সকালের নাশতা খেয়েই সবাই তৈরি হয়ে নিল কনে বাড়ি যাবার জন্য। জুবায়ের; যে কাল অবধি ভীষণ স্বতঃস্ফূর্ত ছিল; আজ হঠাৎ করেই ওর উৎসাহে ভাটা পড়ে গেছে। তৈরি হওয়া নিয়ে সবার রীতিমত তাড়া খেয়েও গড়িমসি করলো কিছুক্ষণ। শেষমেশ বাধ্য হয়েই মাকে এসে বললো,
--- আমার যেতে ইচ্ছে করছে না, মা। তোমরা বরং ওদের বলে দাও। কয়েকদিন পর যাবো।
জুবায়েরের মা জাহেদা ছেলের কথা শুনে হতবাক হলেন। কিছুটা রাগ নিয়েই বললেন,
--- যেতে ইচ্ছে করছে না মানে? এটা আবার কেমন কথা? কাল নিজেই তো আংটি নিয়ে এলি জুয়েলার্স থেকে। এখন আবার… তোর সমস্যা কি সেটা বল।
জুবায়ের দেখলো আবহাওয়া গরম। ঢোক গিলে বললো,
--- শরীরটা ভালো না, মা। এ - অবস্থায় যাওয়া ঠিক হবে না।
--- হয়েছেটা কি?
জাহেদার ধমকে বাড়ির সবার দৃষ্টি পড়লো এদিকে। ওর বোন যূথী আর বাবা এগিয়ে এলেন ঘটনা কি দেখার জন্য। সেদিকে চেয়ে জুবায়ের আরেকটু ভড়কে গেল। জানত, এদের মানা করাটা কঠিন হবে। এতোদিন ধরে বিয়ের এতো প্রেশার দিয়েছে; কত কাঠখড় পুড়িয়েছে ওকে রাজি করার জন্য। অবশেষে যখন সব ঠিক হয়েছে; আংটি বদলের দিন জুবায়ের এমন ক্যারফা বাজালে সমস্যা তো হবেই!
তবুও স্বর নামিয়ে বললো,
--- লুজ মোশন।
কথা শুনে ফিক করে হেসে উঠলো ওর বাপ - বোন। জাহেদা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
--- তাতে সমস্যা কোথায়? তোকে কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা থাকতে বলেছে? সব তো হয়েই আছে। আংটি পড়াবো; দিন ঠিক করব; চলে আসবো।
--- সেটাই তো, মা। দিন ঠিক করতে সময় লাগবে না? সাথে আরো কতো আলোচনা। অনেক সময় লাগবে। ততক্ষন তো আমি কি…
বাকি কথা ইঙ্গিতে বলা হয় গেল। জাহেদা স্থির,
--- প্রয়োজনে বাথরুমে যাবি।
যূথী মুখ ফসকে বলে ফেললো,
--- তোর শ্বশুরবাড়িতে কি বাথরুম নেই নাকি, ভাইয়া? এতো বেসামাল হওয়ার ভয়!
বলেই খিলখিল করে হাসতে লাগলো। বাকি সবার চোখ রাঙানিতে আবার থেমেও যেতে হলো চটপট। জুবায়ের বেচারা হয়ে সুর তুললো,
--- মাআআ! হবু শ্বশুরবাড়িতে এমন বেইজ্জতি করিয় না, প্লীজ! একটু বোঝার চেষ্টা করো। ওখানে গিয়ে ঘনঘন বাথরুমে যাবার কথা বললে… তোমরা থামো। আমি আসছি।
বলতে বলতেই ছুটে গেল বাথরুমে। যূথী এবার হেসেই গড়িয়ে পড়লো যেন!
মিনিট পনেরো পর একটা বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় করে ফিরে এলো জুবায়ের। ওর ক্লান্ত - মলিন চেহারা দেখে মায়া হলো ওর বাপের। স্ত্রীকে বললেন,
--- ছেলে অসুস্থ। এখন যাওয়াটা ঠিক হবেনা। আমরা পরে যেতে পারি! তুমি ওদের সাথে কথা বল। যদি রাজি না হয়, তখন নাহয় আমরা তিনজন গিয়ে আংটি পরিয়ে দিয়ে আসব। ছেলের যাওয়ার প্রয়োজন নেই!
