বিবাহ বিভ্রাট ডটকম

পর্ব - ১৫

🟢

রাত্রি জানত ইমরোজ ওর সাথে অবশ্যই যোগাযোগ করবে। তাই আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল। তবে এটাও চায়, বিয়ের আগে যত কম কথা বলা যায় তত ভালো। নইলে মেজাজ আরও বেশি বিগড়ে গেলে নিজেই বেঁকে বসতে পারে। তখন প্রতিশোধ নেয়া হবে না!

জাহিদ ওকে রিপোর্ট দেবার পরেই গিয়ে মত জানিয়ে এসেছে মা'কে। রিপোর্ট দেখে হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে রাত্রি। আচরণগত সমস্যা প্রকট থাকলেও চারিত্রিক কোনো সমস্যা নেই। জাহিদের এক কাজিন নাকি ওই কলেজে পড়ে। সে জানিয়েছে, আলাদা করে মেয়েরা কথা বলতে গেলে প্রয়োজনীয় কথার বাইরে নাকি একটাও কথা বলে না। প্রতিশোধের জন্য হলেও, ক্যারেক্টার সার্টিফিকেটে পাশ মার্ক না পেলে সে রাজি হতো না কিছুতেই।

বিয়েতে কেন রাজি হয়েছে, সেটা বলতে গিয়ে ওর ভীষণ হাসি পাচ্ছিল, হতবুদ্ধি ইমরোজের চেহারাটা কল্পনা করে। হেসেও ফেলেছিল বলতে বলতে।একে জ্বালাতে এত মজা লাগে কেন, এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দ হয়। চেহারাটা সামনে বসে দেখতে কেমন লাগবে! চিন্তা করেই হেসে ফেলল রাত্রি।

***

ইপ্সিতা এসে খুশির খবরটা উৎপলকে দিল। ওদের এই 'মিশন বিবাহ' প্রায় সফলতার দ্বারপ্রান্তে।

উৎপল সহসা খানিকটা যেন গম্ভীর হয়ে গেল, "আমরা কোনো ভুল করছি না তো?"

ইপ্সিতার মনেও কিঞ্চিৎ দ্বিধা যে নেই তা নয়। তবে নিজের ভাইকে সে চেনে। বাইরে থেকে যতই রাগী হোক, ভেতরে ভেতরে এখনো অদ্ভুত এক সরল শিশু ঘাপটি মেরে আছে। সে অভয় দিল প্রেমিক প্রবরকে,

"ভুল হচ্ছে না। আমার ভাইয়া হার্মফুল নয়। রাত্রি আপু খুব ভালো থাকবে। ওরা কাছাকাছি থাকলে কতক্ষণ আর ঝগড়াঝাটি করবে! একজন আরেকজনকে ঠিকই চিনতে পারবে। চিনতে শুরু করলেই প্রেমে পড়বে। আমার বিশ্বাস ওদের দাম্পত্য ঈর্ষণীয় হবে!"

এই ভরসাতেই তো ওরা এগিয়েছে! সব ভালো হোক।

"আমরা কবে আমাদের কথা বলব উৎপল?"

উৎপলের চোখে ঘোর লাগে, ওদের না হওয়া একটা সংসারের স্বপ্নঘোর।

"ওদের বিয়েটা ভালোই ভালোই হয়ে যাক। এর পরপরই মাকে তোমার কথাটা বলব।"

***

হাবীব সাহেব পত্রিকা হাতে নিচ্ছিলেন, মায়া কড়া গলায় বললেন, "মেয়েটা কি আমার একার? মেয়ের বিয়ে, আর তুমি এখনো পত্রিকায় মুখ ডুবিয়ে বসে আছ? তোমার কোনো দায়দায়িত্ব নেই?"

"বসতে পারলাম কই? তার আগেই তো চেঁচিয়ে উঠলে!"

"উৎপলের বাবা, উনারা চাইছেন, যত দ্রুত সম্ভব বিয়েটা হয়ে যাক। তোমার মেয়ে রাজি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু বেঁকে বসতে কতক্ষণ! আমারও তাই মত। তুমি কী বলো?"

"একটু বেশি তাড়াহুড়া হচ্ছে না?"

