“আমার মনে হয় তোদের কোথাও ঘুরতে যাওয়া উচিত। নতুন নতুন বিয়ে করেছিস, এটাও আমাকে মনে করিয়ে দিতে হবে? তোরা আজকালকার ছেলেমেয়ে। কিন্তু আচরণ করছিস আদি যুগের মতো, এসব কী ইমু?”
“বিয়ে করলেই ঘুরতে যেতে হবে কেন মা?”
ছেলের নির্বুদ্ধিতায় আনোয়ারা যারপরনাই হতাশ হয়ে বললেন, “তোকে তো আমি সব ধরনের পুষ্টিকর খাবার খাইয়ে বড় করেছি। তাও যে এমন ফাঁপা মাথা কই পেয়েছিস বুঝলাম না। হানিমুনে মানুষ কেন যায়? তোদের এরেঞ্জ ম্যারেজ, নিজেদের মতো একটু নিজেদের চিনবি, জানবি। এরজন্যই যাবি।”
হানিমুনে যাবার কোনো ইচ্ছা রাত্রির নেই, তবে এত দামড়া ছেলের মায়ের কাছে ঝাড়ি খাবার এই মনোরম দৃশ্য সে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করছে। ভীষণ হাসি পাচ্ছে ওর, কিন্তু আনোয়ারা কথাগুলো বলেছেন অত্যন্ত সিরিয়াস ভঙ্গিতে, সেজন্য সে হাসতে পারছে না, প্রাণপণ চেষ্টায় হাসি চেপে রেখেছে।
মা সবসময় ইমরোজের সাথে এভাবেই কথা বলেন, তাই সে গা করে না। কিন্তু এখন সামনে ওর একমাত্র শত্রু উপস্থিত।
“মা, আমি জানি এসব। তুমি যার-তার সামনে আমাকে অপমান করছ, এটা কী ঠিক?”
“অপমান? তুই তো জিজ্ঞেস করলি। আমি উত্তর দিলাম শুধু। আর যার-তার সামনে মানে? ও তোর স্ত্রী, ইমু।”
“শোনো মা, আমি এখন কোথাও যেতে পারব না। বিয়ের জন্য সেদিনই ছুটি নিলাম। বারবার ছুটি নেয়া যায় না।”
“সামনের সপ্তাহে বৃহস্পতিবার সরকারি ছুটি আছে। কক্সবাজার যা অন্তত। বুধবার যাবি, শনিবার রাতে বাসার জন্য রওনা দিবি। শুধু রবিবার ছুটি নিতে হবে।”
“মা, আমি যাব না। তাছাড়া উনারও কাজ আছে।”
ইমরোজ চাইছিল না যাবার অজুহাত রাত্রির উপরে চাপিয়ে সটকে পড়তে।
“তোমার মতামত কী রাত্রি?”
রাত্রির সরাসরি না বলত, কিন্তু ইমরোজের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে সাথে ওকে আরেকটু নাকানিচুবানি খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে বলল,
“মা, আমার একটু ব্যস্ততা আসলেও আছে। কিন্তু আপনি বললে আমি ম্যানেজ করে নিতে পারব। তবুও থাক মা, উনি যেহেতু যেতে চাইছেন না, পরে কখনো যাওয়া যাবে।”
“দেখলি? তোর বউয়ের আপত্তি নেই। তোর ওসব ভুজুংভাজুং বহুত সহ্য করেছি। বিয়ে করেছিস, এবার রেসপনসেবলিটি নিতে শেখ। আর রাত্রি, পরে আবার কী! এখন তোমাদের জন্য সময়টা অনেক সুন্দর। যত দিন যাবে, তত রেসপনসেবলিটি বাড়বে। একসময় নিজের শখগুলোকে চাইলেও আর প্রায়োরিটি দিতে পারবে না। মানুষের প্রায়োরিটি চেঞ্জ হয়ে যায়। তাই এখনই একটু নিজেদের মতো সময় কাটাও। সময় চলে গেলে আর ফিরে পাবে না।”
“মা, আমি…”
ইমরোজ আবার গোয়ার্তমি করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, আনোয়ারা বললেন, “এটাই ফাইনাল। তবে কোথায় যেতে চাস, সেটা তোরা ঠিক করিস।”
ওরা বেরিয়ে গেলে ইপ্সিতা বলল, "উফ্ মা। দারুণ।"
ইপ্সিতাই কলকাঠি নেড়েছে মায়ের কাছে। ইমরোজের মতিগতি ওর ভালো লাগছে না, নিজে তো সরাসরি কিছু করতে পারবে না। তাই মায়ের শরণাপন্ন হয়ে বলেছিল, "ওদের যে অবস্থা, কিছু একটা না করলে সারাজীবন ঝগড়া করে কাটিয়ে দেবে!"
এরপর বাকিটা আনোয়ারা নিজেই করেছেন৷
***
রুমে এসে দু'জনেই পায়চারি করতে লাগল, “খুব শখ না হানিমুনে যাওয়ার? ‘আমি ম্যানেজ করে নিতে পারব’ ন্যাকামি! অসহ্য।”
“এত বাজে মিমিক্রি আমি জীবনেও দেখিনি। শুনুন, আপনার সাথে আমি সামনের পার্কেও যেতে চাই না। হানিমুন!”
