উদাস পূরবী হাওয়া

পর্ব - ৭

🟢

বেলা এগারোটা।

বিপার ফ্ল্যাটে এসে উপস্থিত হয়েছে পৃথা। ভোরবেলা বান্ধবীর ফোনকলের পর নিজেকে আর স্থির রাখতে পারে নি পৃথা; রাস্তায় যান চলাচল শুরু হতেই চট করে বেরিয়ে পড়েছে। ফলস্বরূপ এখন বাসার ড্রয়িংরুমে ওর অবস্থান। পথেই ঘুমিয়ে গেছে বাবু; ওকে সোফাতেই আরেকপাশে শুইয়ে দিলো পৃথা। বিপা স্থির হয়ে বসে আছে অন্যপাশের সিঙ্গেল সোফাটায়। কথা যা বলার সে বলে ফেলেছে; কান্নাকাটি যা করবার করে ফেলেছে; এখন কিছু বলবার বা করার নেই আর!

বাবুকে রেখে পৃথা ঘুরে ওর কাছে বসলো। মূর্তির মত নিশ্চল বিপার একহাত ধরে বললো,

--- এতো ভেঙে পড়ছিস কেন, বিপা? এখনি হার মানলে চলবে? আমি তো এসে গেছি। সব আমার উপর ছেড়ে দে!

--- আমি সাজিদকে ওর উপযুক্ত শাস্তি দিতে চাই, পৃথা। তুই আমাকে বলে দে আমি কি করবো!

আচমকা কথা বলে উঠলো বিপা; আশ্চর্য শীতল ওর কণ্ঠস্বর। পৃথা চমকে উঠলো,

--- কি শাস্তি দিবি তুই?

--- যা সে ডিজার্ভ করে!

চোখাচোখি হলো দু’জনের। ওর চোখে প্রতিশোধের আগুন স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। পৃথা ঢোক গিললো। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ‘ডেয়ারিং’ মেয়ে বলে ওর বদনাম ছিল। সবসময় একটা বিদ্রোহীভাব পোষণ করতো। এখন সময়ের সাথে সাথে সেসব হারিয়ে গেছে। ছা-পোষা মনোভাব নিয়ে কি এখন বিদ্রোহ হয়!

--- তুই কি সাজিদ ভাইকে খুন করবি?

--- যদি বলি ‘হ্যাঁ’; তুই কি তাহলে আমাকে সাপোর্ট করবি? সাহায্য করবি বন্ধু হিসেবে?

--- আর ইয়্যু সিরিয়াস?

পৃথা তড়াক করে উঠে দাড়ালো; বিপার মুখভঙ্গি অদ্ভুত কাঠিন্য ভরা। কথা বলছে অথছ গালের একটা পেশিও নড়ছে না। সেভাবেই দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করলো,

--- কসম খোদার!

উদাস পূরবী হাওয়া বাংলা গল্প ইমেজ ৭

দেখতে দেখতে দুপুর পেরিয়ে বেলা গড়িয়ে গেল। পৃথা এখনো যায়নি; দুপুরের খাবারটাও অনলাইন থেকে অর্ডার করে এনেছে বান্ধবীর জন্য। বিপার মুখের দিকে তাকাতে পারছিনা সে। বড্ড ভয় লাগছে। বিপার এতোটা পরিবর্তন হয়েছে? ভালোবাসা মানুষকে এতটা পাল্টে দিতে পারে? যে বিশ্বাস ভেঙে গেলে মানুষ অনুভূতিশূণ্য মূর্তিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়!

এরমধ্যে বাবু উঠেছিল। ওকে খাইয়ে দেবার সময় বিপা একবার কথা বলেছিল; কেমন মলিন স্বর ছিল কণ্ঠে!

--- আমরা বেবি প্ল্যানিং করেছিলাম, জানিস দোস্ত? সাজিস অনেক খুশি ছিল। কিন্তু পাঁচ মাসের মাথায় আমার মিসকারেজ হয়ে গেল। তারপর থেকে সাজিদ কেমন পাল্টাতে লাগলো; আমার কাছে আসেনা; ভালোবাসে না; কেমন করে কথা বলে; কেমন যেন সব এলোমেলো…

পৃথা আবার প্রশ্ন ছুঁড়েছিল,

--- তুই ঝোঁকের মাথায় কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছিস না তো? দেখ, বলাটা সহজ করাটা না। আর করলেও বা কি! মরে গেলেই তো সব শেষ, তাইনা? ওকে তুই অন্যভাবেও সাজা দিতে…

এ - পর্যায়ে চোখে চোখ পড়ে যায়; বিপার হিম শীতল দৃষ্টির সামনে বাকি কথাটুকু গিলে ফেলতে বাধ্য হয় পৃথা। তারপর থেকে বিপা আবারও চুপ করে আছে। অবস্থা বেগতিক দেখে পৃথা বাধ্য হয়েই থেকে গেছে। কে জানে, একা ফ্ল্যাটে ফেলে গেলে কি কাণ্ড বাঁধিয়ে বসে ও!

