চোখের সামনে রাত্রিকে বসে থাকতে দেখে ইমরোজের ছেলেবেলায় পড়া সেই ‘চলে হনহন, ঘোরে বনবন’ ছড়ার মতো ওর মাথাও বনবন করে ঘুরতে লাগল, গত কয়েকদিনে দেখা ভয়ানক সব দুঃস্বপ্ন যেন বাস্তবে রূপ নিতে মুখিয়ে আছে। অস্ফুটস্বরে বলল,
“সর্বনাশ!”
এটা কিছুতেই হতে দেয়া যাবে না। নিজের মেজাজের চড়ে উঠা পারদ নিয়ন্ত্রণ না করতে পেরে বলল, “এটা আপনার বাড়ি জানলে কখনো আসতাম না।”
“আপনি কচি খোকা? কই আপনার সাথে ফিডিং বোতল দেখছি না তো?”
“একদম ফালতু কথা বলবেন না। পারেনই শুধু এসব বাজে কথা বলতে।”
“মোটেও বাজে কথা না। আপনি একেবারে ফুলবাবু সেজে চলে এসেছেন পাত্রী দেখতে, মেয়ে কে না জেনেই নাচতে নাচতে সেজেগুজে চলে এসেছেন? আপনি তো শিশু না!”
“সে তো আপনিও সেজেগুজে শাড়ি পরে সামনে এসে বসেছেন। এখন বলুন, আমার কী ভাবা উচিত?”
“সেটার এক্সকিউজ আপনাকে কেন দেব?”
“তাহলে আমাকে বলছেন কেন?”
“কারণ আপনি একটা গোলমেলে লোক। বিশ্বাসযোগ্য নন।”
“আর আপনি বুঝি বিশ্বাসের বড়ি গিলে বসে আছেন?”
এতক্ষণে বাকিরা সামলে নিয়েছে, সহসা এমন পরিস্থিতির জন্য উৎপল আর ইপ্সিতা বাদে কারোরই মানসিক প্রস্তুতি ছিল না।
আনোয়ারা ছেলেকে থামিয়ে দিয়ে মৃদু ধমক দিয়ে বললেন,
“থাম ইমু। কী বাজে তর্ক করছিস!”
“আমি তর্ক করছি শুধু?”
“মেয়েদের সাথে এভাবে কথা বলতে হয়?”
ইমরোজ চুপ করল, মেয়ে বলেই এত ঔদ্ধত্য দেখাবার পরেও পার পেয়ে গেছে। নইলে…
মায়াও ফিসফিস করে মেয়েকে সাবধান করলেন,
“সিন ক্রিয়েট করবি না, বলে দিলাম।”
“আপা, রাত্রিকে আমার খুব পছন্দ। ইমরোজকে কোনো প্রশ্ন করতে চাইলে করতে পারেন।”
ইপ্সিতাও এবার মায়ের সাথে তাল মিলিয়ে বলল, “আমারও খুব পছন্দ হয়েছে।”
ইমরোজ বিস্মিত দৃষ্টিতে মা আর বোনের দিকে তাকাল, এরা নাকি ওর সবচাইতে আপন মানুষ। ওকে জনমানবহীন জঙ্গলে নির্বাসন দেবার পায়তারা করছে! ওর বিশ্বাস হচ্ছে না!
“আমরা আর কী প্রশ্ন করব! ওরা নাহয় নিজেরা কথা বলে নিক।”
উৎপল বলল, “বাবা, আগে আমরা ছেলেকে একটু যাচাই করে দেখি।”
ও নিজের বোনকে চেনে, এখনই ওদের আলাদা করে কথা বলতে দিলে, সব ভন্ডুল হয়ে যাবে। রাত্রি কটমট করে ভাইয়ের দিকে তাকাল। উৎপল আজ পাত্তা দিল না।
“আমার ভাইয়া খুব ভালো রান্না করতে পারে। নিজের ঘর নিজেই গোছায়।”
ইমরোজ দৃষ্টি দিয়ে আগুন ঝরিয়ে ইপ্সিতাকে ভস্ম করে দিতে চাইল যেন। মানে কী, সার্কাস চলছে! সে কি কোরবানির হাটের গরু! হৃষ্টপুষ্ট কীনা, সেসব মাপজোক করে নেবে! এই দিন দেখার জন্য বয়সে এত বড় হয়েছে!
“তাই নাকি? বাহ্! খুব ভালো গুণ তো এটা!”
