কলটা কেটে দিয়ে বিপা কাঁদতে শুরু করলো হাউমাউ করে। ওর কান্নার শব্দে পাশের ঘর থেকে ছুটে এলেন জেসমিন আর ওর বোনেরা --- রিপা-দীপা। জেসমিন ব্যাকুল হয়ে মেয়েকে ডাকতে শুরু করলেন,
--- কি হইছে, আম্মা? কাঁদছ কেন? কি হইছে বলো...
দুই বোন কি করবে বুঝতে পারল না। কেবল ভীত চোখে নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলো। কান্নার দমকে বিপার মুখ থেকে কথা বেরোচ্ছে না; অস্পষ্ট স্বরে বললো,
--- আম্মা, তোমার জামাই… জামাই আমাকে…
--- জামাই কি হইছে? কোনো বিপদ হইছে! কি বলো, আম্মা ঠিক করে বলো। আল্লাহ্ তুমি আমারে কি বিপদ দিলা…
জেসমিন দিশেহারা! ‘আল্লাহ্ আল্লাহ্’ জপতে জপতে মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা করতে লাগলেন। বোনেরাও এবার এগিয়ে এসে ওর গায়ে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। একটু পর বিপা থেমে গেল; জেসমিনের কথায় ছোটবোন দীপা পানির গ্লাস এনে দিলো। একচুমুক পানি খেয়ে নিজেকে ধাতস্থ করে বিপা বললো,
--- তোমার জামাই হোটেলে আরেকটা মেয়ে নিয়ে গেছে, আম্মা। সাজিদ আমাকে ধোঁকা দিচ্ছে!
--- কি!
হাত থেকে খসে পড়লো গ্লাসটা; তারপর আচমকা সব ঠান্ডা হয়ে গেল!
বাড়িতে যেন ভয়াবহ রাত পেরোলো একটা। রাত থেকে না খাওয়া বিপা; তার সাথে সাথে জেসমিনও। রিপা - দীপা অল্প করে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ভোরবেলার উজ্জ্বল আলোয় যেন গতরাতের বিভীষিকা কেটে গেল অনেকটাই। জেসমিন ভোরবেলা উঠেই আট-দশটা সকালের মত গার্হস্থ্য কর্মে মন দিলেন। নাশতা সেরে রিপা - দীপা স্কুলে চলে গেল। একজন ফোরে; আরেকজন সেভেনে পড়ে।
ওদের স্কুলের জন্য এগিয়ে দিয়ে এসে জেসমিন দেখলেন; বিপা ঘুম থেকে উঠেছে। রান্নাঘরে চুলার ধারে বসেই শুকনো রুটি খাচ্ছে। কেমন উদাস চেহারা! জেসমিন বড় অসহায় বোধ করলেন; এমন একটা পরিস্থিতিতে তিনি কি করতে পারেন, কি করা উচিৎ --- ভেবে পেলেন না। মেয়ের কাছে গিয়ে স্বাভাবিক ভাবে হেসে বললেন,
--- শুকনো রুটি খাচ্ছিস কেন? সবজি নে। ভাজার জন্য ডিম গুলিয়ে রেখেছি তো; ভেজে নিতি।
বিপা উত্তর না দিয়ে বসে রইলো; যেমন ছিল। জেসমিন ডিম ভেজে পাতে তুলে দিলেন। নিজেরও খাওয়া হয়নি। তাই বসলেন ওর পাশেই। কিছুক্ষণ পর ইতঃস্তত করে জিজ্ঞেস করলেন,
--- জামাইয়ের সাথে কথা হয়েছে?
বিপা ঘাড় নাড়লো। কথা হয়নি। সাজিদ কখনো ওকে নিজে থেকে ফোন করেনা; আগে অবশ্য ভিন্ন ছিল। তখন অফিসে থাকাকালীন দু’ ঘন্টা অন্তর অন্তর কল করে অতিষ্ঠ করে ফেলত বিপাকে।
--- ঝগড়া হইছে? ঝগড়া করে বাসায় আসছ?
--- না।
মুখ নিচু করে রইলো। জেসমিন আবারো জিজ্ঞেস করলেন,
--- জামাই তোমাকে মারধোর করে? ঝগড়া করে?
--- গায়ে হাত তোলেনি কখনো। কিন্তু কথা শোনায়।
--- সে তো তোমার বাবাও করত। সবকিছুতে ভুল ধরত। সাথে তোমার দাদিও যোগ ছিল। কিন্তু… আচ্ছা, ছাড়ো এগুলো। জামাই এরকম কাজ আগেও করছে? নাকি এটাই প্রথম?
প্রশ্নগুলো করতে গিয়ে ভীষণ কুণ্ঠাবোধ করছেন জেসমিন। কিন্তু না করেও যে উপায় নেই। লোকে বলে, মেয়েরা বড় হলে মায়ের বন্ধু হয়ে যায়। বিশেষ করে বড় মেয়েরা। খোলা বইয়ের মত সম্পর্ক থাকে। কিন্তু তার বড়মেয়ে বিপার সাথে জেসমিনের মানসিক দূরত্ব অনেক। মেয়ে যখন বড় হয়েছে তখন তিনি ছিলেন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত। ছোট ছোট বাচ্চা, স্বামী - শাশুড়ি সবাইকে নিয়ে ভরা সংসার। যৌথ পরিবারের গ্যাঁড়াকলে মেয়েটা কখন বড় হয়ে গেছে যেন টেরই পাননি!
বিপাও লজ্জিত খুব; মুখ নামিয়েই বললো,
--- নিজে চোখে তো দেখিনি। কিন্তু অনেকদিন ধরেই ওর অভ্যাস পাল্টে গেছে। মাঝে মাঝে গায়ে মেয়েদের পারফিউমের সেন্ট আসে; কলারে লিপস্টিকের দাগ…
--- জিজ্ঞেস করিসনি?