একটুপর জুবায়ের এলো; পৃথা কল করে সবকিছু জানিয়েই ডেকেছিল। দরজা খুলেই পৃথা বললো,

--- তুই এসে বাঁচালি রে! বিপার মাথা গেছে; কিসব বলছে শোন।

জুবায়ের ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই বিপা উঠে দাড়ালো সোফা থেকে; খুব স্বাভাবিক গলায় জানতে চাইলো,

--- তুমি সেদিন মেয়েটার মুখ দেখেছিলে, জুবায়ের?

কোনো ভালোমন্দ জিজ্ঞেস করা নেই; বসতে বলা নেই; এরকম সোজা আসল কথায় আসতে দেখে জুবায়েরও ভড়কালো। পৃথাই কথাই তো সত্য তাহলে। বিপার মাথা কি নষ্ট হয়ে গেছে!

বললো,

--- সেভাবে দেখা হয়নি; দেখলে তো তুমি ভেবে কনফিউজড হতাম না। কিন্তু অনেকটা তোমার মতোই লাগছিল।

--- তুমি ওর খোঁজ বের করে দিতে পারবে? তোমার অনেক সোর্স আছে আমি জানি। আমার জন্য এটুকু করবে?

--- তুই হঠাৎ ওই মেয়েকে নিয়ে পড়লি কেন?

পাশ থেকে জিজ্ঞেস করে উঠলো পৃথা। পরপরই উঠে এসে বিপার দু’হাত ধরলো। নরম গলায় বললো,

--- বিপা দেখ, বোন আমার। তুই পাগলামি করিস না। আই নো, তোর একটা ক্রুশাল টাইম চলছে। কিন্তু সমস্যা নেই। আমরা তোর সাথে আছি। তুই টেনশন নিস না। আমরা সাজিদ ভাইয়ের সাথে কথা বলি?

--- বলে কোনো লাভ নেই। ও শোধরাবে না।

কঠিন সুর। জুবায়ের বললো,

--- কে জানে, শোধরাতেও তো পারে। তোমরা খোলাখুলি আলাপ করছ না কেন? অনেক সময় সামনাসামনি কথা বললেও মানুষের মনের পরিবর্তন…

--- তুমি এইকথা বলছ আমাকে! তুমি নিজে কখনো সামনাসামনি কিছু বলতে পেরেছিলে, জুবায়ের? তোমার মনের কথা জানাতে পেরেছিলে?

বিপা ঘুরে গিয়ে দাঁড়ালো ওর মুখোমুখি। ওরা দু’জনেই হতভম্ব! কীসের ইঙ্গিত দিলো বিপা? জুবায়ের মুখ নামিয়ে ফেললো। চোখে চোখ রাখার সাহস হলোনা। ওর বুকের হৃৎপিণ্ড নামক যন্ত্রটা জোরে জোরে স্পন্দিত হতে থাকলো। বিপা কি জানত ওর মনের কথা? সত্যিই!

বিপা ফিরে এলো পৃথার সম্মুখে,

--- কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয়না রে। যতোই তেল মালিশ কর; লাভ নেই। সাজিদ কখনো স্বীকারই করবেনা!

পৃথা তাকিয়ে রইলো চুপ করে; হঠাৎ স্বর পাল্টালো বিপা,

--- যদি কখনো স্বীকার করে তখনই বা কি হবে, বলতে পারিস? ভাঙা সম্পর্ক কি জোড়া লাগে? আমি কাল অবধি বহুবার ভেবেছি এসব। ও একবার মাফ চাইলেই আমি ক্ষমা করে দিতাম। বিশ্বাস কর! কিন্তু কাল হঠাৎ মনে হলো, বিশ্বাসঘাতককে ক্ষমা করে কি লাভ? সেই তো ঘুরে - ফিরে বিশ্বাস নিয়েই ছিনিমিনি খেলবে…

--- তুই অন্য কিছু কর। মামলা দে? এই ধর, নারী নির্যাতন মামলা? এটা এখন খুব ভালো চলছে রে। সরকার বেশ স্ট্রিক্ট। তুই মামলা দে, আমরা সবাই মিলে প্রমাণ দেব আদালতে, তারপর. . তারপর কেল্লাফতে! চৌদ্দ শিকের ভাত খেতে হবে, দেখিস!

