আজ মায়াদের সপরিবারে দাওয়াত ছিল। রাত্রি বলেছিল, কাজ শেষ করে চলে যাবে। মায়া ভাবলেন, রাত্রির অফিসের সামনে দিয়েই যেহেতু যাবেন, ওকে তুলে নেবেন।
রাত্রির বাবা হাবিব সাহেবকে বসিয়ে মায়া আর উৎপল নেমে এলো। রাত্রির অফিসে ঢোকার পরে রিসিপশনিস্ট উঠে এসে হাসিমুখে তাদের স্বাগত জানিয়ে বসিয়ে দিলো। বলল,
“ম্যাডাম লাস্ট এপয়েনমেন্ট এটেন্ড করছেন। এক্ষুণি বেরুবেন।”
এরমধ্যে কোত্থেকে একটা লোক চলে এলো,
“আসসালামু আলাইকুম।”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম।”
“খালাম্মা, আমি ওই আপার কথা শুইনেই বুঝলাম, আপনি রাত্রি আপার আম্মা। মাশাল্লাহ। আজকে তার হবু জামাইরে দেখলাম৷ মাশাল্লাহ, মানিক জোড় একেবারে।”
মায়া অবাঞ্চিত কথায় এক প্রকার বিরক্তই হলেন, “কী বললেন বুঝলাম না।”
“রাত্রি আপার হবু জামাই, যেমন লম্বায়, তেমন সুন্দর দেখতে।”
উৎপল বলল, “কার কথা বলছেন? তার নাম কী?”
“নাম তো জানি না, তয়, ছবি আছে আমার কাছে। সেলফি তোলার ঢং কইরা তার ছবি তুলছি একটা।”
বলেই সম্মতির অপেক্ষা না করে লোকটা গর্বিত ভঙ্গিতে নিজের মুঠোফোন এগিয়ে দিয়ে বলল, “আমি আইছিলাম, গোয়েন্দার চাকরির জন্যে। আমি এইসবে ভালো। বেশি ভদ্রলোকেরা অন্যের বাড়িতে উঁকিঝুঁকি মারতে শরম পায়, আমার মতো মানুষ দরকার তাগো। এহন বলেন, এত বড় একটা কেস সামাল দিলাম, যোগ্য না আমি?”
ছবিটা দেখামাত্র ইপ্সিতার ভাইকে চিনতে বিন্দুমাত্র সময় লাগেনি উৎপলের। ইমরোজ এখানে কেন এসেছে, এটাও সে জানে। এই লোক কোনো কারণে হয়তো ভুল বুঝেছে। তবে এই ভুলটা সে ভাঙাতে চাইল না। সিদ্ধান্ত নিল আরেকটু উস্কে দিতে।
“ছবি দেখতে হবে না। আপনি যান ভাই। আপনার চাকরির জন্য শুভকামনা।”
লোকটা আরও কিছু বলতে চেয়েছিল, সেই সুযোগ না পাওয়ায় ভারাক্রান্ত মনে ফিরে গেল।
উৎপল বলল, “মা, দেখেছ, তোমার মেয়ে কত এগিয়ে গেছে। এটা সেই ছেলেটাই, যার ব্যাপারে সেদিন বলেছিলাম, রাত্রির জন্য। ও হয়তো কোনো কারণে লজ্জা পাচ্ছে বলতে। আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিত না?”
“তুই শিওর তো?”
“তাহলে এই ছেলে এখানে কেন আসবে? আর ওই লোক কেন ভুলভাল বলবে? কোনোকিছু নিশ্চয়ই আঁচ করতে পেরেছে। নইলে, এটা ভাববে কেন? কত লোকই তো আসে, উনাকে দেখেই লোকটার সন্দেহ হবার তো কোনো কারণ নেই।”
কিছুক্ষণ ভেবে মায়া বললেন, “তোর কথায় যুক্তি আছে। এবার আমাদেরই উদ্যোগ নিতে হবে।”
হাসিমুখে রাত্রি বেরিয়ে আসছে, উৎপল ভাবছে ওর ভবিষ্যতের কথা, এই ষড়যন্ত্রের পেছনে সে কলকাঠি নেড়েছে, এটা জানলে রাত্রি ওকে শূলে চড়াবে নিশ্চিত!
