দু'দিন আগে ইমরোজ-রাত্রি একটা অদ্ভুতুড়ে মধুচন্দ্রিমা শেষ করে ঢাকায় ফিরেছে। ইমরোজ এখন অনেকটাই সুস্থ। রাত্রিও পুরোদমে ফিরে গেছে তার কর্মব্যস্ত জীবনে।
কক্সবাজার থেকে বাস ধরার আগে সবার জন্য কিছু কেনাকাটা করেছে। আজ ওরা দু'জন রাত্রির বাড়িতে এসেছে সেগুলো দিতে। ফেরার আগে মায়া রাত্রিকে আলাদা ডেকে জিজ্ঞেস করলেন,
“উৎপলের বিয়ের বিষয়ে কী যেন বলছিলি যাওয়ার আগে। ও তো কিছুই বলল না। তুই বল তো দেখি।”
রাত্রি ব্যাগে শোভার বায়োডাটা আর ছবি নিয়েই এসেছিল। সেটা মাকে দিয়ে বলল,
“নাও। তুমি আমাকে জানিও।”
মায়া ছবি দেখে বললেন, “মিষ্টি দেখতে মেয়েটা৷ উৎপলের সাথে মানাবে।”
“এখানে ওর মায়ের নম্বর আছে। চাইলে কথা বলতে পারো মা।”
খাবার পরে উৎপলের ঘরে এলো রাত্রি, “ভাইয়া, তোমার কোনো ব্যাপার স্যাপার নেই তো?”
“কীসের ব্যাপার?”
“অবশ্যই বুঝতে পেরেছ ভাইয়া। কীসের কথা বলেছি।”
উৎপল একটু আগেই ইপ্সিতার সাথে কথা বলছিল। মেয়েটা একটা আশঙ্কার মধ্যে আছে। সে-ও কি নেই! কিন্তু বহুদিন আগে রাত্রিকে কথা দিয়েছিল, প্রেমে পড়লে সবার আগে ওকে জানাবে।
তার বোন বড্ড অভিমানি, তাছাড়া ইমরোজের সাথে রাত্রির তখনকার দ্বন্দ্ব সবমিলিয়ে এত নাটক রচনা করতে হয়েছে। এখন আর বিষয়টা এত সরল নেই। এখন যদি বলে, অনেক প্রশ্নচিহ্ন দাঁড়াবে। ওরা যে কলকাঠি নেড়েছে ওদের বিয়ের, সেটা সামনে চলে আসবে। যার ফলাফল ভালো হবে না।
আজ ইমরোজ আর রাত্রিকে একসাথে দেখে উৎপলের মনে হয়েছে, যেভাবেই বিয়ে হোক, দুজনের মধ্যে একটা বোঝাপড়া তৈরি হচ্ছে মাত্র। এই মুহূর্তে ওদের ব্যাপারটা সামনে চলে বোনের নতুন জীবনে তার কিছু না কিছু প্রভাব পড়বেই, সেই প্রভাবটা যে সুখকর নয়, সেটা জানা কথা।
তখন এত তলিয়ে ভাবেনি, ভেবেছিল, এদের বিয়ে হয়ে গেলে দ্বন্দ্ব মিটে যাবে। তখন নিজেদের রাস্তা পরিষ্কার হবে। কেউ বাগড়া দেবে না। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে বিষয়টা আরও বেশি ঘোলাটে আর জটিল হয়ে গেছে। আপাতত ম্যানেজ করতে উৎপল ইতস্তত করে বলল,
“আরে না, তেমন কোনো ব্যাপার নেই।”
রাত্রি ভাইয়ের দিকে অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বলল, “আজ আসি তবে।”
“চলে যাবি? আজ থেকে যা দু'জন।”
“আজ না ভাইয়া। উনি সবে জ্বর থেকে উঠলেন৷ এখান থেকে কলেজটা একটু দূরে হয়ে যায়। এই শরীরে এত ধকল নেয়া ঠিক হবে না।”
উৎপল মৃদু হেসে বলল, “খুব চিন্তা হচ্ছে ইমরোজের জন্য!”
