বিবাহ বিভ্রাট ডটকম

পর্ব - ২৩

🟢

চট্টগ্রামে রাত্রির ফুপুর বাসা, সেখানে একবার না গেলে তিনি ভীষণ মন খারাপ করবেন৷ ওরা এসেছে খুব অল্প সময়ের জন্য। চট্টগ্রাম পৌঁছাতে ভোর হবে। বিকেল পর্যন্ত ফুপুর বাসায় বিশ্রাম করে কক্সবাজারে যাবে ওরা। কিছুক্ষণ ভালোই গেল, দু'জনেই পাশাপাশি বসে বই পড়ছিল। কেউ কারোর সাথে কথা বলছিল না। শুধু ট্রেন থামলে ইমরোজ একবার করে দেখতে চেষ্টা করছিল কোন স্টেশন!

হঠাৎ একজন ইমরোজের বয়সী সুদর্শন ছেলে এসে রাত্রিকে ডাকল,

“আপু, আপনার কাছে পানি হবে?”

ইমরোজ এর আগে যখন উঠেছিল, এই ছেলেকে দেখেছে, ওদের থেকে বেশ দূরেই এর সিট। এদিকে উঁকিঝুঁকি মেরে পাশের জনকে কিছু বলছিল। এখন যে আশেপাশে বাদ দিয়ে রাত্রির কাছে পানি নিতে এসেছে, বিষয়টা ওর ভালো লাগেনি। ওর সন্দেহ আছে, এই ছেলের ব্যাগ চেক করলে নিশ্চিত পানির বোতল পাওয়া যাবে।

রাত্রি কিছু বলার আগে সে-ই বলল, “হ্যাঁ, আমি দিচ্ছি।” এরপর ইচ্ছে করেই রাত্রিকে বলল, “পানিটা কোন ব্যাগে যেন?”

রাত্রি ছেলেটার ইনটেনশন বুঝতে পেরেছে, তবে ইমরোজের ওর প্রতি প্রোটেক্টিভ হবার কারণ বোধগম্য হলো না।

রাত্রি ইমরোজের ব্যাকপ্যাক ইঙ্গিতে দেখিয়ে বলল, “ওইটাতে মনে হয়।”

এবার ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “যদি কিছু মনে না করেন, আপনারা সম্পর্কে…”

দুজন একসাথে উত্তর দিল, “হাজব্যান্ড ওয়াইফ।”

ছেলেটা এই যুগলকে কিছুক্ষণ বিস্মিত দৃষ্টিতে দেখে বলল, “ও আচ্ছা, আপনাদের দেখে বোঝা যায় না ঠিক।”

ওদের সম্পর্ক যাই থাক, বাইরের মানুষ কেন আঙুল তুলবে, দুজনেরই মেজাজ খারাপ হলো, ইমরোজ বলল, “কেন?”

“না, মানে কাপলরা তো গল্প করে, উচ্ছ্বসিত থাকে। আমি ভেবেছিলাম, আপনারা অপরিচিত। আচ্ছা, স্যরি। কিছু মনে করবেন না। আসি।”

রাত্রি হেসে বলল, “সে কী, পানি লাগবে না?”

“না। আসি।”

ছেলেটা যাবার পরে রাত্রি হেসে ফেলল, ইমরোজ বলল, “হাসছেন কেন? আপনাকে বিরক্ত করতে এসেছিল এতে হাসির কী আছে? অদ্ভুত মেয়ে তো আপনি।”

“আমি হাসছি আপনার জন্য।”

“আমি কী করেছি?”

“আমাকে বিরক্ত করলে আপনার কিন্তু খুশি হবার কথা ছিল। আপনি বিরক্ত হলেন কেন?”

“আশ্চর্য! আপনার প্রতি আমার একটা রেসপন্সিবিলিটি আছে না?”