“তাহলে ঢং করে বললেন কেন?”
“কারণ আমি ভেবেছিলাম আপনি কিছু একটা বলে আটকাতে পারবেন।”
“আর আপনি মায়ের ভালো বউমা হয়ে যাবেন, তাই না?”
“ঘ্যানঘ্যান করবেন না তো! একটা সামান্য বিষয়ে কনভিন্স করার ক্ষমতা নেই, আবার বড় বড় কথা।”
“পারতাম যদি না আপনি বাগড়া দিতেন।”
“শুনুন, আপনি যেভাবেই হোক, যাওয়াটা ক্যান্সেল করুন।”
“কথায় কথায় অর্ডার করবেন না। অসহ্য লাগে৷”
“আর আমার খুব ভালো লাগে, এত ভালো লাগে যে, দুটো পাখা গজিয়েছে।”
ইমরোজ মাথায় হাত দিয়ে বিছানায় বসে পড়ল।
রাত্রিও ওর পাশে বসেছে, গভীরভাবে কিছু ভাবছে৷ একটা উপার যদি পাওয়া যায়, যাতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।
“কিছু পেলেন?”
ইমরোজের মাথায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মতো একটা ভাবনা খেলে গেল, এই সুযোগ। জেতার এমন মোক্ষম সুযোগ আর কই পাবে!
সে বালিশে মাথা এলিয়ে দিল আয়েশ করে, এরপর মৃদু হেসে বলল,
“পেয়েছি।”
“বলুন, শুনি, আপনার গোবর ভর্তি মাথা থেকে কী বুদ্ধি বেরুলো?”
ইমরোজ আজ রাগে দাঁতে দাঁত চাপল না, বরং ওর হাসি আরেকটু বিস্তৃত হলো,
“চলুন, ঘুরেই আসি। এরচাইতে বেটার কিছু আর মাথায় এলো না!”
“ফাজলামো করছেন?”
“নাহ্! আমি ভীষণ সিরিয়াস। মধুচন্দ্রিমায় যেতে আমার আপত্তি নেই আর। মধুর প্রতিশোধ মধুচন্দ্রিমায়! আপনি যেমন আমার উপরে শোধ নিতে বিয়ে করেছেন, আমি আবার ঋণ রাখি না! শোধবোধ!”
বলেই গুনগুন করে বেরিয়ে গেল ইমরোজ, রাত্রি ইমরোজের বালিশ মেঝেতে ছুঁড়ে মারল। প্রবল রাগে ফুঁসছে সে! বদের হাড্ডির পেটে পেটে যে এমন শয়তানি, এটা সে আগেই জানত! আজ নিশ্চিত হলো!
“শোধবোধ? আমিও ঋণ রাখি না ইমরোজ। সুদ সমেত ফেরত নেবার জন্য প্রস্তুত থাকুন। তোর মধুচন্দ্রিমায় যদি আমি করল্লার তেতো না মেশাই তো আমার নামও রাত্রি নয়!”
***
রাত্রি না থাকায় বাড়িটা ভীষণ খালি খালি লাগে। মায়া রাত্রির পছন্দের কিছু খাবার রান্না করেছেন। উৎপলকে ডেকে বললেন,
“এগুলো রাত্রিকে দিয়ে আসবি।”
“আমি? ওদের আসতে বললেই তো হতো মা।”
“সে বলা যেত। আনোয়ারা আপা সবসময় আসেন না। এটা স্বাভাবিক। তুই দিয়ে আয় বরং।”
উৎপল সংকোচ নিয়ে রাজি হলো, ওই বাড়িতে এখন সবাই আছে। সবার সামনে ইপ্সিতার সাথে কথা বলতে গেলে যদি ধরা পড়ে যায়!
উৎপল কল দিল ইপ্সিতাকে, সে ধরল না। আজ দুপুরে ঝগড়া হয়েছে। ওই বাড়ি গিয়ে কলিংবেল চাপতে ইপ্সিতাই দরজা খুলে দিল।
উৎপল কথা বলতেই যাচ্ছিল, ইপ্সিতা ইঙ্গিতে ভেতরে দেখিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল,
“আরে ভাইয়া আপনি? আসুন আসুন। কেমন আছেন?”
প্রেমিকার মুখে ভাইয়া ডাক শুনে উৎপল একটা ধাক্কা খেল, মনে হলো কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে! এতকিছু থাকতে শেষ পর্যন্ত ভাইয়া!
ইমরোজ এগিয়ে এলো, “আরে, উৎপল! এসো এসো। কেমন আছ?”
“ভালো। তুমি কেমন আছ?”
“ভালো। তুমি তো আসোই না বাসায়!”
ওরা বসার ঘরে এসে বসল।
“আন্টি কেমন আছেন?”
“মা ভালো আছে।”
“রাত্রি কোথায়?”
