উদাস পূরবী হাওয়া

পর্ব - ৮

🟢

পৃথা আবারও জিজ্ঞেস করলো,

--- সত্যিই আর ভালোবাসিস না? সব তোর ইনফ্যাচুয়েশন ছিল? নাকি ওর বিয়ে হয়ে গেছে; কুমারিত্ব নেই বলে এখন. . .

--- আজেবাজে কথা বলিস না, পৃথা। ভালোবাসা কখনো এসব দেখে না।

--- তাহলে এখনো ভালোবাসিস?

জুবায়ের কিছু বলতে পারলো না। অনুভব করলো, বুকের ভেতরটায় কিছু একটা হচ্ছে। না বলা ভালোবাসারা হয়তো গুমড়ে গুমড়ে মরছে! অস্পষ্ট স্বরে বললো,

--- জানিনা। তুই আমাকে এসব কেন বলছিস, বলত? জানিস না আমার আমার সামনের সপ্তাহে এঙ্গেজমেন্ট?

--- বিপার জীবনের চেয়ে তোর কাছে তোর এঙ্গেজমেন্ট বড় হয়ে গেছে? ছিঃ, জুবায়ের! আমি তোর কাছে এটা আশা করিনি।

গত কয়েক বছর নিজের উপর দিয়ে কি গেছে সেটা যে শুধু জুবায়ের জানে। মানুষটা অন্য কারো জেনেও, তাকে মনে রেখে-তাকে অনুভব করে প্রতি মুহূর্ত কাটানো -- এটা যে নিজের সঙ্গে কতবড় জুলুম সেটা যে ভালোবাসে সেই জানে। কতো সময় নিয়ে ও মনকে বুঝিয়েছে। বাড়িতে বিয়ের জন্য শত চাপের মুখেও টলেনি। নিজেকে সময় দিয়েছে। অতঃপর, যখন মনে হলো সত্যিই মুভ অন করে ফেলেছে তখন রাজি হলো বিয়েতে। এই মুহূর্তে এসে পৃথার কথা ওর সবকিছু এলোমেলো করে দিচ্ছে!

মনকে সামলে অনুভূতিশূন্য কণ্ঠে বললো,

--- মানুষ অনেককিছুই আশা করেনা, পৃথা। তবুও হয়ে যায়। জীবনের নিয়ম এটাই। ভালো থাকিস। দাওয়াত করলে বিয়েতে আসিস।

জুবায়ের কল কাটতে উদ্যত হলো; শেষ মুহূর্তে শুনলো লাইনের ওপাশে চেঁচাচ্ছে পৃথা,

--- তোর বিয়ে তুই খা! খবরদার যদি ডেকেছিস আমাকে!

জুবায়ের ম্লান হেসে ফোন রেখে দিলো। মনে মনে বলল, ‘কি যাতনা বিষে, বুঝবে সে কীসে?’

_________

বিপার দিন কাটছে আগের মতোই। তবে ওর ভাবনায় পরিবর্তন আসেনি। এবারের ভাবনায় ও অটল। দুদিন আগেও জেসমিন কল করে ওকে বলেছেন, সাজিদের সাথে কথা বলতে। শুরুতে উনিও অন্যান্য বাঙালি নারীর মতো বলেছিলেন মানিয়ে নিতে। পুরুষ মানুষের ওরকম কয়েকটা দোষ থাকেই; সেসব ধরে বসে থাকলে হবে না। জামাইকে কাবু করে রাখতে হবে। ও যা চায়, যা ভালবাসে --- সেসব করতে হবে। ঘরে মন ফিরলে বাইরের কথা ভুলে যাবে নিশ্চয়ই! এরকম অনেক সংসারে দেখেছেন উনি। ভুল করে এক - দুবার পা পিছলায় অনেকেরই; কিন্তু চেষ্টা করলে সব আবার ঠিক হয়ে যায়। বিপা মেয়ে, ঘরের বউ, তাই স্বামীকে ফেরানোর দায় ওর ঘাড়েই বর্তায়!

সারাজীবন বিপা মায়ের সব কথা শুনেছে। কিন্তু এই প্রথম ওর জেসমিনের কথা মানতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে বিদ্রোহী হতে। তাইতো গতকাল বাজারে গিয়ে এক বোতল বি/ষ কিনে এনেছে। আজ রাতের খাবারে মিশিয়ে দেবে। সাজিদ ফিরলে দু’জনে একসঙ্গে খাবে; একসঙ্গে ঘুমোবে। চিরদিনের জন্য!

খাবার রান্না হয়ে গেছে। বি/ষটা এখনো মিশায় নি। সাজিদ কখন ফিরবে কে জানে! ততক্ষন গরম তরকারিতে থাকলে কার্যকারিতা যদি নষ্ট হয়ে যায় বি/ষের? জেসমিনকে ফোন করলো বিপা। শেষবারের মতো মায়ের সঙ্গে কথা বলে নেয়া যাক?

কথাবার্তা খুব স্বাভাবিক ছিল। কুশল বিনিময় শেষে জেসমিন নরম হয়ে বললেন,

--- জামাইয়ের সাথে কথা হয়েছে, মা? বলে দেখ না। আমার মন বলছে, সব ঠিক হয়ে যাবে।

বিপা কিছু বলবে তার আগেই আবার বললেন,

--- জামাইয়ের বাসায় মন টেকে না রে। একটা বাচ্চা নাই; শূণ্য ঘরে মন বসে? তোরা আবার বাচ্চা নে, মা। নিজের সংসারটা বাঁচা। এমনে তো চলতে পারেনা!