রাত্রি মাথাটা ইমরোজের দিকে একটু এগিয়ে এনে চোখে চোখ রেগে বলল, “সেটা হলেই ভালো। আমার প্রেমে পড়তে যাবেন না যেন! তাহলেই ডুববেন।”

বলেই রাত্রি সরে গিয়ে সিরিয়াস ভঙ্গিতে বইতে মুখ ডুবিয়ে দিল, এমন ভয়ংকর একটা কথা বলেছে মাত্রই কে বলবে দেখে! ইমরোজের কিছুক্ষণের জন্য শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুততর হয়েছিল কেন কে জানে! তবে ধাতস্থ হয়ে নিয়ে সগর্বে ঘোষণা দিল,

“আপনার প্রেমে? আমি? যদি কখনো উন্মাদ টুন্মাদ হয়ে যাই, তাহলে জানি না, কিন্তু সুস্থ থাকতে, ইম্পসিবল।”

“আমি শুধু সতর্ক করলাম।”

রাত্রি খুব ভালো করে জানে, আর যাই হোক, ইমরোজ ওর প্রেমে পড়েনি। ওকে জ্বালানোর জন্য কথাটা বলেছে। প্রতিক্রিয়া দেখে বেশ মজাও লাগছে!

কতক্ষণ পরে খাবার বের করে খেয়ে নিল, আনোয়ারা ওদের জন্য হালকা খাবার দিয়ে দিয়েছেন।

তবে বাকি রাস্তা কেউ আর কোনো কথা বলল না। নির্বিঘ্নেই কাটল।

নামার সময় ইমরোজ নিজের ব্যাগটা নিয়েই দাঁড়িয়ে পড়েছে দেখে রাত্রি বলল,

“আমার একটা ব্যাগ ধরুন।”

“আপনি নিজেই নিন। আপনারটা আমি কেন ধরতে যাব।”

“একটু আগে না বললেন আমি আপনার রেসপনসেবলিটি? এখনই ভুলে গেলেন?”

“নিলেই তো বলবেন, আমি আপনার প্রেমে পড়ে গেছি। কথা শোনার জন্য কেন নেব?”

“প্রেমে পড়ার ভয় পাচ্ছেন? এত ভীতু আপনি?”

এবার ইমরোজের আঁতে ঘা লাগল, ও মোটেও ভীতু নয়! সেটা প্রমাণ করার জন্য রাত্রির লাগেজটা নিল।

“পুরো একমাস থাকার প্ল্যান না-কি আপনার? এত কী নিয়েছেন ব্যাগে?”

“মেয়েদের অনেককিছু লাগে। ব্যাগ বড় হওয়া স্বাভাবিক। আপনি বুঝবেন না।”

এরমধ্যে ট্রেন থেমে গেছে, নামার আগে ইমরোজ বলল, “আমি মোটেও ভীতু নই।”

“জেনে খুশি হলাম।”

***

“মা আমার কাছে বায়োডাটা চাইছে।”

উৎপল আছে একটা মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে। ইপ্সিতার সাথে মুঠোফোনে কথা বলছে এখন।

“কার?”

“শোভার।”

“উৎপল, ফাজলামো করছ?”

“সত্যি। রাত্রি নাকি সেদিন যাবার আগে মাকে বলে গেছে আমার কাছ থেকে বায়োডাটা নিতে। মা ওটা চাইছে এখন।”

“এবার মনে হয় আমাদের সব বলে দেয়া উচিত। এভাবে আর কত!”

“এভাবেই যদি বলব, তাহলে এত কাহিনী করে ওদের বিয়ে কেন দিলাম? আমি মাকে বলেছি আমি হারিয়ে ফেলেছি ওটা। ওরা আসুক৷ এরমধ্যে একটা ব্যবস্থা ঠিক করে ফেলব। একটু ভরসা রাখো ইপ্সি।”

“আমার কিছু ভালো লাগছে না।”

ভালো ওরও লাগছে না। কোনো বুদ্ধি না পেলে সরাসরি বলতেই হবে। ইপ্সিতা ছাড়া অন্য কাউকে বিয়ে করা ওর পক্ষে সম্ভব নয়।