"তা একটু হচ্ছে। কিন্তু ছেলেটা ভালো, ভদ্র। আদব কায়দা জানে। সেদিন দেখা হয়েছিল, বলেছিই তো। তাছাড়া আনোয়ারা আপা ভীষণ মজার মানুষ, খোলামনের মানুষ। কোনো কুটিলতা নেই। ইপ্সিতাও লক্ষ্মী মেয়ে। আল্লাহ ভরসা বলে শুরু করা যেতে পারে।"

"এটা অবশ্য ঠিক বলেছ। চারপাশে এমন সব গল্প শুনি, সেখানে এমন মানুষ যেই পরিবারে আছে, সেখানে মেয়ে দেয়াই যায়। ঠিক আছে। আমরা একসাথে আরেকবার বসে দিনক্ষণ ঠিক করি। বাকিটা আল্লাহ ভরসা।"

***

ইমরোজ পরেরদিন বাসায় এসে শুনল মা নাকি এখন অব্দি খাবার মুখে তোলেননি। এমনকি পানিও না। ইপ্সিতার কাছ থেকে কথাটা শুনে সে ছুটে মায়ের ঘরে গেল।

আনোয়ারা শুয়ে আছেন চোখ বন্ধ করে। ছেলের সাড়া পেয়েও তিনি চোখ খুললেন না।

"মা, তুমি খাওনি কেন? তোমার ওষুধও খাওনি। এই শরীরে না খেয়ে আছ কেন?"

"তোদের খাবার রান্না করা আছে। খেয়ে নে।"

"তুমিও চলো মা।"

তিনি চোখ খুলে উঠে বসলেন, কিন্তু নামার কোনো লক্ষণ তার মধ্যে পরিলক্ষিত হলো না।

"কী করব গিয়ে? শরীর ঠিক করে কী লাভ? ছেলে পন করেছে বিয়ে করবে না। আমি আর কয়দিন? আমার কথা ভাবিস তুই? একজন মায়ের সন্তানের জন্য কত চিন্তা হয়, তোর ধারণা আছে? ইপ্সিতার বিয়ে হয়ে যাবে, আমি আর কয়দিন। এরপরে তুই কী করবি বাবু? একা থাকবি? একা থাকা যায় সারাজীবন? একাকিত্বের মানে জানিস? মানুষটা চলে যাবার পরে আমি তোদের দিকে তাকিয়ে বেঁচে ছিলাম। আমার বাঁচার অবলম্বন ছিলি তোরা। তুই কী করে থাকবি ইমু? জীবনটা যত ছোট মনে হয়, ততটা ছোট কী? এত লম্বা সময় একা থাকতে পারে না কেউ। তোর ভালো চাওয়াটা আমার অন্যায়?" বলতে বলতে আনোয়ারার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো। কিছু জল গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে।

ইমরোজ মাকে সবসময় মেলোড্রামা করতে দেখেছে, হাসতে দেখেছে, কিন্তু আজ সেসবের ছিঁটেফোঁটাও নেই। এই কান্না সত্যিই তার হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত। সন্তানের জন্য অপার স্নেহ আর আশঙ্কার দোলাচল থেকে তিনি ভেতরে ভেতরে ভেঙে পড়েছেন। তার এই ভঙ্গুর দশা তিনি কোনোদিন সন্তানদের দেখাতে চাননি।

ইমরোজ মায়ের পাশে বসে তার কাঁধে মাথা রাখল।

"মা, এভাবে বলো না প্লিজ। আমার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। তুমি আর ইপ্সিতা ছাড়া আমার আর কে আছে বলো। চলো, খেয়ে নাও, প্লিজ মা?"

"আমার গলা দিয়ে খাবার নামবে না। তুই যা, খেয়ে নে।"

ইমরোজ আরও কিছুক্ষণ মায়ের কাঁধে মাথা রেখে নিশ্চুপ বসে রইল। কতক্ষণ পরে জানে না, সে মুখ খুলল,

"মা, তোমার খুশির চাইতে বড় আমার কাছে আর কিচ্ছু নেই। এই বিয়ে করলে যদি তুমি খুশি হও, তাহলে আমার আপত্তি নেই।"

ইমরোজ জানে না, কখন ওর চোখও ঝাপসা হয়ে এসেছে। আনোয়ারা ছেলের মুখটা দুই হাতে ধরলেন, এরপর ডান হাতে ওর চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললেন,

"দেখিস, তুই খুব সুখী হবি বাবু। আমার দোয়া সবসময় তোদের সাথে আছে, থাকবে।"

ইমরোজ যেন এখন নিজের মধ্যে নেই, কী হচ্ছে না হচ্ছে, কী বলছে নিজেও জানে না। শুধু জানে ওর মা কাঁদছে, কষ্টের কারণ সে নিজে। সেই কষ্ট ওকে লাঘব করতে হবে।

"এবার চলো মা। খেয়ে নাও।"

"চল।"

মৃদু হেসে ছেলের মাথায় পরম মমতায় হাত রেখে বললেন আনোয়ারা। মনে মনে নিজের সমস্তটা দিয়ে প্রার্থনা করলেন।

দুদিনের মধ্যেই বিয়ের তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল। সামনের শুক্রবার বিয়ের দিন ধার্য্য করা হলো।

Story Cover