জাহেদা মানলেন সে-কথা। কনেপক্ষকে জানাতেই তারা বললেন সমস্যা নেই। আংটি পড়ানোর দিন ফুরিয়ে যায়নি। পাত্র সুস্থ হলে যাওয়া হবে। শুনে, জুবায়ের স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো!
সেদিন সারাবেলা জুবায়ের অপেক্ষা করে রইলো বিপার উত্তরের; যেমন করে ছিল গতরাতে। বিপা কোনো টু শব্দটিও করলো না।
জুবায়ের ভয়ে আর কল করতেও সাহস পেলো না। দুদিন দ্বিধায় কাটার পর নিজের উপরই ভীষণ রাগ হলো। কি প্রয়োজন ছিল পৃথার কথা শুনে পুরোনো জোসে নিজের হুশ উড়ানোর? কি ভাবলো, বিপা ওকে? এমনিই ওর জীবনে কত ঝামেলা। আর হয়তো কোনদিন কথাও বলবে না এই কারণে।
জুবায়ের হতাশ হয়ে রইলো। এরমধ্যে জাহেদা জোরাজুরি শুরু করতেই যেতে হলো কনে বাড়ি। আংটি বদল হলো। বিয়ের তারিখ ঠিক হলো চলতি মাসের শেষ শুক্রবার। সবে মাসের শুরু। প্রায় পুরো মাস জুড়েই সময় পাওয়া যাচ্ছে কেনাকাটা করার। জুবায়ের আপত্তি করলো না মোটেই।
ঠিক সেদিনই বিপার খোঁজ মিললো। মেসেজ না; উত্তরটা দিলো ফোনকলে। জুবায়েরকে সোজা প্রশ্ন করে বসলো,
--- তোমার সাথে আমার জরুরি কথা আছে, জুবায়ের। তুমি কি আজকে আমার বাসায় আসতে পারবে?
জুবায়েরের গলা কাঁপতে লাগলো উত্তর করতে গিয়ে। মনে হলো, এমন কঠিন সমস্যায় ও জীবনেও পড়েনি!
_________
বাইরে বেশ রোদ উঠেছে। প্রচন্ড গরমের পর কদিন অসময়ের বৃষ্টি; দিনভর মেঘলা আকাশ থেকে আবারও গরমটা পড়তে শুরু করেছে। জুবায়ের হাতঘড়িতে সময় দেখলো। বিকেল চারটা বাজছে। বিপা কল করেছিল একঘণ্টা আগে। ও-কি বেশি তাড়াহুড়ো করে চলে এসেছে? বিপা বলেছে ‘আজ’; ‘এক্ষুণি’ তো বলেনি!
কলবেল বাজাতেই দরজা খুলে দিলো বিপা। ওর পরনের শাড়িটা সুন্দর কিন্তু শত ভাঁজ পড়ে অবস্থা করুন। জায়গায় জায়গায় কুঁচকে আছে। চুলগুলো ভয়ংকর এলোমেলো। মনে হচ্ছে রাজ্য জুড়ে কাজ করে এসে বিধ্বস্ত হয়ে বসে আছে। জুবায়ের একটু রয়ে - সয়েই ঢুকলো ভেতরে। তার বুকের হৃৎযন্ত্রটা রীতিমত লাফাচ্ছে!
--- আজ বাসা পরিষ্কার করেছি, বুঝলে! প্রচুর ময়লা গায়ে; একটু সময় দাও। আমি গোসল করে আসি?
জুবায়ের মাথা নাড়লো। বিধ্বস্ত বিপা ওকে বসিয়ে রেখে চলে গেল গোসলে। জুবায়ের হাঁফ ছাড়লো। বসে বসে ঠিক করতে লাগলো কি কি বলবে। কারণ ওর মনে হচ্ছে, মস্তিষ্কটা একেবারেই কাজ করছে না। এক্ষুনি কথা বলতে গেলে সব গুবলেট করে ফেলবে!
