বিবাহ বিভ্রাট ডটকম

পর্ব - ২৭

🟢

রাত্রি আর ইমরোজ ফেরার পরে ওদের হাসিখুশি দেখে ভীষণ ভালো লাগল আনোয়ারার৷ তার মনটা প্রফুল্ল হয়ে উঠল।

মনের উপরে জোর দেয়া তার পছন্দ নয় কোনোকালেই। কিন্তু কখনো কখনো সন্তানের ভালোর জন্য একটু শক্ত হওয়াই যায় বলে মনে হলো।

“তোমরা খেয়েছ মা?”

“হ্যাঁ রে।”

“ওষুধ?”

“খেয়েছি। তোর শরীর ঠিক আছে এখন?”

রাত্রি উত্তর দিল, “এখনো পুরোপুরি ঠিক নেই মা। রিকশায়, জ্বর জ্বর লাগছিল বললেন।”

ইমরোজ মুহূর্তেই অপ্রতিভ হয়ে যেতে তিনি বুঝে নিলেন বিষয়টা। বললেন, “কক্সবাজারের ওয়েদার ওর সহ্য হয়নি। সেজন্য মনে হয়। তোর সেবাযত্নে ছেলেটা সুস্থ হয়ে উঠছে।”

রাত্রি কেন জানে না, কিঞ্চিৎ লজ্জাবোধ করল। সে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল,

“মা, ইপ্সিতার বিয়ের বিষয়টা আবার শুরু করব ভাবছিলাম। হাতের কাজ ঝুলিয়ে রেখে তো লাভ নেই।”

“হ্যাঁ, সেই ভালো মা। তুই যখন দায়িত্ব নিয়েছিস, আমি নিশ্চিন্ত। ইমুটা তো কাজেরই না।”

“মা, তুমি কিন্তু আমাকে খোঁচাচ্ছ।”

“সত্যি কথা খোঁচাই লাগে। বউকে দেখে কিছু শেখ। এখন যদি একটু বুদ্ধি হয় ঘটে।”

রাত্রি হেসে ফেলল, ওর হাসি দেখে ইমরোজের পুরোনো রাগের খানিকটা ফিরে এলো,

“উনাকে দেখে শিখতে হবে এখন? কী শিখব? ঘটকালি?”

“করে দেখান পারলে! মুখ দিয়ে বলার সময় অনেককিছু বলা যায়। করতে গেলে দৌড় বোঝা যায়!” আবার লোকটা ওকে ওর প্রফেশন নিয়ে খোঁচা দিয়েছে, সেটা চুপচাপ হজম করার মতো রাত্রি নয়ই।

“আপনি বলতে চাইছেন, এখন যদি আমি ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করতে চাই, তাহলে আমাকে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পার্টিসিপেট করে প্রেসিডেন্ট হতে হবে? নইলে সমালোচনা করতে পারব না?”

অকাট্য যুক্তিতে রাত্রি খানিকটা দমে যাচ্ছিল, একটু সময় নিয়ে উত্তর দিল, “তার প্রয়োজন হবে না। কিন্তু প্রপার ক্রিটিসাইজ করার জন্য ওই বিষয়ে ন্যুনতম জ্ঞান তো থাকতে হবে মাথায়। নইলে সমালোচনাটা ফাঁপা আর অন্তঃসারশূন্য মনে হবে।”

বলে ভেতরে চলে গেল রাত্রি। এই লোক জীবনেও ভালো হবে না।

অপরদিকে ইমরোজের মনে হলো, সেদিনের পরে আবার যে কেন মেয়েটার দুর্বল জায়গা নিয়ে কথা শোনাতে গেল! একটু আগের মুহূর্তটা এত সুন্দর ছিল, তার রেশটা গড়বড় করে দিল।

আনোয়ারা বললেন, “যা, ঘরে যা। ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না, পুরোনো মুরুব্বীরা বলতেন। ভুল বলেননি কিন্তু।”

“তুমি সবসময় ওর পক্ষ নাও কেন মা? আমি তোমার ছেলে, এখন আমি তোমার পর হয়ে গেছি।”

আনোয়ারা ছেলের মাথায় হাত দিয়ে হেসে বললেন, “রাত্রির কথাটা ভেবেছিস? শুধু রাত্রি না, প্রত্যেকটা মেয়েকে বিয়ের পরে নিজের চেনা জগৎ, কমফোর্ট জোন ছেড়ে চলে আসতে হয় সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা পরিবেশে। এডজাস্ট করতে হাজারটা কম্প্রোমাইজ করতে হয়। তোকে তো নিজের রুমটা ছাড়া আর কিছু এখনো অব্দি কম্প্রোমাইজ করতে হয়নি, তাই বুঝিস না। রাত্রি আমাদের ভরসায় এখানে এসেছে। ওকে পুরোপুরি না পারি, অন্তত নিজেদের জায়গা থেকে কিছুটা হলেও কমফোর্ট জোন দিতে পারব না আমরা? চেষ্টা করা উচিত না?”

ইমরোজ আর কিছু বলল না। মা'র কথাগুলো ওর মাথায় প্রবল আলোড়ন তুলল। সত্যিই তো, সে এভাবে ভেবে দেখেনি৷ ক'দিন পরে ইপ্সিতারও বিয়ে হবে, তখন ওর হাজব্যান্ড যদি ওর মতো আচরণ করে, সে নিজেই তো মেনে নিতে পারবে না!

ভাবতে ভাবতে ধীর পায়ে সে নিজের ঘরে এলো। রাত্রি মুঠোফোনে কথা বলছিল।

“আন্টি, চিন্তা করবেন না। ভাইয়া অমত করবে না। তাছাড়া মা-ও জানিয়েছেন, তার শোভাকে পছন্দ হয়েছে।”

“একেবারে এঙ্গেজমেন্ট?”

