সেদিন সারাবেলা বৃষ্টি হলো। কখনো গুড়িগুড়ি কখনো মুষলধারে। সাজিদের কি হলো কে জানে; সারাক্ষণ ঘুরঘুর করলো বিপার আশেপাশে। বিপা পাত্তা দিলো না। সত্যি বলতে ও বিভ্রান্ত হয়ে গিয়েছে। আচমকা সাজিদের এত প্রেম প্রেম ভাব ওর ঠিক হজম হচ্ছে না। কিন্তু সাজিদ হাল ছাড়ল না। আঠার মত লেগেই রইলো ওর সঙ্গে!
______
[সপ্তাহখানেক পর]
সাজিদের কাজকর্ম ঠিক বুঝতে পারছেনা বিপা। কদিন ধরে মনে হচ্ছে, সাজিদ যেন পাল্টে গেছে। বিয়ের পরপর যেমন সম্পর্ক ছিল দুজনের খুনসুটিময়; ঠিক তেমন। বিপার বড় ভালো লাগছে এই অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে এখন। সাজিদ যদি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ফিরে আসে; বিপার কাছে ক্ষমা চায়; বিপা ক্ষমা করবেনা কেন? নিশ্চয়ই করবে। মুখে যতোই বলুক, বিপা তো নিজেও জানে ওর মনের অবস্থাটা। বড্ড নাজুক সে। কখনো বিদ্রোহী হতে চায় বটে; কিন্তু দিনশেষে সেও আট - দশটা বাঙালি নারীরই মতো!
সন্ধ্যায় হঠাৎ পৃথা এলো বাসায়। সাথে ওর বাবুটা নিয়ে। অনেকদিন পর পুরোনো বান্ধবীদের দেখা হলে উৎফুল্লের সীমা থাকেনা। বিপা - পৃথারও বাঁধভাঙা আনন্দ হলো। কিছুক্ষণ খুব হৈ - চৈ করার পর দুজনে বসলো গল্প করতে। পৃথা জিজ্ঞেস করলো,
--- জুবায়ের এসেছিল তোর বাসায়? কথা হয়েছে? শালা অনেক হ্যান্ডসাম হয়ে গেছে নারে?
বিপা হাসলো,
--- বিদেশের হাওয়া লাগলে সবাই সুন্দর হয়।
--- যাহ! বললেই হলো নাকি? সৌন্দর্য না থাকলে এমনই এমনই কিছু হয়? জুবায়ের আগেও হ্যান্ডসাম ছিল; এখন তো আরোও. .
পৃথা প্রতিবাদ করলো যেন। বিপা দুষ্টুমি করে বললো,
--- উহুম, উহুম আপু। জামাই রেখে অন্যের দিকে নজর দেয়া তো ভালো নয়!
--- ধ্যাত। কি যে বলিস না!
লাজুক হাসলো; তারপর হঠাৎ কি মনে হতেই সোজা হয়ে বসলো। একটু উদ্বেল হয়ে বললো,
--- জুবায়ের এখনো বিয়ে করেনি, জানিস?
বিপা জানে সেটা। সেদিন কথায় কথায় বলে ফেলেছিল জুবায়ের। কারণটা যদিও জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি বিপা; কেননা ভয় লেগেছিল। যদি সত্যিটা ওর সহ্য না হয়! অবশ্য জুবায়ের ওকে সেই বিপদে ফেলেনি; নিজেই বলেছে হেতু।
এতক্ষনের হাস্যোজ্বল মুখটা একটু মলিন হলো ওর,
--- হ্যাঁ, শুনলাম। আন্টি বলেছিল কোনো বিদেশিনীর ফাঁদে পা দেয়া যাবেনা। দেশে এসেছে এবার বিয়ে করতেই!
--- হুম। আর কতো একা একা জীবন? এবার সেটেল্ড হওয়া দরকার। আর কতো একজনের ভাবনায়…
--- আরও দু’ কাপ চা আনছি।
কথার মাঝখানেই বিপা উঠে গেল চা আনার জন্য। পৃথা বুঝলো ওর এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা; দীর্ঘশ্বাস ফেললো। এ-ছাড়া কিই বা করার আছে?