বিপা ফিরলো আধা ঘণ্টা পর; আলমারির পাট ভাঙা সুন্দর শাড়ি পরে। বডি লোশনের মিষ্টি সুবাসে ঘরটা ভরে উঠলো। জুবায়ের আড়চোখে তাকিয়ে ঢোক গিললো। একটু আগের বিধ্বস্ত মেয়েটাকে কি স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে! বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিনগুলোর মত আবারও প্রেমে পড়ে গেল জুবায়ের!
--- চা খাবে?
জুবায়েরের সংবিৎ ফিরলো; অপ্রস্তুত হয়ে বললো,
--- হ্যাঁ। দাও।
--- বসো, আনছি। চা করাই আছে। ফ্লাক্সে রেখেছিলাম।
মিনিট দুয়েক পর চা এসে গেল। কাপে চুমুক বসিয়ে বিপা একদম ভনিতাহীন সহজ ভাষায় বললো,
--- দেখো, জুবায়ের। মানুষের জীবন খুব অদ্ভুৎ। আমরা যাকে চাই; তাকে পাইনা। আবার পেয়ে গেলে মনে হয়, একে হয়তো চাইনি; এরচেয়ে বেটার ডিজার্ভ করি। চাওয়া - পাওয়ার হিসেব মেলাতে মেলাতে আমার জীবনেরও অনেকটা সময় নষ্ট হয়েছে। আমি ভেবেছিলাম, এখানেই সমাপ্তি টানবো। সাজিদকে মেরে নিজেও ম রে যাব...
এ - পর্যায়ে কথা বলে উঠলো জুবায়ের,
--- কি পাগলের প্রলাপ বকছ, বিপা! তুমি সুইসাইড করবে? কি ভয়ংকর চিন্তা!
মলিন হাসির রেখা দিলো ওর ঠোঁটের কোণে,
--- সেদিন তুমি মেসেজটা না করলে; এতক্ষণে কাজটা হয়েই যেতো। কাল সাজিদ তাড়াতাড়ি ফিরেছিল; মুডও ভালো ছিল ওর; হেসে হেসেই মরে যেতে পারতাম। কিন্তু—-তোমার মেসেজটা আমাকে অনেক ভাবিয়েছে, জানো। আমি আসলে জানতাম তোমার মনের কথা। বিদেশ যাওয়ার আগেই। তখন কিছু বলিনি কারণ আমি চাইনি কোন ঝামেলা করতে; তোমাকে কোনভাবে এমবারেসিং সিচুয়েশন ফেলতে।
মুখ তুললো বিপা; জুবায়ের তাকিয়ে আছে ওরই দিকে। চোখাচোখি হতেই চোখ সরিয়ে নিলো,
--- আমিও চাইনি। তোমরা খুব হ্যাপি কাপল ছিলে. .
--- হুম। ছিলাম; ইনফ্যাক্ট এখনো সবাই তাই ভাবে। কিন্তু ভেতরের খবর তো অন্য. .
একটা দীর্ঘশ্বাস পড়লো। সেই সঙ্গে নিঃস্তব্ধটা গ্রাস করলো দু’জনকে। নিঃশব্দে চা শেষ করার পর বিপাই মুখ খুললো,
--- সাজিদ আমার সঙ্গে যা করলো; তারপর দ্বিতীয়বার কাউকে বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হবে। আদৌ বিশ্বাস জন্মাবে কি-না, ভালবাসতে পারব কি-না কে জানে। কিন্তু ভালোবাসা ছাড়াও সংসার করা যায়। আমি হয়ত চেষ্টা করতে পারি; কিন্তু তোমার কি অতটুকু ধৈর্যে কুলোবে?
--- মানুষটা অন্যকারো জেনেও এতবছর যদি ভালোবাসতে পারি; তবে সে আমার হবে এই ভরসায় এক জীবনও পার করতে পারব নিশ্চয়ই!