উৎপলের কথায় আনোয়ারা বললেন, “জীবনে চলার জন্য টুকিটাকি কাজ ছেলেমেয়ে সবাইকেই রপ্ত করতে হয়। বাড়িতে মা হোক, স্ত্রী হোক, তাদের একটু সাহায্য করায় অসম্মানের তো কিছু নেই। বরং কাজটা তাদের যতটা, ততটাই নিজেরও। আর কাজ কাজই, আমরাই ছেলেদের কাজ, মেয়েদের কাজ নিয়ে ক্লাসিফিকেশন করে নিয়েছি।”
কথাবার্তা চলল বেশ অনেকক্ষণ, খাবার টেবিলে ইমরোজের সাথে হাবীব সাহেব আর উৎপলের আড্ডা বেশ জমে উঠল। প্রথমদিকে ওদের ঝগড়া করতে দেখে ইমরোজকে এ্যারোগ্যান্ট বলে মনে হচ্ছিল, কিন্তু এখন কথা বলে ভীষণ ভালো লাগল। মাথা থেকে চিন্তার বোঝা নামল।
ইমরোজ দেখল এই বাড়িতে রাত্রি বাদে আর প্রত্যেকেই ভারি আন্তরিক। ওর উপরের রাগ তাই পরিবারের অন্যদের উপরে প্রকাশ করা ঠিক নয়। তাই তাদের সাথে ওর সহজাত আচরণই করল।
ফিরে যাচ্ছিল, এরমধ্যে একটা টেক্সট মেসেজ এলো,
“আপনি ভুলেও যদি বিয়েতে রাজি হয়েছেন, তাহলে ভীষণ পস্তাবেন।
রাত্রি”
ইমরোজ সাথে সাথে লিখল, “আমি তো আপনাকে বিয়ে করার জন্য মরে যাচ্ছি। আপনার মতো মেয়েকে বিয়ে করে নিজের শান্তি নষ্ট করার চাইতে, জঙ্গলে গিয়ে পশুপাখিদের সাথে বাস করাটাও শান্তির।”
রিপ্লাই এলো এক মিনিটের মধ্যে, “আমার মতো মেয়ে মানে কী?”
“উন্মাদ।”
“আমি যদি উন্মাদ হই, তবে আপনি গাধা প্রজাতির মানুষ। যার মাথায় এক তোলা বুদ্ধি নেই, অথচ লজিকলেস কথার খই ফুটছে।”
“আপনি শুধু উন্মাদ না, মহা উন্মাদ।”
“এই যে দেখলেন, আপনার নিজের কথার স্থায়িত্ব নেই। মিনিটে মিনিটে আমাকে দেয়া বিশেষণ পরিবর্তন করছেন। এত ঝগড়ুটে মানুষের মতো তর্ক না করে নিজের উপরে ভরসা বাড়ান, যাতে নিজেরই মতামত চেঞ্জ না হয়!”
আর টেক্সট লিখল না, মনে মনে আওড়ালো, “অসহ্য।”
“গিয়েই সিনক্রিয়েটটা কেন করলি?”
মাঝরাস্তায় আনোয়ারার প্রশ্নে মুঠোফোন থেকে চোখ তুলল ইমরোজ, “মা, ওকে আমি বিয়ে করব না।”
“তাহলে কাকে বিয়ে করবি? পছন্দের কেউ আছে তোর?”
ইপ্সিতা পাশে বসে ভাবল, ওকে মা কেন এই প্রশ্ন করলেন না! তাহলে এত এত প্ল্যান করতে হতো না।
“না।”
“তাহলে? এভাবেই আইবুড়ো সেজে বসে থাকবি? এটাই দেখার বাকি ছিল! ভেবেছিলাম নাতি নাতনির সাথে একটু আনন্দ করব! সেই সুখ কি আর আমার কপালে আছে!”
“মা, প্লিজ, তোমার মেলোড্রামা আবার শুরু করো না। ভালো লাগছে না।”
“মেলোড্রামার দেখেছিস কী তুই? মেলোড্রামা কত প্রকার, কী কী, উদাহরণসহ ব্যাখ্যা, সব দেখবি। এটাই শুনতে হলো আমার।”
“আমি ওই মেয়েকে বিয়ে করব না। তার চাইতে বনবাসে চলে যাব।”
“তাহলে তাই যা৷ কয়দিন পরে বুড়ো হবি, আধবুড়া অবিবাহিত ছেলেকে চোখের সামনে দেখতে চাই না। শোন, যতই ধানাইপানাই কর, কোনো লাভ হবে না। তোর পছন্দ থাকলে বিবেচনা করে দেখতাম। যেহেতু নেই, তাই রাত্রি'ই ফাইনাল।”
“মা?”