--- তুমি চিন্তা করোনা, আম্মা। আমি দেখি কি করা যায়। তুমি ভালো থাকো। রিপাদের আমার আদর দিও।

বিপা কল কেটে দিলো। চোখ মুছতে মুছতে সাজিদের আসার অপেক্ষায় বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো। পায়চারি করতে করতে একবার ভাবলো নিপাকে কল করবে। রিং হলো; রিসিভ হলো না। বিপার উদাস লাগতে শুরু করলো। কারো কাছেই কি ঠিকঠাক বিদায় নেয়া হবে না?

ওর হঠাৎ পুরোনো দিনের কথা মনে পড়তে লাগলো। নিজের ছোটবেলা; কৈশোর; যৌবন --- মৃত্যুর আগে নাকি মানুষ তার পুরো জীবনটা একবার দেখতে পায়? বাবা - মা, বোন, দাদা - দাদি, আত্মীয় - স্বজন এমনকি বন্ধুবান্ধবদেরও মনে পড়তে লাগলো। কয়েকদিন আগে পৃথার সাথে কি কথা হয়েছিল মনে পড়তেই হঠাৎ হেসে ফেললো। পৃথা ওর মন খারাপ দেখে হাসানোর জন্য বলেছিল,

--- এতো মন খারাপ করিস না তো, বিপা। আমার কাছে সলিড সল্যুশন আছে। যেই দণ্ডের এতো ঘামান্ড ওই মারদ জাতির; ওই দণ্ডটারেই উড়ায় দে! ভাতের সাথে ঘুমের ঔষুধ খাওয়াবি; মরার মত ঘুমাবে। তারপর চা ক্কু নিয়া ঘ্যাচাংফু। না থাকব বাঁশ, না বাজবো বাঁশি! বুঝলা মনু?

দুঃখের মধ্যেও হেসে ফেলেছিল বিপা। সে - কথা হঠাৎ মনে হতেই চোখ ঝাপসা হয়ে এলো ওর। পৃথা, পৃথারে! তোর সাথে আর কখনো আড্ডা দেয়া হবেনা!

উদাস পূরবী হাওয়া বাংলা গল্প ইমেজ ৮

রাত ন’টা বাজছে। বাইরে থেকে মাত্র ফিরেছে জুবায়ের। কাল তার এঙ্গেজমেন্ট। সেজন্যে একটু কেনাকাটা করতে গিয়েছিল। বাসায় ঢুকতেই ফোনে একটা মেসেজ এলো। পৃথার নম্বর থেকে টেক্সট এসেছে; বাংলায় লেখা,

--- তুই এতদিন কেন বিয়ে করিস নি; আমি জানি জুবায়ের। তুই বিপাকে এখনো ভালোবাসিস। কাল তোর জীবনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। কিন্তু সেই দিনটাকে হেলায় নষ্ট করিস না। শেষবারের মতো ভেবে দেখ। একবার বিপাকে জানা মনের কথা?

জুবায়ের খুব বিরক্ত ভঙ্গিতে মেসেজটা ডিলেট করে দিলো। পৃথার মাথা খারাপ। কাল আংটি পড়াতে যাবে একটা মেয়েকে; আজ আবার আরেকটা মেয়েকে বলবে ভালোবাসার কথা?

জুবায়ের নিজের মতো পরিবারের সাথে সময় কাটাতে লাগলো। কালকের দিন কি কি করবে, এই নিয়ে পরিবারের সদস্যদের বেশ পরিকল্পনা। অনেকক্ষন আড্ডা হলো।

__________

বারোটা পর্যন্ত বিপা বসে রইলো বারান্দায়। মশার কামড় খেলো। শেষমেশ সাজিদকে ফোন করার পর জানা গেল, আজ ফিরবে না সে। খবরটা শুনেও রাগ হলো না বিপার। বরং অদ্ভুৎ শূন্যতার হাহাকার ঘিরে ধরলো ওকে। রাতে শু’তে যাওয়ার আগে ওর ফোনেও একটা মেসেজ এলো,

--- আমি তোমাকে ভালোবাসি, বিপা। হয়ত কখনো বলতাম না। কিন্তু তোমার অবস্থা দেখে বলতে বাধ্য হচ্ছি। ভার্সিটি লাইফের শুরু থেকেই তোমাকে আমার ভাললাগত। বলবো বলবো করে বলা হয়নি। তারপর তো, তুমি সাজিদ ভাইকে ভালোবাসলে। আমি চলে গেলাম বিদেশে। সব ভুলেই গিয়েছিলাম; কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হলো তোমাকে সব জানানো দরকার।

আমার এই কথায় হয়তো তোমার কিছুই যাবে - আসবে না। তবুও জানালাম। হয়ত না জানালে ভবিষ্যতে কোনদিন গিয়ে আফসোস করবো। আফসোসের জায়গা রাখতে চাইনা।

তোমাকে আমি ভালোবেসেছি, ভালোবাসি। তুমি কুমারী নও; তোমার একবার বিয়ে হয়েছে; এগুলো আমার যায় আসেনা। আমি এখনো তোমাকে ততটা চাই; যতোটা আগে চাইতাম। তুমি সাজিদ ভাইকে নিয়ে অনেক ডিস্টার্বড আমি জানি। এ-সময়ে কথাগুলো বলাও অনুচিত। কিন্তু আমি বলব, তুমি সমস্ত আজেবাজে চিন্তা বাদ দিয়ে সাজিদ ভাইয়ের সাথে কথা বলো। ডিভোর্স দিয়ে দাও; আমরা বিয়ে করবো। তোমাকে নিয়ে চলে যাব জার্মানি। দেখবে, বার্লিন শহর তোমার দুঃখ ভুলিয়ে দেবে। আমরা সবকিছুর ‘নতুন শুরু’ করব!

Story Cover