বিপার হৃদয় সন্তুষ্ট হলো; মনে হলো দীর্ঘ দহনের পর একটুখানি শীতালু হাওয়া ছুঁয়ে দিলো ওকে। আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললো,
--- আমি তোমাকে বিয়ে করব, জুবায়ের। কিন্তু তার আগে আমি সাজিদকে ওর প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দিতে চাই। এটা আমার পক্ষে একা সম্ভব নয়। তোমার সাহায্য লাগবে। তুমি কি সাহায্য করবে আমায়?
--- আমি রাজি।
জুবায়ের তাকালো ওর চোখের দিকে। বিপা হাসলো অদ্ভুতভাবে। চোখেও ফুটে উঠল হাসির ছাপ। জুবায়ের মন্ত্রমুগ্ধের ন্যায় তাকিয়ে রইলো!
__________
[কয়েকদিন পর]
জুবায়ের নিয়মিত যাতায়াত করছে বিপার বাসায়। ইতোমধ্যে সাজিদেরও পেছনে একজন লোক লাগিয়ে দিয়েছে জুবায়ের। ও কখন কোথায় যাচ্ছে, কি করছে—-সবকিছুরই আপডেট থাকছে বিপার কাছে। তবে কিছুদিন পেরিয়ে গেলেও ওকে কোনো মেয়ের সঙ্গে সরাসরি দেখা যায়নি। সম্ভবত সাজিদ আঁচ করছে কিছু একটা। এই নিয়েই কথা হচ্ছিল আজ। জুবায়ের বললো,
--- সাজিদ ভাই বেশ সচেতন হয়ে গেছে, বিপা। গত চার-পাঁচদিনে কোনো মেয়ের সঙ্গে দেখা করেনি। অফিসেই থেকেছে অতরাত অবধি!
বিপা পাস্তা বানাচ্ছে কিচেনে। জুবায়ের কিচেনে ঢুকতেই ওর হাতে একবাটি ধরিয়ে দিয়ে বললো,
--- তুমি যদি কারো নাকের ডগায় বসে তাকে ধোঁকা দিতে চাও; তাহলে তোমাকে এইটুকু সাবধান হতেই হবে!
--- হুম। কিন্তু চিন্তা নেই। খুব শীঘ্রই ওনার পর্দা ফাঁস করবো আমরা। সামনে সপ্তাহে উনি অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে তিনদিনের; সম্ভবত সিলেট যাবে। রিসোর্টের রুম বুকিং দিয়েছে; ট্রেনের কামরা ভাড়া করেছে। পাক্কা হানিমুন প্ল্যান—-খবর পেলাম।
বিপা থমকালো। অন্য সময় হলে হয়তো এই এক কথাতেই ওর মনটা খারাপ হয়ে যেতো; আজ খুব দ্রুতই নিজেকে সামলে নিলো। বাঁকা হেসে জানালো,
--- তাহলে আমাদের জন্যও টিকেট বুক করো। ওর হানিমুন প্ল্যানে আমরাও শামিল হলাম নাহয়?
জুবায়ের চোখে চোখে ইশারা করলো কিছু একটা। দু’জনেই হেসে উঠলো।
_____
জুবায়ের চলে যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই সাজিদ ফিরলো। একেবারে আচমকা! বিপা কিছু বলবে সে সুযোগটুকু না দিয়েই খপ করে ওর চুলের মুঠি ধরলো; হ্যাঁচকা টান দিয়ে আরেক হাতে মাথাটা চেপে ধরলো দেয়ালে। পরপর কয়েকটা বাড়ি দিতেই মাথা ফেটে গেল; কপালের দু’পাশ থেকে র;ক্ত বেরোতে লাগলো ঝরঝর করে। বিপা আর্তনাদের মতো স্বর তুললো। ওর হাত ছাড়াতে ধস্তাধস্তি শুরু করে দিলো। সাজিদ যেন আরও ক্ষেপে উঠলো তাতে। চুল ছেড়ে ঘুরিয়ে নিলো ওকে; একহাতে গলা চেপে ধরে হিসহিসিয়ে উঠলো,
--- হারামজাদি! আমারই খেয়ে-পরে, আমারই পেছনে ছু;রি বসানো? আমার বাসায় তুই তোর লাং নিয়া আসোস? এতোবড় কলিজা তোর? আজ তোর একদিন কি আমার…