রাত্রি যেন কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল, মুখ সামান্য আরক্ত হলো কী!
“ওই লোকের জন্য আমার চিন্তা হবে? কী যে বলো না ভাইয়া! ধূর!”
এরপর উঠে দাঁড়িয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছিল, এরপর আবার বলল, “মানবিকতা বলে একটা জিনিস আছে। তুমি আমাকে চেনো না ভাইয়া?”
উৎপল উপলব্ধি করল, মুখে যাই বলুক, মনে সূক্ষ্ম হলেও একটা অনুভূতি জন্মাচ্ছে! সেটা লুকাতে চাইছে বলেই বারবার অজুহাত দিচ্ছে। ওর ভালো লাগল! ভেতরের অপরাধবোধ কিছুটা যেন কমল, যাক ওর প্রিয় একমাত্র ছোট্ট বোনটা ভালো আছে। কিন্তু সব জানলে…
“রাত্রি…”
রাত্রি ঘুরে তাকাল, “কিছু বলবে?”
“ধর, আমি যদি কোনো ভুল করে থাকি তোর সাথে? তুই কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবি?”
“কী ভুল? আমার সাথে? ভাইয়া, তুমি আমার সাথে ভুল কিছু করবে, এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে!”
বলে এগিয়ে এলো রাত্রি, “কী হয়েছে বলবে? ডিস্টার্বড?”
বিশ্বাসও কখনো কখনো গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়, আজকের আগে উৎপল সেটা উপলব্ধিই করতে পারেনি। এই বিশ্বাস সে নিজের হাতে ভেঙেছে! প্রবল অনুশোচনায় আবারও মন জুড়ে জাল বিস্তার করল। কোনোমতে বলল,
“কিছু না, এমনি জিজ্ঞেস করলাম। খুব ভালো থাক।”
রাত্রি কয়েক মুহূর্ত উৎপলের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল, এরপর ধীরপায়ে বেরিয়ে এলো। ভাইকে সে খোলা বইয়ের মতো পড়তে পারে। আজ মনে হচ্ছে, কিছু একটা যেন ঠিক নেই। ঠিকঠাক পড়তে পারছে না যেন, কিছু অক্ষর আচমকাই দুর্বোধ্য ঠেকছে!
***
ইমরোজকে আজ বাইক নিতে দেয়নি রাত্রি, বাড়ি থেকে বেরিয়ে ওরা রিকশায় উঠল। শীতের রাত। ল্যাম্পপোস্টের ঘোলাটে কুয়াশাচ্ছন্ন আলো কেমন মায়া ছড়িয়ে রেখেছে চারদিকে। চাঁদটাও ঘোলাটে।
রিকশায় পাশাপাশি বসেছে ওরা। রাত্রি শাড়ি পরেছে আজ। হাতে কাচের চুড়ির ঝিনঝিন শব্দ কানে যেন মিষ্টি সুরের ঝংকার তুলছে ইমরোজের।
“আপনার শরীর ঠিক আছে এখন?”
“বুঝতে পারছি না, মনে হচ্ছে জ্বর আবার আসছে।”
ত্বরিত বেগে রাত্রি নিজের কাচের চুড়ি পরা হাতটা ইমরোজের কপালে রাখল, জ্বর পরিমাপের জন্য। ইমরোজের ভেতরে হঠাৎ কী যেন হয়ে গেল! মনে হলো মুহূর্তটা এখানেই থেমে থাক!
“না, জ্বর নেই। খারাপ লাগছে?”
