথা আছে।
সেই মতো একটা রেস্টুরেন্টে আসতে বলেছিল। শোভা কী বুঝেছে কে জানে, উৎপল গিয়ে দেখে চার-পাঁচজন কাজিনকে সাথে নিয়ে সেজেগুজে এসেছে। কেমন লাজুক চোখে ওকে দেখছিল। কাজিনরা টিকা টিপ্পনী কাটছিল এমনভাবে যেন ওদের বিয়েটা হচ্ছে।
উৎপল ইতস্তত করে বলল, “আপনার সাথে একা কথা বলার দরকার ছিল আসলে।”
পাশ থেকে অন্য একটা মেয়ে বলল, “বিয়ের পরে সারাজীবন পরে আছে একান্তে কথা বলার।”
“আপনারা ভুল বুঝছেন। বিষয়টা জরুরি, প্লিজ।”
শোভা ফিসফিসিয়ে তাদের কী যেন বলল, উৎপল শুনতে পায়নি। এরপর তারা উঠে গেলে শোভা বলল, “আমার ফ্যামিলি ভীষণ কনজারভেটিভ। আপনি বলুন না, কী বলবেন?”
উৎপলের খারাপ লাগল, ওর একটা ভুলের জন্য কতগুলো মানুষের জীবনে জটিলতা সৃষ্টি হলো। কিন্তু বলতে তো হবেই। শোভা ভীষণ লাজুক, চুপচাপ ধরনের একটা মেয়ে। ওর কথা বলা, তাকানো দেখেই এটা বোঝা যায় যে ওকে পছন্দ করে মেয়েটা। শুধু ছবি দেখে আর ওর সম্পর্কে জেনেই এতটা!
ওদের এক মেয়ে বন্ধু বলেছিল, যে মেয়েরা আগে কোনো রিলেশনশিপে থাকেনি, বিয়ের পরে প্রেম করবে বলে সিদ্ধান্ত নেয় তারা তেমন সম্পর্কের আভাস পেলেও পছন্দ মতো হলে খুব দ্রুত প্রেমে পড়ে যায়! কথাটা সত্যি কিনা উৎপল জানে না। ওর অপরাধবোধ বেড়ে গেল। কিন্তু না বললেও নয়,
“দেখুন, আসলে ভুলটা আমার। আমি কনফেস করতে এসেছি আজ।”
“ভুল?”
“আসলে আমি একজনকে ভালোবাসি। ওকে ছাড়া কাউকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।”
“কিন্তু আমি জানতাম আপনি কোনো সম্পর্কে নেই।” মৃদু লাজুক হাসি মিলিয়ে গিয়ে একটা দুঃখী দুঃখী মেঘ শোভাকে গ্রাস করে ফেলেছে ততক্ষণে।
“রাত্রির কোনো দোষ নেই। ও জানত না। মানে কিছু জটিলতার জন্য ওকে বলা হয়নি। জানি দুঃখ প্রকাশ করার মুখ আমার নেই। তবুও, বলতে চাই। আমি মন থেকে স্যরি বলছি। যেটুকু দেখলাম আপনাকে, তাতে এটুকু বুঝতে পেরেছি, আপনি খুব ভালো মেয়ে। কিন্তু আমি অপারগ।”
“আপনার সাথে আমার আরও আগে দেখা হলে ভালো হতো।” বিষণ্ণ হেসে বলল শোভা।
“আপনি খুব ভালো কাউকে ডিজার্ভ করেন। যার সবটা জুড়ে আপনি থাকবেন। শুভকামনা রইল আপনার জন্য।”
“আপনার জন্যও।”
উৎপল উঠতে না উঠতেই শোভার গ্যাং চলে এলো। হয়তো শোভার প্রতিক্রিয়া দেখেই তারা কিছুটা আন্দাজ করে নিয়েছে।
নানা বাক্যবাণ ভেসে আসছে, পরিস্থিতি জটিল হবে সামনে এটুকু বুঝতে পেরেছে। কিন্তু আর দাঁড়ায়নি। এটুকু বলতে পেরে এখন একটু শান্তি পাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। আরও আগে রাত্রিকে বলতে পারলে এই নিরীহ মেয়েটার মন ভাঙত না।
এখন সে দাঁড়িয়ে আছে রাত্রির রুমের সামনে। সেদিনের পর থেকে প্রায় দশদিন পেরিয়ে গেছে৷ এরমধ্যে রাত্রি একদিনও ওর সাথে কথা বলেনি। মা-ও প্রয়োজনীয় কথা ছাড়া কথা বলেন না। শুধু বাবাই যা কিছুটা স্বাভাবিক আছেন।
নক করার কিছুক্ষণ পরে রাত্রি দরজা খুলে দিল।
“তোর সাথে কথা ছিল রাত্রি। সময় হবে?”