খাওয়া শেষ হয়েছে ওর। উঠে গিয়ে বেসিনে হাত ধুলো। কিছুটা সময় নিয়ে ফিরে এসে বললো,
--- শুরুতে করতাম। প্রচন্ড রাগ দেখাতো। তারপর আস্তে আস্তে ছেড়ে দিয়েছি।
জেসমিন দীর্ঘশ্বাস আড়াল করলেন,
--- এখন কি করবে? আমি কথা বলব জামাইয়ের সাথে? ফোন করে বাসায় ডাকো নাহয়।
--- আর কি হবে কথা বলে। সাজিদ কখনো স্বীকার করবে না, আম্মা! বরং রেগে আজেবাজে কথা বলবে।
--- তবুও। বলে দেখতে কি! আমি তোর মা; আমার সাথে নিশ্চয়ই বেয়াদবি করবে না।
প্রত্যুত্তরে বিপা কিছু বললো না। নখ খুঁটতে লাগলো। জেসমিন আমতা আমতা করে বললেন,
--- তোদের মধ্যে কি কিছুই নেই এখন?
--- কি থাকবে? যা ছিল সব ফুরিয়েছে…
--- কিছুই না?
জেসমিন অসম্ভব লজ্জা পাচ্ছেন; মেয়েকে এই ধরনের প্রশ্ন করতে তার ভেতরটায় যে কি বয়ে যাচ্ছে! বিপা তার দিকে তাকায় নি; অন্য দিকে মন ছিল বলেই প্রশ্নটা ঠিক বুঝলো না। ও অবাক হয়ে তাকালো,
--- কীসের কথা বলছো?
জেসমিন তাকালেন মেয়ের দিকে। কেমন একটা কণ্ঠে বললেন,
--- শেষবার কবে কাছাকাছি এসেছিলি তোরা?
বিপার ভারি লজ্জা লাগলো। কেউ এভাবে শুধায়? তাও তার আপন মা। কাচুমাচু করে বললো,
--- অনেকদিন আগে।
--- তাও কতদিন? হিসেব নেই তোর?
ধমকের বিপরীতে লজ্জায় ছোট হয়ে বিপার মন। কখনো কি ভেবেছিল, এ জাতীয় বিষয়ে মায়ের সঙ্গে কথা বলতে হবে? স্তিমিত গলায় জানালো,
--- মাস ছয়েক হবে।
উত্তর শুনে গম্ভীর হয়ে গেলেন জেসমিন। পায়চারি করতে লাগলেন ঘরজুড়ে। বিপা দু' হাতে মুখ ঢেকে ফেলে। মায়ের কাছে এই মিথ্যেটা বলতে তার বুক কাঁপছে। কিন্তু সত্যিটা কি করে বলবে? স্পষ্ট মনে আছে পরশুরাতের কথা। কতদিন পর কাছাকাছি আসা হয়েছিল দু’জনের। বৃষ্টিভেজা রাতের কতো আবেদন! অথচ চূড়ান্ত মুহূর্তে আচমকাই ওর ছিটকে সরে গিয়েছিল সাজিদ। মুখ বিকৃত করে বলেছিল,
‘সরি টু সে বিপা। তোমার মধ্যে আগের ভাইবটা আর নেই। বিরক্ত লাগছে!’
তারপর পরই উল্টো ঘুরে শুয়ে পড়েছিল। বাকিরাত বিপা ঘুমায়নি একফোঁটাও। সারারাত মুখে বালিশ চাপা দিয়ে কেঁদেছে। বাইরে বৃষ্টির তুমূল আওয়াজে মিশে গেছে ওর সমস্ত চাপা আর্তনাদ। ভালোবাসার শেষ পরিণতি এই? আগের ‘ভাইবটা আর নেই’? সে-কথা ভাবলেই যে বিপার মরে যেতে ইচ্ছে করে!
--- জামাই তোকে কিছু বলেছে? কখনো বলেছে কি করলে সে খুশি হয়। কি চায় তোর কাছে?
--- কি চাবে? না, কিছু নয়তো।
জেসমিন হিসহিসিয়ে উঠলেন এবার,
--- তুই বুঝছিস আমার কথা? কি বুঝাতে চাইছি আমি?
ইঙ্গিতটা বোধগম্য হতেই চমকে উঠলো বিপা। মা এমন ব্যক্তিগত প্রশ্ন করছে কেন! তথাপি সে উত্তর করলো,
--- আমি কখনো ওর অবাধ্য হইনি, আম্মা। ওর কথার বিপরীতে কোনদিন না বলিনি। তবুও কেন এমন করছে, আমি জানি না। আমি জানি না সত্যিই…
বলতে বলতেই কেঁদে ফেললো আবারও। আঁচলে মুখ চাপা দিয়ে ফোঁপাতে লাগলো। জেসমিন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন; মুখে কথা জোগাল না!
সেদিন বিকেলের বাসেই বিপা ফিরে এলো। সাজিদ জানেনা সে খবর। তাই সেরাতে ও ফিরলো না। সমস্ত রাত বিপা পায়চারি করে কাটালো। ভোরবেলার দিকে ফোন করলো পৃথাকে।
অত সকালে বিপার ফোন আশা করেনি পৃথা। বেচারি তখন বাবুকে নিয়ে ব্যস্ত; সবে ঘুম থেকে উঠে যন্ত্রণা শুরু করেছে। কল রিসিভ করে কুশল বিনিময়েরও সুযোগ হলো না; বিপা প্রশ্ন ছুঁড়ল,
--- কখনো যদি তুই জানতে পারিস, ভাইয়া তোর সাথে চিট করছে; তখন তুই কি করবি পৃথা?