“অপ্রয়োজনীয় কথা আমি শুনি না।”
***
ওরা চলে যাবার পরে বসার ঘরে উৎপল বসে আছে ওর বাবা-মায়ের সাথে। রাত্রি নিজের ঘর থেকে বের হয়নি।
উৎপল প্রশ্ন করল, “ছেলেকে কেমন দেখলে তোমরা?”
মায়া বললেন, “এমনিতে তো ভালোই মনে হলো। কিন্তু ওরা দুজন তো একজন আরেকজনকে সহ্যই করতে পারে না বলে মনে হলো। এটাই ভাবনার।”
উৎপল উত্তর গুছিয়েই রেখেছিল, বলল, “মা, এভাবে কেউ অল্প পরিচিত কারো সাথে ঝগড়া করে? তুমিই বলো! তাছাড়া সেদিন ওই লোকটা কী বলল শোনোনি? আমার তো মনে হচ্ছে কাহিনী অন্য।”
বাবা বললেন, “কী কাহিনী?”
“আমার ওদের কথাবার্তার ধরণ দেখে মনে হলো, দুজনেই দু'জনকে পছন্দ করে। কিন্তু কোনো কারণে ওদের মধ্যে মনোমালিন্য চলছে। ইগো কাটিয়ে উঠে কেউ এগিয়ে আসছে না। দুজনেই অন্যজনের জন্য অপেক্ষা করছে। রাত্রির আপনজন হিসেবে ওদের সাহায্য করা আমাদের দায়িত্ব না?”
মায়া ভাবলেন, উৎপলের কথা ফেলে দেবার মতো নয়। নইলে অকারণে এভাবে ঝগড়া করবে কেন স্বল্প পরিচিত কারো সাথে।
“ঠিক আছে, রাত্রিকে জিজ্ঞেস করে দেখি।”
“মা, তোমার মনে হয়, ও এখন তোমাকে বলবে কিছু?”
“তাও ঠিক।”
***
রাত্রির মাথায় আগুন জ্বলছে, শাড়ি বদলে ফেলেছে, সেটা এখন মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে৷ ওই বিরক্তিকর ছেলের জন্য ওকে এই শাড়ি পরতে হয়েছে, ভাবলেই অসহ্য লাগছে। এই শাড়িটা জ্বালিয়ে দিতে পারলে শান্তি পেত! কী লজ্জা! অপমানে ওর মাথা কাটা যাচ্ছে।
পরক্ষণেই ভাবল, নিরীহ শাড়ির উপরে রাগ করে লাভ কী! বরং এত সুন্দর শাড়িটা নষ্ট হবে৷ ইমরোজের মাথায় আগুনটা ধরালে কাজের কাজ হতো।
সে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে উৎপলের রুমে এলো।
“ভাইয়া, তুমি এটা কেন করলে?”
উৎপল শঙ্কিত হলো, ধরা পড়ে গেল নাকি!
“কী করেছি আমি?”
“ওই লোকটার সাথে আলাদা করে কথা বলায় বাগড়া দিলে কেন?”
“তাহলে কী হতো?”
“কী আবার হতো! ওই ত্যাঁদড়টাকে উচিত শিক্ষা দিতাম।”
“তাহলে তুই এই বিয়ে করতে চাস না?”
“প্রশ্নই আসে না। আমাকে চেনে না! আমাকে বলে কি-না আপনার মতো মেয়েকে বিয়ে করার চাইতে জঙ্গলে গিয়ে পশুপাখির সাথে সংসার করব! আমার মতো মেয়ে বলে সে আমাকে অপমান করেছে, সেটার সুদ সহ ফেরত দিতাম। এই সুযোগ তোমার জন্য নষ্ট হলো আজ।”
“তোর চাইতে পশুপাখির সাথে সংসার করা ভালো এই কথা বলেছে? এত বড় সাহস ওর? তুই এর শোধ তুলবি না?”
“অবশ্যই তুলব। এমনি এমনি ছেড়ে দেব নাকি!”
“তোর জায়গায় আমি হলে এই বিয়েতে রাজি হয়ে যেতাম।”
“তোমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে ভাইয়া।”
“আমি ঠান্ডা মাথায় বলছি। শোন, ওকে তুই শাস্তি দিতে চাস, তাই না? ওকে শাস্তি দেয়ার এরচাইতে ভালো সুযোগ আর কোনোদিন পাবি না! তোকে বিয়ে করার চাইতে ও অন্য যেকোনো কিছু করতে রাজি। তাহলে সেটাই কর, যেটা ও চায় না। তারপর সারাজীবন ধরে শাস্তি দিতে পারবি।”
“কিন্তু ওই মাথামোটা ত্যাঁদড়কে এই শাস্তি দেয়াটা তো আমার জন্যও শাস্তিস্বরূপ।”
“তা অবশ্য ঠিক। তাহলে ওর ইচ্ছাই প্রাধান্য দে। কী আর করবি। ওর বোনের বিয়ে হয়ে গেলে তো তোর সাথে আর ওর যোগাযোগও হবে না। অপমানের শোধটা তুলবি কীভাবে?”