--- তুমি চাইলে অনেকভাবেই শাস্তির ব্যবস্থা করা যায়, বিপা। শুধু তুমি চাইলেই…

জুবায়ের বললো পেছন থেকে। পৃথাও যেন সুযোগ পেল। কাঁধে হাত রেখে আশ্বস্ত করলো,

--- হ্যাঁ, অনেক উপায় আছে। কিন্তু তুই ভেবে দেখ! জানে মারাটা বেশি হয়ে যায়না? আর একটা মানুষকে মারলেই কি সব মিটে যায়? সবচেয়ে বড় কথা, এটা পাপ। মানুষ খুন কতবড় গুনাহ, তুই জানিস!

--- আর ওটা করছে? সেটা পাপ না? গুনাহ হয়না ব্যভিচার করলে? স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণা করলে?

--- তবুও। তুমি ভাব একবার। ছুঁচো মেরে হাত গন্ধ করবে কেন!

ওরা দুজনে ঘিরে ধরলো ওকে। ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে বিপা কি যে মনস্থির করলো; শুধু সেই জানে!

___________

[এক সপ্তাহ পর]

বিপার বাসা থেকে যাওয়ার পর পৃথা প্রথমে কিছুদিন বিভ্রান্ত ছিল। বিপার সেদিনের কথা - ভঙ্গি - চেহারা ও কিছুতেই ভুলতে পারছিল না। বান্ধবীর জন্য অসম্ভব কষ্ট হলেও ওর যে ভাবনা সেটা ওকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছিল। বিপার কথাবার্তা অসংলগ্ন ধরণের; মানুষ মেরে ফেলবে! কি ভয়ংকর চিন্তা! দ্বিধা-দ্বন্দ্বের জেরে কিছুদিন উপেক্ষা করে গেছে ওকে; নিজের সংসার - বাবুকে নিয়ে মগ্ন থেকেছে। কিন্তু আজ আবারও মাথায় চেপে ধরলো সব। শতহোক, প্রিয় বান্ধবী তো! আর সাজিদের সাথে দেখা করিয়ে দিয়েছিল পৃথাই; সে হিসেব করলে কিছুটা দায়িত্ব তো ওরও আছে!

পৃথা সরাসরি কল করলো জুবায়েরকে। কিছুক্ষণ ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করার পর জানতে পারলো, জুবায়েরের মা মেয়ে পছন্দ করেছেন। সামনের সপ্তাহে ওদের বাড়িতে যাবে জুবায়ের। আংটি পড়িয়ে বিয়ের দিনতারিখ ঠিক করবে। আপাতত এই নিয়ে ব্যস্ত সময় যাচ্ছে। শুনে মনের আশায় পানি পড়লো ওর। তবুও শেষ চেষ্টার জন্য বললো,

--- বিপার সঙ্গে তোর আর কথা হয়নি? ওই পাগল কি করছে কিছু জানিস?

--- আমি কি করে জানবো? তোর বান্ধবী তুই তো জানবি!

পৃথা আশাহত হলো। অনুযোগ করে বললো,

--- এভাবে বলছিস কেন, দোস্ত! ও বান্ধবী আর তোর কিছু না! তোর তো ফার্স্ট লাভ ছিল বিপা; এতো তাড়াতাড়ি ভুলে গেছিস?

জুবায়ের কিছুক্ষণ সময় নিলো। যে কথা ও ভুলে যেতে চায়, সে কথা কি করে বারবার ওর কাছেই ফিরে আসে --- বুঝতে পারেনা। গত কয়েকবছরে কম তো চেষ্টা করে নি ও। বললো,

--- সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা ব্যাপার, পৃথু। আমি বিপাকে কতদিন ধরে ভালোবেসেছি; ওকে ভুলবার জন্য কতকিছু করেছি তুই জানিস না। যখন তুই জেনে যাস তুই এমন একজনকে ভালোবাসছিস সে অলরেডি অন্যকারো, তখন কতো কষ্ট হয় জানিস? এতোদিন পর আমি সব ভুলে গিয়ে যখন নতুন করে জীবন শুরু করতে যাচ্ছি, তখন তুই এসে…

ওকে কথা শেষ করতে না দিয়েই পৃথা বলে উঠলো,

--- তুই সত্যিই মুভ অন করেছিস, জুবায়ের? সত্যিই বিপাকে ভালোবাসিস না? ওর ভালোমন্দে তোর কিচ্ছু যায় - আসেনা?

জুবায়ের থমকালো, চমকালো। ওর মনে হলো, পৃথার এই এক প্রশ্নে ওর ভেতরের সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে গুড়িয়ে গেল। ছোট্ট একটা প্রশ্ন, অথচ কি তাকদ! ওর দীর্ঘ একটা সময়ের চেষ্টা - অনুভূতির যুদ্ধ সব শেষ হয়ে গেল। জুবায়ের সত্যিই কি বিপাকে ভালোবাসে না আর?

Story Cover