তবে এতকিছুর পরও সে এটা বিশ্বাস করে সে বোনের ভালোই চাইছে। নিজের ভালোর সাথে বোনেরও ভালো হোক।
***
ইপ্সিতার হাতে শোভা নামের মেয়েটার ছবি আর বায়োডাটা তুলে দিল উৎপল। উল্টেপাল্টে দেখে ইপ্সিতা জিজ্ঞেস করল,
“এটা দিয়ে আমি কী করব? এটা কে?”
“এর নাম শোভা।”
“সেটা তো দেখতেই পাচ্ছি।”
“রাত্রি এই মেয়েটাকে সিলেক্ট করেছে আমার সাথে বিয়ে দেবার জন্য।”
ইপ্সিতা দপ করে জ্বলে উঠল, “মানে কী? তোমার বিয়ে ঠিক করে ফেলছে। আর তুমি নাচতে নাচতে সেই খবর আমাকে দিতে এসেছো? এখন আর আমাকে ভালো লাগছে না? শোভার শোভায় ডুবতে ইচ্ছা করছে? যাও, বিয়ে করে ফেলো তোমার শোভাকে!”
উৎপল কথা বলার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পাত্তাই পেল না। এমন সাঁড়াশি কথার আক্রমণে সে ঢাল খুঁজে পাচ্ছিল না। অবশেষে যখন সুযোগ পেল, ততক্ষণে ইপ্সিতা উঠে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শুরু করেছে।
উৎপল ওর পেছনে যেতে যেতে বলল, “আরে, আমি কখন বললাম, আমি ওকে বিয়ে করব। এই পাগলী, শোনো না, আরে, একটু আস্তে হাঁটবে তো। আরে, দেখো, আমি বিয়ে করতে চাইলে এগুলো এনে তোমাকে দেখাতাম? বোঝো না কেন?”
এবার ইপ্সিতার গতি খানিকটা শ্লথ হলো, কিন্তু কিছু বলল না।
উৎপল বলল, “এখন আমাদের একসাথে লড়ার সময়, বিভক্তির সময় না। আমাদের মাথা ঠান্ডা করে ভাবতে হবে। মনে আছে, এটা একটা যু দ্ধ! যু দ্ধের ময়দানে এমন কত বিপদ ওঁৎ পেতে আছে। এগুলো তো আমাদের সামলাতে হবে, তাই না?”
ইপ্সিতা এবার পুরোপুরি থেমে গেল, ঘুরে তাকিয়ে উৎপলের দিকে তাকিয়ে বলল,
“স্যরি।”
“এই তো বুঝতে পেরেছ। মিশন বিবাহের নতুন একটা চাল দিয়েছি আমি।”
কৌতূহলী ইপ্সিতা প্রশ্ন করল, “কী চাল?”
“বসো, বলছি।”
সব শুনে উদ্ভাসিত হাসল ইপ্সিতা, উৎপল মুগ্ধ গলায় বলল, “সুন্দর।”
“কী?”
“তোমার হাসি।”
“আর আমি?”
“সেটা নতুন করে বলতে হবে?”
“হ্যাঁ, প্রতিদিন বলবে। যখন বুড়ো হয়ে যাব, চামড়ায় ভাঁজ পড়বে, দাঁত পড়ে যাবে, সব চুল সাদা হয়ে যাবে, তখনও বলবে। শুনতে এত ভালো লাগে! মনে হয়, একজন মানুষ আছে, পুরো পৃথিবীর চোখে যাই হোক, সেই মানুষটার চোখে আমি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দরী।”
কেমন স্বপ্নালু শোনায় ইপ্সিতার গলাটা, চোখে স্বপ্নের আঁকিবুঁকি।
উৎপল মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলল, “বলব, সবসময় বলব।”
প্রিয়জনের হাসিমুখ দেখতে কার না ভালো লাগে! স্বপ্নের পথের বাঁধাগুলো যেন কিছুক্ষণের জন্য ওদের মন থেকে হারিয়ে গেল, একরাশ ফুরফুরে বাতাস ওদের সমস্ত মনকে আচ্ছন্ন করে ফেলল!