ওর মনে পড়ে ওর বন্ধু পিয়ালের বিয়েতে ইপ্সিতা এসেছিল। সে পিয়ালের ছোটবোনের ফ্রেন্ড। সেখানেই পরিচয়। কথাবার্তা চলতো। বলতে বলতে একসময় ভালোলাগা তৈরি হয়, তারপর হুট করে একদিন সে প্রস্তাব দিয়ে ফেলে। ইপ্সিতাও রাজি হয়ে যায়৷ সেই থেকে ওদের সম্পর্ক। কত শত প্রতিশ্রুতি।

***

কক্সবাজারে আসতে রাত হয়ে গেল। ওরা হোটেলে নিজেদের রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে একবার বেরুলো। কলাতলী বীচের এদিকে ভালোই জন সমাগম। তবে আলো নেই সেভাবে। অদূরের স্থানীয় দোকানগুলোর আলো আসছে খানিকটা। আজ অদ্ভুত সুন্দর চাঁদ উঠেছে। জোৎস্নালোকে ভেসে যাচ্ছে জলরাশি, বাতাসে ভেসে আসছে সমুদ্রের কান্না কিংবা আনন্দের সুর!

সেইসাথে বিশাল সমুদ্রের গর্জন কেমন মন খারাপ করা একটা ভালো লাগায় আচ্ছন্ন করে ফেলল রাত্রিকে। মনে হলো সুবিশাল জলরাশির সামনে সে অতি তুচ্ছ একজন মানুষ। ওর আশেপাশে সমস্তই যেন মুহূর্তের জন্য বিস্মৃত হয়ে গেল।

“আমার এই গর্জনটা খুব ভালো লাগে।”

ইমরোজের কথায় ওর ঘোর কাটল, এর আগেও সে দুবার এসেছে এখানে। একবার পরিবারের সাথে, আরেকবার ফ্রেন্ডদের সাথে। এবার যার সাথে এসেছে, তার সাথে ওর অদ্ভুত এক যোগসূত্র! ওর যে জীবনসঙ্গী হবে, তার অবচেতন মনে আঁকা ছবির সাথে কি এই ছেলেটা মিলে! তবুও তো একটা অদৃশ্য সুতো ওদের আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।

এই অপার্থিব পরিবেশই কি-না, ওদের ভেতরে থাকা প্রতিশোধের খেলা, কিছু মুহূর্তের জন্য যেন কোথায় সরে গেছে! রাত্রির আজ আর রাগ হলো না,

“আমারও।”

ওরা সৈকত ধরে হাঁটল বেশ কিছুক্ষণ। মাঝেমধ্যে অর্থহীন কিছু আলাপ। দুজনেই যদিও স্বীকার করবে না, তবুও ভেতরে ভেতরে জানে, সময়টা মন্দ কাটেনি।

হোটেলে ফিরতেও কিছুক্ষণ ঘোরের মধ্যেই থাকল। তবে ওই পরিবেশে যা স্বাভাবিক, এই আলো ঝলমলে বন্ধ রুমটা সম্পূর্ণই আলাদা।

কিছুক্ষণের মধ্যেই দুজন আবার নিজেদের মধ্যে ফিরে এলো। চমৎকার সময় কাটায় রাত্রি আজ আর ইমরোজের পিছু লাগেনি।

সে জামাটা বদলাবে বলে ওয়াশরুমে যাচ্ছিল, ইমরোজের ঝড়ের বেগে ওকে ক্রস করে ঢুকে পড়ল।

রাত্রির কিছুক্ষণ সময় লাগল বুঝতে৷ এরপর দাঁতে দাঁত চেপে বলল,

“অসভ্য, ফাজিল ছেলে।”

সে প্রবল রাগে এই পাশ থেকে ছিটকিনি তুলে দিয়ে জামা বদলে আয়েশ করে বসল। একে ছাড় দেয়াই ভুল হয়েছে, ব্যাটা বদের হাড্ডি, মিচকে হনুমান। আজ ইমরোজের একদিন কী রাত্রির একদিন! যদি জরুরি হতো, ও যেহেতু আগে যাচ্ছিল, ওকে বললে কি যেতে দিত না! এটা কী ধরনের বর্বর আচরণ!

Story Cover