পৃথা চলে গেল ন’টার দিকে। রাতের খাবারের প্লানিং ছিলনা ওদের; বিপা ছাড়লো না কিছুতেই। ওদের বাসার গেইট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে বিপা। তখন পরিবেশটা বেশ ঠাণ্ডা; শীতালু বাতাস বইছে। দু’ - একবার বিজলিও চমকাতে দেখলো। কে জানে ঝড় হবে নাকি!
পৃথার যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিস থেকে ফিরল সাজিদ। বিপা অবাক হলো না তেমন। কদিন ধরে সাজিদ সময়মত বাড়ি ফিরছে। ফেরার পথে ওর জন্য কিছু উপহারও আনছে। আজ এনেছে কিটক্যাটের প্যাকেট। বিপা প্যাকেটটার দিকে অনেকক্ষন তাকিয়ে দেখলো। ঠিক বুঝলো না নিজের অনুভূতি; না সাজিদেরটা!
সেরাতে বেশ ঝড় হলো। তুমুল বৃষ্টির সাথে মেঘের গম্ভীর গর্জন। বহু বহু দিনপর সুযোগ পেয়ে সাজিদও কাছে টানলো বিপাকে। বৃষ্টিভেজা একটা রাতের আহ্বানে বিপা ভুলে গেলো সবকিছু। নিজের রাগ - ক্ষোভ - দুঃখ - হতাশা - প্রতিবাদ —- সব ভুলে উন্মাদনায় ভাসলো; আত্মসমর্পণ করলো স্বেচ্ছায়!
একটি উজ্জ্বল ভোর।
জানালার ফাঁক গলে রোদ এসে পড়লো বিছানায়; বিপার অবিন্যস্ত শরীরে। ঘুম ভেঙে সর্বপ্রথম নিজের পাশবালিশে হাত রাখলো মেয়েটা। ফাঁকা জায়গা; ফাঁকা সব। এদিক - ওদিক তাকিয়ে অস্থির চিত্তে উঠে বসলো বিছানায়। দু’হাতে মাথা চেপে ধরে আচানক কান্নায় ভেঙে পড়লো। এসব কি তামাশা হচ্ছে ওর জীবনে? কেন সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে বারবার?
সাজিদ অফিসে চলে গিয়েছে অনেকক্ষণ আগে। বিপা ধীরে ধীরে বিছানা ছাড়লো; নাশতা বানালো। এরপর তৈরি হয়ে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে। না, চিরদিনের জন্য নয়! আপাতত ক’দিনের স্বস্তির জন্য; নিজেকে একটু বোঝার জন্য ওর একা থাকা চাই।
বিপাকে দেখে ওর মা জেসমিন ভীষণ খুশি হলেন। বড় মেয়ে বাড়ি এসেছে —-আনন্দ তো হবেই। মেয়ের সব পছন্দের খাবার রাঁধতে বসে গেলেন।
বাড়িতে এখন নিপা ছাড়া ওর বাকি দুই বোন আছে। অবশ্য ওদের পাশের বাড়িতেই ওর চাচার পরিবার থাকে। ওর দাদার বাড়ি - ভিটে ছিল এসব। তিনি মরে যাওয়ার পর বাপ-চাচারা ভাগ করে নিয়েছে যে যার মতো। ওর দাদি অবশ্য আছে বেঁচে; ছেলেদের বাড়িতে পালা করে থাকেন। দাদি চাচার বাড়িতে শুনে বিপা সেখানে গেলো দেখা করতে।
বাছিরুন বেগম পুরোনো আমলের মানুষ। বুড়ো বয়সে ছেলেদের বাড়িতে থাকছেন বটে; কিন্তু তবুও বেশ একাকীত্বে ভোগেন। বাড়ির সদস্যরা তেমন একটা গা করে না তার উপস্থিতি - অনুপস্থিতি বিষয়ে। সেখানে নাতনিকে দেখে খুব আমোদ পেলেন। নাতজামাই আসেনি শুনে বেশ ঠাট্টাও হলো,
--- কি রে ছেড়ি! ভাতার রাইখা বাড়ি আইসা পড়লি; এইটা কেমন কথা?