অপরপ্রান্তের কথাগুলো ইমরোজ শুনতে পাচ্ছে না, রাত্রি মনোযোগ দিয়ে শুনছিল, এরপর বলল,

“আমি বুঝতে পেরেছি আন্টি। তবুও, পাত্র-পাত্রী একবার সরাসরি কথা বলে নিলে ভালো হতো না?”

“ঠিক আছে, আন্টি। আমি বাসায় কথা বলে আপনাকে জানাব।”

ইমরোজ কথা বলার সুযোগ পেল না, রাত্রি তার মাকে কল দিল,

“মা, শোনো। শোভার মা কল করেছিলেন। আন্টি চাইছেন, দেখতে যাবার দিনই একটা চূড়ান্ত ব্যবস্থা হোক। আসলে দেখে এসে রিজেক্ট করা, বিষয়টা অপমানজনক হয়ে যায়। উনার কথাটাও ফেলে দেবার মতো না। তুমি কী বলো?”

“আমি তোর বাবার সাথে কথা বলে জানাই।”

মায়ের সাথে কথা বলতে মোবাইলটা কান থেকে নামাতেই ইমরোজ বলল, “উৎপলের নিজের মতামত ছাড়াই ওর বিয়ে ঠিক করে ফেলছেন? ওর তো অন্য পছন্দ থাকতে পারে।”

“নেই। থাকলে সবার আগে আমি জানতাম। তারপরও কনফার্ম হবার জন্য আমি ওকে আজকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম। না-ই করেছে।”

“তারপরও…”

“আপনারা ইপ্সিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন? করেননি তো। নিজেরা যা করেননি, সেটা নিয়ে দয়া করে জ্ঞান কপচাবেন না।”

কথার ছিরিছাঁদ নেই এই মেয়ের। ‘জ্ঞান কপচাবেন না’, রুচিশীল মানুষ এভাবে কথা বলে!

“ইপ্সিতা বাচ্চা একটা মেয়ে। ও এসবের সময়ই পায়নি। তাই জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন হয়নি।”

“বাচ্চা মেয়ে? তাহলে বিয়ের জন্য উতলা হচ্ছেন কেন? আগে বড় হোক। তারপর ভাবেন।”

ইমরোজ প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বলল, “আমার ওষুধ নিয়ে যাইনি ওই বাড়িতে। আপনি রেখেছিলেন। দেবেন প্লিজ।”

“দিচ্ছি।”

রাগ চেপে নির্লিপ্ত গলায় কথাটা বলে গ্লাসে পানি ঢেলে ওষুধ বের করে ইমরোজকে দিল সে।

“থ্যাংক ইউ, রাত্রি।” হেসে বলল ইমরোজ।

“গরু মেরে জুতা দান করার দরকার নেই।” অভিমানী গলায় বলল রাত্রি।

“রাগলে আপনাকে ভীষণ সুন্দর লাগে রাত্রি।”

ইমরোজ স্ত্রীর মনোভঞ্জনের উপায় খুঁজে না পেয়ে যা মুখে এলো, বলে ফেলল! আশ্চর্য হয়ে দেখল, মেয়েটা সত্যিই হেসে ফেলল এবার, নিটোল প্রশান্তিদায়ক, স্নিগ্ধ মিষ্টি হাসি!

“আপনি যখন অপ্রস্তুত হয়ে কিঞ্চিৎ বোকা বোকা আচরণ করে ফেলেন, তখন আপনাকে ভীষণ কিউট লাগে ইমরোজ। একদম আদুরে বেড়াল ছানার কিউট।”

বলেই আদর করে ছোট্ট শিশুদের যেমন করে গাল টিপে দেয়, তেমন করে ইমরোজের গাল টেনে দিল রাত্রি!

ইমরোজ একইসাথে লজ্জা পেল কিঞ্চিৎ, রাগ হলো অনেকটা এবং সবচাইতে আশ্চর্যজনক এবং ভয়াবহ ব্যাপার হলো, ওর ভালোও লাগল!

“আমি মোটেও বোকা বোকা আচরণ করি না। আর বেড়াল ছানা মানে?”

“বেড়াল ছানা মানে বেড়ালের বাচ্চা। আপনি দেখছি বাংলাতেও ভীষণ কাঁচা। পড়ান কীভাবে?” দুষ্ট হাসি রাত্রির চোখে-মুখে!

“আপনি ভীষণ যাচ্ছে তাই।”

“আপনিও।”

ইমরোজকে জ্বালাতে ওর এত ভালো লাগে! সত্যি সত্যি আদুরে লাগে তখন! তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। মুখ ফুলিয়ে ইমরোজকে ফুঁসতে দেখে রাত্রি সশব্দে হেসে ফেলল।

ইমরোজ আরও বিরক্ত হলো। কোনো মানে হয়!

“একদম হাসবেন না।”

“এখানে হাসতে বারণ বুঝি? কই, কোথাও নিষেধাজ্ঞার সাইনবোর্ড তো দেখছি না!”

ইমরোজ কাঁথা মুড়িয়ে শুয়ে পড়ল। রাত্রি তখনও মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছে।

“ফাজিল মেয়ে!”

কাঁথায় প্যাকেট হয়ে থাকা ইমরোজের অস্ফুটস্বরে বলা কথাটা অবশ্য রাত্রির কান পর্যন্ত এলো না।

মায়ের কাছ থেকে বিয়ের কথা পাকাপাকি হবার কথা শুনে মাথায় একসাথে হাজারটা বজ্রপাত হলো উৎপলের। সে ইপ্সিতাকে কল দিয়ে বলল,

“আজই দেখা করো। আর্জেন্ট।”

Story Cover