“ভেতরে ভেতরে আছে বোধহয়। বড্ড শীত লাগছে।”
কেন যে ইমরোজ মিথ্যেটা বলল, রাত্রির আলতো স্পর্শ চাইছিল বোধহয়। একটা মিথ্যে আড়াল করতে দ্বিতীয় মিথ্যেটা বলল। তবে ফলাফল যা হলো তা রীতিমতো অপ্রত্যাশিত।
রাত্রি ওর গায়ের শালটা খুলে ইমরোজকে ধরিয়ে দিয়ে বলল, “এটা গায়ে জড়িয়ে নিন ভালো করে।”
কিছুদিন ধরে যেন অন্য একটা রাত্রিকে আবিষ্কার করছে ইমরোজ। অমন পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করা রাত্রির ভেতরের অন্য একটা সত্তা। একই মানুষের ভেতরে কতরকম শেড থাকে! দ্বৈত সত্তা ধরনের কোনো মনোব্যাধিতে আক্রান্ত নাকি এই মেয়েটা! সন্দিহান হলো ইমরোজ।
“না, না। আপনি তো সোয়েটার পরেননি। অনেক ঠান্ডা ওয়েদার।”
“আমি আপনার মতো গাধামো করে জ্বর বাধাইনি। অতটাও ঠান্ডা নয়।”
বলল বটে, কিন্তু শাল খোলার পরে মৃদু কাঁপছে রাত্রি। ইমরোজ বুঝল সেটা। ওর কথায় রাগ হলো যদিও, কিন্তু কাজের মধ্যে অদ্ভুত মায়া জড়ানো।
ইমরোজ একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসল, নিজে শাল জড়িয়ে তার অপর অংশটুকুতে রাত্রিকে আবৃত করে নিল। ওর একটা হাত তখন রাত্রির কাঁধে, শাল যাতে পড়ে না যায়! সেটা নিশ্চিত করার জন্য।
রাত্রি কড়া চোখে তাকেতে সে বলল, “আপনি আমাকে গাধামোর সার্টিফিকেট দিয়ে দিয়েছেন। গাধামো করলেও এটুকু বোধ আছে যে, নিজের ভালোর জন্য আরেকজন কষ্ট করছে, সেটা দেখেও তার প্রতিকার না করে বসে থাকব।”
"বুঝেছি, অনেক মানবিক মানুষ আপনি!"
কেন জানে না, রাত্রির এই কুয়াশার চাদরে ঘেরা রাত, নির্জীব ল্যাম্পপোস্ট, তার মৃদু স্নিগ্ধ আলো, ঘোলাটে চাঁদের মৃদু জোছনা, হুড খোলা রিকশা, আর পাশে ঘেঁষে বসে ওকে শাল দিয়ে আবৃত করে আলতো হাতে জড়িয়ে থাকা মানুষটা সমস্ত কিছুকে ভালো লাগল। ভীষণ ভীষণ ভালো!
রাত্রির কথার ঈষৎ খোঁচায় ব্যথিত হয়ে ইমরোজ হাত সরিয়ে নিতে যাচ্ছিল, রাত্রি ইমরোজের হাতটা ধরে রাখল। শালটা ছোট, তাই কিছুটা সরে এলো ইমরোজের দিকে। কাজটা কেন করল সে জানে না, শুধু জানে, ভালো লাগছে এই কেয়ার করাটা।
মুখের কাঠিন্য সরিয়ে মৃদু হাসির রেখা ফুটল অবচেতনেই। ইমরোজ আশ্বস্ত হয়ে একবার তাকাল ওর মুখের দিকে। মনে হলো, এই মেয়ে জাঁদরেল হতে পারে, তবে হাসিটা ভীষণ মিষ্টি! কেমন মোহাবিষ্ট হয়ে গেল ইমরোজ, অবচেতনেই৷
ইমরোজের মনে হলো, অব্যাখ্যায় কত কী যে ঘটে যায়। মুহূর্তটা যেন পরাবাস্তব! বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর সেই প্যারালাল ইউনিভার্সে ঘটা কোনো ঘটনা যেন!
দু'জনে অদ্ভুত নৈঃশব্দের বাঁধনে আটকে গেছে যেন, অথচ নৈঃশব্দের ভিড়েও কত অদৃশ্য, অব্যক্ত কথার আনাগোনা!