উৎপল নিজের বোনকে চেনে, ইপ্সিতার কাছ থেকে ইমরোজ সম্পর্কে অনেককিছু শুনেছে৷ আজ নিজেও কথা বলে এটুকু বুঝতে পেরেছে, রেগে একটু মুখে হম্বিতম্বি করা পর্যন্তই, মানুষ হিসেবে খারাপ নয় ছেলেটা। দুটো বরফের টুকরো এক পাত্রে রাখলে কিছুক্ষণ পরেই গলে জল হয়ে একসাথে মিশে যায়, তখন আর এদের আলাদা করে কোনো অস্তিত্ব থাকে না। ওরা দুটো কিছুদিন ঠোকাঠুকি করে ঠিকই একদিন ওই বরফ গলা পানির মতো একাকার হয়ে যাবে, এটাই ওর বিশ্বাস। সেজন্যই আরও উস্কে দিল।
রাত্রি ভীষণ বুদ্ধিমতী, তবে একটাই সমস্যা কেউ ঢিল ছুঁড়লে পাটকেল না ছুঁড়া পর্যন্ত ওর ঠিক স্বস্তি হয় না। এই সুযোগটা ওর নেয়া উচিত বলেই মনে হলো।
সে নিজের ঘরে ফিরে এলো, উৎপলের পরামর্শটা গুরুত্ব সহকারে বেশ সময় নিয়ে ভাবল। এরপর জাহিদকে কল দিল।
“জাহিদ ভাই, তোমাকে ৩১৩ নম্বর ফাইলের ইপ্সিতা, তার ভাইয়ের ব্যাপারে ইনভেস্টিগেট করতে বলেছিলাম। করেছিলে?”
“হ্যাঁ। বোরিং লাইফস্টাইল। কলেজ টু বাসা, বাসা টু কলেজ, মাঝেমধ্যে অল্পকিছু বন্ধুর সাথে আড্ডা দেয়। এইটুকুই।”
“আচ্ছা, ওইটা বাদ দাও। নতুন করে খোঁজ নাও। ওই ব্যাটার স্বভাব চরিত্র কেমন? প্রেমঘটিত ব্যাপার স্যাপার আছে কিনা! সব দেখবে।”
“কেন? উনিও কি আমাদের সার্ভিস চাইছেন নাকি?”
“পরে বলব। একটু দ্রুত দেখতে পারবে? আর্জেন্ট।”
“আচ্ছা, দেখি।”
ওকে উন্মাদ বলা, কত্ত বড় স্পর্ধা, উন্মাদ কাকে বলে হাড়ে মজ্জায় টের পাইয়ে তবে দম নেবে রাত্রি!
যদিও ইমরোজের প্রতি ওর কোনো আগ্রহ নেই, তবুও অন্যের বয়ফ্রেন্ড নিয়ে টানাটানি করার কোনো ইচ্ছা ওর নেই। যেই কারণেই হোক, চারিত্রিক সার্টিফিকেটে উত্তীর্ণ কিনা সেটাও দেখে নিয়েই সে এগুতে চায়।
***
মায়া ব্যাংকে এসেছিলেন, কাজ শেষ করে রিকশার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। হঠাৎ তার পাশে একটা রিকশা এসে থামল৷ ইমরোজ তাকে দেখে নেমে দাঁড়িয়ে সালাম দিল।
“কেমন আছ বাবা?”
“ভালো। আপনি কেমন আছেন আন্টি?”
“ভালো। তোমার মা কেমন আছে? শরীর ভালো?”
“জ্বি আন্টি, মা ভালো আছে।”
আজ সূর্যের তেজ একটু বেশি, ইমরোজ বলল, “আন্টি আপনি এই রিকশা নিয়ে চলে যান।”
“তুমি?”
“আমি ম্যানেজ করে নেব আন্টি। আপনি রোদে দাঁড়িয়ে থাকবেন না, শরীর খারাপ করবে।”
“ভালো থেকো বাবা।”
“মামা, একটু সাবধানে নিয়ে যাবেন।”
এমন ব্যবহারে মায়ার মনের দ্বিধা কেটে গেল, কী ভালো ছেলে! তিনি তো ওকে দেখেননি। চাইলেই পাশা কাটিয়ে নিজের কাজে চলে যেতে পারত। কিন্তু নিজে নেমে তাকে ওই রিকশায় তুলে দিল।