“জরুরি কথা থাকলে হবে। এছাড়া সময় নেই।”
উৎপলের হাতে অনেকগুলো চকলেট, রাত্রির খুব প্রিয় এগুলো।
“অনেকদিন থেকে জমছিল। নে।”
ওর হাতের দিকে তাকিয়ে বলল রাত্রি, “এখন আমি বড় হয়ে গেছি ভাইয়া। লাগবে না।”
“তুই না বলতি, বড় হয়ে গেলেও ছেলেবেলার কিছু প্রিয় অভ্যাস ধরে রাখতে চাস?”
“তুমি তখন আমাকে ভালোবাসতে ভাইয়া। এখন বাসো না।”
“এটা তোর মনে হয়?”
“হুম।”
উৎপল ভেতরে এলো। বোনকে সে খুব ভালো করে চেনে, ভীষণ জেদি। একবার জেদ চেপে গেলে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা দুষ্কর। তবুও চেষ্টা করবে উৎপল। রাত্রি ওর অন্যতম দুর্বল জায়গা।
রাত্রির বিছানায় বসে উৎপল বলল, “তোর মনে আছে, ছেলেবেলায় আমরা একবার নানু বাড়িতে গিয়ে পাশের বাড়ির আম বাগান থেকে আম চুরি করতে গিয়েছিলাম, তুই মূল হোতা ছিলি। আমি গাছ থেকে পড়ে পা ভেঙে ফেললাম। যতদিন পা ঠিক হয়নি, ততদিনে তুই কোথাও খেলতে যাসনি। সারাক্ষণ আমার সাথে থেকেছিস। কতবার আমার জন্য ঢাল হয়ে তুই পাড়ায় মারামারি পর্যন্ত করেছিস! তুই শুধু আমার ছোট বোন না, আমার সবচাইতে প্রিয় বন্ধুও। এভাবে একটা কনক্লুশনে পৌঁছে গেলি?”
“তুমি আমার কথা ভাবো ভাইয়া? ভাবলা এভাবে চেনা-জানা নেই, এমন একটা মানুষের সাথে শুধু নিজে পাওয়ার আশায় বিয়ে করিয়া দিলে! ইমরোজ ভালো মানুষ। কিন্তু ধরো সে যদি এমন না হতো! যদি খুব খারাপ মানুষ হতো?”
“আমি নিজে খোঁজ নিয়েছি, তাছাড়া ইপ্সিতাকে চিনি, ওর ভাইয়ের কথা অনেক শুনেছি। কাজটা করার পেছনে আমার স্বার্থ ছিল, এটা আমি মানি। কিন্তু ইমরোজ খারাপ হলে আমি পিছিয়ে আসতাম।”
“বিয়েটা খেলা নয় ভাইয়া, জীবনটা ছেলেখেলার জায়গা নয়। ইমরোজ আর আমি পুরোপুরি মিস ম্যাচ। এক ছাদের নিচে সারাজীবন থাকার জন্য শুধু ভালো মানুষ হলেই তো হয় না ভাইয়া, আরও অনেক কিছু দরকার হয়। আমাদের মধ্যে সেসবের কিছুই নেই। আমি রাত হলে ও দিন, আমি তেল হলে ও জল। সারাজীবন কেটে যাবে লড়াই করতে করতে। এভাবে হয় না ভাইয়া।”
“তোর এটাই মনে হয়?”
“মনে হবে কেন? এটাই সত্যি। তুমি দেখেছ তো, এভাবে কথা বলতে পারত না। আমাকে বিয়ে করে ওর জীবন শেষ হয়ে গেছে।”
“তুই ভালো করে ভেবে দেখ রাত। তুই যেমন আমার উপরে রেগে আছিস, ইমরোজও তেমন ইপ্সির উপরে রেগে আছে। রাগের মাথায় কী বলেছে…”
“ঠিকই বলেছে। ভুল তো নয়। রেগে গেলেই সবকিছু বলা যায়?”
রাত্রির মনে হয়েছিল হয়তো ভুল বুঝতে পারবে ইমরোজ, কিন্তু বৃথা ভাবনা। নইলে এই দশদিনে একবারও কল দেয়নি লোকটা।
“তুমি যাও ভাইয়া। আর এরপর থেকে চকলেট আনবে না। আমার প্রতি যার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই, ভরসা নেই, তার দেয়া কিছু আমি নেব না। এখন মাথা ব্যথা করছে। ঘুমাব।”
উৎপলের হৃদয় এফোঁড়ওফোঁড় হয়ে গেল। সে কাতর গলায় বলল, “না নিস, নাই। থাকল এখানে। আমি আনবই। একদিন হয়তো বুঝবি আমার কাজ ভুল হলেও তোর আর ইমরোজের বিয়ের সিদ্ধান্ত ঠিক ছিল। ভুল থেকেও তো ফুল ফোঁটে অনেক সময়। না খেলে ফেলে দিস নাহয়।”
উৎপল বেরিয়ে গেল, যেতে যেতে মনে হলো, সে সত্যিই ভীষণ বোকা।