--- সে তো ব্যস্ত দাদি। আমি এলাম তোমাদের সাথে দেখা করতে।
বিপা হেসে বললো। বাছিরুন তার লিকলিকে শীর্ণ হাত বাড়িয়ে নাতনির হাত টেনে ধরলেন; নরম কণ্ঠে বললেন,
--- এতোদিন পর দেখা করতে আসলি, বু? কতদিন তোরে দেখিনা। কতবড় হইয়া গেছস, দেখি! বোইস; আমার পাশে।
বিপা বসতেই হঠাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে ফেললেন,
--- মোটা হইছস তো রে। পোয়াতি নাকি? সংসারে টোনা-টুনি আসবো?
বিপা মুখ নামিয়ে নিলো; অদ্ভুত লজ্জা সাথে খানিকটা হতাশাও ঘিরে ধরলো ওকে। বাছিরুন বেগম হাসলেন। গাল টিপে বললেন,
--- কেউ আসবো? কথা কস না ক্যা ছেড়ি!
--- না, দাদি। এখনো না। দুয়া রাখিও।
বাছিরুন বেগম হেসে মাথা নাড়লেন। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর বিপা উঠলো বাড়ি যাবার জন্য; রাস্তায় ওর চাচির সঙ্গে দেখা হলো। ভদ্র মহিলা অজ্ঞাত কারণে বিপাকে ঠিক পছন্দ করেন না। বিপা সেটা জানে বলেই তেমন একটা মেশার চেষ্টাও করে না। কিন্তু এভাবে মুখোমুখি দেখা হয়ে গেলে কথা না বলাটা খারাপ দেখায়। দু'-একটা কথা বলার পর সে জিজ্ঞেস করলো চাচাতো বোনদের খোঁজখবর,
--- চাচি, নিঝুম নেই বাড়িতে? ওকে দেখছি না যে…
--- ও ইউনিভার্সিটিতে পড়ে; বাড়িতে থাকে নাকি? অসময়ে ওরে খুঁজলে পাবা নাকি!
চাচি বেশ বিরক্ত কণ্ঠে বলেই চলে গেলেন। বিপা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো সেখানটায়।
__________
রাতে জুবায়ের হঠাৎ ফোন করলো বিপাকে। হঠাৎ ওর কল দেখে খানিকটা চমকালো বিপা। সারাদিনে মোটামুটি নিজের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে দূরে থেকে ওর মনটা ভালো হয়ে গিয়েছিল। এসময় জুবায়েরের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছিল না মোটেও।
তবুও কি ভেবে রিসিভ করতেই জুবায়ের ওকে আরো বেশি চমকে দিলো,
--- তুমি কি এই মুহূর্তে ইন্টারকন্টিনেন্টালে আছ, বিপা? সাজিদ ভাইয়ের সাথে এসেছ?
বিস্ময়ে মুখ থেকে কথা সরলো না ওর; জুবায়ের আবার বললো,
--- কিন্তু তুমি ওয়েস্টার্ন পরতে শুরু করেছ কবে থেকে? না, আই মিন ইটস ইয়্যর চয়েজ, কিন্তু… ভাইয়ের সাথে মেয়েটাকে ‘তুমি’ ভাবতে আমার একটু কষ্টই হচ্ছে।
বিপা তখনো চুপ; মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে যেন। জুবায়ের ফের বললো,
--- উপরতলায় যেতে দেখলাম; রুম নং কত? ভালো হয়েছে দেখা হয়ে; এই সুযোগে সাজিদ ভাইয়ের সাথে একটা মোলাকাত হবে নাহয়। সেদিন বাসায় গেলাম উনি ছিলেন না…
--- ওই মেয়েটা আমি নই, জুবায়ের। আমি কোনো হোটেলে যাইনি।
বহুকষ্টে উচ্চারণ করলো যেন। জুবায়ের ভ্রু কুঁচকে ফেললো,
--- তাহলে ওই মেয়েটা?
ভীষণ অবাক হয়ে বললো জুবায়ের --- সবটা বুঝতেই পারছে; তবুও যেন অস্পষ্ট। বিপার সুখের সংসারেও কি তবে ফাটল দেখা দিয়েছে?
পাঠকের উদ্দ্যেশ্যে লেখিকার কথাঃ [*** ভাতার শব্দটি একেক অঞ্চলে একেক অর্থ বহন করে। এক স্থানে গালি; অন্য স্থানে বুলি। যেই প্রেক্ষাপটে লিখেছি; সেখানে অর্থ দাঁড়ায় স্বামী। সুশীল পাঠকদের নাক না সিটকানোর অনুরোধ!]