“ও ভেতরে, তুমি বোসো। আমি ডেকে দিচ্ছি।”
উৎপল খাবারগুলো ইপ্সিতার হাতে দিয়ে বলল, “এগুলো রাখুন। মা পাঠিয়েছে আপনাদের জন্য।”
ইমরোজ উঠে দাঁড়িয়েছিল, বলল, “ইপ্সিকে আপনি বলছ? ও ছোট মানুষ।”
উৎপল বলল, “ছোট হোক, উনি একজন ভদ্রমহিলা। প্রথমেই তুমি বলাটা…”
ইপ্সিতা কটমট করে ওর দিকে তাকাল, ভদ্রমহিলা! ইমরোজ ভেতরে যেতেই ইপ্সিতা ফিসফিস করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, “আমি ভদ্রমহিলা? ফাজলামো হচ্ছে?”
“আমি যদি ভাইয়া হতে পারি, তোমাকে ভদ্রমহিলা বলেছি, আপু বলিনি, এটাই ভাগ্য।”
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল, এরমধ্যে রাত্রি এসে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল, “ভাইয়া!”
উৎপল উঠে বোনকে ভালো মতো দেখে ওর মাথায় হাত রেখে বলল, “কেমন আছিস?”
“তুমি কেমন আছ সেটা বলো! আমাকে তাড়ানোর জন্য অস্থির হয়ে গিয়েছিল। এখন তো মনে হয় বিন্দাস আছিস।”
উৎপল আজ আর খুঁনসুটি করল না, “তোকে ছাড়া বাড়িটা ভীষণ খালি খালি লাগে রে!”
রাত্রি উৎপলের কাঁধে মাথা রাখল, চোখে পানি চলে আসছিল, সেটাকে কোনোমতে প্রবোধ দিয়ে বলল, “এখন তো তোমাকে আর আমার জন্য চকলেট আনতে হয় না!”
উৎপল পকেটে থেকে চকলেটের বক্সটা বের করে রাত্রির হাতে দিলো, “প্রতিদিন এনে জমিয়ে রাখি। আজ একেবারে দিলাম। এতদিনের অভ্যাস কি এত সহজে ভোলা যায়?”
“ভাবি, তুমি এখনো চকলেটের বায়না করো?”
“ওর কাছে সারাজীবন করব। কিছু জিনিস বদলাতে ইচ্ছে করে না। ধরে রাখতে ইচ্ছে করে। বড় হয়ে গেলেও ছেলেবেলা গায়ে মেখে রাখতে ভালো লাগে!”
“কী কিউট ব্যাপার!” ইপ্সিতার কথায় রাত্রি হেসে উৎপলকে বসতে বলে নিজেও পাশে বসল।
ইমরোজ রাত্রিকে পাঠিয়ে মায়ের ঘরে যাচ্ছিল তাকে ডাকতে। কিন্তু ভাইবোনের মিষ্টি আদুরে আবদার ভরা খুঁনসুটি দেখে কেন জানে না দাঁড়িয়ে পড়ল! প্রথমে চকলেটের আবদার শুনে বিরক্ত হয়েছিল, পরে কেন যেন ভীষণ ভালো লাগল! রাত্রিকে সবসময় ডাকাবুকো দেখে অভ্যস্ত ইমরোজ৷ ওই ইমেজের ভেতরে যে এমন শিশুসুলভ আরেকটা রাত্রি আছে, এটা ওকে চমৎকৃত করেছে!
সে-ও ইপ্সিতাকে ভীষণ ভালোবাসে, কিন্তু এভাবে সেটা প্রকাশ করতে পারে কী! উৎপলের মতো!
“তুই এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী করছিস?”
আনোয়ারার কথায় সম্বিতে ফিরে আশেপাশে তাকিয়ে দেখল, সবগুলো চোখ ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। সে বলল,
“তোমাকেই ডাকতে যাচ্ছিলাম মা।”
ইপ্সিতা আর উৎপল পুরো সময়টা তটস্থ হয়ে রইল, কোনোভাবেই ধরা পড়া যাবে না। উৎপলকে কিছুতেই না খাইয়ে ছাড়লেন না আনোয়ারা।
খাবার সময় মা উৎপলের প্লেটে মাছ তুলে দিচ্ছিলেন, ইপ্সিতা প্রায় বলেই ফেলতে যাচ্ছিল, উৎপল মাছ খায় না! এই যাত্রায় রাত্রির জন্য বেঁচে গেল। সে-ই বলল কথাটা। উৎপল তো আপনি তুমি গুলির ফেলছিল বারবার।
ইপ্সিতার মাঝেমধ্যে ভাইয়া ডাকটাই যত নষ্টের গোড়া! এত কাঁঠখড় পুড়িয়ে মিশন বিবাহ সাক্সেসফুল করেছে কী ওর মুখে ভাইয়া ডাক শোনার জন্য!
ইপ্সিতাকে মেসেজে বলেছে, “খবরদার ভাইয়া বলবে না।”
“ভদ্রমহিলা বললে কেন? এখন তো শুনতেই হবে।”
ধূর! কোনো মানে হয়! তবে এতকিছুর মধ্যে একটা খবর শুনে ভালো লাগল, রাত্রি আর ইমরোজ মধুচন্দ্রিমায় যাচ্ছে।